স্মৃতির শ্লেট: হঠাৎ চলে যাওয়া এক বড় ভাই-বন্ধুর কথা

শরীফ মুহাম্মদ ।।

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক থেকে নিয়ে আজকে পর্যন্ত আধুনিক শিক্ষিত যে কজন লেখক-সাংবাদিক কিংবা সাংবাদিক-লেখকের সঙ্গে আমার পরিচিতিটা কিছুটা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার পর্যায়ে গিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী। বয়সে তিনি আমার চেয়ে দশ-এগারো বছরের বড়। গত ১৪/১৫ বছর যাবত তার সঙ্গে আমার যোগাযোগটা ছিল অত্যন্ত সজীব এবং প্রায় সার্বক্ষণিক।

বিজ্ঞাপন

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী ভাই ছাড়াও অধ্যাপক আবদুল গফুর, ইউসুফ শরীফ, সালেহ উদ্দিন আহমেদ জহুরী, সরদার ফরিদ আহমদ, গুলশান আব্দুল হাই, হাসনাইন ইমতিয়াজ, মসউদ-উশ-শহীদ, মাহবুবুল আলম মাসুদ-গত ২৫ বছরের লেখালেখি অঙ্গনের সম্পর্কের স্মৃতিতে এই নামগুলো উজ্জ্বল হয়ে আছে।

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী ভাই গত ২৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন একজন সৎ দক্ষ মনোযোগী মেধাবী মধ্যবয়সী সাংবাদিক। সাংবাদিকতায় তার জগৎটা ছিল সাব এডিটিং বা নিউজ সম্পাদনা বিভাগ। এ বিষয়ে ঢাকার বরেণ্য সাংবাদিকদের একজন ছিলেন তিনি। সরদার ফরিদ আহমদ ভাইয়ের ভাষায়, হুমায়ুন সাদেক ভাই হচ্ছেন আইনেস্ট মানুষ এ বিষয়ে। যায়যায়দিন, নয়া দিগন্ত, আমার দেশ, অর্থনীতি প্রতিদিন-এসব পত্রিকায় তিনি বার্তা সম্পাদক অথবা অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক এমনসব দায়িত্ব পালন করেছেন।

হুমায়ূন সাদেক ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ‘আমার দেশ’ যুগে। ২০০৫/০৬ এর দিকে তার সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠতে থাকে। তিনি তখন দৈনিক আমার দেশ-এর যুগ্ম বার্তা সম্পাদক। আমি ফিচার বিভাগে ধর্ম ও জীবন পাতা দেখি। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। পরিচয়ের আনুষ্ঠানিকতা পার হতেই একটা ব্যক্তিগত রূপ ধারণ করতো তার সঙ্গে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর একটি অভিজাত মুসলিম পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। পোশাক-আশাক চালচলনে ‘ফিটফাট আধুনিক মানুষ’ ভেতরে তার গভীর ধর্মপ্রাণ একটা মন ছিল। এবং এর সঙ্গে কিছুটা কোমল ও প্রয়োজনীয় পক্ষপাতও ছিল।

২০০৫ থেকে তার মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগ পর্যন্ত প্রায় নিয়মিত ফোনে কথা হতো, দেখা হতো তার সঙ্গে। আমি দেখা করতে পরবর্তী সময়ে যায়যায়দিন ও নয়া দিগন্তে অনেকবার গিয়েছি। মাঝে একবার অসুস্থতার কারণে শাজাহানপুরে তার বাসায় দেখতেও গিয়েছি। এই করোনা কালে বিভিন্ন সময়ে তিনি আমাকে ফোন করতেন। এবং একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এই সময়টাতে বিভিন্ন আমল মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কে আমাকে অনেক বেশি জিজ্ঞেস করতেন। গত কয়েক মাস আগে আমার মনে হয়েছিল, তিনি মাগরিবের পর সহ দিনের বিভিন্ন সময়ে কিছু নফল আমলেও সময় দেন। টেলিভিশনের আলোচনা শুনে কিংবা কারো কোন লেখা পড়ে ধর্মীয় মাসআলা-মাসায়েলের বিষয়ে কোনো সংশয় কিংবা মতবিরোধের পর্যায়ে পড়লে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করতেন। আমি সরল ভাবে তাকে হানাফী মাযহাবের করণীয় আমলের কথাটি বলে দিতাম। সন্তুষ্টচিত্তে তিনি আমল করতেন।

নিচু কন্ঠ মানুষ ছিলেন। সাংবাদিকদের মধ্যে কিছুটা নির্বিরোধ সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। sub-editors কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে নেতাও ছিলেন। কিন্তু রূঢ়ভাষী মানুষ ছিলেন না। খুব মনোযোগী পাঠক ছিলেন। বহু বিষয়ে বহু বইপত্র পড়েছেন এবং পড়তেন। আমার কাছ থেকে নিয়ে কয়েক বছর নিয়মিত মাসিক আলকাউসার পড়েছেন। অন্যদিগন্ত নামের একটি ডাইজেস্টে তিনি নিয়মিত লিখতেন বিদেশি ফিচার (অনূদিত অবলম্বনকৃত)। প্রায় প্রতিটি সংখ্যা পরবর্তী সাক্ষাতের সময় তিনি আমার হাতে তুলে দিতেন।

বিদেশি রাজনীতির ওপর পর্যবেক্ষণী কলাম লিখেছেন কিছু। ভালো ছড়া লিখতেন। পল্টনে বহুবার বসে চা খেয়েছি। বশির মেসবাহ ভাইয়ের অফিস সালসাবিলে অনেক বার মিলিত হয়েছি আমরা। আমি তাকে কোন বই পড়তে দিয়েছি, এটা নিয়ে পরে কোনো আলোচনা হয়নি এমন খুব কমই হয়েছে। যেকোনো নতুন ধরনের কোন লেখা নিয়ে আলোচনা হলে তিনি বিভিন্ন বইয়ের কথা উল্লেখ করতেন। ‘রঙিন মখমল দিন’ শুরু করার আগে বা শুরুর সময়টাতে রবীন্দ্রনাথ, আল মাহমুদ, হুমায়ূন আহমেদ, প্রতিভা বসু- এদের ছেলেবেলা এবং আত্মজীবনী টাইপের লেখা বিভিন্ন রচনার কথা তিনি বলেছেন।

এযুগের আলেম লেখকদের অনেকের গদ্য দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যেতেন। রসিকতা করে বলতেন ‘মুসলমানদের লেখায় এখন সাহিত্য আসছে’। আমার একটি বইয়ের ফ্ল্যাপে তার কিছু লেখা আছে। একবার ‘রঙিন মখমল দিন’ নিয়ে তিনি তার অদ্ভুত একটি অভিব্যক্তি আমার কাছে প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘আপনার এই বইটিতে এ দেশের কওমী মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিশু-কিশোরদের জীবনটা কেমন হয় তার একটা চিত্র আছে। এটা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একটা সংযোজন। আপনার এই বই পড়ার আগে আমার ঠিক এরকম ধারণা ছিল না।’ হুমায়ুন সাদেক ভাইয়ের কথায় অনুপ্রাণিত হতাম, এবং অনেক হতাশাব্যঞ্জক অভিজ্ঞতার গল্প শুনে অনেক সময় মুষড়েও পড়তাম। কিন্তু সামগ্রিকভাবে অনেক উপকৃত হয়েছি তার কাছ থেকে।

কাজকর্ম শূন্য কোনো সময়ে অথবা কোনো ডে অফ-এ গল্প চা পান আসরে বসতাম, অনেক সময় ঘুরাঘুরি তো বের হতাম। একবার তাকে নিয়ে লালবাগে চলে গেলাম। মরহুম মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল-এর ওখানে লম্বা গল্প চলল। ওইদিন সুযোগ করে মুফতি আমিনী রহ.-এর সঙ্গে উনাকে বসিয়ে দিলাম। বেশ কয়েকবার তিনি মিরপুরে মারকাযুদ দাওয়ায় আসতে চেয়েছিলেন। সময় হয়ে উঠেনি। ঢাকার বাইরে কয়েক জায়গায় বেড়ানোর কথা ছিল, আর হলো না। একবার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কক্সবাজার সফর হয়েছিল তার সঙ্গে।

সাংবাদিকতায় সব ধারার মানুষেরই তিনি প্রিয় জন ছিলেন। ফোরাম ও রাজনৈতিক পক্ষ বিপক্ষ- এর বিভাজন মুক্ত সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের পরপর দুবার সভাপতি ছিলেন। তবে তিনি সাংবাদিকতায় আওয়ামী বলয়ের মানুষ ছিলেন না। অপরদিকে বিএনপি-জামাত ঘরানার প্রতিনিধিত্বশীল কেউ ছিলেন বলেও মনে হয় না। জীবনের শেষ ২/৩ বছর এর জন্য অনেক কঠিন সময় তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে। চাকরি-বাকরিহীন ছিলেন লম্বা একটা সময়।

হুমায়ুন সাদেক ভাইয়ের সব গুণাগুণের সঙ্গে অদ্ভুত ব্যাপার এটাও ছিল যে তিনি সীমাহীন ভদ্র লাজুক চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলেন। গত মাসখানেক যাবত বারবার মনে হয়েছে, তার সঙ্গে একটু অন্তরঙ্গ পরিবেশে বসা দরকার। গত কয়েকদিন আগে তার মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে একটি ‘বুকভাঙা’ স্ট্যাটাস তিনি দিয়েছিলেন। ওই স্ট্যাটাসের ভেতরে দুঃখের যে অন্তহীন গল্প আছে এটা কিছুটা আমি স্পর্শ করতে পেরেছিলাম। কিন্তু এরপর তার সঙ্গে আর দেখা হলো না।

আমি যতোটুকু তাকে বুঝেছি, একজন ধর্মপ্রাণ, আদর্শবান, দেশপ্রেমিক এবং অত্যন্ত সৎ মানুষ ছিলেন তিনি। তার দুটি সন্তান বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে। দু-একবার বাসায় গিয়ে বুঝেছি, বিত্তের চেয়ে বইয়ের পরিমাণ বাসায় অনেক বেশি। সেই মানুষটি হঠাৎ এবং আকস্মিক ভাবেই চলে গেলেন। গত কয়েক মাস ফোনে ফোনে বিভিন্ন আমল সম্পর্কে তার জিজ্ঞাসাবাদের কথা আমার এখন বারবার মনে পড়ছে।

আল্লাহ তাআলা এই মানুষটিকে জান্নাতের বাসিন্দা বানিয়ে নিন।

এস এন

বিজ্ঞাপন