‘বিদেশী প্রভাবের কারণেই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ইসলামি ইস্যুতে কথা বলতে ভয় পায়’  

সাইফ নূর ।।

ইসলাম ও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দম্ভোক্তি ও দেশটির বহুতল ভবনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কার্টুন প্রকাশের পর বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের তীব্র প্রতিবাদ এখনো অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর দেশে দেশে চলছে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ,সমাবেশ, মিছিল,পণ্য বয়কটসহ নানামাত্রিক প্রতিবাদ আন্দোলন।

বিজ্ঞাপন

এ দেশের আনাচে-কানাচে এমন কোনো জেলা-উপজেলা নেই যেখানে গত এক সপ্তাহজুড়ে এই ইস্যুতে তৌহিদী জনতার বিক্ষোভ হয়নি। টেকনাফ থেকে তেতুঁলিয় পর্যন্ত বিস্তৃত মানচিত্রের বুকজুড়ে গত এক সপ্তাহে নবী প্রেমিক মুসল্লিদের মিছিল ও শ্লোগান ‘বিশ্বনবীর অপমান, সইবে নারে মুসলমান’ ধ্বনিতে মুখরিত ছিল বাংলার আকাশ-বাতাস।

‘মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এদেশের সিংহভাগ মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় চেতনাকে গুরুত্ব দেয় না’

কিন্তু দেশের ইসলামী দলগুলোর বাইরে মূলধারার যে কয়টি প্রধান রাজনৈতিক দল রয়েছে, যারা সবসময় জনগণের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেন, জনগণের ভোটে যারা ক্ষমতায় ওঠানামা করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান নাগরিকদের এত বড় ইস্যুতে তাদের ভূমিকা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। লক্ষ্য করা গেছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং সাবেক বিরোধী দলের ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রায় কাছাকাছি। ইতোমধ্যে সরকার জানিয়েছে যে, তারা দু’কুল রক্ষার নীতি গ্রহণ করবেন। ফ্রান্সের ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের নিন্দাও জানাবেন না। অন্যদিকে চলমান ফ্রান্সবিরোধী আন্দোলন নিয়ে সহিষ্ণু আচরণ প্রদর্শন করা হবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। অপরদিকে সাবেক বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে ঘটনার এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পর যখন বিশ্বব্যাপী আন্দোলন প্রায় হয়ে গেছে, কানাডার অমুসলিম প্রধানমন্ত্রী, ইরানের শিয়া নেতৃবৃন্দও যখন মুসলমানদের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে ক্ষান্ত হয়েছেন, পরিস্থিতি অনুকূল হয়েছে, তখন তাদের বিবৃতি প্রকাশ্যে এসেছে। বিষয়টিকে অনেকে ‘বাতাসের গতি দেখে কথা বলা’ হিসেবে দেখতে চাইছেন।

এ প্রসঙ্গে ইসলাম টাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা বিশিষ্ট ইসলামী লেখক জনাব আদম আলী এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির প্রফেসর জনাব শাহেদ হারুন।

এ প্রসঙ্গে সামরিক কর্মকর্তা জনাব আদম আলী বলেন, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এদেশের সিংহভাগ মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় চেতনাকে গুরুত্ব দেয় না। ফলে দেশের রাজনৈতিক দল সম্পর্কে জনগণের আস্থা অনেক কমে গেছে। ধর্মীয় ইস্যুতে ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটলে তারা যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, ইসলামের ওপর আঘাত আসলে তারা সেভাবে কথা বলে না। এটা আমরা অনেক আগে থেকেই দেখে আসছি।’

তিনি বলেন, ‘মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো সাম্প্রদায়িকতার ব্যাখ্যা করে এ ইস্যুতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিষয়ে যে চিন্তা তারা লালন করেন, সেটা তাদের কাজের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতদুষ্ট। দেখা যায়, সংখ্যালঘু কোনো ধর্মের অনুষ্ঠানকে যেভাবে তারা প্রমোট করেন, একটা ইসলামিক অনুষ্ঠানকে সেভাবে তারা প্রমোট করেন না। পূজার অনুষ্ঠানে তারা যেভাবে উচ্চমহল থেকে ছুটে যান, সীরাত বা ওয়াজ- মাহফিলে তাদেরকে সেভাবে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না। কোথাও অন্যধর্মের লোকজন আক্রান্ত হলে তারা যেভাবে রাজনৈতিকভাবে বা মিডিয়াতে হাইলাইট করেন, ইসলামের ওপর বা ইসলামী ব্যক্তিত্বগণ আক্রান্ত হলে তারা তেমনটি করেন না। এটা তাদের নরমাল একটা চরিত্র।’

এদিকে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির প্রফেসর জনাব শাহেদ হারুন বলেন, ‘আসলে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করলেও পারত পক্ষে ইসলামের পক্ষে কথা বলতে চায় না। অবস্থা বেগতিক দেখলে অথবা নব্বই শতাংশ মানুষ সেদিকে ঝুঁকলে তখন কথা বলে। ইসলামের প্রতি তাদের দরদ নেই। বিএনপিকে ইসলামের পক্ষের মনে করা হয়। কিন্তু বিএনপি আমলে কোনো কোনো মন্ত্রী ঢাকা শহরের অধিক সংখ্যক মসজিদ নিয়ে আপত্তি করেছিল। ফলে তাদের কারো কাছ থেকেই ইসলামের পক্ষে অবস্থান আশা করা যায় না।’

কেন তারা ইসলামী ইস্যুতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন?

পলিটিক্যাল দলগুলো তো নাগরিক স্বার্থ নিয়েই কথা বলবে। উপজাতি আক্রান্ত হলেও তারা যেমন কথা বলেন, হিন্দুদের মন্দির আক্রান্ত হলেও তারা যেমন কথা বলেন, ইসলামি আন্তর্জাতিক বা বড় কোনো ইস্যু সামনে আসলে বড় দলগুলোর মুসলমানদের প্রতি সংহতি জানিয়ে কথা বলতে দ্বিধা কেন তাহলে? যারা ক্ষমতায় থাকেন বা যারা ক্ষমতায় যেতে চান, প্রত্যেকেই কেন গণমানুষের আবেগকে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়- এমন প্রশ্নের উত্তরে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জনাব আদম আলী ‘বিদেশী শক্তিগুলোর প্রভাব’ এবং ‘দেশীয় কথিত সুশীলদের সমালোচনার ভয়’কে দায়ী করেছেন।

তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দলগুলো তাদের পজিশনকে সুদৃঢ় রাখার জন্য নিয়ন্ত্রিত অবস্থান গ্রহণ করেন। আমার কাছে মনে হয়, হয়ত এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের সাথে তাদের যে ‘সুসম্পর্ক’ আছে তাতে অবনতি হতে পারে, অথবা এদেশে যারা ‘সুশীল সমাজ’ আছে তারা তাদেরকে মন্দ বলবে- এ আশংকায় তারা দ্বিধাগ্রস্ত থাকে।’

তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক পরাধীনতাকে এর পেছনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন প্রফেসর শাহেদ হারুন। তিনি বলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশই প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন নয়। এসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আসে দিল্লি, টোকিও, লন্ডন এবং ওয়াশিংটন থেকে। আফ্রিকার অনেক দেশ এখনো প্যারিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালিত হয়।  ফলে এসব উন্নয়নশীল রাষ্ট্র পার্শ্ববর্তী বা ইউরোপের ঋনদাতা দেশগুলোর কাছে নতজানু থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের রাজনৈতিক দলগুলো ইসলামি ইস্যুতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে এবং ভীত অবস্থাতেই ব্যাপক পর্যবেক্ষণের মধ্যে বসবাস করে।’

কিন্তু অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে তাদেরকে কেন দ্রুত বক্তব্য-বিবৃতি দিতে দেখা যায়, তখন কেন তারা দ্রুত আক্রান্ত এলাকায় ছুটে যান, সংহতি প্রকাশ করেন? তাদের এধরনের আচরণ কি ইসলাম বিদ্বেষ কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে এই প্রফেসর বলেন, না, আমি ঢালাওভাবে সেটা মনে করি না। মূলত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করে। সংখ্যালঘুদের পক্ষে বললে তারা আন্তর্জাতিকভাবে ফলাও পাবেন, পরাশক্তিগুলোর সমর্থন লাভ করবেন- এই চিন্তা থেকে তারা সেক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। এক্ষেত্রেও তাদের সেই ক্যালকুলেশন কাজ করে।’

বিশিষ্ট লেখক জনাব আদম আলী সাহেব মনে করেন, ‘ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এখন বাংলাদেশে যে রীতি চালু হয়েছে তাতে তারা জনগণের আবেগকে তেমন পাত্তা দেয় না। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাকিয়ে থাকেন বিদেশী প্রভুদের দিকে। এই আচরণ তাদের রাজনৈতিক দলনেতাদের ব্যক্তিত্বকে যেমন খাটো করে, তেমনি তাদের রাজনৈতিক ভাবধারাকেও ক্ষুণ্ন করে। এমনিভাবে বিষয়টি তাদের রাজনৈতিক সততাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।’

জনাব শাহেদ হারুন মনে করেন, আমরা আসলে স্বাধীন কাগজে কলমে। সত্যিকার অর্থে যদি আমরা স্বাধীন হতাম তাহলে দেশে জনগণের অনুভূতির মূল্যায়ন হতো। এখন সবার আগে গুরুত্ব পায় বিদেশীদের স্বার্থ। দেশ ও জনগণের স্বার্থ এখন খুব কমই গুরুত্ব পায়। রাজনীতির ময়দানে আগের সেই আভিজাত্য বাকি নেই। প্রতিহিংসার রাজনীতিটাই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা আশা করি, দেশের রাজনীতিবিদরা যদি ধীরে ধীরে বিদেশী প্রভাবের বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারেন, তাহলে অনেক সৎ রাজনীতিবিদ দেশ ও জনগণের সেবায় কাজ করার সুযোগ পাবেন। তখন প্রকৃত অর্থেই দেশ স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করবে- যোগ করেন তিনি।

এস এন