হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ., ইতিহাসের কিংবদন্তী, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক রাহবার

মুশফিক ইলাহী ।।

১৮১১ ঈসায়ী সনের কথা। গোটা ভারতবর্ষ তখন ইংরেজদের হাতে পরাধীন। নিজেদের শাসন ক্ষমতা হারিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা চরম নির্যাতিত, নিপীড়িত। ইংরেজদের কাছে তারা ধর্মীয় আগ্রাসন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। অপরদিকে উম্মাহর চির স্বাধীনতাকামী আলেম সমাজ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় রত। বৃটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে তারা প্রাণপন লড়াই করছিলেন নিজেদের শক্তি-সামর্থের শেষ বিন্দুটুকু দিয়ে।

বিজ্ঞাপন

এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে ভারতবর্ষের মুসলমানদের আশার আলো হয়ে উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার অন্তর্গত ‘নানুতা’ নামক প্রত্যন্ত একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করলো চাঁদের মতো ফুটফুটে এক শিশু। শিশুটির যখন তিন বছর বয়স, তখন একদিন দোয়া ও বরকত লাভের উদ্দেশ্যে তাকে সে যুগের বিখ্যাত বুযুর্গ, আযাদী আন্দোলনের সিপাহসালার হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ রহ.-এর কোলে তুলে দেওয়া হয়। হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ রহ. শিশুটির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করেন এবং বরকতস্বরূপ তাকে বাইয়াত করে নেন।
মাত্র তিন বছর বয়সে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহিদ রহ.-এর বাইয়াতের সৌভাগ্য লাভকারী সেই শিশুটিই ছিলেন সাইয়্যিদুত্ তা-ইফাহ, আলেমকুল শিরোমনি, আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.।

যিনি ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠতম আধ্যাত্মিক রাহবার, আযাদী আন্দোলনের সিপাহসালার এবং মহান সংস্কারক। সমকালীন আলেম-ওলামাদের অভিভাবক ও আধ্যাত্মিক রাহবার হওয়ার কারণে তাকে ‘সাইয়্যিদুত্ তা-ইফাহ’ তথা আলেমকুল শিরোমনি অভিধায় অভিহিত করা হয়। এ মহা-মনীষীর জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য। ভারতবর্ষের ইসলামী জাগরণের পেছনেও তাঁর রয়েছে অসামান্য অবদান। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে ইলমে ওহীর সূতিকাগার দারুল উলূম দেওবন্দের স্বপ্নদ্রষ্টা ও উপদেষ্টা। কারণ, তাঁরই দুই ভাবশিষ্য ও খলিফা কুতুবুল ইরশাদ হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. এবং হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা কাসেম নানুতুবী রহ. পরবর্তীতে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন।

বিশ্ববরেণ্য এই আধ্যাত্মিক রাহবার, এই কালজয়ী অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব আজকের এই দিনে নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে তাঁর প্রিয় রবের সান্নিধ্যে চলে যান। আজ তাঁর ইন্তেকালের দিনে তাঁর বৈচিত্রপূর্ণ জীবনের কিছু দিক তুলে ধরা হলো।

জন্ম ও পবিত্র বংশধারা
তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা প্রথমে নাম রেখেছিলেন ইমদাদ হোসাইন। কিন্তু সমকালীন বিখ্যাত বুযুর্গ হযরত শাহ ইসহাক দেহলবী মুহাজিরে মাদানী রহ. তাঁর নাম বদলে রাখেন ইমদাদুল্লাহ। পরবর্তীতে এ নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল হাফেয মুহাম্মদ আমিন। পঞ্চান্ন ধাপ উপরে গিয়ে তাঁর পবিত্র বংশধারা হযরত ওমর ফারুক রাযি. এর সাথে মিলিত হয়। হযরত হাজী সাহেব রহ. ১২৩৩ হিজরীর ২২ শে সফর মোতাবেক ১৮১১ ঈসায়ী সনে সাহারানপুর জেলার নানুতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষা-দীক্ষা
হযরত হাজী সাহেব রহ. শৈশবে নিজে নিজেই কুরআর হিফয করেন। তারপর ষোল বছর বয়সে দিল্লীতে গমন করে যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন শায়েখ মামলুক আলীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। হযরত মাওলানা কলন্দর জালালাবাদীর কাছে মেশকাত শরীফ অধ্যয়ন করেন। মাওলানা আবদুর রহীম নানুতুবীর কাছে হিসনে হাসীনফিকহে আকবরের পাঠ গ্রহণ করেন। এই দুই মহান মনীষী ছিলেন হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. এর একান্ত শিষ্য।

আধ্যাত্মিক সাধনা
হাজী সাহেব রহ. পনের বছর বয়সে হযরত শায়েখ নাসিরুদ্দীন নকশবদন্দী রহ.-এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং নকশবন্দিয়া তরিকায় পূর্ণতা লাভ করেন। তারপর স্বপ্নযোগে আদিষ্ট হয়ে হযরত মিয়াজী নূর মুহাম্মদ ঝানঝানবী রহ.-এর কাছে বাইআত হন। মাত্র কয়েকদিন শায়েখের খেদমতে থেকেই বাহ্যিক-আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জন করে মহান মুরশিদ হযরত মিয়াজী নূর মুহাম্মদ ঝানঝানবী রহ. এর খেলাফত ও ইজাযত লাভে ধন্য হন।

ইংরেজবিরোধী জিহাদে অংশগ্রহণ
শাইখুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. নিজ আত্মজীবনী ‘নকশে হায়াত’ গ্রন্থে লিখেন- ১৮৫৭ সালের বিপ্লবের পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে তৎকালীন ওলামায়ে কেরাম শামেলী ও আশপাশের এলাকা স্বাধীন ঘোষণা করে সর্বাত্মক জিহাদের ডাক দেন। হযরত হাজী সাহেবকে আমীর, হযরত কাসেম নানুতুবীকে সেনাপতি, হযরত গাঙ্গুহী রহ. কে প্রধান বিচারপতি নির্ধারণ করা হয়। তারা ইংরেজদের সাথে লড়তে থাকেন। এক পর্যায়ে ইংরেজদের কূটকৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে হযরত হাজী সাহেব আত্মগোপন করে মক্কায় হিজরত করেন।

মক্কায় হিজরত
জিহাদে বাহ্যিকভাবে পরাজয়ের পর হযরত হাজী সাহেব অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়েন। এদিকে মক্কা-মদীনার টান তাকে ব্যাকুল তোলে। তিনি পূণ্যভূমিতে হিজরতের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। ইংরেজদের গ্রেফতারি পরোয়ানা কাঁধে নিয়ে আত্মগোপন করে, জীবনের চরম দুর্ভোগ সহ্য করে, মরু বিয়াবান পাড়ি দিয়ে বহু কষ্টে তিনি ১২৭৬ হিজরীতে মক্কায় পৌঁছেন। মক্কায় তিনি চরম অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে থাকেন।
হযরত হাজী সাহেব রহ. জন্মগতভাবেই অত্যন্ত জীর্ণ-শীর্ণ দুর্বল গঠনের অধিকারী ছিলেন। তার ওপর অবিরাম আধ্যাত্মিক সাধনা-মুজাহাদা, অর্ধাহার-অনাহার, বিনিদ্ররজনী তাকে আরো দুর্বল করে ফেলেছিলো। হযরত শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রহ. বলেন- একবার আমার তাঁর একটি আচকান দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো । তা এতই সংকীর্ণ ছিলো যে, আট দশ বছরের বাচ্চার গায়েও জড়ানো অসম্ভব ছিলো।

ইন্তেকাল
এ মহান মনীষী, যুগের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক রাহবার পৃথিবী ও পৃথিবীবাসীদের আলোকিত করে ১২ ই জুমাদাল আখির ১৩১৭ হিজরী মোতাবেক ১৮ ই অক্টোবর ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে রোজ বুধবার ফযরের সময় আপন রবের ডাকে সাড়া দেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৪ বছর ৩ মাস ২০ দিন। মক্কা মুকাররমার জান্নাতুল মুআল্লায় মাদরাসায়ে সাওলাতিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা রহমতুল্লাহ কিরানবী রহ.-এর সমাধির পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

হাজী সাহেব রহ. এর প্রসিদ্ধ খলিফাগণ:
ইমামে রব্বানী হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ.
হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা কাসেম নানুতুবী রহ.
হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ.
হযরত মাওলানা আহমদ হাসান আমরুহী রহ.
হযরত মাওলানা মহিউদ্দিন খাতেব রহ.
হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহিদ বাঙ্গালী রহ. প্রমুখ

হাজী সাহেব রহ. এর প্রসিদ্ধ রচনাবলী
হাজী সাহেব রহ.-এর উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু রচনাবলী রয়েছে। তাঁর গ্রন্থগুলো আলহামদুলিল্লাহ প্রকাশিত ও সহজলভ্য।

১.হাশিয়ায়ে মসনবী মাওলানা রুমী রহ.
২. গিযায়ে রূহ
৩. জিহাদে আকবার
৪. মসনবী তুহফাতুল উশ্শাক
৫.ইরশাদে মুরশিদ
৬. যিয়াউল কুলুব
৭. ফালসাফায়ে হাফত মাসায়েল
৮. গুলজারে মারেফত, এই কিতাবটি এখন কুল্লিয়াতে ইমদাদিয়া নামে প্রসিদ্ধ।

সূূত্র: হযরত শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রহ. কৃত ‘তারীখে মাশায়েখে চিশত’ ‘ইমদাদুস্ সুলুকের ভূমিকা” তারীখে ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’ প্রভৃতি।

বিজ্ঞাপন