প্রসঙ্গ মোহর : উদাসীনতা ও কিছু কথা

শরীফ মুহাম্মদ ।।

এক আত্মীয়ের বিয়ের মজলিসে ছিলাম। বিয়ের প্রধান আনুষ্ঠানিকতাকে প্রচলিত ভাষায় বলা হয় কাবিন। অর্থাৎ কাজী সাহেবের মাধ্যমে বিয়ের চুক্তিপত্র সম্পাদন। সেই কাবিন করার সময় দেখলাম কনে পক্ষের প্রভাবশালী অভিভাবক জোর দিয়ে বললেন, লেখেন, দেনমোহর দশ লাখ এক টাকা। আমি আঁতকে উঠলাম। বর বেচারার মাসিক উপার্জন আমার জানা মতে বার থেকে পনের হাজার টাকা। উল্লেখ করার মতো কোনো সঞ্চয় তার নেই। পরিবারের শ্রেণী নির্ণয় করলে বলতে হবে সে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। কিন্তু আমি দেখলাম, বরের পক্ষের মুরববীরা ততোটা ভড়কে গেলেন না। কেবল মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। যেন ব্যাপারটা একটু বুঝতে চাচ্ছেন। কাজী সাহেবও কলম থামিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। বর ও কনে পক্ষের উপস্থিত অভিভাবকদের মাঝে কয়েক মিনিটের হালকা গুমোট অবস্থা ভাঙলেন এবার কনে পক্ষের সেই অভিভাবক। তিনি কিছুটা বিরক্তি ও কিছুটা উল্লাস নিয়ে বললেন, এ টাকা কি ছেলেকে আজই পরিশোধ করতে হবে? ছেলে-মেয়ে ঠিক থাকলে দশ লাখ টাকার হিসাব কেউ নিতে যাবে না।’

বিজ্ঞাপন

মোহর ধার্য করার সামাজিক ও ভুল একটি দর্শনের কথাই তিনি তুলে ধরলেন। তার কথায় সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। যাক এ টাকা তাহলে পরিশোধ করতে হবে না। উভয় পক্ষের সম্মতিতে সেই অংকেই মোহর ধার্য করে বিয়ে সম্পন্ন হল। এর মানে দাঁড়ালো, মোহর ধার্য করার উদ্দেশ্যের মধ্যেই ‘পরিশোধ’ নেই। এটা হচ্ছে বরের প্রতি একটা সংকেত। যদি দাম্পত্য-সম্পর্ক কখনো শেষ করতে চাও তাহলে তোমাকে এই বিশাল অংক পরিশোধ করেই সেটা করতে হবে। দাম্পত্য রক্ষা বা দাম্পত্য নিরাপত্তার একটা হুমকিমূলক কাগুজে তাবিজ বানিয়ে দেওয়া হল এখানে মোহরকে। বাস্তবক্ষেত্রে যার কোনোই কার্যকারিতা থাকে না। অপরদিকে মোহরের পাওনা টাকাটা থেকে বঞ্চনার মধ্য দিয়েই দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করল মেয়েটি। সে শুরুতেই জেনে গেল, এ টাকাটা পাওয়ার জন্য ধার্য হয়নি। বরং এটা পাওয়ার মতো পরিস্থিতি (অর্থাৎ তালাক) না পড়ার আকাঙ্খাই তার মাঝে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে ওঠার কথা।

দুই.

অন্য এক ঘটনার কথা বলি। এ ক্ষেত্রেও বর-কনে উভয়জন মধ্যবিত্ত পরিবারের। বিয়ের সময় মোহর ধার্য হল দেড় লাখ টাকা। প্রায় পনের বছর আগের কথা। বাজার ও অলংকার বাবদ পঞ্চাশ হাজার টাকা উসূল বা পরিশোধ দেখানো হল। কিন্তু বাকি এক লাখ টাকা পরিশোধের চিন্তা বাদ দিয়ে বর তার স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইল। নতুন জীবনে প্রবেশকারী লাজুক স্ত্রী দাম্পত্যের প্রথম প্রহরেই তার পাওনা ক্ষমা করে দিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ক্ষমা কি আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ছিল? হয়তো ছিল, হয়তো ছিল না।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দুর্ভাগ্যক্রমে এভাবে মোহরের টাকা ক্ষমার পর দাম্পত্য সম্পর্কে কোনো ফাটল দেখা দিলে মোহরের সেই বকেয়া টাকা যথারীতি পাওনা টাকা হিসেবেই দাবি করা হয়। এছাড়াও অন্য একটি ব্যাপারও এখানে লক্ষ্য করার মতো। দাম্পত্যের একদম প্রথম পর্বে অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময় ও অনুভূতির মধ্যে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর আর্থিক পাওনা ছেড়ে দেওয়ার আবেদন করা কতোটা সঙ্গত? আর্থিক পাওনা দাবি করা বা ছেড়ে দেওয়ার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে কি মেয়েটি তখন থাকে? স্বামীর ক্ষমা চাওয়ার উত্তরে তার পক্ষে কি বিনয়ের সঙ্গেও ‘না’ বাচক কোনো উত্তর দেওয়া সম্ভব? এর মানে হল, মোহরের বকেয়া টাকাটা পরিশোধ না করার জন্য ক্ষমা চাওয়ার একটি কৌশল গ্রহণ করা হল। এখানেও আর্থিক পাওনা থেকে বঞ্চনার ঘটনা ঘটল মেয়েটির জীবনে। মোহরের পাওনা এখানেও তামাশা হয়ে গেল।

এরকম ব্যাপার আরেকভাবেও ঘটে। সেটি হচ্ছে, সাধারণ সামর্থ ও সাধ্যের চেয়ে মোহর অনেক বেশি ধার্য করা হয় কেবল সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর জন্য। এখানেও বর-কনে উভয় পক্ষ ধরে রাখেন, এ মোহর পরিশোধের জন্য নয়, কেবল সামাজিকভাবে বড় অংকের মোহর দেওয়া-নেওয়ার নাম জাহির করার জন্য। এতেও মোহর অনাদায়ী থাকে। যার জন্য মোহর থেকে বঞ্চিত হয় সেই নারী।

তিন.

মোটামুটিভাবে মোহর পরিশোধ না হওয়া বা না করার প্রধান কয়েকটি কারণের একটি হচ্ছে বিশাল ও সাধারণ দৃষ্টিতে স্বামীর পক্ষে পরিশোধ-সম্ভব নয় এমন অংকের মোহর ধার্য করা, যেন স্বামী কখনো তালাকের পথে যেতে সাহস না পায়। দাম্পত্য রক্ষার একটি প্যাঁচানো উদ্দেশ্যে এবং পরিশোধের চিন্তাও জাগ্রত না হওয়ার নিয়তে এক্ষেত্রে মোহর ধার্য হয়। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, মোহরের বড় অংশ বকেয়া রেখে সেটিকে কোনো আর্থিক দায় ও ঋণই মনে না করা। এজন্য ক্ষমা চাওয়া ও করার একটি রেওয়াজী পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর তৃতীয় কারণ বলা যায়, মোটা অংকের মোহর ধার্য করে সামাজিকভাবে নাম কুড়ানোর চেষ্টা। পরে এটাকে পরিশোধ করার প্রয়োজন নেই-পর্যায়ের একটা অনন্তকালীন ঋণ মনে করা  হয়।

চার.

আর এর সবগুলোই সম্ভব হয় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মোহর নামক আর্থিক লেনদেনের বিষয়টির প্রকৃতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও উদাসীনতার কারণে। মোহর তো হচ্ছে বিয়ে বা দাম্পত্যের একটি ওয়াজিব আর্থিক আমল। যা পরিশোধ করবে স্বামী এবং পাবে স্ত্রী। এটা স্ত্রীর আর্থিক পাওনা স্বামীর কাছ থেকে। এ পাওনা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফে বহু নির্দেশনা এসেছে। মূলত মোহর  একজন নারীর নারীত্ব বৈধ উপায়ে একজন পুরুষের কাছে সমর্পণের একটি প্রতীকী সম্মানী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাহাবায়ে কেরামের যুগে স্বামী প্রথম মিলনের রাতে স্ত্রীর কাছে যাওয়ার আগেই মোহরের পূর্ণ অংক অথবা তার বড় অংশ অথবা একটি অংশ পরিশোধ করা বাস্তব অনুশীলনের ক্ষেত্রে জরুরি মনে করতেন। বকেয়া অংশও অত্যন্ত সম্ভাব্য স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিশোধ করে দেওয়া হত। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে পুরো মোহর বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা প্রথম মিলনের রাতের আগে নগদ পরিশোধ করা সবচেয়ে উত্তম। তার পরে উত্তম হল মিলনের রাতের আগে অন্তত কিছু অংশ পরিশোধ করে দেওয়া এবং সামর্থের দ্রুততম সময়ে বকেয়াটুকু পরিশোধ করা। মোহরের টাকা পরিশোধ না করার পরিকল্পনা যাদের থাকে, তাদের প্রতি হাদীস শরীফে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। দাম্পত্যের জন্য মোহর ওয়াজিব, স্বামী দেবে, স্ত্রী গ্রহণ করবে। মোহর বিয়ের সময় তো ধার্য হতেই পারে, ধার্য না হলেও মোহর ওয়াজিব। এমনকি বিয়ের সময় মোহর না দেওয়ার শর্ত করে নিলেও বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মোহর পরিশোধ করা ওয়াজিব।

পাঁচ.

মোহরের অর্থ থেকে নারীর বঞ্চনা কমানো বা বন্ধ করারও কিছু উপায় অবশ্যই আছে। এর প্রধান উপায় হচ্ছে, বিয়ে ও দাম্পত্যের জন্য মোহরকে অবশ্য আদায়যোগ্য একটি আর্থিক লেনদেনের বিষয় বলে দৃঢ় অন্তঃকরণে মনে করা। এরপর নিজেদের কর্মপন্থা ঠিক করা। মোহর সম্পর্কে কুরআন মজীদ ও হাদীস শরীফের সিদ্ধান্তের প্রতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্পিত হওয়া। নারীর সম্মান ও পাওনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এটাকে কোনোভাবেই পোশাকী কোনো চুক্তি বা রেওয়াজ মনে না করা। এরই কিছু শাখা উপায়ও রয়েছে। যেমন : ভুল ও ঘুর পথে মোহরের ব্যবহার বন্ধ করা। দাম্পত্য রক্ষার জন্য মোহরকে হুমকি হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তা বাদ দেওয়া। মোহরের অংককে সামাজিক মর্যাদার ইস্যু না বানানো। একই সঙ্গে বরের সামর্থ এবং বর ও কনের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিশীল অংকের মধ্যে মোহরের পরিমাণ ধার্য করা। যেন তাতে পরিশোধ করার উদ্দেশ্য থাকে এবং পরিশোধ করা সম্ভব হয়। সর্বোপরি বিয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই শরীয়ত, সুন্নত ও রুসমমুক্ততা বজায় রেখে চলা। বিশেষত মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য কিংবা স্বল্প আয়ের কোনো বরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অহেতুক খরচগুলো না করে মোহরের টাকা পরিশোধের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া। বরের বিয়ে ও বিয়ে প্রস্ত্ততির পুরো বাজেট এক লাখ টাকা হলে চেষ্টা করতে হবে প্রাক বিয়ে ও ওলীমার খরচ পঞ্চাশ হাজারের নিচে সেরে ফেলার। বাকি টাকা পূর্ণ মোহর কিংবা আংশিক মোহর হিসেবে পরিশোধ করার। কমিউনিটি সেন্টার বুকিং, বরযাত্রায় চার-পাঁচটা গাড়ি ভাড়া করা এবং বাহারী বাজারের পথে না হেঁটে বরযাত্রা ও ওলীমার সুন্নতী ধারা অনুসরণ করলে মোহরের টাকা পরিশোধ করা তার জন্য অনেক সহজ হয়ে যাওয়ার কথা।

মোহরকে অবশ্যআদায়যোগ্য আর্থিক আমল মনে করলে সামর্থ সীমিত থাকলেও  তা আদায়ের উপায় বের হয়ে আসবে। মোহর আদায়ের উদাসীনতা থেকে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ও আমাদের সমাজকে রক্ষা করুন। আমীন।