নৌবাহিনীর সদস্যকে মারধর: সাধারণ মানুষও কি এমন দ্রুত বিচার পাবেন?

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: বাংলাদেশে নৌ বাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় কিংবা সম্প্রতি কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর রাশেদ সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নজিরবিহীন ত্বরিত গতিতে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

অনেকেই পোস্ট দিয়ে কিংবা কমেন্ট করে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে এমপি হাজী সেলিমের পুত্র ও তার সহযোগীদের আটক করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে র‍্যাবের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা দেয়ার ঘটনার প্রশংসা করছেন।

বিজ্ঞাপন

এর আগে কক্সবাজারের হক্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টিও ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলো।

যদিও হাজী সেলিমের পুত্র ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পর অনেকে প্রশ্ন তুলছেন যে দেশের কোনো সাধারণ নাগরিক এভাবে হেনস্থার শিকার হলে তিনিও এমন দ্রুততম সময়ে বিচার পাবেন কীনা। নাকি সরকারের বিশেষ বাহিনী কিংবা প্রভাবশালীদের জন্যই আইন এমন সক্রিয় থাকবে।

তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন অন্যায় করলে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না- এটিই সরকার নিশ্চিত করবে।

“নৌবাহিনীর কর্মকর্তার ঘটনায় যেভাবে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে একজন সাধারণ মানুষও যদি কোনো অন্যায়ের শিকার হয় তার ক্ষেত্রেও একই ভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে,” মিস্টার হক বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন।

তিনি বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন সেটিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা যেই করুক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

যদিও বাস্তবতা হলো গত ১০ই অক্টোবর সিলেটের কাষ্টঘর এলাকা থেকে আটক করা রায়হান আহমেদ পুলিশী হেফাজতে মারা যাওয়ার পর এখনও মূল আসামীকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

ফেসবুকে অনেকেই এমন মন্তব্য করছেন

আবার গত বছর ১৮ই অক্টোবর ঢাকার গুলশানে গাড়ির ধাক্কায় মারা গিয়েছিলেন লিয়ানা ত্রিপুরা পপি, যিনি পড়াশোনার পাশাপাশি একটি বিউটি পার্লারে চাকুরি করতেন।

ওই ঘটনায় বিচারের পরিবর্তে উল্টো নিহতদের পরিবারকে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো বলে অভিযোগ উঠেছিলো।

তার ভাই জয়ন্ত ত্রিপুরা নিকোলাস বিবিসিকে বলছেন তারা একটি মামলা করেছেন তবে প্রধান অভিযুক্ত এখন জামিনে আছে এবং অগ্রগতি বলতে এটুকুই হয়েছে।

এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যেগুলো বিচারের জন্য দিন, মাস এমনকি বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার পাচ্ছে না অনেকে।

নৌবাহিনীর কর্মকর্তা মারধরের শিকার হওয়ার পর সোমবার সকালে থানায় মামলা দায়ের করলে সেদিন দুপুরেই কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা দেয়ার ঘটনার পর অনেকেই তাই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আশা করেছেন যে অন্য যে কোনো পেশার মানুষ বা কোনো সাধারণ নাগরিকই যেন এমন ঘটনার শিকার হলে এরকম ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়।

ফেসবুকে নাহিদ তাহসান লিখেছেন, “….আশা করি আগামীতে কোনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অথবা কোন সাধারণ শ্রেণীর মানুষকে কোনো নেতা, এমপি, মন্ত্রী অথবা পাওয়ারফুল কর্মকর্তা কেউ মারলে তাকে যেন দ্রুত এভাবেই গ্রেপ্তার করা হয়…”।

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন লিখেছেন, “সাংবাদিককে রামদা দিয়ে কুপিয়ে কাউন্সিলর বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়…বাহিনীর সদস্যকে মারধর করায় কয়েক ঘণ্টায় গ্রেফতার-দণ্ড!”

রাহাদ আহমদ লিখেছেন, “হাজি সেলিমের ছেলে যদি আমাকে এভাবে মারতো, আমি কী বিচার পেতাম?”

পারভেজ নাদির রেজা লিখেছেন, “বিচার এখন সাধারণ থেকে বহুদূরে, তবে সেনা, পুলিশ ও আমলাদের একেবারে কাছে”।

ফেসবুকে দেয়া পোস্টফেসবুকে দেয়া পোস্ট

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী বলছেন এটিই এখন বড় প্রশ্ন যে আইনের চোখে সবাই সমান সুযোগ পাচ্ছে কীনা।

“অপরাধের বিরুদ্ধে এমন দ্রুত ব্যবস্থা সবাইকে উজ্জীবিত করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র কি সেই সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত করতে পারছে? সেটি পারলে আইনের শাসন নিশ্চিত হবে, মানুষ তার প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার পাবে যা গণতন্ত্রকেই শক্তিশালী করবে,” বলেন তিনি।

পরিসংখ্যানে দেখা যায় গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩১ লাখ মামলা ঝুলে ছিলো। তবে বেসরকারি একটি সংস্থা বলছে, ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা ৩৩ লাখেরও বেশি।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭-২০২২ সাল পর্যন্ত কৌশলগত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বিচার ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঝুলে থাকা বা বিচারাধীন মামলা।

আইন বিশেষজ্ঞরা পুলিশের কাছে মামলা দায়ের হওয়া থেকে শুরু করে বিচারের প্রায় প্রতিটি ধাপে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ করে থাকেন।

মাঝে মধ্যে কিছু আলোচিত মামলা দ্রুত বিচার করে রায় দেয়ার উদাহরণও আছে, কিন্তু দেশের মোট মামলার তুলনায় এর সংখ্যা খুবই কম।

মানবাধিকার সংগঠক নুর খান লিটন বলছেন এটিই বাস্তবতা যে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ কিংবা নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লে. ওয়াসিফ আহমদ খানকে মারধরের ঘটনায় যত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে অন্য ঘটনাগুলোতে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

“এ নিয়ে জনমনে কিছুটা ক্ষোভও আছে, কারণ অনেক সময় সাধারণ মানুষ অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে তাদেরকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়। তাই আমরা চাইবো শুধু কোনো বাহিনী বা বিশেষ মর্যাদার ব্যক্তি নয় বরং আইন যেন সবার জন্য সমাধান হয়,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা বাহিনীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থার এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে।