পেঁয়াজ জাগরণ: খাদ্যপণ্যে দরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণ

শরীফ মুহাম্মদ।।

পেঁয়াজ খাদ্যপণ্য হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, কিন্তু গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশেষত বাংলাদেশি মানুষের জীবনে। পেঁয়াজ ব্যাপকভাবে আমদানি করা হতো ভারত থেকে। গত দুই বছর ভারত পেঁয়াজ নিয়ে তার নানা রকম নিয়ন্ত্রণ ও নখরামি দেখিয়েছে। ২০০ টাকা দরেও তখন মানুষ পেঁয়াজ কিনেছে।

বিজ্ঞাপন

এরপর দেশীয় উৎপাদক এবং কৃষকরা ব্যাপকভাবে এ মৌসুমে পেঁয়াজ চাষ করলেন। এখন ভারত থেকে পেঁয়াজ পাঠানো শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, আগে বাংলাদেশে রপ্তানি করার মতো উদ্বৃত্ত তাদের ছিল না, এখন আছে, তাই পাঠানো হচ্ছে। পেঁয়াজ নিয়ে বছর দুয়েক যাবত যে ধরনের কারসাজির খেলা দেখা গেছে, তাতে এ জাতীয় নিরীহ ‘কার্যকারণ’ দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য মনে হয় নি। ফলে বড় বড় আড়তে ভারতীয় পেঁয়াজ বর্জন করা শুরু করেছেন ক্রেতারা। সাধারণ ব্যবসায়ী কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ের ক্রেতা-কেউ কেউ ভারতীয় পেঁয়াজ না কেনার জন্য পোস্টার ফেস্টুন গায়ে ধারণ করে প্রতিবাদও করছেন।

এসব খবর এসেছে গণমাধ্যমে। অনেকেই মনে করছেন, বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে ভারত যে রকম নখরামি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের আচরণ করে থাকে, তাতে বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে তাদের প্রতি নির্ভরতা ও তাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসার চেষ্টা করা দরকার। পেঁয়াজ দিয়েও এটা বড় ভাবে শুরু হতে পারে। পেঁয়াজ আহামরি কোনো পণ্য নয়, কিন্তু এই পেঁয়াজ কেন্দ্রিক ‘জাগরণ’ থেকেই ভারতের বাজারকে বড় রকম ধাক্কা দেওয়া সম্ভব।

সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন জনের অভিব্যক্তি দেখলে বোঝা যায়, এদেশের নানা শ্রেণীর মানুষ এটা এখন চাচ্ছে মনেপ্রাণে চাচ্ছে। এমনকি এর জন্য আর্থিক কিছু বাড়তি মূল্য পরিশোধ করতে হলেও, এর জন্য জিব্বার কিছু রুচি প্রসাদ কিছুদিনের জন্য বর্জন করতে হলেও এদেশের মানুষ ভারতকে খাদ্যপণ্যের বাজারে কলকাঠি নাড়ানোর জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। এজন্য অনেকেই বলছেন, বেশি দাম দিয়ে হলেও দেশের কৃষকদের পেঁয়াজ কিনুন, ভারতের পেঁয়াজ কেনা বর্জন করুন।

গরুর গোশতের ক্ষেত্রে এক সময় ভারতের বাজারের প্রতি বাংলাদেশের ব্যাপক নির্ভরতা ছিল। কোরবানির আগে সীমান্ত খুলে দিয়ে ভারতের গরুর মিছিল ঢুকতে না দিলে অনেকে আশঙ্কা করতেন, কোরবানির সময় গরুর বাজার অনেক চরা হয়ে যাবে। গত দশ বছরে দেশের খামারি ও কৃষকরা গরু-ছাগল লালন পালন ও চাষবাসে অন্তত এতোটুকু সক্ষমতা অর্জন করেছেন যে ভারতের হাড় জিরজিরে গরুর মিছিলের দিকে কোরবানির আগে মানুষকে আর তাকিয়ে থাকতে হয় না। খামারিদের কাছ থেকে একটু বেশি দামে গরু কেনার অভ্যাস এদেশের মানুষের হয়ে গেছে। এবং দেশীয় এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অথবা সক্ষমতা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করতেও দেখা গেছে।

আজ পেঁয়াজ নিয়ে ‘জাগরণের’ গল্প চলছে। এ গল্প সৃজনশীল পরিশীলিত সক্ষমতাদীপ্ত নতুন আরেকটি পরিস্থিতিতে আমাদেরকে নিয়ে যেতে পারে। প্রতিবেশী যেই দেশ বা দেশগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্যপণ্যে নানা রকম ব্ল্যাকমেইলিং নিয়ন্ত্রণ ও সাম্রাজ্য বিস্তারবাদের চেষ্টা করে তাদেরকে আর কিছু করতে না পারি, আমাদের বাঁচার চেষ্টা আমাদের করা দরকার। যখন তাদের দিক থেকে আঘাত আসবে তখনই এখানে প্রত্যয়ের নতুন ইট গাথতে হবে।

যতটুকু অনুভব করি পেঁয়াজ নিয়ে সেই ইট গাথার কাজ নাগরিকরা করছেন। ব্যবসায়ী পর্যায় ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এখন সক্ষম ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। যারা খাদ্যপণ্যে আমাদের ঠেকিয়ে দেয় তাদের থেকে বেঁচে পথচলার চেষ্টা ও সংস্কৃতি আমাদের দরকার।

আরো পড়ুন: লাখ লাখ তরুণ-তরুণী জীবদ্দশায় থেকেও ‘মরে যাচ্ছে’

বিজ্ঞাপন