‘আইনের শাসন ও প্রয়োগ না থাকায় দায়িত্বশীলরা অপেশাদার বক্তব্য-আচরণের সাহস পাচ্ছেন’

রায়হান মুহাম্মদ।।

ধর্মপ্রাণ মানুষের অন্যতম শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব দেশের আলেম সমাজ। মানুষ ভালোবাসেন আলেম সমাজকে ও দ্বীনের অতন্দ্র প্রহরী কওমী মাদরাসাগুলোকে। দ্বীনের একনিষ্ঠ খাদেম আলেম সমাজ মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেন ইসলামের সঠিক বার্তা। এক্ষেত্রে কারো চোখ রাঙানি ও দাপটকে তোয়াক্কা করেন না তারা। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামের সময়কাল থেকে নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগ- সব যুগেই দ্বীনের ঝাণ্ডাবাহীরা  সত্য-প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে ছিলেন অনড়।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান সময়েও প্রতিকূল পরিবেশ তোয়াক্কা করে ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন আলেম সমাজ। জানিয়ে দিচ্ছেন ধর্মীয় বিষয়ে হালাল-হারামের বিধান। ধর্মীয় বিষয়ে আলেম সমাজের এ অবস্থানকে কেউ কেউ দেখেছেন বাঁকা চোখে, নিয়েছেন অন্যভাবে। তাই আলেম সমাজ ও কওমী মাদরাসার প্রতি এক ধরণের উগ্র আচরণ প্রকাশ করতে দেখা গেছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বশীলকে। তাদের বক্তব্যে ঝরে পড়েছে বিদ্বেষ।

আলেম সমাজকে নিয়ে দেশের দায়িত্বশীল পর্যায়ের লোকদের এমন আচরণ ও বক্তব্য দুঃখজনক বলছেন চট্টগ্রামের ওমর গণি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. আফম খালিদ হোসেন।

তিনি ইসলাম টাইমসকে বলছেন, কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়, কারো থেকে কোন অপরাধ সংগঠিত হলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতে আদালত রয়েছে। জাতির দায়িত্বশীলরা অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে আইনকে সহায়তা করতে পারেন, অপরাধীকে গ্রেফতার করতে পারেন, কিন্তু তাদের থেকে অপেশাদার আচরণ ও বক্তব্য কখনোই প্রত্যাশা করেন না দেশের আপামর জনতা।

দায়িত্বশীলদের অপেশাদার আচরণ-বক্তব্যও আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল এবং এজাতীয় বক্তব্য সমাজে শ্রেণী বৈষম্য তৈরি করে বলছিলেন অধ্যাপক ড. আফম খালিদ হোসেন।

মাদরাসায় পরিবারের সব থেকে মেধাহীন ছেলেটিকে পড়াশোনার জন্য পাঠানো হয় এবং মাদরাসায় পাঠিয়ে সন্তানদের থেকে ভালো কোন ফলাফল পাওয়া যায় না – জাতীয় বক্তব্য দিতে শোনা গেছে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলদের, এসবের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে কওমী মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত একটি শিক্ষাব্যবস্থা, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ধর্মীয় বিবেচনা বাদ দিলেও একটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে দায়িত্বশীল পর্যায়ের লোকদের এমন অশ্রদ্ধাপূর্ণ বক্তব্য রাষ্ট্র স্বীকৃত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে আঙ্গুল তোলার নামান্তর, যা কখনো কাম্য নয়। তাছাড়া একে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর অন্তর্ভুক্ত বলছিলেন তিনি।

‘‘নিজের প্রচেষ্টায় কুরআন শিখেছি, আমি নিজেও কুরআন পড়েছি, আপনারা কি শিখেছেন…’’- আলেম সমাজকে কটাক্ষ করে বর্তমানে কারো কারো মুখে শোনা গেছে এমন কথা। – অধ্যাপক ড. আফম খালিদ হোসেন বলছেন, কুরআন পড়া এক জিনিস আর কুরআনের জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ হওয়া, কুরআনের মমার্থ অনুধাবন করা আরেক ব্যাপার। শুধু কুরআন পড়তে জানেন এমন ব্যক্তি কখনোই কুরআনের মুফাসসিরের সাথে নিজেকে তুলনা করতে পারেন না।

তিনি বলছেন, দেশের প্রতিটি মানুষ বিশুদ্ধ উচ্চারণে কুরআন পড়তে শিখবেন, ধর্মীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করবেন এটা আমাদের চাওয়া এবং যারা কুরআন পড়তে শিখবেন তাদের প্রতি আমাদের শুভ কামনা। তাই বলে কেউ শুধু কুরআন পড়তে পারেন বলে দেশের আপামর জনতার শ্রদ্ধাভাজন আলেম সমাজকে কটাক্ষ করা কোনভাবেই কাম্য নয়।

বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু ও ইসলামী মূল্যবোধকে কেউ কেউ ভিন্ন চোখে দেখছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধকে মুখোমুখি দাড় করাতে চাইছেন, তাদের উদ্দেশ্যে অধ্যাপক ড. আফম খালিদ হোসেন বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধ’-ব্যাপারগুলো কখনো ভিন্ন নয়, বঙ্গবন্ধুর বাবার শরীরে সর্বদা শোভা পেত ধর্মীয় পোশাক আশাক এবং বঙ্গবন্ধু নিজেও কখনো ধর্মীয় চেতনা বিরোধী ছিলেন না। তাই ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধ’ ব্যাপারগুলোকে মুখোমুখি দাড় করানো অমূলক একটি বিষয় বলেছেন অধ্যাপক ড. আফম খালিদ হোসেন।

বর্তমানে আলেম-ওলামার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে আইন শৃঙ্ক্ষলা বাহিনী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বক্তব্য ও আচরণে এক ধরণের বাড়াবাড়িই করে ফেলছেন যাতে দেশের বিচার বিভাগের প্রতি স্পষ্ট অশ্রদ্ধা প্রকাশ পাচ্ছে বলে মত অধ্যাপক ড. আফম খালিদ হোসেন।

এছাড়া জনগনের ট্যাক্সে পরিচালিত প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জনগণ সম্পর্কে এমন বক্তব্য প্রদানের অধিকার নেই বলছিলেন তিনি।

দায়িত্বশীলদের অপেশাদার বক্তব্য ও আচরণে অনেককে শক্ত ভাষায় এসবের প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে, এই যে মানুষের মাঝে এক ধরণের বিরোধ ও সংঘাতপূর্ণ উত্তর দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে,  এসবের জন্য মূলত দায়িত্বশীলদের অদায়িত্বহীন আচরণ দায়ী-এসবের দায় তারা এড়াতে পারেন না বলছেন চট্টগ্রামের ওমর গণি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. আফম খালিদ হোসেন।

এদিকে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলছেন, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের লোকদের কাছ থেকে যেসব আচরণ প্রকাশ পাচ্ছে তা খুবই দুঃখজন। দায়িত্বশীলদের থেকে বিভিন্ন এলকার স্থানীয় কর্মী পর্যায়ের আচরণে হতাশ দেশের মানুষ এবং তাদের এজাতীয় কথা ও আচরণ সরকারী আইন লঙ্ঘনের নামান্তর বলছিলেন ড. আহমদ আবদুল কাদের।

জনগনের ট্যাক্সে পরিচালিত সরকারী কর্মচারীদের পক্ষ থেকে আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষের প্রতি দুর্ব্যবহার দেশের আইনের প্রতি স্পষ্টত ধৃষ্টতা প্রদশর্ন বলছেন ড. আহমদ আবদুল কাদের।

বর্তমানে দেশে আইনের শাসনের সঠিক প্রয়োগ না থাকার কারণেই মূলত দায়িত্বশীল পর্যায়ের লোকেরা উশৃংখল আচরণ ও অপেশাদার বক্তব্য দেওয়ার সাহস পাচ্ছেন। এজাতীয় নৈরাজ বন্ধে শুধু জনগণ নয়, সব শ্রেণীর নাগরিক ও দায়িত্বশীলদের আইনের আওতায় এনে জবাবদিহীতা বাধ্যতামূলক করতে হবে বলছেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও দেশের দায়িত্বশীলদের সরকারী কর্মচারী নয় বরং রাষ্ট্রের কর্মচারী হিসেবে জনগনের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালনের মনোভাব লালন করতে বলে মত খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের।

আরো পড়ুন: আলেমদের তাচ্ছিল্য: ‘ভেতরে থাকা ইসলাম বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ’

-এনটি

বিজ্ঞাপন