চেতনার বাতিঘর শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান রহ.

আবু হিশাম ।।

শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান রহ.। দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম শিক্ষার্থী। হাজারো আলেমের মুরুব্বি ও উস্তাদ। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর অন্যতম খলিফা। বৃটিশ বিরোধী রেশমী রুমাল আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। উপমহাদেশের স্বাধীনতার জন্য ইংরেজের ঐতিহাসিক মাল্টার কারাগারের বন্দি। আপন যুগের মহান মুহাদ্দিস ও মুফাসসির। দারুল উলূম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসীন ও শাইখুল হাদীস।  মহান মুজাহিদ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রপুরুষ।

বিজ্ঞাপন

আমাদের চেতনার বাতিঘর।

তিনি ১২৬৮ হিজরী মোতাবেক ১৮৫১ সালে বেরেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। যেখানে তাঁর সম্মানিত পিতা মাওলানা জুলফিকার আলী উসমানী দেওবন্দী রহ. কর্মস্থল হিসাবে স্বপরিবারের বসবাস করতেন। মিয়াজী মেঙ্গালোরী এবং মিয়াজী আব্দুল লতিফ সাহেবের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা ও কুরআন মাজীদ সমাপ্ত করেন। অতঃপর ফার্সী সকল কিতাব ও আরবী প্রাথমিক কিতাবগুলো তাঁর মামা মাওলানা মেহতাব আলীর কাছে পড়েন।

তাঁর পনের (১৫) বছর বয়সে ১৬৮৩ হিজরীর ১৫ মুহাররম মোতাবেক ১৮৬৬ সালের ৩০ মে ‘আযহারে হিন্দ’ খ্যাত দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন দেওবন্দের সর্বপ্রথম ছাত্র। এবং সেখানকার প্রথম শিক্ষক মোল্লা মাহমুদ সাহেবের শীষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কুতুবে সিত্তা সহ আরো বেশ কিছু কিতাব দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী সাহবের (রহ.) কাছে অধ্যায়ন করেন।

১২৮৮ হিজরীতে পড়াশোনা শেষ করেন এবং এই বছরই দেওবন্দ মাদরাসায় সহকারী শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে সুদীর্ঘকাল (১৮৮৮-১৯২০ সাল) প্রায় ৩৩ বা ৩৪ বছর যাবত তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসীন এবং শাইখুল হাদীস ছিলেন।

তার সর্বজনস্বীকৃত রচনাবলীর মধ্যে তরজমায়ে কুরআন মাজীদ, আদিল্লায়ে কামেলা, ইযাহুল আদিল্লা, আহসানুল কুরা, আল আবওয়াব ওয়াত তারাজিম লিল বুখারী, হাশিয়ায়ে মুখতাসারুল মাআনী, তাসহীহে আবু দাউদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তাদরীস ও রচনার পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খেদমত:

* জমিয়তুল আনসার প্রতিষ্ঠা: ১৮৮০ সালে হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, পবিত্র কুরআন ও রাসূলের হাদিসের গুঢ় রহস্য ও গভীর জ্ঞান সম্পর্কে সাধারণ মুসলমানদেরকে পরিচিত করা। তাদের আকীদা ও আমলের সংস্কার করা এবং জাতির মৃত হৃদয়কে জীবিত করে তোলার প্রচেষ্টা চালানো।

* রেশমী রুমাল আন্দোলন: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন, যা ইতিহাসে “রেশমী রুমাল আন্দোলন” নামে বিখ্যাত। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশদের ভারত থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই লক্ষ্যে তিনি তুর্কি সরকারের সাথেও সন্ধি স্থাপন করেছিলেন। যার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং মাল্টায় কারাবন্দী করা হয়েছিল। এই আন্দোলনের প্রভাবে কাবুলে সর্বপ্রথম ইংরেজ বিদ্রোহী সরকার গঠিত হয়।

* ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ: হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. ব্রিটিশদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বর্জনের বিষয়ে শরিয়তের যুক্তি-প্রমাণ পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করে বলেছিলেন, মুসলমানদের প্রথম কর্তব্য হলো, ইসলামের শত্রুকে শত্রু হিসাবেই বিবেচনা করা এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব, প্রেম ও অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি হয় এমন সব সম্পর্ক ছিন্ন করা। এই নৈতিক যুদ্ধকে বলা হত “অন্তরঙ্গতা বিসর্জন”।

* জামিয়া মিল্লিয়া প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ: হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. তাঁর সহচর হাকিম আজমল খান সাহেবের সাথে ২৯ শে অক্টোবর ১৯০২ সালে জামিয়া মিলিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।

হযরত শায়খুল হিন্দ তাঁর পুরো জীবন দ্বীনী ইলমের শিক্ষাদানে ব্যয় করেছেন। তাঁর শাগরিদগণের তালিকা সুদীর্ঘ। যাঁরা পরবর্তীতে তাঁর মিশন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিলেন।

৩০ শে নভেম্বর ১৯২০ সালে এ মহামনীষী দিল্লিতে ইন্তেকাল করেন। দারুল উলূমের প্রতিষ্ঠাতা হযরত নানুতবী (রহ.) এর পাশে তার কবর অবস্থিত।

এম এস আই 

বিজ্ঞাপন