ওলিউর রহমান ।।
২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল মতিঝিলের শাপলার বুকে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে সংগঠিত হওয়া ঐতিহাসিক লংমার্চ থেকে নবী প্রেমের যে ঢেউ জোয়ার হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল; একমাস পর মে মাসের ৫ তারিখে সে জোয়ার আরও গতি সঞ্চয় করে ফিরে এসেছিলে শাপলার চত্বরে। রাজধানীজুড়ে শ্বেত-শুভ্রতার মিছিল। যিকির ও স্লোগানে মুখরিত পরিবেশ।
৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আটক জামাত নেতাদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে গঠিত হওয়া শাহবাগের গণজাগরণমঞ্চ যখন অনলাইনে ইসলাম ও রাসূল অবমাননাকারীদের উন্মুক্ত প্লাটফর্মে পরিণত হলো তখন এই গন জাগরণমঞ্চের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং রাসূল অবমাননাকারীদের বিচারসহ আরও ১৩ টি দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ৫ মের গণ জমায়েত বা ঢাকা অবরোধ সংগঠিত হয়েছিল।
দেশের দ্বীনপ্রাণ লাখো লাখো তাওহিদী জনতার এই জোয়ার, এই আন্দোলন রাজনৈতিক আবরণমুক্ত থাকলেও ৫ মের অভূতপূর্ব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ‘ভেতরে-বাইরে’ অনেক রাজনীতি হলো। সে প্রেক্ষিতেই সংগঠিত হলো ঐতিহাসিক ‘দুঃখজনক ঘটনা’। ভারতের কবির সাথে সুর মিলিয়ে বলা যায়- ‘সব কুচ ইয়াদ রাখি গায়ি’।
আরো পড়ুন: শাপলা চত্বরে এক বিষণ্ন বিকেল : হয়তো এটিই আমার শেষ মুনাজাত
৫ মে ‘র স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সেদিনের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির অন্যতম সংগঠক এবং ইসলামি ঐক্যজোটের ইসলামী ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, এদেশের মানুষ যে ইসলামকে পছন্দ করে এবং উলামায়ে কেরামকে মান্য করে তার বড় প্রমাণ ছিল ৫ মের কর্মসূচি। শাসক গোষ্ঠীর সর্বাত্মক অসহযোগিতা সত্ত্বেও মানুষ তাদের ঈমানী কর্তব্য পালনে ইসলাম বিরোধী সংস্কৃতি, অপবিশ্বাস, উগ্রতা এবং নাস্তিক্যতাবাদের বিরুদ্ধে উলামায়ে কেরামের ডাকে স্বতস্ফুর্ত সাড়া দিয়েছিলো। পাশাপাশি ৫ মে’র সে ভয়াবহ রাতে আমরা একটি বিয়োগাত্মক, বেদনাদায়ক ঘটনারও সাক্ষী হলাম। উগ্রতা এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানির প্রতিবাদে নিজেদের ঈমানী দাবি আদায়ে আন্দোলন করতে আসা তাওহিদি জনতাকে পিটিয়ে, যুলুম করে ঢাকা থেকে তাড়ানো হলো।
আরো পড়ুন: শাপলায় ঘটে যাওয়া এক আবেগময় অধ্যায়
হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আযিযুল হক ইসলামাবাদীর স্মৃতিচারণে উঠে আসে ৫ মের অন্য চিত্র। তিনি বলেন, রাত তখন আড়াইটা, তিনটা। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত তাওহিদি জনতার কেউ তখন শাপলার চত্বরে ঘুমন্ত। কেউ তাহাজ্জুদে এবং জিকির, তিলাওয়াতে মশগুল। তাদের কাছে ছিলো তাসবীহ, জায়নামায। হঠাৎ ফকিরাপুল, নটরডেম এবং দৈনিক বাংলার দিক থেকে নিরস্ত্র, ক্লান্ত, অবসন্ন তাওহিদি জনতার ওপর গরম পানি, টিয়ার শেল, গুলি নিক্ষিপ্ত হতে লাগল।
সরকারি পর্যায়ে নানা কৌশলে সেদিন ‘কিছুই হয়নি’ বলা হলেও সেদিন অনেককিছু হয়েছিল। অনেত হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। যোগ করেন মাওলানা আযিযুল হক ইসলামাবাদী।
মাওলানা ইসলামাবাদীর মতে, ৫ মে কে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বর্বরতম কালো রাত্রি হিসেবে স্মরণ করা হবে।
আরো পড়ুন: বালাকোট থেকে মতিঝিল: মিল-অমিল
এদিকে ৫ মে পরবর্তী সময়ে সেই আন্দোলনের প্রভাব সম্পর্কে মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, জেল, জুলুমের মাধ্যমে ৫ মে কেন্দ্রীক উত্তানকে অবদমিত করা হলেও সেদিনের ঘটনা শাসকগোষ্ঠীকে এই বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছিল যে, ইসলাম ও মুসলমানকে উপেক্ষা করে কোনো মতাদর্শ এ দেশে চলতে পারে না। এরই প্রেক্ষিতে গণ জাগরণের মঞ্চও ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিলো।
৫ মে পরবর্তী হেফাজতের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারা প্রসঙ্গে আক্ষেপ করে মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, আন্দোলনকে কেন্দ্র যে জনসম্পৃক্ত তৈরি হয়েছিল হেফাজত নেতৃত্ব সে জনসম্পৃক্ততা খুব কাজে লাগাতে পারেনি। এর রাজনৈতিক নানা কারণ রয়েছে ঠিক। তবে আমাদের আরও কুরবানী ও মুজাহাদার প্রয়োজন ছিল।
আরো পড়ুন: ৪ এপ্রিল মুফতি আমিনী রহঃ-এর ডাকা ঐতিহাসিক হরতাল
হেফাজতের উত্থাপিত দাবিগুলো পূরণ হয়নি সত্যি। তবে নেতৃবৃন্দ তাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছেন বলে আমি মনে করি না। যোগ করেন মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন।
শুকরানা মাহফিল এবং নানা রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন কৌশলি উত্তর দেন। তিনি বলেন, শুকরানা মাহফিল তো হেফাজতের ব্যানারে ছিল না। তাই প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হলেও হেফাজতের উপর সে ঘটনার দায় পুরোপুরি চাপানো যায় না। হ্যা, কিছু মানুষের বক্তব্য ও আচরণ সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন উত্তাপনের সুযোগ করে দিয়েছে।
আরো পড়ুন: শাপলা চত্বরের ঘটনায় তৌহিদী জনতার পরাজয়ের কিছু নেই: আল্লামা কাসেমী
হেফাজতের বর্তমান উপস্থিতি এবং ভবিষ্যত বিষয়ে মুফতি সাখাওয়াত বলেন, হেফাজত একটি দ্বীনি আন্দোলন ও একটি চেতনার নাম। হেফাজত ওই অর্থে কোনো সংগঠন ছিলো না। হেফাজত কেন্দ্রিক আন্দোলন থেকে আমি আশাবাদি যে, আমরা যদি উপযুক্ত পরিবেশ করতে পারি তাহলে মানুষ ঈমান, ইসলামের ডাকে যেকোনো মুহূর্তে সাড়া দিবে।
একই ব্যাপারে মাওলানা আযিযুল হক ইসলামাবাদী নিজের মনোভাব এভাবে ব্যক্ত করেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশী মুসলমানদের ঈমান ও আকিদাভিত্তিক এ আবেগময় ধারার প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন। উগ্রস্যকুলার ও বামপন্থীরা হাজারো উসকানি দিলেও হেফাজত দৃঢ়তার সঙ্গে তার অরাজনৈতিক ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। হেফাজতে ইসলামের লক্ষ্য আদর্শিক, রাজনৈতিক নয়। সুতরাং হেফাজত আছে, থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আরো পড়ুন: ৬ এপ্রিল: শাপলায় আঁছড়ে পড়া নবী প্রেমের ঢেউ
















