বাবরি মসজিদের পর এবার লক্ষ্যবস্তু মথুরার শাহী ঈদগাহ

মাসুম মুরাদাবাদী ।।

গত ২০ অক্টোবর ২০২০ তারিখে ভারতের মথুরার জেলা জজ ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ মসজিদের বিরুদ্ধে মামলা শুনানির অনুমতি দেন। ভগবান কৃষ্ণ বিরাজমানের দায়ের করা এ মামলায় মন্দির সংলগ্ন শাহী ঈদগাহটি অপসারণের দাবী জানানো হয়। এর আগে সিনিয়র বিভাগীয় বিচারক অনুরূপ একটি মোকদ্দমা খারিজ করেছিলেন। তবে গত সপ্তাহে জেলা জজ সেই আবেদনটি অনুমোদন করে শাহী ঈদগাহ মসজিদের ট্রাস্ট বোর্ড এবং ইউপি সুন্নি কেন্দ্রীয় ওয়াকফ বোর্ড বরাবর নোটিশ জারি করেন। শুনানিতে বলা হয়, ১৯৬৮ সালে এই বিষয়ে দু’পক্ষের মাঝে যে সমঝোতা-চুক্তি হয়েছিল তা ছিল প্রহসনমূলক। সুতরাং এটি প্রত্যাখ্যান করে এই মামলাটি পুনরায় বিচারের আওতায় আনা উচিত।

বিজ্ঞাপন

সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের উপর সফলভাবে দখলদারিত্ব কায়েম করার পর এবার আরেকটি ঐতিহাসিক মসজিদকে লক্ষবস্তু বানানো হচ্ছে। যাতে দেশের অভ্যন্তরে হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং এবং উভয় পক্ষ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। অপর দিকে এ পরিবেশ থেকে ফায়দা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হতে পারে আরও অনেক দূর।

স্মর্তব্য যে, গত বছর ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদের বৈধ জমি সংক্রান্ত মামলায় রাম মন্দিরের পক্ষে রায় দেওয়ার পর থেকে সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী শক্তি কয়েক ধাপ অগ্রসর হয়েছে। তাদের দৃষ্টি ও মনোভাব এখন ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিটি মসজিদের নীচে তারা এখন মন্দিরের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের চেষ্টায় লিপ্ত। এই বিপজ্জনক মনোভাব ও হীন তৎপরতার একমাত্র উদ্দেশ্য হল মুসলমানদেরকে ভারতের যমীন থেকে বিতাড়িত করা এবং তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা।

আপনাদের মনে থাকার কথা যে, একটি পুরোহিত দল  সম্প্রতি উপাসনালয় সংরক্ষণ-আইন ১৯৯১ ‘বাতিল করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে দৌঁড়ঝাঁপ করেছিল। অথচ এই আইন অনুসারে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় প্রতিটি উপাসনালয় যে অবস্থায় ছিল ঠিক তেমনই থাকবে এবং কারোর এটি পরিবর্তনের অধিকার থাকবে না। এই আইনটি পাস হওয়ার পর জনগণ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল যে, ভবিষ্যতে সংঘ-পরিবার বাবরি মসজিদের মতো বিতর্ক উত্থাপন করার কোন সুযোগ পাবে না এবং সমস্ত উপাসনালয় দুর্বৃত্তদের ঘৃণিত উদ্দেশ্য থেকে নিরাপদ থাকবে। তবে এখন অনুভূত হচ্ছে যে, এটি ছিল জনগণের সুধারণা এবং আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র। বাস্তবে যার কোন ফলাফল আর অবশিষ্ট নেই। কারণ এখন এই ক্ষেত্রে প্রতিদিন নতুন নতুন বিশৃঙ্ক্ষলা দেখা দিচ্ছে। আর দেশ যাচ্ছে রসাতলে।

উপাসনালয় সংরক্ষণ-আইন ১৯৯১- বাতিল করার দাবি বস্তুতপক্ষে, অযোধ্যার পর কাশী ও মথুরার মসজিদগুলোর বিরুদ্ধে অধিকার দাবী করার পথ সুগম করা। ১৯৯১ সালে বিরোধীদের চাপের মুখে নরসিমা রাও সরকার ভবিষ্যতে অযোধ্যার মত দ্বন্দ্ব রোধকল্পে উপাসনালয়-সংরক্ষণ আইন পাস করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, এই সংঘাতের ফলে দেশ সম্মুখীন হয় এক অপূরণীয় ক্ষতির। অন্য দিকে ধর্মনিরপেক্ষতার যে আবরণ ‘ভারতমাতা’ গায়ে জড়িয়েছে সেটিও মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় ।

আপনার মনে পড়ার কথা,  অযোধ্যায় যখন বাবরি মসজিদের বৈধ জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের সর্বনাশা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কাছে এমন ৩০০০ মসজিদের একটি তালিকা ছিল তাদের ভাষ্যমতে যেগুলো মন্দির ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছিল। সে সময়ই এই তিন হাজার মসজিদের তালিকার শীর্ষে ছিল ঐতিহাসিক তিন মসজিদের নাম। অর্থাৎ অযোধ্যার বাবরি মসজিদ, বেনারসের জ্ঞানবাপি মসজিদ এবং মথুরার শাহী ঈদগাহ মসজিদ। তাদের শ্লোগান ছিল “অযোধ্যা তু ঝাঁকি হ্যায় , কাশী মথুরা বাকি হ্যায়।”

যখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ‘রাম জন্মভূমি মুক্তি আন্দোলন’ চলমান ছিল। সাথে চলছিল সমানভাবে ধ্বংসযজ্ঞও। তখন কোন কোন ব্যক্তির মত ছিল, বাবরি মসজিদের ব্যাপারে সমঝোতা করে নিলে বাকি মসজিদগুলো রক্ষা করা যেতে পারে। তবে তখনো দূরদর্শী কিছু মানুষের অবস্থান ছিল এই, মসজিদগুলোকে মন্দিরে পরিণত করার আন্দোলন একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ, যা ভারতীয় মুসলমানদের পায়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরিয়ে দেবে। উপরন্তু তাদেরকে পরিণত করবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে। সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী দলগুলির আসল লক্ষ্য হল, এই দেশ থেকে মুসলমানদের উৎখাত করা বা তাদের এমনভাবে কোনঠাসা করা যেন এই দেশে হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।

অযোধ্যায় ৫০০ বছরের পুরানো বাবরি মসজিদে মূর্তি স্থাপন ছিল একটি সুদীর্ঘ ও ভয়ংকর পরিকল্পনার অংশ , যেখানে তারা তাদের প্রথম সাফল্য অর্জন করে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে। যেদিন পুলিশ,  প্রশাসন ও সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় দিনের আলোতে বাবরি মসজিদকে শহীদ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় এবং চূড়ান্ত সাফল্য সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আদায় করে গত বছরের নভেম্বর মাসে। সেদিন মসজিদের বিরুদ্ধে করা সমস্ত সাম্প্রদায়িক অপরাধ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বাবরি মসজিদের মালিকানার রায় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পক্ষেই ঘোষণা করে। আশ্চর্যের বিষয় হল, আদালত বাবরি মসজিদ ভেঙে দেওয়ার কর্মকাণ্ডকে ফৌজদারি অপরাধ ঘোষণা দিলেও এর দায়ে জড়িত কোন অপরাধী দোষী সাব্যস্ত হয়নি এবং পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে দোষীরা সকলেই বেকসুর খালাস পেয়েছে।

গত জুনে, হিন্দু সংগঠন ‘বিশ্ব ভাদ্র পূজারী পুরোহিত মহা সংঘ’ উপাসনালয় সংরক্ষণ-আইন ১৯৯১-এর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন দাখিল করেন। সেখানে তারা বলেন, “১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১ সালে পাস হওয়া কেন্দ্রীয় আইনটি হিন্দুদের বঞ্চিত করছে এমন অসংখ্য মন্দির থেকে, যেগুলো ভেঙ্গে পরবর্তীতে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। হিন্দুদের এই ঐতিহাসিক উপাসনালয়গুলির মালিকানা দাবি করার অধিকার থাকা উচিত। এই অধিকার ফিরে পাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক 1991 সালে পাস হওয়া আইনটি। অথচ এটিকে কখনো চ্যালেঞ্জ করা হয়নি এবং কোনও আদালতও আইনত এটি বিবেচনা করেননি।”

বেনারসের জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং মথুরার শাহী ঈদগাহ উভয়টি এমন উপাসনালয় যেখানে কোন বিরোধ নেই এবং এখানে বিনা বাধায় নামাজ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বেনারসের জ্ঞানবাপী মসজিদটি বিশ্বনাথ মন্দিরের সন্নিকটে। একইভাবে মথুরার শাহী ঈদগাহও শ্রী কৃষ্ণ জন্মভূমি মন্দির সংলগ্ন। সম্প্রতি, বেনারসের জ্ঞানবাপী মসজিদের মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্টে একথা বলে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল যে, ১৬৬৪ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব এখানে একটি মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। অনুরূপভাবে সাম্প্রদায়িক হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর একই অভিযোগ রয়েছে মথুরার শাহী ঈদগাহের ব্যাপারেও। তারা দাবী করে, আওরঙ্গজেব ১৬৬৯ সালে একটি মন্দির ভেঙে এখানে ঈদগাহ এবং একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এই বিবাদটি ব্রিটিশ শাসনামলে আদালতে পৌঁছেছিল, তবে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে এটি নিষ্পত্তি হয়েছিল। সেই থেকে সেখানে নিয়মিত নামাজ পড়া হচ্ছে। ১৯৫১ সালে শিল্পপতি দম্পতি কিশোর বিড়লা মথুরায় মন্দিরের জমি কিনে কৃষ্ণ জন্মভূমি ট্রাস্টের হাতে জমি হস্তান্তর করেন। ১৯৬৮ সালে, ট্রাস্ট ও ঈদগাহ কমিটি একটি সমঝোতায় পৌঁছে যে, ঈদগাহ ও মসজিদ নির্মিত প্রায় ১১৩ একর জমি ঈদগাহ কমিটির পরিচালনায় থাকবে। পার্শ্ববর্তী জমিতে এখন একটি দুর্দান্ত শ্রী কৃষ্ণ জন্মভূমি মন্দির রয়েছে যেখানে একসময় জীর্ণ কেশব নাথ মন্দির ছিল। কিন্তু দুর্বৃত্তদের চোখ শাহী ঈদগাহের উপর আটকে আছে। এবং তারা এটি দখলের চেষ্টায় লিপ্ত।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অযোধ্যার মোকদ্দমায় সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পর কিছু উগ্র হিন্দু সংগঠন কাশী এবং মথুরার বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। তখন আরএসএস প্রধান মোহন ভগবতের বক্তব্য ছিল, কাশি এবং মথুরা তাদের এজেন্ডায় নেই। তবে এখন মথুরার ঈদগাহের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা এবং সে মামলা অনুমোদনপূর্বক আদালতের ট্রাস্ট বোর্ড ও ওয়াকফ বোর্ড বরাবর নোটিশ প্রেরণ প্রমাণ করছে যে, সংঘ পরিবার তার খেলা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। ভারতের বৃহত্তর জনস্বার্থে এই বিপজ্জনক খেলা বন্ধ করা এখন সময়ে সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন।

অনুবাদ: আহমদ বিন যহীর 

আরো পড়ুন: বাবরি মসজিদ শাহাদাত রায়: ‘সবাই নির্দোষ হলে তাহলে মসজিদ ভাঙল কারা?’

‘বাবরি মসজিদ: এ সিদ্ধান্ত বিশ্বের দরবারে ভারতের আদালতকে কলঙ্কিত করবে’

বাবরি মসজিদ মামলার এ রায় অবিচারের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত: মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড

ভারতীয় দুই প্রত্নতত্ত্ববিদের দাবি: বাবরি মসজিদের নিচে রামমন্দির থাকার তথ্য মিথ্যা

রায় হয়েছে, ইনসাফ নয়