ফিদাকা নাফসী ইয়া রাসূলাল্লাহ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)

মাওলানা তাওহীদুল ইসলাম তাইয়িব ।।

ন্যূনতম ভদ্রতা শিষ্টতা ও মানবতাবোধের দাবি হলো, যে কোনো অনুগ্রহকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। অন্তত হৃদয় গভীরে কৃতজ্ঞতার অনুভূতি পোষণ করা। এই কৃতজ্ঞতা মানুষের স্বভাবজাত। সুস্থ সভ্য মানুষ অবচেতন মনেই কৃতজ্ঞ হয়। সাধ্যমতো কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চেষ্টা করে। তাই অনুগ্রহ পাওয়ার পরও যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ হয় না, সমাজ তাকে নিন্দার চোখে দেখে। নিম্নজাতের লোক মনে করে। তাকে সম্মানের আসনে গ্রহণ করতে পারে না। এমনটি করে বিবেকের বিবেচনা থেকেই।

বিজ্ঞাপন

দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ নিত্যদিন অসংখ্য মানুষের অনুগ্রহ লাভ করে। অন্যের অনুগ্রহ ছাড়া মানুষের একটি দিনও চলে না। এটাই দুনিয়ার রীতি। আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে এভাবেই সাজিয়েছেন। এরপর বলেছেন অনুগ্রহকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে।

দুনিয়ার জীবনে মানুষের সবচে বড় অনুগ্রহকারীর মধ্যে রয়েছেন তার মা বাবা। কারণ তাঁদের মাধ্যমেই প্রত্যেকের পৃথিবীতে আসা। তাঁদের উসিলায়ই জীবনের অস্তিত্ব লাভ করা। তাই তাঁদের প্রতি সর্বোচ্চ কৃতজ্ঞতার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, তাঁদেরকে উফ্ শব্দটি পর্যন্ত বলো না। তাঁদের সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলো। তাঁদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সদাচার করো।

মা বাবার চেয়েও অনেক অনেক বেশি অনুগ্রহ আমাদের প্রতি আমাদের রবের। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের। কারণ আমাদের পুরো জীবনটাই তাঁর দান। জীবনের যাবতীয় বিষয়, যাবতীয় প্রয়োজন তাঁরই অনুগ্রহে সমাধা হয়। তাঁরই হুকুমে জীবনের সব আয়োজন ও বিয়োজন।

জীবনের পরে আমাদের যে মৃত্যু, সেটাও তাঁর হাতে। মৃত্যুর পর আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাঁর কাছেই আমাদের পরবর্তী সকল বিষয়।

মোটকথা, সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ আমাদের প্রতি তাঁর। সেজন্য তাঁর প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ থাকার কথাও বলেছেন তিনি। সেই কৃতজ্ঞতা বিবেকেরও দাবি।

মৃত্যু পরবর্তী জীবনই মানুষের আসল জীবন, একথা মুমিনমাত্রই জানে এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। কারণ সে জীবনের পরে কোনো মৃত্যু নেই। সে জীবনের কোনো সমাপ্তি নেই। সে জীবন সুদীর্ঘ অসীম। কূল কিনারাহীন।

সেই জীবনের সফলতা পেতে হলে এই জীবনে কিছু করণীয় আছে। বরং এই সংক্ষিপ্ত জীবন পুরোটাই সেই জীবনের জন্য। কিন্তু কীভাবে, কী উপায়ে, কী কর্মে লাভ করা যাবে সেই জীবন? কী বিশ্বাসে, কী চেতনায়, কী কর্মপন্থায় পাওয়া যাবে সেই সফলতা?

মানুষকে সেসব জানানোর জন্যই আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী পাঠিয়েছেন। রাসূল পাঠিয়েছেন। কিতাব নাযিল করেছেন। এরপর বলেছেন, সেই নবী রাসূলের আনুগত্য করতে। সেই কিতাব অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে।

মা বাবার মাধ্যমে যেমন তিনি আমাদের অস্তিত্ব দিয়েছেন, নবী রাসূলদের মাধ্যমে দিয়েছেন চির সফলতার দিশা। তাই মা বাবার প্রতি যেমন সদাচারের নির্দেশ দিয়েছেন, নবী রাসূলদের প্রতি দিয়েছেন ভক্তি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আনুগত্যের নির্দেশ।

আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে যত নবী পাঠিয়েছেন সবার প্রতিই আমার ঈমান ও বিশ্বাস রয়েছে। সবার প্রতিই রয়েছে শ্রদ্ধা ভক্তি ও ভালোবাসা। তবে আনুগত্য এবং পূর্ণ আনুগত্য রয়েছে শুধু হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। কারণ তিনিই আমাদের নবী। এবং কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের নবী। তিনি খাতামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন। তিনি সায়্যিদুল আম্বিয়া ওয়া রাহমাতাল লিল আলামীন।

তাঁর মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেদায়েত দিয়েছেন। অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে এনেছেন। আমরা তাঁর মাধ্যমেই লাভ করেছি আমাদের রবের পরিচয়। আমাদের খালিক ও মালিকের পরিচয়। তাঁর মাধ্যমেই লাভ করেছি দুনিয়া-আখিরাতে সফলতার সন্ধান।

তাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা যেমন আল্লাহ তাআলার নির্দেশ, তেমনি সুস্থ বিবেকেরও যৌক্তিক দাবি।

ইতিহাস সাক্ষী, এই পৃথিবী একমসয় ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। অন্যায় অনাচার, জুলুম নির্যাতন ও মুর্খতা বর্বরতায় পূর্ণ ছিল। আল্লাহ তাআলা সেই সময়ে রাসূলে আকরাম মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠালেন। তাঁর মাধ্যমে পুরো পৃথিবীকে হেদায়েতের দিশা দিলেন। সঠিক জীবনের সন্ধান দিলেন। এরপর বললেন,

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا

নিশ্চয় আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ—এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।-সূরা আহযাব, আয়াত ২১

বলেছেন,

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

(হে নবী!) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।-সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১

আরও সুষ্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,

قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ

(হে নবী) আপনি বলে দিন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের খান্দান, তোমাদের সেই সম্পদ যা অর্জন করেছ, তোমাদের সেই ব্যবসা যাতে মন্দার আশঙ্কা কর এবং বসবাসের সেই ঘর যা তোমরা পেয়ে সন্তুষ্ট, (এসব) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা কর, যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ ফায়সালা প্রকাশ করেন। আর আল্লাহ ফাসেকদেরকে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছান না।-সূরা তাওবা, আয়াত : ২৪

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বলেছেন,

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার মা-বাবা, সন্তান-সন্তুতি ও সকল মানুষ অপেক্ষা বেশি প্রিয় না হব।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৫

ঈমানের স্বাদ লাভ করার প্রসঙ্গে বলেছেন, যে ব্যক্তির মাঝে তিনটি বিষয় থাকবে, সে এর মাধ্যমে ঈমানের স্বাদ লাভ করতে পারবে। তন্মধ্যে প্রথম বিষয়টিই হলো,

أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا

যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য সকল ব্যক্তি ও বস্তু অপেক্ষা সবচে বেশি প্রিয় হবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৬

সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হিশাম রাযি. বলেন, একদিন আমরা হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। এমতাবস্থায় তিনি উমর ইবনুল খাত্তাবের হাত ধরে রেখেছিলেন। তখন উমর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবন ছাড়া বাকি সকল জিনিসের চেয়ে বেশি প্রিয়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। তাতে হবে না। যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ! যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার কাছে তোমার জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয় না হব ততক্ষণ পর্যন্ত (তোমার ঈমান পূর্ণ) হবে না।

কিছুক্ষণ পর হযরত উমর বললেন, হ্যাঁ, এখন আল্লাহর কসম! (আমি অনুভব করছি) আপনি আমার কাছে আমার জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এবার হয়েছে হে উমর!-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬৬৩২

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বতের প্রসঙ্গে এসব হাদীস না থাকলেও কেবল বিবেকের দাবি থেকে তাঁর প্রতি সবচে বেশি ভালোবাসা পোষণ করা উচিত ছিল। কারণ, তাঁর চেয়ে বেশি অনুগ্রহ আল্লাহ ছাড়া আর কারও নেই আমাদের উপর। তাঁর মাধ্যমে দুনিয়া আখেরাতের যত প্রাপ্তি, এর ক্ষুদ্রতম অংশও নেই অন্য কারও মাধ্যমে। সুতরাং আল্লাহ তাআলার পর তাঁর প্রতিই সবচেয়ে বেশি মহব্বত থাকার কথা।

তাঁর আনুগত্যেই যখন আমাদের দুনিয়া আখেরাতের সফলতা, তাঁর মাঝেই যখন আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ, তখন একান্ত ভালোবাসা ও সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা কেবল তাঁর প্রতিই নিবেদিত হওয়া উচিত। হৃদয়ের গভীর থেকে, জীবন উৎসর্গ সেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট রাখা আমাদের কর্তব্য।

এর উপর কুরআন মাজীদের একাধিক আয়াতে তাঁর মহব্বতের নির্দেশ, হাদীস শরীফের বহু বর্ণনায় তাঁর প্রতি মহব্বতের কথা! এবং তাঁর মহব্বত আমাদের জীবন ও আমাদের প্রিয় সকল ব্যক্তি-বস্তুর চেয়ে বেশি হওয়ার কথা! তাঁর মহব্বত আমাদের ঈমানের মানদ- এবং তাঁর মহব্বতে আমাদের ইহ পরকালীন সফলতা!

সুতরাং হে আল্লাহ! আমাদের হৃদয়গুলো পূর্ণ করে দিন তাঁর মহব্বতে। জীবন উজ্জ্বল করে দিন তাঁর ভালোবাসায়। চির কামিয়াবী ও সফলতা দান করুন তাঁর প্রতি উৎসর্গিত করে।

ফিদাকা নাফসী, ফিদাকা উম্মী, ফিদাকা আবী, ওয়া ফিদাকা জামীয়ি আহিব্বাতী ইয়া রাসূলাল্লাহ! সালাতুল্লাহি ওয়াসালামুহু আলাইক।