প্রতি বছর কেন নতুন নতুন অজুহাতে মাহফিলে বাধা?

রায়হান মুহাম্মদ।।

আবহমানকাল ধরে দাওয়াতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে ওয়াজ-মাহফিলের মঞ্চগুলো। দেশের আপামর জনতার কাছে শান্তি-সম্প্রীতি ও ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্লাটফর্ম হিসেবেও পরিচিত এ মাহফিলগুলো। শীত মৌসুমে দেশের রাজধানী, জেলা-উপজেলা এবং একেবারে গ্রাম পর্যায়ে ওয়াজ মাহফিল বা ধর্মীয় সমাবেশ হয়ে থাকে। শীতকালে মাহফিলগুলোকে ঘিরে দেশব্যাপী ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে এক ধরণের উৎসব আমেজের দেখা মেলে।

বিজ্ঞাপন

আবমানকাল ধরে দেশে ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার এক অভাবনীয় ঐহিত্য ধরে রেখেছে এই ওয়াজ-মাহফিলের মঞ্চগুলো। দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত নির্বিঘ্নে ওয়াজ মাহফিলগুলোর আয়োজন সম্পন্ন হয়ে আসলেও বিগত কয়েক বছর ধরে নানা অজুহাতে ওয়াজ-মাহফিলে বাধা, বক্তাকে হয়রানীসহ অপ্রীতিকর বিভিন্ন ঘটনা দেখতে হয়েছে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে। যা ছিল একেবারে অপ্রত্যাশিত।

দাওয়াতের অন্যতম একটি মাধ্যম- ধর্মপ্রাণ মুসলমানের দেশে হঠাৎ এভাবে বাধার সম্মুক্ষীন হচ্ছে কেন?- ব্যাপারটিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? জানতে ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল বক্তা আলেম ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর সাথে, তিনি ইসলাম টাইমসকে বলেছেন, ওয়াজ-মাহফিলগুলো ধর্মীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য। ধর্মীয় অনুশাসন যথাযথভাবে পালন করেন এমন মানুষ ছাড়াও যারা ধর্মীয় বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে বেখর তারাও স্বতস্ফূর্তভাবে বক্তাদের ওয়াজ শুনতে অংশ গ্রহণ করেন মাহফিলগুলোতে। এই মাহফিলগুলোতে অংশগ্রহণের কারণে বেনামাজী, মুখে দাড়ি নেই এমন অসংখ মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার ঘটনা ইতিপুর্বে দেখা গেছে। তারা নামাজ, রোজা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম সুন্নত দাড়ির প্রতি যত্নবান হয়েছেন। এমনকি অপরাধ জগতে অবাধ বিচরণ এমন লোকদের জীবনেও ওয়াজ মাহফিলের প্রভাবে পরিবর্তনের ঘটনা অহরহ।

তিনি বলছেন, একজন মুসলমানের জীবনে ধর্মীয় প্রভাব বিস্তার করে এমন মজলিসগুলোকে নির্বিঘ্নে চলতে দেওয়ার পরিবর্তে যারা করোনাসহ বিভিন্ন অজুহাতে সেগুলো বন্ধ করতে চান, তারা মূলত অজুহাতগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মাহফিলের প্রভাব ও আবেদনকে বাধাগ্রস্থ করতে চান।

অন্যভাবে বলতে গেলে, মাদক,সুদ-ঘুষসহ নানা অনৈতিকতা ছেয়ে যাওয়া সমাজে মাহফিলগুলোর প্রভাবে যে আমূল পরিবর্তন ঘটছে, মাহফিলের সেই প্রভাব ও আবেদনগুলোকে সহ্য করতে না পেরেই একটি পক্ষ এই মাহফিলগুলোকে বন্ধ করতে চায়- তাদের আচরণ ও কার্যকলাপে অন্তত তাই ফুটে উঠছে বলছেন মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী।

মাওলানা অফেন্দীর ভাষায়, শুধু মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধির থেকে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন এবং মানার চেষ্টা ও আকাঙ্ক্ষা রাখেন-এমন আমলদার মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়াটা বেশি প্রয়োজন। এতে করে সমাজের রন্ধে রন্ধে ছড়িয়ে থাকা অনাচারগুলো বন্ধ হবে এবং শান্তিপূর্ণ যে সমাজের স্বপ্ন আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি তার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এমন একটি সমাজ নির্মাণে মুসলমানদের আমল ও নৈতিকতায় পরিবর্তন আনতে ব্যাপক প্রভাব যেন রাখতে না পারে এই মাহফিলগুলো, মূলত সেকারণেই বিভিন্ন অজুহাতে মাহফিলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা- বলে অভিমত দিচ্ছেন তিনি।

বিভিন্ন মহল থেকে বর্তমানে বক্তাদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ও উত্তেজিত বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়-এক্ষেত্রে তিনি বলছেন, যদি অযৌক্তিক ও নিয়মবহির্ভূতভাবে কেউ সারাক্ষণ উত্তেজিত বক্তব্য দিতে থাকেন তাহলে এজাতীয় ক্ষেত্রে বক্তাকে অবশ্যই নিজের নিয়ন্ত্রণ করা উচিত; কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেকে অবমাননা, ইসলামের বিভিন্ন বিধানকে নিয়ে কটাক্ষ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত করার মতো ইস্যূ কেউ তৈরি করলে সেক্ষেত্রে বক্তারা অবশ্যই চুপ থাকবেন না। ইসলামের ধারক-বাহক হিসেবে বক্তা-আলেমদেরও আল্লাহ তায়ালার দরবারে জবাবদিহিতা করতে হবে। নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে তারা অবশ্যই কথা বলবেন।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বক্তারা ধর্মীয় বিধি-নিষেধ জানিয়ে স্পষ্ট কথা বলবেন। এমন পরিস্থিতিতে বক্তাদের  কথাকে উস্কানি হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যাপারটা মাওলানা আফেন্দী ব্যখ্যা করছেন অনেকটা এভাবে যে, কারো বাসায় চোর চুরি করতে এলো, গৃহকর্তা চোরকে ধরে তার বিচার দাবি করছেন; কিন্তু চোরকে শাস্তি না দিয়ে চোর ধরার কারণে বাড়িওয়ালার উপর উল্টো দোষ চাপানো হচ্ছে কেন তিনি এতো রাতে চোর ধরতে গেলেন!

প্রতিষ্ঠিত অনেক বক্তা আলেম, যারা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, তাদের ফলো করতে গিয়ে অনেক তরুন আলেম বক্তাদের মাঝে উত্তেজক বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যারা হয়তোবা প্রতিষ্ঠিত বক্তাদের মতো পরিস্থিতি সামলাতে পারবেন না; এক্ষেত্রে ‘একমণ ইলমের জন্য দশমণ প্রজ্ঞা দরকার’-  এই প্রবাদের উদ্ধৃতি টেনে মাওলানা আফেন্দী বলছেন, সবাইকে নিজের স্তর, বয়স, পরিবেশ, পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে হবে। এবং কথা বলার ক্ষেত্রে অবশ্যই ভাবতে হবে  আমার বলা কথার জের আমি কতটা টানতে পারবো।

শুধু বড়দের অনুসরণ করতে গিয়ে এমন কিছু বলে দিলেই চলবে না যার ভার আমি নিজেও টানতে পারবো না। তাই কিছু কিছু দায় বক্তাদেরও নেওয়া উচিত এবং সচেতন হওয়া উচিত বলছেন তিনি।

এছাড়া  মাহফিলের আয়োজক কমিটিরও এক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতনতার পরিচয় দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বক্তা আলেম ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী।

এদিকে বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক আলেম মাওলানা ইমামুদ্দীন মেহের বলছেন, আবহমানকাল ধরে নির্বিঘ্নে ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন হয়ে এলেও বিগত কয়েক বছর ধরে হঠাৎ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। নানান অজুহাতে শীতকালীন মৌসুমে মাহফিলগুলোতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতি বছরই নতুন নতুন অজুহাত দাঁড় করানো হচ্ছে।

তিনি বলছেন, ধর্মীয় বিষয়ে জানার উন্মুক্ত মজলিস এ মাহফিলগুলো বন্ধের এমন পদক্ষেপ কখনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় চেতনাবোধ জাগ্রত করতে সহায়ক হিসেবে পরিচিত এ মাহফিলগুলোকে বাধাগ্রস্থ করার মাধ্যমে হয়তোবা বাধাদানকারীরা নিজেদের অজান্তেই দেশের বৃহত্তম গোষ্ঠীর সাথে এক ধরণের বৈরিতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করছে, যা কখনোই ভাল ফলাফল বয়ে আনবে না বলে মত দিচ্ছেন তিনি।

তিনি বলছেন, সুদ-ঘুষসহ সমাজে ছড়িয়ে থাকা অনৈতিকতা নিয়ে কথা বলা দেশের আলেম সমাজের দায়িত্ব। শুধু আইন-আদালত, প্রশাসন মানুষের মাঝে নৈতিকতা ও অপরাধ প্রবণতা থেকে ফেরাতে মূল সমাধান নয়, এগুলোকে সহায়ক শক্তি বলা যেতে পারে;কিন্তু মানুষের চিন্তা-ভাবনায় নৈতিকতা ও অপরাধ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার পরিকল্পনা বদ্ধমূল করতে ধর্মীয় অনুশাসন ও ধর্মীয় বিষয়ে জানার উন্মুক্ত মঞ্চগুলোকে অবাধে চলতে দেওয়া উচিত।

তিনি বলছেন, আলেম সমাজ বরাবরই মানুষকে নৈতিকতার উপদেশ দিয়ে আসছেন, তারপরও সমাজে ঘটে চলেছে মাথা নিচেু করে দেওয়ার মতো এমন কিছু ঘটনা যা আমরা মুখে বলতে পারছি না। এক্ষেত্রে তিনি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আনুশকা ও দিহানের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন এ ঘটনাগুলোর আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ধর্মীয় বিষয়ে জানা-শোনার মাধ্যমগুলো আরো বিস্তৃত হওয়া দরকার; কিন্তু এখনো আমরা এর প্রয়োজনীতা উপলদ্ধি না করে যদি ধর্মীয় বিষয়ে জানার উন্মুক্ত মজলিস-মাহফিলগুলো বন্ধ করতে উঠেপড়ে লাগি, তাহলে সামনে হয়তোবা আমাদের আরো বড় খেসারত দিতে হবে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক আলেম মাওলানা ইমামুদ্দীন মেহের।