আত্মা বেচাকেনার হাটের শিল্পী  

শরীফ মুহাম্মদ ।।

আরব দেশে রঙিন বাতাস লেগেছে বেশ আগেই। মিডিয়া ও সংস্কৃতির কাঁধে ভর করে এ বাতাস দিনদিন চাঙ্গা হয়েছে। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার সাথে হাত ধরাধরি করে অনুপ্রবেশ ঘটেছে অবিশ্বাস, সত্যের প্রতি বিদ্রোহ এবং বাতিল ধর্ম মতের প্রতি দাসত্বের মনোভাবের। এর অতি সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ হলো কুয়েতের এক নর্তকী-গায়িকা। বাংলাদেশের কোন কোন গণমাধ্যম সাধ করে তার পরিচয় দিয়েছে- ‘কুয়েতের নারী কন্ঠ শিল্পী’।

বিজ্ঞাপন

লজ্জাশীলতা, নিজের দ্বীনের প্রতি ন্যূনতম ভালোবাসা এবং বিচার-বিবেচনা খুইয়ে বসা এই নারী সম্প্রতি ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দিয়ে ‘ইহুদি’ হয়ে গেছে। না, এটা তার কোনো নীরব নিঃশব্দ আত্মোপলব্ধির ব্যাপার না, ঘোষণা দিয়ে, জানান দিয়ে, দুনিয়াব্যাপী ঢাকঢোল পিটিয়ে সে বোঝানোর ‘চেষ্টা’ করেছে, কেন সে ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দিয়েছে আর কেনই বা ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছে! যেকোনো আসমানী দ্বীন ধর্মের সঙ্গে ন্যূনতম সামঞ্জস্যহীন জীবনাচারের অধিকারী এই নারীর ধর্ম পরিবর্তনের এই তামাশা পর্যবেক্ষকদের মাঝে ব্যাপক কৌতুক ও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।

গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কুয়েতের নারী কণ্ঠশিল্পী ইবতিসাম হামিদ ঘোষণা করেছেন, তিনি ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। তিনি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছেন। ইসলাম ছেড়ে দেওয়ার পেছনের কারণগুলোও তিনি ‘ব্যাখ্যা করেছেন’। গতকাল বৃহস্পতিবার আরটির বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর।

মিডিল ইস্ট মনিটরের ভাষ্য, ইবতিসাম হামিদ ‘বাসমা আল-কুয়েতি’ নামে সুপরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছে। সেই ভিডিওতে অশ্লীল পোশাক আশাকে অভ্যস্ত এই নারী বলেছে, ‘আমি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছি। গর্বের সঙ্গে ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরের ঘোষণা করছি’।

ধর্ম পরিবর্তনের ব্যাপারটি যে তার মনোজাগতিক ধর্মীয় ও উপলব্ধি ঘটিত পরিবর্তন থেকে ঘটেনি, বরং এখানে শো অফ, তামাশা, আত্মম্ভরিতা, ইসলাম বিদ্বেষ এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অধিপতি ইহুদী-খ্রিস্টানদের তুষ্ট করার মতো দাসসুলভ মনোবৃত্তি কাজ করেছে, তা তার বিভিন্ন আচরণ ও বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। যেমন সে বলেছে, ‘ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তার বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়েছে’। ‘আমি ইহুদি’ এটি বলতে পেরে আমি গর্বিত।

গত কয়েক বছর ধরে আরবের মুসলিম সমাজ ও পরিবারগুলোর ভেতর থেকে হঠাৎ করে এমন একজন দুজন নারীর আবির্ভাব ঘটতে দেখা গেছে, যারা মুসলিম পরিবার রীতি, ইসলামের শালীনতা সমৃদ্ধ পর্দা বিধান এবং ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামের শৃঙ্খলাপূর্ণ দিকনির্দেশনার প্রতি ঝাঁঝালো ভাষায় বিষোদগার করেছে। এরা আরব কিংবা যে কোনো মুসলিম দেশ থেকে বের হয়ে পাশ্চাত্যের কোনো দেশে আশ্রয় চেয়েছে। একইসঙ্গে ইসলামী জীবনের ছিদ্রান্বেষী পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোর মজাদার ‘প্রোপাগান্ডা আইটেম’ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।

পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই ধারণা ছিল, এসব সাজানো ‘বিদ্রোহে’র পেছনে পশ্চিমা সভ্যতা ও ধর্ম ভিত্তিক এনজিওগুলোর ভূমিকা রয়েছে। প্রকাশ্য ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনা না ঘটায় সেই ধারণা বা সিদ্ধান্ত স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করা যায়নি। ‘ক্রীড়নক বিদ্রোহীরাও’ সরাসরি ধর্ম পরিবর্তন করে ‘ইহুদী’ কিংবা ‘খ্রিস্টান’ হয়ে যাওয়ার কথা এতদিন মুখ ফুটে বলেনি। এখন সেই ‘লাজশরমের’ দিন হয়তো আর নেই! এ জন্য ‘ইহুদি’ হয়েও বোকার মতো ‘গর্ব’ করছে।

পৃথিবীতে বর্তমানে ইহুদিধর্ম অনুসারী প্রধান শক্তি ও রাষ্ট্র সবচেয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী অভব্য শক্তি হিসেবে পরিচিত। অর্থ-বিত্ত প্রযুক্তি এবং শক্তির ক্ষেত্রে নানারকম প্রকাশ্য ও গোপন কারিশমা থাকলেও ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতি শান্তিবাদী পৃথিবীর কোনো নাগরিকের ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা রয়েছে, এমন নয়। কেবল ক্ষমতাপূজারী, শক্তির প্রতি আনুগত্যের মাথা-নোয়ানো হীনমন্যতাগ্রস্ত মানুষেরা ছাড়া এখনকার দিনে অন্য ধর্ম থেকে গিয়ে ইহুদি ধর্মের প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য স্থাপন করার ঘটনা বিরল, বলা যেতে পারে কিছুটা অসম্ভব। সেই সময়ে কুয়েতের এই অর্ধনগ্ন গায়িকা নিজেকে পুরো ‘দিগম্বর’ করে দিয়ে প্রমাণ করলো, আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের এই স্রোতে বিক্রি হয়ে যাওয়া বহু মুসলিম নারী পুরুষের মাথার মতো তার মাথাটিও একটি গর্বিত মাথা। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

এই নারী কি তার জীবন বদলে ফেলেছে? এই নারী কি জীবন ও যৌবনের সভ্যতার কোনো চাদর টেনে এনেছে? ইসলাম তাকে দেয়নি আত্মা হৃদয় ও সভ্যতার এমন কোনো শান্তি সে কি ইহুদি ধর্মে গিয়ে আত্মস্থ করেছে? তার ভাষায় ‘ইসলামের বহু ত্রুটি-বিচ্যুতির’ কথা বললেও তার নিজের জীবনের অন্ধপাঁক সে বদলাতে পারেনি। ইসলাম বিদ্বেষ প্রকাশ করতে গিয়ে হাজার বছরে ওরিয়েন্টালিস্ট ও ইসলাম বিদ্বেষী চক্র যেসব আরোপিত ছক ও ছবি এসেছে তা সে অতিক্রম করতে পারেনি। মালালা তসলিমারা ঘুরিয়ে পেচিয়ে যে দাসত্বের মিছিল সৃষ্টি করেছে, কুয়েতের এই ইবতিসাম সরাসরি সেই মিছিলের ব্যানার হাতে নিয়েছে।

শুধু আরব দেশ নয়, মুসলিম দেশগুলোতে আত্মা কেনাবেচার হাট জমজমাট করে তোলার খেলায় নেমেছে পাশ্চাত্যের ইসলামবিদ্বেষী মিশন ও চক্রগুলো। অপেক্ষা ছাড়াই এখনকার দিনগুলোতে এরকম ‘তামাশা’ প্রায়ই চোখে পড়তে পারে। নিঃসন্দেহ থাকুন, এইসব তামাশার পেছনে আত্মোপলব্ধি অথবা হৃদয়ের কোন চিৎকারের গল্প নেই, ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দেওয়ার নামে যেসব দৃশ্যচিত্র সামনে আনা হচ্ছে, এর সঙ্গে যুক্ত শুধু আত্মা বিক্রির ধান্ধা, এর সঙ্গে যুক্ত শুধু হৃদয় পোড়ানোর অমানবিক উৎসব।

-এনটি