‘আজকের পর আলআকসার বিড়াল ও পায়রাগুলিকে কে খাবার দেবে!’

জুমান আবু আরাফা ।।

চলে গেলেন আল-আকসা মসজিদের আশেক ফিলিস্তিনিদের প্রিয় ‘‘গাসসান ইউনুস আবু আইমান৷’’

বিজ্ঞাপন

তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া মাত্র তাঁর স্মৃতিগুলো ফিলিস্তিনিদের হৃদয়পটে উত্তাল সাগরের মতো উথলে উঠে৷

তিনি “আবু হুরায়রাতুল আকসা” উপাধিতে মসজিদুল আকসার মুসল্লিসহ সকল ফিলিস্তিনিদের মধ্যে পরিচিত ছিলেন। কারণ তিনি মসজিদে আকসার পাখি ও বিড়ালগুলির বেশ যত্ন নিতেন এবং নিয়মিত খাবার খাওয়াতেন৷

মজার বিষয় হলো- তিনি মসজিদের আঙ্গিনায় প্রবেশ করলে কিংবা মসজিদ থেকে বের হলেই পাখিরা তাকে দেখে ছুটে আসতো৷ বিড়ালগুলো দৌঁড়ে এসে তার চারপাশে ভীড় জমাতো৷ একটা ভিডিও ফুটেজে চিত্রটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে৷ হৃদয়ের গভীরকে ছুঁয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্য৷ হৃদয়তন্ত্রীতে বেঁজে উঠে বেদনার একটা করুণ সূর!

সত্যি তার মৃত্যুতে আকসার পাখি ও বিড়ালগুলো যেন ভীষণ শোকাহত ও অসহায় হয়ে পড়েছে! সত্যি বলতে কী, আমিও মনের গভীরে কেমন এক কষ্ট অনুভব করলাম৷  মনের অজান্তেই কেন যেনো আমার চোঁখের পাতাদুটোও……

‘আবু হুরাইরাতুল আকসা’ ৩ মাস আগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন৷ (সোমবার ১৮ জানুয়ারি, ২০২১) ফিলিস্তিনের “আররা” শহরে তাঁর ইন্তেকাল হয়৷ তখন তার বয়স হয়েছিলো ৭২ বছর৷ প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আবু আয়মান সেখান থেকে প্রতিদিন বাসে কিংবা গাড়িতে করে আড়াই ঘণ্টারও বেশি পথ অতিক্রম করে মসজিদে আকসায় আসা-যাওয়া করতেন।

মসজিদে আকসাকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন৷ তাই  মসজিদে আকসায় একটা স্মৃতি তিনি রেখে যেতে চাইতেন৷ সর্বদা  তিনি কাঁধে কালো একটি ব্যাগ ঝুলিয়ে, হাতে অন্য কয়েকটি ব্যাগ নিয়ে মসজিদে আকসায় আসতেন৷ ব্যাগগুলোতে ভরা থাকতো পাখি ও বিড়ালদের জন্য হরেক রকমের খাবার৷ দর্শনার্থীদের জন্য মিষ্টি৷ শিশুদের জন্য বিভিন্ন উপহার ও নানা ধরনের  মিষ্টান্ন দ্রব্য৷

মসজিদে আকসায় তিনি প্রবেশ করার সাথে সাথে বিড়ালরা তার চারপাশে জড়ো হতো৷ পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে, একেবারে নিচে নেমে তাঁর মাথার উপর চক্কর দিতে থাকতো৷ মুগ্ধ দৃষ্টিতে হৃদয়কাড়া এই দৃশ্যগুলি  সবাই দেখতো৷

ইসরায়েলীয় আগ্রাসন তাকে বেশ কয়েকবার আল-আকসা মসজিদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলো৷  তবু তিনি সর্বদা হাসিখুশি থাকতেন৷ তবে ইসরায়েলী ভীরু সৈন্যরা তার উপর আক্রমন করার তেমন সাহস পেত না৷ সম্ভবত তারা জানতো যে, তার দিকে ক্ষতির হাত বাড়ালে তার ভক্ত ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আর বিড়ালের আক্রমনে তাদের বারোটা বাজবে৷ কারণ মানুষের সাথে যুদ্ধ করা যায়, কিন্ত আল্লাহর সৈন্যদের সাথে লড়াই করবে এমন হিম্মত কার?

তিনি হুজুর সা._র প্রিয় সাহাবী আবু হুরায়রার মতো সরল ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন৷ তার হৃদয়-কাননে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়তো মায়া ও ভালোবাসার শিশির বিন্দু, যা সর্বদা সবাইকে সিক্ত করতো৷

আল-আকসার দর্শক ও মুসল্লিদের কাছে  তিনি অনেক প্রিয় ও পরিচিত ছিলেন৷ প্রায়ই তাদেরকে তিনি  মিষ্টি মুখ করাতেন, তাদের কাছে দোয়া চাইতেন৷

আর শিশুদের পেলে তো তাঁর  আনন্দের সীমা থাকতো না৷ শিশুদেরকে দেখামাত্রই হাস্যজ্জল চেহারায় ওদের কাছে ছুটে যেতেন৷ ওদের সাথে গল্প ও হাসি কৌতুক করতেন৷ নানা রকমের উপহার  দিতেন৷ আদর করে মিষ্টি খাওয়াতেন৷

গত সোমবার তিনি মসজিদে আকসাকে বিদায় জানিয়ে মহান প্রভূর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারের পাড়ি জমান৷ তাঁর মৃত্যু সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয় শোকের কালো ছায়া৷

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ভরে আছে তাঁর শোক ও কীর্তীগাঁথা হাজার হাজার স্ট্যাটাসে, প্রবন্ধে৷ একজন লিখেছেন, ‘‘দীর্ঘকায় হাস্যজ্জল ও ঘন শুভ্র দাড়ি বিশিষ্ট এই লোকটির নূরানী চেহারায় পূর্ণিমা চাঁদের মতো এক টুকরো হাসি সর্বদা লেগেই থাকতো৷

তাঁর চেহারা থেকে ছড়িয়ে পড়তো প্রশান্তিময় আলোকচ্ছটা৷ মসজিদে আকসা ও তার দর্শনার্থী ও মুসল্লিগন  অবশ্যই তাকে স্মরণ করবে৷ স্মরণ করবে তাকে আকসার পাখি ও বিড়ালগুলো৷’’

দখলদার ইসরায়েলী সৈন্যরা যদি আকসার খোলা প্রাঙ্গনে তার জানাযার অনুমতি দিতো, তাহলে সেদিন শুধু শত শত মানুষই নয়, হাজার হাজার পাখি এবং বিড়ালও  তার জানাযায় হয়তো শরীক হতো৷ পৃথিবী সেদিন অবলোকন করত বিস্ময়কর এক বিরল দৃশ্য!

আকসার আবু হুরায়রার স্মৃতিগুলো প্রতিটি ফিলিস্তিনির বুকে, এবং আকসার প্রতিটি ইট ও বালুকনার কাছে চীর ভাস্বর হয়ে থাকবে৷ কিন্ত সেখানকার অসহায় বিড়াল ও পাখিগুলি আকসার প্রধান ফটকে আশাতুর দৃষ্টিতে তাঁর অপেক্ষায় সর্বদা তাকিয়ে থাকবে….!

আলজাজিরা আরবি থেকে অনুবাদ:  ইয়াহইয়া বিন আবু বকর নদভী

-এমএসআই