একটি জানাযা : সৌভাগ্যের স্মৃতিচারণা

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

বাংলা ভাষায় বেশ অর্থপূর্ণ একটি শব্দ হলো ‘ঈর্ষণীয়’। যদি জানাযার সঙ্গে শব্দটির ব্যবহার সুপ্রয়োগ হয়ে থাকে তাহলে বলব, আজ একটি ঈর্ষণীয় জানাযায় অংশগ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছে। স্বভাবতই অনেক জানাযা অনেকের জন্য অনেক বিবেচনায় ঈর্ষণীয় হয়। আজ যে জানাজা সম্পর্কে আমি স্মৃতিচারণা করছি সেটিও বিশেষ একটি দিক বিবেচনায় ঈর্ষণীয়।

বিজ্ঞাপন

বহু তালিবুল ইলমের প্রিয় উস্তায হযরত মাওলানা শফিকুল্লাহ সাহেব (নাযেম সাহেব হুজুর) রহমতুল্লাহি আলাইহির জানাযার কথা বলছি। নিঃসন্দেহে তাঁর ইনতিকালে এই দেশ ও এই দেশের আলেম সমাজ একজন দরদী উস্তাযকে হারিয়েছেন। হারিয়েছেন এমন একজন মনীষীকে  যিনি হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহমতুল্লাহি আলাইহির সান্নিধ্য লাভ করেছেন।

হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রহমাতুল্লাহ আলাইহিকে সরাসরি দেখেছেন এমন মানুষ হয়তো এখন আর একজনও নেই। ঠিক তেমনি এক সময় এমন হয়ে যাবে যে, হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.কে দেখেছেন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের সৌভাগ্য যে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ.-কে যাঁরা দেখেছেন এবং তাঁর একান্ত সাহচর্য লাভ করেছেন এমন অনেক মনীষীকে দেখতে পেয়েছি। তাঁদের মুখে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ.-এর স্মৃতিচারণা শুনতে পেয়েছি। মরহুম হযরত নাযেম সাহেব হুযূর রাহ. তেমনই একজন।

আমি হযরত নাযেম সাহেব হুজুর রহ.-এর কাছে সরাসরি পড়িনি। তবে অনেকবার তাঁকে দেখেছি। তাঁর মুখের কথা শুনেছি। এবং তাঁর সম্পর্কে তাঁর ছাত্রদের মুগ্ধতামাখা শ্রদ্ধাবাক্য এবং আবেগময় অনেক স্মৃতিগল্প শুনেছি। আর আজ জানাযার মাঠে গিয়ে সেই মুগ্ধতা ও আবেগের অনেক বাস্তব চিত্র দেখতে পেয়েছি।

তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ‘অসংখ্য’ পর্যায়ের ছিল না ঠিক। তবে মনে হয় তাঁদের ৯৮/৯৯ ভাগই ছিলেন উলামায়ে কেরাম এবং তালিবানে ইলম। সাদা পাঞ্জাবী ও সাদা টুপি এবং আপাদমস্তক শুভ্রতামাখা এক নূরানী জামাত। সেখানের অল্প কজন ছাড়া হয়তো কারোরই কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই তাঁর সাথে। তবুও বড় আপন হয়ে, বড় আবেগ নিয়ে তারা শামিল হয়েছেন এই জামাতে। এবং যেন শামিল হতে পেরে কৃতজ্ঞ ও সৌভাগ্যবান মনে করেছেন নিজেকে। চেনা চেহারায় তো দেখেছি অনেক, অচেনা চেহারাগুলোতেও দেখেছি অনেক অশ্রুমাখা স্নিগ্ধতা। বিরহের পবিত্রতম অনুভূতির ছাপ।

উত্তরখানের মাস্টারপাড়ার বেশ বড় একটি মাঠে জানাযা হলো। এরপর জামুন মাদ্রাসা সংলগ্ন ছোট্ট মাকবারায় দাফন হলো। দুই জায়গাতেই একই দৃশ্য। সাদা পোশাকের নূরানী জামাত। চোখে মুখে কেমন ভালোবাসামাখা আবেগ। ঠোটে তিলাওয়াত ও দুআ বাক্য।

গুঁড়ি গুঁড়ি লাল মাটি জমা করে রাখা স্তুপ থেকে সবাই মুঠ ভরে নিচ্ছিলেন এবং পরম মমতায় দুআ পড়ে পড়ে কবরে রাখছিলেন। দৃশ্যটি এমন যা কোনও উপমা দিয়ে বুঝানো সম্ভব নয়। এছাড়াও দাফনের আগে পরে এই চোখ এমন দু একটা দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছে, যার বিবরণ দিতে সত্যিই এই কলম অক্ষম।

দাফনের জমায়েত একটু হালকা হলে আমি ধীর পায়ে কবরের খুব কাছে গেলাম। ঈসালে সওয়াবের নিয়তে কিছু তেলাওয়াত করলাম। ঠিক সেই জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম যেখানে কিছুক্ষণ আগে দাঁড়িয়েছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় এক মনীষী ব্যক্তি। তিনি এখানে দাঁড়িয়েই দোয়া পড়েছিলেন।

ঈছালে ছওয়াব করার পর যখন ফেরার পথে পা বাড়ালাম পুরোটা পথ কী এক তন্ময়তা আমার পুরো অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করে রাখল। কেমন এক ভালো লাগা পুরো হৃদয়জগতকে দখল করে নিল। এবং স্বপ্নের মতো করে মুহূর্তক্ষণ আগের স্মৃতিগুলো একের পর এক কল্পনাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেল। আর মনে হল এমন জানাজা এবং এমন দাফন ঈর্ষণীয় হবে না কেন!

তালিবানে ইলমের এত বড় জামাত এবং তাদের এমন অশ্রু নিবেদন একজন মানুষের পরম প্রাপ্তি নয় তো কী!

এই দুনিয়ার হাজারো জানাজা হাজারো দাফন মানুষ দেখেছে এবং নিত্যদিন দেখছে। রাজনৈতিক প্রধান ব্যক্তি, চিন্তানৈতিক অঙ্গনের পুরোধা ব্যক্তি এবং বড় বড় ইউনিভার্সিটির সম্মানিত অধ্যাপক—সবার জানাযাই মানুষ দেখে। খুব কাছে থেকে তাদের দাফনকার্য সম্পাদন করে। এরপর যখন দেখে এমন একটি জানাযা। এমন একটি দাফন। তখন তারাও কোনো হিসাব মিলাতে পারে না। গভীর রহস্যের মতো ঘোরলাগা ভাব জমাট বাঁধে তাদের চিন্তায়। এত তফাৎ?! কেন এমন হয়? নিশ্চয় এই পৃথিবী সাক্ষী—এমন জানাজা ও এমন অশ্রুমাখা বিদায় কারা কবে কোথায় লাভ করেছে!

ইজে