হাদীসে বর্ণিত ঘুমের আগে পালনীয় কিছু সুন্নত ও আদাব

মাওলানা মুহাম্মাদ আনওয়ার হুসাইন।।

ঘুম আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নিআমত। বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ অনুগ্রহ ও দান। সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য ঘুমের বিকল্প নেই। শারীরিক-মানসিক ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করতে এই পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলা ঘুমকে অন্যতম প্রধান মাধ্যম বানিয়েছেন। আসুন জেনে নেওয়া যাক হাদীসে বর্ণিত ঘুমের পূর্বের কিছু সুন্নত।

বিজ্ঞাপন

এক. ঘুমের পূর্বে ওযু করা

ঘুমের পূর্বে ওযু করে নেয়া উত্তম। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إِذَاأَتَيْتَ مَضْجَعَكَ فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلَاةِ

যখন তুমি বিছানায় গমন করবে তখন নামাযের ওযুর মতো ওযু করে নাও। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৭

মুজাহিদ রাহ. বলেন, আমাকে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন-

لَاتَنَامَنَّ إِلاَّعَلَى وُضُوءٍ،فَإِنَّ الْأَرْوَاحَ تُبْعَثُ عَلَى مَاقُبِضَتْ عَلَيْهِ

তুমি অযু ছাড়া ঘুমোতে যাবে না। কেননা সকল রূহ পুনরুত্থিত হবে ঐ অবস্থার ওপর যে অবস্থায় তা কবজ করা হয়েছে। -জামে মা‘মার ইবনে রাশেদ।

ورجاله ثقات إلاأبايحيى القتات هوصدوق فيه كلام ) فتحالباريلابنحجر (১১/ ১১০)

আবুল ওয়ারদ ইবনে হামিদ রাহ. বলেন,

قُلْتُ لِعَبْدِالرَّحْمَنِ بْنِ السَّلْمَانِيِّ: هَلْ صَحِبْتَ أَحَدًامِنْأَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُحَدِّثُنَاعَنْهُ؟ قَالَ: نَعَمْ , غَيْرُوَاحِدٍ , قَالَ: مَامِنْ رَجُلٍ يَأْوِي إِلَى فِرَاشِهِ , وَهُوَطَاهِرٌ , ثُمَّ يَنَامُ وَهُوَذَاكِرٌ , إِلاَّكَانَ فِرَاشُهُ لَهُ مَسْجِدًاوَإِلاَّكَانَ فِي صَلَاةٍ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ.

আমি আব্দুর রহমান ইবনে সালমানী রাহ.-কে বললাম, আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সাহাবীর সঙ্গ লাভ করেছেন, যার থেকে আপনি কোনো হাদীস বর্ণনা করেন? তিনি বললেন হাঁ! আমি একাধিক সাহাবী থেকে হাদীস শুনেছি। তারা বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন অযু করে বিছানায় যায় অতঃপর সে যিকির করতে করতে ঘুমায়, তার বিছানা হয়তো তার জন্য মসজিদ হয়ে যায়। অথবা জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত পুরো সময় তার নামাযের মতো কাটে। -আততাহুর, কাসেম ইবনে সাল্লাম

দুই. ঘুমের পূর্বে বিছানা ঝেড়ে নেয়া

ঘুমের পূর্বে বিছানা ঝেড়ে নেয়া মুস্তাহাব। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إِذَاأَوَى أَحَدُكُمْ إِلَى فِرَاشِهِ فَلْيَنْفُضْ فِرَاشَهُ بِدَاخِلَةِ إِزَارِهِ،فَإِنَّهُ لَايَدْرِي مَاخَلَفَهُ عَلَيْهِ

যখন তোমাদের কেউ বিছানায় শয্যা গ্রহণ করতে যায়, সে যেন তার লুঙ্গির/চাদরের ভেতর দিক দিয়ে নিজ বিছানা ঝেড়ে নেয়। কারণ তার জানা নাই যে, বিছানার উপর তার অনুপস্থিতিতে পীড়াদায়ক কোনো কিছু পড়েছে কি না।’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩২০

এজন্য ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে বিছানা ভালোভাবে ঝেড়ে নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বিছানায় ঘুমাতে হবে। বিছানা পরিষ্কারের জন্য কোনো কাপড় বা বিছানার ঝাড়– দিয়েও পরিষ্কার করতে কোনো অসুবিধা নেই। হাদীস শরীফে যে লুঙ্গির কথা এসেছে মুহাদ্দিসীনে কেরাম এর কারণ ব্যক্ত করেছেন এই যে, সে সময় সাহাবায়ে কেরামের নিকট বাড়তি কাপড় ছিল না। যে কারণে পরিধেয় কাপড়ই বিছানা ঝাড়ার কাজে ব্যবহার করা হত।

 

তিন. ঘুমের পূর্বে চুলা, মোম বাতি ইত্যাদি নিভিয়ে দেয়া

ঘরে চুলা জ্বালানো থাকলে বা মোমবাতি, কয়েল ইত্যাদি জ্বালানো থাকলে যা থেকে অসাবধানতাবশত আগুন লাগার আশঙ্কা থাকে, ঘুমের পূর্বে তা নিভিয়ে ফেলা। এগুলো জ্বালানো রেখে ঘুমানো নিষেধ। হাদীস শরীফে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لاَتَتْرُكُواالنَّارَفِي بُيُوتِكُمْ حِينَ تَنَامُونَ

তোমরা যখন ঘুমাতে যাবে ঘরে আগুন জ্বেলে রাখবে না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২০১৫

আবু মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন-

احْتَرَقَ بَيْتٌ بِالْمَدِينَةِعَلَى أَهْلِهِ مِنَ اللَّيْلِ،فَحُدِّثَ بِشَأْنِهِمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: إِنَّ هَذِهِ النَّارَإِنَّمَا هِيَ عَدُوٌّلَكُمْ، فَإِذَا نِمْتُمْ فَأَطْفِئُوهَاعَنْكُمْ

একবার রাতে মদিনার এক ঘরে আগুন লেগে ঘরের লোকজনসহ পুড়ে গেল। এদের অবস্থা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করা হল। তিনি বললেন এ আগুন নিঃসন্দেহে তোমাদের শত্রু। সুতরাং তোমরা যখন ঘুমাতে যাবে তখন তা নিভিয়ে দিবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬২৯৪

চার. ঘুমের পূর্বে কিছু দুআ-আযকার

ঘুমের পূর্বে তিন কুল পড়া মুস্তাহাব। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও উপকারী আমল। এতে বান্দা যেমন আল্লাহ্র ওয়াহদানিয়াত অর্থাৎ একত্বের স্বীকারোক্তি  এবং শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা প্রদান করে তেমনি আঁধার রাতের সবধরনের অনিষ্টতা ও ক্ষতি হতে আফিয়াত ও নিরাপত্তার জন্য বান্দা নিজেকে আল্লাহ্র হাতে সঁপে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত এ আমল করতেন। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন-

أَنَّ النَّبِيَّ صلى اللهُ عليه وسلم كَانَ إِذَاأَوَى إِلَى فِرَاشِهِ كُلَّ لَيْلَةٍ، جَمَعَ كَفَّيْهِ ثُمَّ نَفَثَ فِيهِمَا فَقَرَأَ فِيهِمَا: قُلْ هُوَاللّٰهُ اَحَدٌ وَقُلْ اَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ وَقُلْ اَعُوْذُ  بِرَبِّ النَّاسِ  ثُمَّ يَمْسَحُ بِهِمَا مَااسْتَطَاعَ مِنْ جَسَدِهِ، يَبْدَأُ بِهِمَاعَلَى رَأْسِهِ وَوَجْهِهِ، وَمَاأَقْبَلَ مِنْ جَسَدِهِ، يَفْعَلُ ذَلِكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রাতে যখন বিছানায় গমন করতেন তখন তিনি সূরা ইখলাস সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে দুহাত একত্র করে তাতে ফুঁক দিতেন। অতঃপর যতদূর সম্ভব সমস্ত শরীরে হাত বুলাতেন। মাথা ও মুখ থেকে আরম্ভ করে তাঁর দেহের সম্মুখ ভাগের ওপর হাত বুলাতেন এবং তিনবার তিনি এরূপ করতেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০১৭

নিজে এ আমল করা এবং শিশুদেরকে তা শিক্ষা দেয়া। শিশুরা এ সূরাসমূহ না জানলে পিতা মাতা নিজে পড়ে হাতে ফুঁক দিয়ে শিশুদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে পারেন। এতে ইনশাআল্লাহ আমলের উপকারিতা তারাও লাভ করবে।

পাঁচ. ঘুমের দুআ পড়া এবং ডান গালের নিচে ডান হাত রাখা

হাদীস শরীফে ঘুমের সময়ের বিভিন্ন দুআ যিকির-আযকার ও অযীফার কথা বর্ণিত হয়েছে। এখানে সংক্ষেপে কিছু দুআ আযকার উল্লেখ করা হলো। আরো বিস্তারিত জানার জন্য আওরাদ আযকারের কিতাব দেখে নেয়া যেতে পারে।

হযরত হুযাইফা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন-

كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَخَذَ مَضْجَعَهُ مِنَ اللَّيْلِ، وَضَعَ يَدَهُ تَحْتَ خَدِّهِ، ثُمَّ يَقُولُ: اللَّهُمَّ بِاسْمِكَ أَمُوتُ وَأَحْيَا وَإِذَا اسْتَيْقَظَ قَالَ: الحَمْدُ لِلهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَمَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শয্যা গ্রহণ করতেন তিনি তাঁর হাতকে গালের নিচে রাখতেন এরপর বলতেন-

اللَّهُمَّ بِاسْمِكَ أَمُوتُ وَأَحْيَا

হে আল্লাহ আপনার নামেই মৃত্যুবরণ করি আপনার নামেই জীবিত হই। আর যখন ঘুম থেকে উঠতেন তখন বলতেন-

الحَمْدُ لِلهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَاأَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

মুসনাদে আহমাদ-এ বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন-

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ إِذَا نَامَ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى تَحْتَ خَدِّهِ وَقَالَ: اللهُمَّ قِنِي عَذَابَكَ يَوْمَ تَبْعَثُ عِبَادَكَ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শয়ন করতেন তখন তার ডান হাত গালের নিচে রেখে বলতেন-

اللَّهُمَّ قِنِي عَذَابَكَ يَوْمَ تَبْعَثُ عِبَادَكَ

হে আল্লাহ আপনি যখন আপনার বান্দাদেরকে কবর থেকে উঠাবেন সেদিন আমাকে আপনার আযাব থেকে রক্ষা করুন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৮৬৬০; সুনানে আবী দাউদ, হাদীস ৩৮৭৭

-এনটি