মাওলানা নিসার আলী তিতুমীর, হার না মানা এক মহাবীর

সাইফ নূর ।। 

মাওলানা নিসার আলী তিতুমীর রহমাতুল্লাহি আলাইহি। উপমহাদেশের দ্বীনী সংস্কার ও স্বাধীনতার তিতিক্ষার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্বল নাম। মুসলিম মানসপটে শিহরণসঞ্চারী এক স্বাপ্নিক পুরুষ। ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা। ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লার স্থপতি সাইয়েদ মীর নেসার আলী তিতুমীরের শাহাদাত দিবস আজ। (১৯ নভেম্বর ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ)

বিজ্ঞাপন

তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি সর্বপ্রথম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। তিতুমীরই সর্বাগ্রে বাংলার একাংশে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় পৌনে দুশ’ বছর আগে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য তিনিই প্রথম যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

মাওলানা নিসার আলী তিতুমীরের জন্ম ১৭৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমায়। এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে। আরবী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে তিনি পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ১৮ বছর বয়সে কোরআনের হাফেজ হন। পড়ালেখা শেষ করে তিনি মক্কা গমন করেন। সেখানে তাঁর দেখা হয় উপমহাদেশের মহান সংস্কারক ও মুজাহিদ সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ রহ.-এর সাথে। তিতুমীর তার হাতে তরিকত ও জিহাদের বায়আত গ্রহণ করেন।

১৮২৭ সনে তিতুমীর দেশে প্রত্যাবর্তন করেই শিরক-বিদআত উৎখাত এবং সুন্নতের পূর্ণ অনুসরণের আন্দোলন শুরু করেন। তিতুমীরের ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অল্পকালের মধ্যে তিন-চারশ লোক তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। উল্লেখ্য যে, তার মুর্শিদের প্রদর্শিত ‘তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া’ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তিনি সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অচিরেই তিনি এক বিরাট সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সমর্থ হন। তার সমর্থকদের বেশিরভাগই ছিল কৃষক,তাঁতী ও সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ। মসজিদ সংস্কার, নামাজসহ ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান পালন, ধর্মীয় সমাবেশ ও জলসার মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা ইত্যাদির মধ্যেই তিনি তার প্রাথমিক আন্দোলনের কাজ সীমাবদ্ধ রাখেন।

তিতুমীরের আন্দোলনের প্রধান তিনটি উদ্দেশ্য ছিল- মুসলমানদের অধর্মীয় আচরণ থেকে বাঁচানো, শাসক ইংরেজদের ইঙ্গিতে পরিচালিত অত্যাচারী শোষক জমিদারদের হাত থেকে শোষিত হিন্দু-মুসলমান প্রজাদের রক্ষা করা এবং ভারতবর্ষকে ইংরেজ শাসনমুক্ত করা।

১৮২৭ সালে নিসার আলীর ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে অত্যাচারী জমিদার, নীলকর ও ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। তিতুমীরের উত্থানে ভীত হয়ে পড়ে জমিদাররা। স্থানীয় জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র দেব তিতুমীরকে শায়েস্তা করতে বেশ কয়েকবার লাঠিয়াল বাহিনী পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু লাঠিয়াল বাহিনী বারবারই পরাস্ত হয়ে ফিরে আসে। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র দেব মুসলমানদের ‘দাঁড়ি’ রাখার ওপর কর বসিয়ে তা আদায় করতে শুরু করে। এতে রেগে গিয়ে ১৮৩০ সালের ৬ নভেম্বর প্রায় ৩০০ অনুসারী নিয়ে জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র দেবের বাড়ি পুঁড়া গ্রামে হামলা চালান তিতুমীর। এতে উভয় পক্ষ ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এরপর তিতুমীর জমিদার ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি ইংরেজদের খাজনা না দিয়ে তাঁর কাছে খাজনা পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ ঘোষণা মানতে নারাজ জমিদাররা। গোবরডাঙ্গার জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় তিতুমীরকে কর দিতে সরাসরি অস্বীকার করে। তিতুমীর ও কালীপ্রসন্নের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। কালীপ্রসন্নকে সাহায্য করতে তার বন্ধু লাটবাবু কলকাতা থেকে দুইশ হাবশি পাইক পাঠিয়ে দেয়। দুইশ লাঠিয়াল পাঠায় মোল্লাহাটি নীলকুঠির ম্যানেজার। কালীপ্রসন্নের নিজেরও ছিল চারশ পাইক, দুইশ লাঠিয়াল আর কয়েকটি হাতি। সবাই মিলে আক্রমণ করে তিতুমীরকে। বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে তাদের তাড়িয়ে দেন তিতুমীর।

তিতুমীরের আহবান ছিল অত্যাচারী জমিদারী প্রথার বিরুদ্ধেও। তাঁর একটি শ্লোগান ছিল, লাঙ্গল যার, জমি তার। তাঁর বক্তব্য ছিল, যার শ্রমের ফসল তাকেই ভোগ করতে দিতে হবে। এই অভাবনীয় আহবানের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলার কৃষকদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। তাঁর নের্তৃত্বে গড়ে ওঠে নির্যাতিত দরিদ্র কৃষকদের সমন্বয়ে একটি দল। কিন্তু তিতুমীরের আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রথম বিরোধীতায় নামেন জমিদারগণ। বিশেষ করে পূঁড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়, গোবরা গোবিন্দপুরের জমিদার শ্রী দেবনাথ রায়, ধান্যকুড়িয়ার জমিদার শ্রী রায়বল্লভ, তারাগুনিয়ার শ্রী রাম নারায়ন নাগ, নাগরপুরের জমিদার গৌর প্রসাদ চৌধুরী, সরফরাজপুরের জমিদার শ্রী কে পি মুখার্জী ও কলিকাতার গোমস্তা লালু বাবু প্রমূখ তিতুমীর ও তার সঙ্গীসাথীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন।

ইংরেজ নীলকররাও ছিলেন জমিদারদের পক্ষে। পূঁড়ার জমিদার তিতুমীরের সঙ্গীসাথীদের ওপর নির্যাতন শুরু করেন। তিতুমীর ঐ জমিদারকে পত্র মারফত জানান যে, তিনি (তিতুমীর) কোন অন্যায় করছেন না, ইসলাম প্রচারের কাজ করছেন। এই কাজে বাঁধা দান করা ঠিক নয়। এটা পরধর্মে হস্তক্ষেপের সামিল হবে। তিতুমীরের এই পত্র নিয়ে জমিদারের কাছে গিয়েছিল আমিনুল্লাহ নামক একজন দূত। জমিদার তিতুমীরের পত্রকে কোন তোয়াক্কা না করে তাঁর দূতকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। জমিদারের লোকেরা মুসলিম-প্রধান গ্রাম বশিরহাটের মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয় ও গ্রামটি লুট করে। সরফরাজপুরের মসজিদে তিতুমীর ও তার কয়েকজন অনুসারীকে পুড়িয়ে মারার চেষ্ঠা করা হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত তিতুমীর বেঁচে যান। প্রত্যেকটি ঘটনার পর মুসলমানরা থানায় মামলা করেছিল। কিন্তু মামলার তদন্ত ও রায় সবই ছিল একপেশে। তিতুমীর ন্যায়বিচার পাননি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকেও।

তিতুমীর থাকতেন সরফরাজপুর গ্রামে। গ্রামবাসীদের ওপর জমিদারের বারবার আক্রমন ও অত্যাচারের কারণে তিনি নিজেই সে গ্রাম ছেড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন নারিকেলবাড়ীয়া গ্রামে। ১৮৩১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি দলবলসহ নারিকেলবাড়ীয়া গ্রামে যান। সেখানে চারিদিক থেকে অব্যাহত হামলার কারণে তিতুমীর তার আস্তানাটিকে নিরাপদ করার জন্য বাঁশের বেড়া দিয়ে নির্মাণ করেন তাঁর বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা। নারিকেলবাড়ীয়ার পরিত্যাক্ত একটি মসজিদকে সংস্কার করে সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ চালু করেন। তাঁর নের্তৃত্বে নদীয়া ও ২৪ পরগনা জেলার অনেক এলাকার মানুষ একতাবদ্ধ হয়। স্বভাবতই এটা জমিদারদের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। জমিদার কৃষ্ণদেব রায় ১৮৩১ সালের ২৯ অক্টোবর সহস্রাধিক সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে নারিকেলবাড়ীয়া আক্রমন করতে আসেন। তিতুমীর তাঁর অনুসারীদের জীবনরক্ষার্থে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন। এভাবেই বাঁশের কেল্লা নামক দূর্গটির নাম ছড়িয়ে পড়ে। নারিকেলবাড়ীয়া আক্রমন করতে এসে গোবরা-গোবিন্দপুরের জমিদার স্বয়ং নিহত হন। শেষে জমিদারদের বাহিনী পিছু হটে যায়।

ভীত-সন্ত্রস্ত জমিদার ও নীল কুঠিয়ালরা তিতুমীরকে দমনের জন্য সামরিক সাহায্য চেয়ে বাংলার তৎকালীন গভর্নরের কাছে দরখাস্ত করেন। গভর্নরের নির্দেশে কলকাতা থেকে যশোরে একটি সেনাদল পাঠানো হয়। যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে এই বাহিনী ১৮৩১ সনের ১৫ নভেম্বর নারিকেলবাড়িয়ায় আক্রমণ করে। কিন্ত মুজাহিদবাহিনী যুদ্ধের এক পর্যায়ে এই বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। যুদ্ধে ইংরেজ পক্ষের বহু লোক হতাহত হয়। আলেকজান্ডার কোনোমতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। ১৭ নভেম্বর কৃষ্ণনগরের ম্যজিস্ট্রেট আর একটি বাহিনী নিয়ে নারিকেলবাড়িয়া যাত্রা করেন। এই বাহিনীও বিপর্যস্ত ও পর্যুদস্ত হয়ে পলায়ন করে। এরপর আসে সেই চূড়ান্ত লড়াই। পূর্ব উল্লিখিত আলেকজান্ডার ও মেজর স্কুটের নেতৃত্বাধীন এক বিশাল বাহিনী ১৯ নভেম্বর নারিকেলবাড়িয়া আক্রমণ করে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ইংরেজবাহিনীর মোকাবেলায় অসম যুদ্ধে তিতুমীরের বাহিনী টিকতে পারেনি। ইংরেজবাহিনী কামানের গোলার আঘাত তিতুমীরের বাঁশের কেল্লাটি ধ্বংস করে দেয়।

১৯ নভেম্বর, ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের অন্যতম একটি স্মরণীয় দিন। এদিন ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, বাংলার বীর সাইয়েদ মীর নেসার আলী তিতুমীরের শাহাদাত দিবস। সেদিন ইংরেজ সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় এজেন্ট অত্যাচারী জমিদারদের সম্মিলিত গুলীবর্ষণে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন তিতুমীরসহ ৫০ জন নিরপরাধ বীর যোদ্ধা। গ্রেফতার করা হয়েছিল আরও ৩৫০ জনকে। যাদেরকে পরে বিচারের নামে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন শাস্তি দেয়া হয়েছিল। দেশের গরীব কৃষকদের পক্ষে কথা বলাই ছিল তাদের অপরাধ। শহীদ তিতুমীরসহ নিহত মুসলমানদের লাশগুলিকেও প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।

আমরা জাতীয় বীরদের আজ ভুলতে বসেছি। যে জাতি তার জাতীয় বীরদের কদর করতে জানে না সেখানে বীর জন্মায় না। শহীদ মাওলানা সৈয়দ মির নেসার আলী তিতুমীর আমাদের জাতীয় বীর। সেদিন তিনি বাঁশেরকেল্লা নির্মাণ করে বলেছিলেন, “একটু পরেই হয়তো আমরা ইংরেজদের আক্রমণের শিকার হবো। তবে এতে ভয় পেলে চলবে না। এই লড়াই শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে। আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এই পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।”

সেদিন ইংরেজ সরকার মাওলানা নিসার আলী তিতুমীরকে শহীদ করে ভেবেছিল, স্বাধীনতা আন্দোলনকে তারা দমন করতে পেরেছে। সত্যের আওয়াজকে তারা স্তিমিত করে ফেলেছে; কিন্তু তারা ভুল ভেবেছিল। তিতুমীরের শাহাদাত সারা ভারতে স্বাধীনতার স্ফুলিঙ্গকে আরো জ্বালিয়ে দিয়েছিল। পরিণামে তাদেরকে এদেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।

শহীদ তিতুমীর তার বীরত্বের জন্য ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। জীবন বাজি রেখে তিনি হক ও ইনসাফের  জন্য লড়াই করেছেন। হার মানেননি জালেম অপশক্তির কাছে। তাঁর এই দৃঢ়তা ও অনবদ্য প্রেরণা আজও বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানকে অনুপ্রাণিত করে, শিহরিত করে।

এম এস আই