আল্লামা তোফাজ্জল হক হবিগঞ্জী: ঘরোয়া জীবনের টুকিটাকি

মাওলানা তোফাজ্জল হক হবিগঞ্জী (১৯৩৮ — ২০২০)। ছিলেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা একজন প্রবীণ আলেম। তার ঘরোয়া জীবনের স্মৃতি জানতে তার ছাহেবযাদা মাওলানা তাফহীমুল হকের সাথে কথা বলেছেন ইসলাম টাইমসের এনাম হাসান জুনাইদ। মোবাইল ফোনে নেওয়া সাক্ষাতকারটির অংশবিশেষ তুলে দেয়া হল  ইসলাম টাইমসের পাঠকদের জন্য।  

 এনাম হাসান: কোনো চিন্তা ছাড়াই আপনার আব্বার কোন স্মৃতিটি এখনো চোখে ভাসছে?

বিজ্ঞাপন

মাওলানা তাফহীম: এই প্রশ্ন করলে তো আর জবাব খুজে পাই না কোনটা রেখে কোনটা বলব। ছোট্ট একটা ঘটনা বলি। তখন আমি অনেক ছোট। আব্বা বাসায় কি যেন লিখছেন। আব্বার হাতে ফোর কালারের একটা কলম।

আম্মা বাজারের লিস্ট বা এজাতীয় কোনো কাজের জন্য কলমটা চাইলেন। আব্বা আমাকে ৫ টাকা দিয়ে বললেন, যাও একটা কলম নিয়ে আস তোমার আম্মার জন্য। আমার হাতের কলমটা তো মাদরাসার।

আমানতের প্রতি তার সচেতনতা আমাকে এখনো নাড়া দেয়।

আরেকবার আমাকে পানি আনতে বললেন। তার সামনে একজন মেহমান। আমি পানি এনে দিলাম। গ্লাস উপরের দিকে ধরেছিলাম। তিনি শিখিয়ে দিলেন, গ্লাস দিয়ে কাউকে পানি দেয়ার সময় নিচের দিকে ধরতে হয়। উপরের দিকে না।

এনাম হাসান: অর্থিক খরচ আয়ব্যয়ের ক্ষেত্রে আপনার আব্বার নীতি কেমন ছিল? পরিবারে সদস্যের ক্ষেত্রে বাইরের লোকদের ক্ষেত্রে?

মাওলানা তাফহীম: আমার আব্বা তাদরীসের পাশপাশি সব সময় ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। আমাদের জন্মের আগ থেকে আব্বা ব্যবসা করতেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যবসা করেছেন। কখনো লাভ হয়েছে কখনো লোকসান হয়েছে। আব্বার রেখে যাওয়া রডসিমেন্টের ব্যবসা এখনো আমরা ধরে রেখেছি।

ব্যয়ের ক্ষেত্রে আব্বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করতেন। আমাদেরকে আয়েশিভাবে চলার সুযোগ দিতেন না। তবে বাড়িতে মেহমান আসলে আব্বা দু’হাত খুলে খরচ করতেন। আমাদের মাদরাসার মাহফিলে যে সব আলেম আসতেন তারা আমাদের বাসায় খেতেন। আব্বা আমাদের মাধ্যমে তাদের মেহমানদারি করাতেন।

একবার ব্যবসার জন্যে আব্বার কাছে ঋণ চাইলাম। আব্বা বললেন কবে ফেরত দেব। যেদিন সময় হল সেদিন আব্বা আমাকে মনে করিয়ে দিলেন। আমি আব্বার টাকা বুঝিয়ে দিলাম। আব্বা তখন বললেন, মোআমালা এভাবেই করতে হয়। তারপর টাকাটা আবার ফিরিয়ে দিলেন।

আমাদের বিয়ে শাদি আব্বাই করিয়েছেন। কিন্তু বিয়ে শাদির পর অনেক টানাটানির মধ্য দিযে যেতে হয়েছিল আমাকে। তখন আব্বা ইচ্ছা করেই আমাদের সহযোগিতা করতেন না। আম্মা পীড়াপীড়ি করলে বলতেন, তাদের চলতে দাও। এভাবে তারা শক্ত হবে। আব্বার এই প্রশিক্ষণ জীবনে বহু কাজে এসেছে। আব্বার জন্য এখন দোয়া। সত্যি সংকট আমাদেরকে অনেক সমৃদ্ধ করে।

এনাম হাসান: আপনারা কি আপনার দাদা-দাদিকে পেয়েছেন? তাদের সাথে আপনার আব্বার আচরণ কেমন ছিল একটু বলবেন কি?

মাওলানা তাফহীম: হা, আমরা আলহামদুলিল্লাহ আমাদের দাদাদাদি দুজনকেই পেয়েছি। আমাদের দাদাও বড় আলেম ছিলেন। দাদা বলতেন, তোমার আব্বাকে আমি ছোট বয়সে শিখিয়েছি কিভাবে ঢিলা নিতে হয়। এরপর তোমার বাবাকে আর কখনো এর ব্যতিক্রম করতে দেখিনি। তোমার আব্বার আখলাক হল সুন্নতের পূর্ণ অনুগত।

আব্বাও দাদাকে অনেক সম্মান ও ভক্তি করতেন। খাবারের সময় বাচ্চাদেরকে মা বাবা যেভাবে খাওয়াতেন সেভাবে দাদাকে খাওয়াতেন।

সফর  থেকে ফিরে প্রথমেই দাদির সাথে দেখা করতেন। দাদির খোঁজ নিতেন।

আমার দাদিও আব্বাকে তেমনই স্নেহ করতেন। একবার লন্ডনে সফরে যাওয়ার দাদির কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলে আব্বার কপালে চুমা খেলেন। আমরা তখন হাসছিলাম। দাদি বললেন, তোমাদের সন্তান হলে তোমরা বুঝবে। সন্তান মা বাবার কাছে কখনো বৃদ্ধ হয় না।

এনাম হাসান: তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনার আব্বার কয়েকটি নসীহত বলুন

মাওলানা তাফহীম: তরুণদের উদ্দেশে আব্বার যে নসীহতগুলো এমুহূর্তে আমার মনে আসছে তা হল

১. সব সময় বুজুর্গদের সাথে লেগে থাকবে। শুধু আলেম হলেই হবে না, যুগ সচেতন আলেম হতে হবে।

একমন ইলমের জন্য ৩ মণ হেকমত দরকার। এই নসীহতের পেছনের গল্পটা বেশ মনে পড়ছে। একবার সাবরেজিস্টার অফিসের জায়গা অবস্থিত একটি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয়। আব্বা তখন এর প্রতিবাদ করেন। এক পরিচিত মুফতি সাহেব ফতোয়া দিলেন মসজিদ ভাঙ্গা জায়েয হয়েছে। আব্বা তখন তাকে বললেন, এক মণ ইলমের জন্য ৩ মন হেকমত দরকার। তুমি যে আজ সরকারি জায়গার দোহায় দিয়ে মসজিদ ভাঙ্গার জায়েয হওয়ার ফতোয় দিলে দেশে তো সরকারি জায়গা আরো অনেক মসজিদ আছে এবার তো সরকার সব জায়গার মসজিদ ভাঙ্গা শুরু করবে। তখন তুমি কি করবে।

 ইজে