উন্নত জীবনের টানে: বসনিয়ার জঙ্গলে ঘরছাড়া বাংলাদেশীদের দুঃখগাথা

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য প্রবাসীদেরকে বাহবা দিলেও তাদের দু:খ ও দুর্দশার কথা খুব কম মানুষই জানেন। তবে অনেকে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, জীবনকে একটু ভালোভাবে যাপন করার জন্যে পরিবার পরিজন ফেলে দূরদেশে নিজেদেরকে এমন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কি আদৌ যৌক্তিক?

সম্প্রতি জার্মান ভিত্তিক  একটি গণমাধ্যমের সংবাদিক বসনিয়ার জঙ্গলে থাকা ইউরোপগামী বাংলাদেশীদের সাথে দেখা করে এসেছেন। তিনি লেখা ও ভিডিওর মাধ্যমে তুলেছেন জঙ্গলে আশ্রয় নেয়া বাঙ্গলীরা কিভাবে দিন যাপন করছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি লিখেছেন, বসনিয়ার ভেলিকা ক্লাদুসা ছোট্ট শহর, বাসিন্দা হাজার চল্লিশেক। শহরে প্রবেশ করতেই দেখলাম, আমাদের দেশের মতোই রাস্তায় অসংখ্য নেড়ি কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরটাতে আভিজাত্যের কোনো ছাপ নেই। তবে ঠান্ডা ছিল বেশ। রাতের খাবারটা হোটেল নিচেই এক রেস্তোরাঁয় সারলাম।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বসনিয়ায় ভোরে ঘুম ভাঙল আজানের ধ্বনিতে। সকাল সকাল শরণার্থীদের খোঁজে যাত্রা করলাম। শহরের এক পাশে দক্ষিণ এশীয় আশ্রয়প্রার্থী, আরও সহজ করে বললে বাংলাদেশি, পাকিস্তানি এবং আফগানদের দেখা মিলতে বেশি সময় লাগল না। পশ্চিম বসনিয়ার পাহাড়ি শহরটির প্রধান সড়কের এক পাশ ধরে মাথা নিচু করে হাঁটতে দেখলাম কয়েকজনকে, হাতে হলুদ রঙের বাজারের ব্যাগ। তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন, আরও খানিকটা গেলে একটি শরণার্থীশিবির চোখে পড়বে। তবে সেই শিবিরের ভেতরের চেয়ে বাইরে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংখ্যা বেশি। শিবিরের পাশের এক পাহাড়ের ঢালে রয়েছেন অনেক বাংলাদেশি।

পাহাড়ের সেই অস্থায়ী বাসিন্দাদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। তাঁদের প্লাস্টিকের খুপরিতে সোজা হয়ে বসারও উপায় নেই, দাঁড়ানোর তো প্রশ্নই আসে না। সেখানে নেই বিদ্যুৎ, পানি কিংবা শৌচাগারব্যবস্থা। রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা করেন তাঁরা। জঙ্গলের একাংশ ব্যবহার করেন প্রাকৃতিক কর্ম সারতে। পাহাড়ের নিচের একটা নালায় কাপড় ধোয়া, গোসল করা হয়৷

খাবারদাবারের আয়োজন নিজেদেরই করতে হয়। এ জন্য দেশ থেকে নানাভাবে টাকা আনেন কেউ কেউ। এক শ ইউরো আনালে হাতে পান আশি ইউরো। বাকিটা হুন্ডি চক্র নিয়ে নেয়। সেই টাকায় সুপারমার্কেট থেকে চাল, ডাল কিনে জঙ্গলে খড়ি জ্বালিয়ে রান্না হয়। সবার আবার টাকা আনার সাধ্য নেই। যারা পারেন না, তাঁরা চেয়েচিন্তে খান কিংবা অপেক্ষায় থাকেন কখনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা স্থানীয়দের। কালেভদ্রে আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা তাঁদের খাবার দেয়। এমনই খাবার, যা খেয়ে অভ্যস্ত নয় দক্ষিণ এশীয়রা।

প্রথম দিন সেই জঙ্গলের খবর প্রকাশের পর অবশ্য জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) বেশ সক্রিয় হতে দেখেছি। পরদিন জঙ্গলের ছয় শ বাসিন্দার জন্য স্লিপিং ব্যাগ এবং খাবার নিয়ে কয়েকটি গাড়ি হাজির হয়েছিল। সবাই পেয়েছিলেন সেই স্লিপিং ব্যাগ। জানতাম এই উদ্যোগ সাময়িক। তবু ভালো লেগেছিল যে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে কিছুদিন অন্তত তারা একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।

সবচেয়ে খারাপ লেগেছে সেদিন বিকেলে। বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যে নির্মমভাবে পেটানো হয়, সে কথা শুনেছিলাম। কিন্তু সেদিন চোখের সামনে দেখলাম সেই নির্মমতার কিছু নমুনা। এক বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হলো, যাকে কিছুক্ষণ আগেই সীমান্তে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়েছে। তার কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছিল। ক্ষতের মধ্য দিয়ে হাড় দেখা যাচ্ছিল আর সারা শরীরে ছিল পেটানোর দাগ।

এ রকম আরও কয়েকজন আহতকে তখন অ্যাম্বুলেন্স এবং আইওএমের গাড়ি এসে নিয়ে গিয়েছিল। এভাবে গুরুতর আহতরা দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসার সুযোগ পান। সেই সময়টা তাঁরা আইওএম পরিচালিত শিবিরে থাকতে পারেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গোটা বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে, অথচ তাদের সীমান্তেই এভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন আশ্রয়প্রার্থীরা। নিজের চোখে না দেখলে হয়তো আমার পক্ষে বিশ্বাস করাই কঠিন হতো বিষয়টি। আশার কথা হচ্ছে, বিষয়টি ইইউর নজরে আনার পর তারা তদন্ত করবে বলে জানিয়েছে। জোটটির সীমান্তে কোনো আশ্রয়প্রার্থীকে এভাবে পেটানোর নিয়ম নেই, বরং কেউ আশ্রয় নিতে চাইলে সেটির কারণ জানতে এবং সেই ব্যক্তি আসলেই আশ্রয় পাওয়ার উপযুক্ত কি না, তা যাচাই করতে হবে। আর যাচাইবাছাইয়ের এই সময়টায় সেই ব্যক্তিকে ইইউভুক্ত কোনো এক দেশে আশ্রয় দিতে হবে। মোটা দাগে নিয়ম এটাই। বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে বলেই অভিযোগ আশ্রয়প্রার্থীদের।

সূত্র: প্রথম আলো