পশ্চিমাদের কপটতা: ভিন্ন মতের নামে তারা সব সময় বিদ্বেষ চরিতার্থ করতে চায়

মাওলানা যাহেদ রাশেদী ।।

মুসলমানদের সম্পর্কে পশ্চিমাদের সবচেয়ে বড় আপত্তি, মুসলমানরা খুব রাগী ও আবেগপ্রবণ। বিশেষত কুরআন মজীদ ও হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রশ্নে তারা খুবই সংবেদনশীল।

বিজ্ঞাপন

আমি বলি, পশ্চিমাদের কাছে যা আপত্তির বস্ত্ত, তা আমাদের কাছে গর্বের বিষয়। কারণ ক্রোধ একটি স্বভাবজাত প্রবণতা, মানুষের স্বভাবে রাগ-অনুরাগ এবং প্রীতি ও বিদ্বেষের যে প্রবণতাগুলো রয়েছে, তা আল্লাহ তাআলার দান এবং কোনোটিই অপ্রয়োজনীয় নয়। মানুষের কোনো অবস্থাতেই রাগান্বিত হওয়া উচিত নয়-এমন কথা মানবস্বভাবের সম্পূর্ণ বিরোধী। তবে অন্য সকল বিষয়ের মতো রাগ-অভিমান প্রকাশেরও নির্ধারিত ক্ষেত্র ও সীমারেখা আছে।

কেউ যদি দাবি করে যে, কোনো কিছুতেই তার রাগ উঠে না তাহলে সে একজন অসুস্থ মানুষ, তার আশু চিকিৎসা প্রয়োজন। একইভাবে কারো যদি সবকিছুতেই রাগ উঠে তাহলে তারও চিকিৎসার প্রয়োজন।

যার প্রতি আপনার ভালবাসা আছে, তার অসম্মান অবশ্যই আপনাকে ক্ষুব্ধ করবে। এটা প্রেম ও  ভালবাসার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

তাই একজন মুসলমান সে যতই বে-আমল হোক কুরআনের অসম্মান বরদাশত করবে না, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবমাননা সহ্য করবে না। কুরআনের মর্যাদা রক্ষার জন্য, নবীর মর্যাদা রক্ষার জন্য একজন সাধারণ মুসলমানও জীবনের বাজি লাগাতে পারে। আজকের এই চরম অবক্ষয়ের যুগে এটিই আমাদের আসল পুঁজি। এটি নবীর প্রতি ভালবাসার প্রমাণ। দ্বীনের ভাষায় একেই বলে ঈমান।

পশ্চিমাদের আরেকটি অভিযোগ, দুনিয়ার সকল জাতি যখন খোদা, রাসূল ও ধর্মগ্রন্থের কথা ছেড়ে দিয়েছে তখনও মুসলমানরা সকল বিষয়ে আল্লাহর কথা বলে, রাসূলের কথা বলে।

তাদের এই অভিযোগও সত্য এবং এটাও আমাদের গর্বের বিষয়। আল্লাহর হাজার শোকর যে, আমাদের কাছে আল্লাহর কালাম ও আল্লাহর নবীর বাণী সুসংরক্ষিত আছে। শুধু তাই নয় আল্লাহর কালাম ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী আমাদের কাছে এতই সুসংহত যে, বুশ, ওবামা ও টনি ব্লেয়ারকেও যদি মুসলমানদের সাথে কথা বলতে হয় তাহলে কুরআনে কারীমের কোনো আয়াত কিংবা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো হাদীস মুখস্থ করে আসতে হয়।

আল্লাহর হাজার শোকর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে শুধু যে আমাদের হৃদয়ের বন্ধন তা-ই নয়; বরং আজও আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্ধৃত্তি কুরআন ও সুন্নাহ। এই আস্থা ও বিশ্বাসই পশ্চিমাদের মাথাব্যথার কারণ। তাই তা বিনষ্ট করার জন্য তারা মরণপন করেছে। দুইশ বছরেরও বেশি সময় যাবত তারা প্রাণান্ত চেষ্টা করেছে, কীভাবে  মুসলমানের ঈমান ও আকীদা নষ্ট করা যায় এবং তাদের অন্তর থেকে এই আযমত ও মহববত দূর করা যায়। কিন্তু আলমহামদুলিল্লাহ, এখনও তারা সফল হতে পারেনি। ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত সফল হতে পারবেও না।

পশ্চিমা ও সেক্যুলার গোষ্ঠী আরো প্রচার করে যে, মুসলমানরা ভিন্নমত সহ্য করে না। এটা একটি মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। কারণ চৌদ্দশত বছর ধরে মুসলিম মনীষীরা ঈমান-আকীদা, কুরআনে কারীম ও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অমুসলিমদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। আজ পর্যন্ত কোনো মুসলমান কোনো অমুসলিমকে এই প্রশ্ন করেনি যে, সে কেন ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করছে? অতীতেও তাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়েছে। এখনও দেওয়া হচ্ছে। আর বিগত প্রায় তিনশ বছর যাবত বিশেষভাবে ইসলামী আইন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন ও কর্ম নিয়ে পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই অধ্যয়ন ও গবেষণা হচ্ছে। অমুসলিমদের মতামত সামনে আসছে। মুসলিম গবেষকরাও যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। গ্রন্থের জবাবে গ্রন্থ এবং উদ্ধৃতির জবাবে উদ্ধৃতি সামনে আসছে। সুতরাং ভিন্নমত সহ্য করা হয় না-এ কথা অবাস্তব। ভিন্নমত নয়, মুসলমানরা যা সহ্য করেন না তা হচ্ছে অবমাননা। এটা অতীতেও সহ্য করা হয়নি, ভবিষ্যতেও করা হবে না।

এটা পশ্চিমাদের কপটতা যে, ভিন্ন মতের নামে তারা বিদ্বেষ চরিতার্থ করতে চায়, কোনো আত্মমর্যাদাশীল জাতি যা সহ্য করতে পারে না। ভিন্নমত ও অবমাননা এককথা নয়। তাই এর জবাবও একরকম হয় না। দেখুন, লাহোর থেকে আর্য পন্ডিত দয়ানন্দ স্বরস্বতীর বই প্রকাশিত হয়েছিল, যাতে কুরআনে কারীম সম্পর্কে অসংখ্য প্রশ্ন করা হয়। মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতুবী ও মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী কিতাব লিখে তার জবাব দিয়েছিলেন। কিন্তু লাহোরেই জনৈক রাজপাল যখন রঙ্গীলা রাসূল লিখল তখন এর জবাবে কোনো কিতাব লেখা হয়নি। এর জবাব দিয়েছিলেন গাজী আলীমুদ্দীন শহীদ রাহ.।

[‘তাহাফফুযে নামূসে রিসালাত’ এবং ইসলামী তাশাখখুছ কে তাহাফফুয কে লিয়ে মুশতারাকা জাদ্দো জাহদ কী জরুরত’ শীর্ষক দুটি নিবন্ধ থেকে গৃহীত। অনুবাদ : মুহাম্মাদ ত্বহা হোসাইন]