নারায়ণগঞ্জ ট্রাজেডি: দুর্ঘটনায় দগ্ধ রোগীদের পাশে কিছু সময়

নুরুদ্দীন তাসলিম।।

নারায়ণগঞ্জের তল্লায় মসজিদে তিতাসের গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ। ৩৮ মুসল্লি দগ্ধ। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি রোগীদের অবস্থা সরেজমিন কাভারেজ দিতে হবে। দায়িত্ব পড়লো আমার উপর। যথেষ্ট উৎসাহ দিলেন সম্পাদক সাহেব। অক্ষরে অক্ষরে, এক কথায় বলতে গেলে হাতে কলমে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে কাজ করতে হবে সেখানে গিয়ে।

বিজ্ঞাপন

মনের ভয় তবুও কাটে না। নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করতে ফোন করলাম জহির উদ্দিন বাবর সাহেবের কাছে। দূর থেকে দেখে গুরু গম্ভীর মনে হয়। তবে কাছে গেলে দিল খুলে কথা বলেন। শুনেই বললেন, এ কোন ব্যাপার না। যাবেন, দুয়েকজন রোগীর আত্মীয়ের সাথে কথা বলে ঘুরে ফিরে আসবেন। আর কোন কাজ নেই। বাকিটা প্রতিবেদনে লিখবেন।

ঘুরে ফিরে এসে লিখে ফেলা একি এতোই সহজ! শরীরে জ্বর চলে আসে আসে অবস্থা! আধো ঘুম, আধো আতঙ্কে কাটলো পুরো রাত।

সকাল হতেই বুকটা দুরু দুরু কাঁপছে। মাথায় চাপ অনুভূত হচ্ছে।

একবার মনে হল, জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে যেতে হবে। এতে চাপের কি? কারণে-অকারণে কতজনই তো যায়। নিজেও হাসপাতালের বেডে শুয়েছি দুয়েকবার। কিন্তু আজ হাসপাতালে যাওয়াটা হঠাৎ এতোটা চাপের মনে হচ্ছে- পেশাদারীত্বের কারণে। আমাকে যেতে হবে প্রতিবেকদক হিসেবে। সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে দুর্ঘটনায় হতাহতদের অবস্থার কাভারেজ দিতে হবে। জীবনের প্রথম সরেজমিন প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করতে যাওয়া, তাও এতো বড় ঘটনায়। চাপ একটু বেশিই নিচ্ছিলাম।

গতরাতে সম্পাদকের কথাগুলো চাপ কমাতে সাহায্য করল। মাসুমকে সাথে নিয়ে ১০ নাম্বার হয়ে শাহবাগ।শাহবাগ থেকে রিক্সাযোগে বার্ন ইনস্টিটিউটের গেটে। মাসুমের সাথে যাত্রাবাড়ীতে মেশকাতের বছর থেকে পরিচয়। সেই থেকে ভাল বোঝাপড়ার সম্পর্ক। জীবনের প্রথম মাঠ সাংবাদিকতার দিনে কিছুটা সাহস পেতে সাথে নিয়ে গেলাম জোর করে।

অপেশাদারিত্বের কারণে প্রবেশ পথেই আটকে দিল সিকিউরিটি গার্ড। অনেক রোগী, অযথাই ভীড় করছেন কেউ কেউ। তাই যাকে তাকে ভেতরে যেতে দিতে চান না। আমাকেও ঢুকতে দিচ্ছেন না ভেতরে।

জীবনের প্রথম সরেজমিন প্রতিবেদন, শুরুর আগেই মাঠে মারা পড়ল বুঝি! সরেজমিন প্রতিবেদনের আশায় গুড়েবালি। এখান থেকেই ফিরে যেতে হচ্ছে বুঝি।

সরেজমিন প্রতিবেদন করতে গিয়ে জীবনের প্রথম সফরেই ব্যর্থ- এজাতীয় একটা চিত্র কল্পনায় ভেসে উঠছিল। হৃদপিন্ডে ধুকধুক শব্দ শুনতে পেলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা, এরপর কৌশলে ইমার্জেন্সি, ক্যাফেটেরিয়া পেরিয়ে অভ্যর্থনার জন্য রাখা চেয়ারগুলোর একটিতে বসলাম।

সাংবাদিকতা ‘ধান্দাবাজি’- যতদূর মনে পড়ে সাহিত্য, সাংবাদিকতা কোর্সে আহমেদ সেলিম রেজা স্যার এভাবেই বলেছিলেন। বুঝলাম, আজ সেই ধান্দাবাজি অবলম্বন করেই কাজগুলো করতে হবে।

দেশের সব নামীদামী টেলিভিশনের সাংবাদিকরা ক্যামেরা নিয়ে বসে আছেন। এইসব মিডিয়া হাউজের তুখোড় সংবাদকর্মীদের সামনে আমি এক আনাড়ি প্রতিবেদক! বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। আধা ঘন্টা সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলাম সবকিছু। নিজেকে স্বাভাবিক করে লিফট বেয়ে ৫ তলায়। এখানেই নারায়ণগঞ্জের দুর্ঘটনায় দগ্ধ রোগীরা চিকিৎসাধীন। দগ্ধ ৩৭জনের ২৪ জনই তখন শহীদের কাতারে।

৫তলার অভ্যর্থনা কক্ষে ঢুকতেই দেখা মেললো রোগীর স্বজনদের। সবার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। দুদিন হলো নাওয়া-খাওয়া ভুলে প্রিয়জনকে ফিরে পাবার অপেক্ষা।

কথা বলে জানা গেলো, রাতে প্রত্যেক রোগীর একজন থাকতে পারেন অভ্যর্থনা কক্ষে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন নিয়মের কারণে ঢাকার আশপাশে বাসা নেই, এমন রোগীর স্বজনদের অনেকেই নাকি একটু বিশ্রামের জন্য ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিচ্ছেন ফুটপাতে।

ব্যয়বহুল শহরে রোগীকে নিয়েই টানাটানি, সেখানে হোটেলে থাকার কথা ভাবতেও পারছেন না তারা, কারো কারো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিই তো জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। নরম বিছানা নাকি ফুটপাত, তা দেখার সুযোগ কই!

রোগীর স্বজনদের নামে বহিরাগত কেউ কেউ নাকি চুরির মতো দুর্ঘটনা ঘটান, তাই সমবেদনা থাকলেও সবাইকে ঢালাওভাবে থাকার অনুমতি দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

দুর্ঘটনায় শহীদদের একজন শেখ ফরিদ। তখনো চিকিৎসাধীন বার্ন ইনস্টিটিউটে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। উঠতি বয়সী এ তরুণের সাথে পেখম মেলছিল তার বাবা মায়ের স্বপ্নগুলো। তিতাসের গ্যাস লিকেজের দুর্ঘটনা নিমিষেই ভেঙে দিয়েছে পেখম মেলা স্বপ্নগুলো।

‘ছেলে নামাজে গিয়ে আহত হইছে, কিচ্ছু হবে না আমার ছেলের’। ‘কেউ বলবি না আমার ছেলে মারা যাবে’। – একটু পর পর চিৎকার করে কেঁদে উঠছেন ফরিদের মা। ফরিদের বাবা নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও ছেলেকে ফিরে পেতে চান। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন।

রোগীর স্বজন ছাড়াও আইসিইউতে সরাসরি দেখা করেছিলাম শেখ ফরিদ, আব্দুল আজিজ, আমজাদ মিয়া নামের দগ্ধদের সাখে। আমজাদ মিয়া ছাড়া বাকি দুজন এখন জান্নাতবাসী।

আইসিইউ-এর ভেতর আগুনে ঝলসে যাওয়া মানুষগুলোকে দেখে আঁতকে উঠেছিলাম-এদের কিভাবে মানুষ বলা যায়! মনে হচ্ছিল কয়লার আবরণে ঢাকা কোন ‘প্রাণী’- যারা মানুষের মতো কথা বলতে পারেন, অথবা গল্পের বইয়ে পড়া, ভিডিওতে দেখা কোন ‘ভূত’ আমার চোখের সামনে! এরা দুর্ঘটনায় দগ্ধ রোগী একথা আগে থেকেই না জানলে হয়তো ওখানেই হার্ট অ্যাটাক করতাম।

‘হাসপাতালে এলে ঈমান বাড়ে’- কথাটা যেন আরো স্পষ্ট হল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল- পৃথিবীর যত পেশার মানুষ আছেন, তাদের মাঝে বার্নের ডাক্তারদের মত মহান কেউ নেই!

আইসিইউতে দেখা রোগীদের মাঝে শেখ ফরিদ যেন দাগ কেটে বসে আছেন আমার মনে। তাকে দেখে কেঁদে উঠেছিলাম। ভুলেই গিয়েছিলাম রোগীকে শান্ত্বনা দিতে হয়। আমার কান্না দেখে ফরিদ নিজেই শান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। হুজুর মতোন মানুষ দেখে বারবার দোয়া চাইছিলেন, আন্তরিক হয়ে কথা বলতে চাইছিলেন, কিন্তু কষ্ট হচ্ছিল।

রঙবেরং-এর বিভিন্ন জিনিস নিয়ে কেউ যেন একটু পরপর দলবেঁধে আসছে ফরিদের কাছে, তাকে নিয়ে যেতে চাইছে। নার্সকে ফরিদ বলছিলেন, তার বেড চেঞ্জ করতে- বেড চেঞ্জ করলে হয়তো তাকে নিয়ে যেতে পারবে না কেউ, এমন ধারণা ছিল ফরিদের।

আমি বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ফিরে আসার পরের দিন শহীদ হন শেখ ফরিদ। অনেক কষ্ট হয়েছিল তার মৃত্যু খবর শুনে। বারবার আফসোস হচ্ছিল জান্নাতের বাগানে পাখি হয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষটার কাছে গতকাল নিজের জন্য অনেক দোয়া চাইতে পারতাম।

সেদিন আইসিইউতে আরো কথা হয়েছিল দগ্ধ আব্দুল আজিজের সাথে। জান্নাতের পথযাত্রী মানুষটার অনেক কষ্ট হচ্ছিল। বলছিলেন- এই কষ্ট আর কত সহ্য করা যায়!

আইসিইউ থেকে বেরিয়ে আসার সময় ডানপাশ থেকে ভেসে এলো- ও হুজুর ভাই, এদিকে একটু আসেন! আমজাদ নামের এক দগ্ধ রোগী ডাকছিলেন।

অনেক ভয় লাগছিল আইসিইউ-এর ভেতরে। সহ্য করতে পারছিলাম না, ভেতরে থাকা আমার জন্য কষ্ট হচ্ছিল।তবে এমন স্পর্শকাতর মানুষের ডাকে সাড়া না দিয়ে কিভাবে চলে যাই! কাছে ডেকে বারবার দোয়া চাইছিলেন। আমি দোয়া চাইলাম, সবসময় যেন নামাজ ঠিক থাকে এই দোয়াই দিলেন আমজাদ।

সাধারণত মানুষ যেসব কারণে দুর্ঘটনার সম্মুখীন হন, অন্যকে সবসময় তা থেকে বিরত থাকার অনুরোধই করতে শোনা যায়। তবে নামাজ পড়তে গিয়ে আহত আমজাদকে দেখলাম অন্যভাবে। তিনি জামাতে পাবন্দ থাকার দোয়াই করলেন-যা হৃদয় স্পর্শ করলো।

আমজাদ বেঁচে গেছেন আশঙ্কা থেকে। দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া সৌভাগ্যবানদের একজন তিনি। পৃথিবীতে তার জীবন সহজ হোক এই কামনা।

আইসিইউর-এর সামনে স্বজনের জন্য অপেক্ষমানদের একজন আব্দুল আজিজের স্ত্রী আসমা বেগম। স্বজনদের নিয়ে যখন সবার মাঝে হাহুতাশ, এমন সময়ে অনেকটাই শান্ত্ব মনে হয়েছে তাকে। দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তারপরও এতোটা নির্ভার কিভাবে আপনি?-পেশাদারিত্ব জাতীয় প্রশ্ন।

বোরকার আড়াল থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, আমি জানি শহীদী মৃত্যুর মর্যাদা, আমার স্বামীকে আল্লাহ তায়ালা শহীদ হিসেবে কবুল করলে আমি তাতেই সন্তুষ্ট।

– এই নারীর উত্তরে অভিভূত হয়েছিলাম। শত বিপদেও আল্লাহ তায়ালা উপর সন্তুষ্ট, বিভিন্ন বইয়ে পড়েছি- এমন মহিয়সীদের কথা মনে পড়ছিল তখন। কিছুক্ষণের জন্য যেন আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম বইয়ের পাতায়।পরবর্তীতে আসমা বেগমের স্বামী আব্দুল আজিজ শহীদ হয়েছেন।

স্বামী জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালের বেডে, এসময় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার বাবা। স্বামীর মৃত্যুর পরও তাকে বলতে শোনা গেছে, রবের হুকুমের উপর আমি খুশি। তাকে যেন সত্যিই আল্লাহ তায়ালা পরীক্ষা করছেন আর তিনি রবের উপর সব সময় খুশি, ঘটনাদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছিল।

দগ্ধদের সাহায্য করা হয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী আলেম সংগঠন ও সরকারের পক্ষ থেকে।

জানতে পারলাম, রোগী দেখতে এসে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন মন্ত্রী মহাদয়। মন্ত্রীর সামনে উপস্থিত থেকে  গ্রহণ করা রোগীর স্বজনরা পুরো ১০ হাজারই পেয়েছেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন না এমন রোগীর স্বজনরা জানালেন, পরবর্তীতে তাদের ২ হাজার কমিয়ে ৮ হাজার দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুপথযাত্রীদের স্বজনদেরও ছাড় দেওয়া হলনা! দুই হাজারের লোভ সামলানো গেলনা! কি আর বলার আছে! এসব নিয়ে বলবেন কলামিষ্টরা।

সেদিন আরো কথা হয়েছিল দগ্ধ আবুল বাশার, ফরিদ মিয়া, নজরুলের স্বজনসহ ভাই, স্বামী, বাবা, ছেলের জন্য অপেক্ষামান আরো অনেকের সাথে। যাদের ৩ জন ছাড়া বাকি সবাই এখন পরকালের বাসিন্দা। কথা হয়েছিল আমার মতো সমকালে শিক্ষানবিশ এক প্রতিবেদকের সাথে। তিনি আগেও কাজ করেছেন সরেজমিন প্রতিবেদক হিসেবে, সরলভাবেই কথা বলেছেন, তার থেকে শিখেছি অনেক কিছু।

এক ফাকে তিনি প্রশ্ন করে বসলেন, সাংবাদিকতা কেনো বেছে নিলেন, সমাজের ‘থার্ট ক্লাস’ একটা পেশা! নিজেও সংবাদে কাজ করেন, এমন একজনের থেকে এ কেমন প্রশ্ন! ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম! প্রশ্নটা তাকে উল্টো ছুড়ে মারার অবশন না রাখতে বললেন- আমি আপাতত করছি, পরে ছেড়ে দিব। সাংবাদিকতার ইচ্ছে থাকলে তো টেলিভিশনেই যেতাম।

টেলিভিশন ছাড়া অন্য মাধ্যমে কাজ করা মানুষগুলো তাহলে কি করে! ছেড়ে দিলে এ পেশায় আসার কারণ কী!

এজাতীয় প্রশ্নগুলো করতে ইচ্ছে করলো না কেন যেন। দাওয়ার মাধ্যম হিসেবে সাংবাদিকতা অপরিহার্য এ ধরণের কোন উত্তর দিতেও ভালো লাগলো না। অথবা হতে পারে, তাকে করার মতো ভাল কোন প্রশ্ন ও উত্তর জানা ছিল না আমার, তাই ঠোঁট বাকা একটা হাসিই ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।

হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে বারবার মনে হচ্ছিল কিছু করতে পারবো কিনা! ঘটনার আবেদন কতটা তুলে ধরা সম্ভব হবে! এ জাতীয় কিছু শঙ্কা পুরো পথে তাড়া করলো। কয়েকটা প্রতিবেদনের পর আব্বু বলেছিলেন টাকা হলে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিব’  এই প্রতিবেদন ছাপানো হলে কয়েকজন ফোন করেছিলেন পরিবারটাকে সাহায্য করতে। -কিছুটা খুশি খুশি ভাব ফুটে উঠেছিল ঠোঁটের কোণে।

-আরএম