স্মৃতির দর্পণে হযরত মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমী রাহ.

মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ।।

জন্ম : রবিউল আওয়াল ১৩৬৭ হি. মোতাবেক ২১-০১-১৯৪৮ ঈ.

বিজ্ঞাপন

মৃত্যু : ২৭-০৪-১৪৪২ হি. মোতাবেক ১৩-১২-২০২০ ঈ. রবিবার

হযরত রাহ.-এর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল, যখন অধম মাদরাসা আরাবিয়া খেড়িহরে মাধ্যমিক স্তরের কোনো জামাতের তালিবে ইলম ছিলাম। যোহরের পর মাদরাসার জামে মসজিদে তালিবে ইলমদের উদ্দেশে বয়ানও করেছিলেন।

জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বিন্নুরী টাউনে পড়াশুনাকালীন ১৪০৯ হিজরীর রমযানে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে আসা হয়েছিল। তখন হযরতের খেদমতে হাজির হয়েছিলাম। সেটা ছিল হযরতের সঙ্গে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। এই সাক্ষাৎ জামিয়া মাদানিয়া বারিধারায় হয়েছিল। জামিয়া মাদানিয়া তখন সবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এরপর তৃতীয় সাক্ষাৎ হয়, যখন বান্দা ১৪১৬ হিজরীর রজব মাসে তলবে ইলমের সফর থেকে ফিরে আসি। খুবসম্ভব ১৪১৬ হিজরীর শাবানে বা রজবের শেষে জুমার দিন কুমিল্লা টাউনহল মিলনায়তনে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আব্বাজান রাহ., মুফতী দিলাওয়ার হুসাইন ছাহেব এবং বান্দাও অংশগ্রহণ করি। তার আগের দিন কুমিল্লায় অনেক বড় ওয়াজ-মাহফিল হয়েছিল। সেখানে আমরা শরীক হয়েছিলাম আর তার পরের দিন সেমিনারে। সেমিনারে হযরত রাহ. জনাব সায়্যেদ আবুল আ‘লা মওদুদী মরহুমের ভুল চিন্তা-চেতনা এবং জামাতে ইসলামীর চিন্তাগত বিপথগামিতা সম্পর্কে বিস্তারিত ও তথ্যনির্ভর আলোচনা করেছিলেন।

এরপর যখন শাওয়াল ১৪১৬হি. মোতাবেক মার্চ ১৯৯৬ঈ.-এ মারকাযুদ দাওয়াহর সূচনা হয়, সম্ভবত চার-পাঁচ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন বারিধারায় হাজির হয়ে হযরতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম  এবং তাঁকে মারকাযুদ দাওয়াহ সম্পর্কে জানিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, বড়দের মশওয়ারায় শুরু হয়েছে; ভালো হয়েছে। তবে আপনি যদি শুরুতে একবার দরসে নেযামীর সকল কিতাবের তাদরীস করে নিতেন তাহলে ভালো হত।

হযরতের সুউচ্চ মাকাম সম্পর্কে তখনই কিছু ধারণা হয়ে গিয়েছিল, যখন বান্দা খেড়িহর মাদরাসায় ছিলাম। আব্বাজান হযরত মাওলানা শামসুল হক রাহ.-এর সামনে এই প্রসঙ্গ উঠল যে, হযরত তাঁর শাগরিদ; তখন আব্বাজান বললেন, শাগরিদ তো ওই সময়ে ছিলেন; এখন তো তিনি মাশাআল্লাহ কত বড় আলেম হয়ে গেছেন!

হযরত রাহ. আব্বাজানের কাছে কাশিপুর মাদরাসায় (মনোহরগঞ্জ, লাকসাম, কুমিল্লা; হযরতের এলাকা চড্ডা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত) তাইসীরুল মুবতাদী ও আলমানতিক পড়েছিলেন। তিনি আব্বাজানের সুন্দর পাঠদান পদ্ধতির ভক্ত ছিলেন এবং তাঁর অনেক প্রশংসা করতেন। মাদরসার প্রতি তাঁর নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার গুণটি তিনি বিশেষভাবে আলোচনা করতেন। এ কথাটি তো তাঁর থেকে (আব্বাজানের জীবদ্দশায়ও এবং ইনতিকালের পরেও) অনেকবার শুনেছি যে, তিনি মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন। হযরত বলেছেন, বর্তমানে মাদরাসা এবং তালিবে ইলমদের জন্য উৎসর্গিতপ্রাণ মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন! কিন্তু যারা হযরতকে চেনেন তারা খুব ভালোভাবেই জানেন-এই বৈশিষ্ট্যগুলো হযরতের মাঝে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল।

আব্বাজান রাহ.-এর নিসবতের কারণে তিনি অধম ও ভাইজান (হযরত মাওলানা মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ)-কে মহব্বত করতেন। বান্দার দাওয়াতে তিনি একাধিকবার মারকাযুদ দাওয়াহ্য় তাশরীফ এনেছিলেন। সর্বশেষ তাশরীফ এনেছিলেন মারকাযুদ দাওয়াহর হযরতপুর প্রাঙ্গণে।

১ মুহাররম ১৪৪০ হি. তারিখে সকাল সকাল তিনি তাশরীফ আনেন। মেহমানখানায় হযরতের খেদমতে একাকী কিছু সময় বসার সুযোগ হয়। পরে কিসমুদ দাওয়াহ-এর প্রথম বর্ষের কামরায় ছাত্র-উস্তায সবাইকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মজলিস হয়। হযরত দীর্ঘ সময় কথা বলেন। যেন তালিবে ইলম ও মুদাররিসগণের পুরো পাথেয় তিনি এক বয়ানেই দিয়ে দেন। আলহামদু লিল্লাহ সেই বয়ান মাসিক আলকাউসারের যিলহজ্ব ১৪৪০হি. (আগস্ট ২০১৯ঈ.) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। আমার খেয়াল-তলাবায়ে কেরাম ও নবীন মুদাররিসগণ এই বয়ান অবশ্যই পড়বেন।

মেহমানখানার মজলিসে তিনি অনেক বিষয়ে আলোচনা করেন। তাঁর সহপাঠী এবং আমাদের উস্তায হযরত মাওলানা মুফতী হাবীবুর রহমান ছাহেব (তাঁর খান্দানী নাম আলাউদ্দীন। ফরিদাবাদ, তারপর খেড়িহর এবং এরপর মালিবাগ মাদরাসায় তাদরীসের খেদমত আঞ্জাম দেন। ১৯৯৮ ঈসায়ী সনে তাঁর ওফাত হয়)-এর বিষয়ে বলেন-কাফিয়া, শরহে জামী, শরহে বেকায়া ও হেদায়া (আওয়ালাইন) আমরা (কুমিল্লা বরুড়া মাদরাসায়) একসঙ্গে পড়েছিলাম।  দেওবন্দে কোনো কারণে (হয়ত পরে গিয়েছিলেন) তিনি এক বছর পরে ছিলেন। সে কারণেই তিনি বুখারী শরীফ হযরত মাওলানা ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী রাহ.-এর নিকট পড়তে পারেননি। শুধু ‘বাদউল ওহী’র অংশটুকু পড়তে পেরেছিলেন।

তিনি বলেন, মাওলানা হাবীবুর রহমান ছাহেব শরহে জামীর বছর হিফয শুরু করেন। আর জালালাইনের বছর তা সম্পন্ন হয়। কিন্তু মাঝখানে কোনো জামাত বাদ দেননি। তিনি কখনো গীবত করতেন না। কোনো মজলিসে গীবত হলে উঠে যেতেন। হকের বিষয়ে কোনো ছাড় দিতেন না; সরাসরি বলে দিতেন।

এরপর হযরত নিজের ছাত্রজীবনের কিছু কারগুজারী শোনান। তিনি দীর্ঘ ছয় বছর হযরত মাওলানা কারী তায়্যিব ছাহেব রাহ.-এর মজলিসে বসেছিলেন। সাহারানপুরে শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহ.-এর মজলিসে যেতেন এবং দেওবন্দে মুফতী মাহমূদ হাসান গাঙ্গুহী রাহ.-এর মজলিসে বসতেন।

দারুল উলূমে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করার পর তাকমীলে আদব মাওলানা ওহীদুয যামান কিরানবী রাহ-এর নিকট পড়েন। দেওবন্দে তাকমীলে মা‘ক‚লাতও পড়েন। হযরত নানূতবী রাহ.-এর রিসালাসমূহ মূফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রাহ.-এর কাছে পড়েন। মুসলিম শরীফ (উভয় খণ্ড) পড়েন মাওলানা শরীফুল হাসান রাহ.-এর নিকট। আবু দাউদ শরীফ (উভয় খণ্ড) পড়েন দেওবন্দ নিবাসী মাওলানা আবদুল আহাদ রাহ.-এর নিকট। তিরমিযী ও শামায়েল পড়েন মাওলানা ফখরুল হাসান মুরাদাবাদী রাহ.-এর নিকট। ইবনে মাজাহ পড়েন হযরত শাহ ছাহেব রাহ.-এর শাগরিদ মাওলানা ইসলামুল হক আযমী রাহ.-এর নিকট। মাওলানা ইসলামুল হক সাহেব ‘আততাহকীকুল  মারযী’ নামে মাইবুযীর শরাহ লিখেছিলেন। এমনিভাবে মুকাদ্দিমায়ে মেশকাতেরও শরাহ লিখেছেন।

হযরত বলেন, মুয়াত্তা মালেক আমরা মাওলানা নাসীর আহমাদ খান রাহ.-এর কাছে আর মুয়াত্তা মুহাম্মাদ মাওলানা নাঈম ছাহেব রাহ.-এর কাছে পড়েছি। তহাবী পড়েছি মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মিরী রাহ.-এর নিকট। সে বছরেই তাঁর দরস দাওরাতে উন্নীত হয়।

নাসায়ী শরীফ পড়েছি মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন বিহারী রাহ.-এর নিকট। বুখারী (প্রথম খণ্ড) পড়েছি মাওলানা ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী রাহ.-এর নিকট। দ্বিতীয় খণ্ডপড়েছি ফকীহুল উম্মত মুফতী মাহমূদ হাসান গাঙ্গুহী রাহ.-এর নিকট। মেশকাত (প্রথম খণ্ড) পড়েছি মাওলানা নাঈম ছাহেব রাহ.-এর নিকট।

দ্বিতীয় খণ্ড পড়েছি মাওলানা সালিম কাসেমী রাহ.-এর নিকট। তাঁর কাছে শরহে আকায়েদও পড়েছি।

মাকূলাতের মধ্যে সদরা, শামসে বাযেগা ও শরহে আকায়েদ জালালী পড়েছি মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন বিহারী রাহ.-এর নিকট। কাযী মুবারক ও হামদুল্লাহ পড়েছি মাওলানা কমারুদ্দীন ছাহেবের নিকট। আর তাওযীহ ও তালবীহ পড়েছি মাওলানা খুরশীদ হাসান ছাহেবের নিকট, যিনি মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী ছাহেবের চাচাতো ভাই।

তিনি বলেন, দাওয়ায়ে হাদীসের পর প্রথম শু‘বায়ে আদব তারপর মা‘ক‚লাত পড়ি। এরপর তাকমীলে দ্বীনিয়াতের বছর মুযাফফর নগরের কোনো মাদরাসায় তাদরীসের ফায়সালা হলে সেখানে চলে যাই।

এরপর হযরত রাহ. কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। আকাবিরের দুই জামাত কিংবা দুই ব্যক্তির মধ্যে যদি ইনতেযামী ধরনের কোনো  ইখতিলাফ হয়ে যায়, অথবা মুজতাহাদ ফীহ মাসআলায় তাঁদের মাঝে দ্বিমত হয়ে যায় তখন সাধারণভাবে দেখা যায়, কিছু লোক এটাকে বিভেদ ও দলাদলির মাধ্যম বানায়। একজনের সমর্থনে আরেকজনের নিন্দা করতে থাকে। এরূপ কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে হযরত বলেন, ‘নিন্দুক’ উভয় জায়গা থেকে মাহরূম থাকে। অর্থাৎ সে যাঁর পক্ষ নিয়ে অন্যের নিন্দা করে, তাঁর ফয়েয-বরকত থেকেও সে বঞ্চিত হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলবী রাহ.-এর কিতাব الاعتدال في مراتب الرجال -এর আলোচনা করেন। এটি প্রসিদ্ধ কিতাব। পরবর্তীতে লেখক এর ‘তাকমিলা’ লিখিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। এই তাকমিলা গুরুত্বপূর্ণ রিসালা।

হযরত বলেন, দেওবন্দী চিন্তাধারার ধারক ও মুখপাত্র হওয়ার ক্ষেত্রে হযরত হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ. এবং হযরত শাইখুল ইসলাম মাদানী রাহ.-এর মধ্যে কোনও পার্থক্য ছিল না। এ প্রসঙ্গে তিনি হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানী দামাত বারাকাতুহুমের বরাতে বলেন, দেওবন্দের চিন্তা-চেতনা ও নীতি-আদর্শে এই দুইজনের মাঝে কোনও পার্থক্য নেই। উভয়েই দেওবন্দের আদর্শের মুখপাত্র। তাঁদের মধ্যে যে ইখতিলাফ হয়েছে সেটা কিছু শাখাগত ও সাময়িক বিষয়ে। দু’জনই আমাদের আকাবির। হযরত বলেন, মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী রাহ. আরজাবাদ মাদরাসা থেকে প্রকাশিত ‘পয়গামে হক’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। শিরোনাম ছিল, ‘রূহানী জগতের দুই শাহানশাহ’।

হযরত সেদিন তাঁর উস্তায মাওলানা ওহীদুয যামান কিরানবী রাহ.-এর এই বাণীও শুনিয়েছিলেন-

تقسیم کارہوگا،نہ کہ تقسیم فکر

হযরত এটাও শুনিয়েছিলেন যে, ১৯৯৬ ঈ.-এর নির্বাচনের আগে কোনো একদিন গুলশানের এক বাড়িতে ফেদায়ে মিল্লাত হযরত মাওলানা আসআদ মাদানী রাহ.-এর সঙ্গে হযরত মাওলানা কাজী মু‘তাসিম বিল্লাহ রাহ., হযরত মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী রাহ. ও হযরত রাহ. নিজেও ছিলেন। তখন হযরত ফেদায়ে মিল্লাত এক প্রসেঙ্গ বলেছিলেন-

اگرعوامی لیگ اقتدارپرآئےتویہاں کےمسلمانوں کادینی تشخص ختم ہوجائےگا۔

মারকাযুদ দাওয়াহর মেহমানখানার সেই মজলিসে হযরত রাহ. দারুল উলূম দেওবন্দের বৈশিষ্ট্যের বিষয়েও আলোচনা করেছিলেন। বলেছিলেন-

এক. বাতিলের সামনে মাথা নত না করা।

দুই. লোভ এবং যুলুমের কারণে হক থেকে বিচ্যুত না হওয়া।

কোনও সন্দেহ নেই, হযরত রাহ.-এর মাঝে এই দুই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল।

সেই মজলিসে আরও কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। এখন এটুকু উল্লেখ করলাম। আল্লাহ তাআলা হযরতকে রহমতাবৃত করুন, তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দিন, তাঁর পরিবার-পরিজনকে সবরে জামীলের তাওফীক দান করুন এবং তাঁর দ্বীনী খেদমতগুলো সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত সজীব রাখুন-আমীন।

হযরতের ইলমী মাকাম, বহুমুখী দ্বীনী খেদমত এবং বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে হযরতের শাগরিদগণ লিখবেন ইনশাআল্লাহ। হযরতের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হল যুহদ ও কানাআত অর্থাৎ দুনিয়াবিমুখতা ও অল্পেতুষ্টি। কঠিন এবং দীর্ঘ অভাব-অনটনেও তিনি বিচলিত হননি; বরং অত্যন্ত সবর ও শোকরের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর ঘর, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা এবং জামিয়া সোবহানিয়ার ইতিহাস উজ্জ্বল সাক্ষী। আমি মনে করি, এই ইতিহাস সংরক্ষণ ও সংকলন ভবিষ্যত প্রজন্মের বড় ঋণ, যা একমাত্র তাঁর ঘনিষ্ঠজন ও নিকটের শাগরিদরাই আদায় করতে পারবেন। আল্লাহ তাদের হিম্মত ও তাওফীক দান করুন!

হযরত রাহ.-এর আসল পরিচয় এই ছিল যে, তিনি একজন সফল মুআল্লিম এবং মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন। শিক্ষক ও পথনির্দেশক ছিলেন। প্রয়োজনের সময় তিনি যবানে নাহি আনিল মুনকার করার এবং হক কথা বলার দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ দু-তিন বছরে তিনি সিয়াসী খেদমতে মনে হয় বেশি মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁর গোটা জীবনে, যদ্দুর জানি, এটা তাঁর মূল বা বড় ব্যস্ততা কখনো ছিল না।

তলাবায়ে কেরামের যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হল, তলবে ইলমের যামানায় কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা তাদের কাজকর্মে অংশ নেওয়া-এটা তালিবে ইলমদের জন্য প্রাণহারী বিষ। তাদেরকে যে কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডথেকে একদম পৃথক থাকতে হবে। ইনহিমাক ও একাগ্রতা ব্যতীত ইলমে পরিপক্বতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এটা হযরত রাহ. বারবার বলতেন এবং সকল প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবেত্তার এটাই সিদ্ধান্ত। অধম একবার দারুল উলূমের বর্তমান একাধিক আকাবিরের কাছে জনৈক আলেমের মাধ্যমে জানতে চেয়েছিলাম-আমাদের পূর্ববর্তী আকাবির রাজনৈতিক সংগঠন বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তালিবে ইলমদের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে কী বলতেন? তাঁরা বললেন, এই মসিবত তো ওই সময় ছিলই না; এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য কীভাবে পাওয়া যাবে!

আজকাল কওমী মাদরাসায় অধ্যয়ন সম্পন্নকারী কিছু কিছু ব্যক্তির মাঝে এই রোগ দেখা দিয়েছে যে, তারা কতিপয় কট্টরপন্থী সালাফীর এবং সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনাকারী কিছু লোকের বিচ্ছিন্ন চিন্তা-ভাবনাকে এই বলে প্রচার করছে যে, এটাই কুরআন-সুন্নাহ্র দাবি এবং এটাই আসল দেওবন্দিয়াত!

অথচ তাদের ‘বিশেষ’ চিন্তা-ভাবনা উলামায়ে দেওবন্দের নীতি-আদর্শ এবং গোটা দুনিয়ার জুমহুর আকাবির উলামায়ে কেরামের নীতি-আদর্শের বিপরীত। জানা নেই, কে তাদেরকে ‘মানহাজী’ নাম দিয়েছে আর কিসের ভিত্তিতে দিয়েছে? হযরত মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমী রাহ. এ ধরনের লোকদের চিন্তা-ভাবনার বিরোধী ছিলেন। তিনি এ বিষয়ে সরাসরি আমাকে বলেছেন এবং আশংকা ব্যক্ত করেছেন। আর বলেছেন, এ বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

এমনিতে গোটা দুনিয়াতে ধারাবাহিকভাবে উলামায়ে কেরাম ও নেককার বুযুর্গগণ একের পর এক চলে যাচ্ছেন। এই ভূখণ্ডেও এমন-ই হচ্ছে। কিন্তু হযরতের ইনতিকালের পরে তো আমরা যেন একদমই এতীম হয়ে গেলাম। আল্লাহ তাআলা উত্তরসূরীদের মাঝে পূর্বসূরীদের খাঁটি ওয়ারিস তৈরি করে দিন। আর উত্তরসূরীদের উচিত, এই মিরাসের ধারক হওয়ার জন্য এবং তার হক আদায় করার জন্য যথাযথ মেহনত করা এবং উসূল-আদবের প্রতি লক্ষ রাখা। আল্লাহ তাআলা সবাইকে তাওফীক দান করুন-আমীন। হ

وآخردعواناأن الحمدلله رب العالمين

-বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক

০৪-০৫-১৪৪২ হিজরী

-এমএসআই