মার্কিন জোটের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’: রাক্কায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বর্বরতম ট্র্যাজেডি

ওলিউর রহমান।।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী অনন্ত যুদ্ধে’র কথা মনে আছে? যে ‘ওয়ার অন টেররের’ ধুঁয়ো তুলে একে একে ভগ্নস্তুপে পরিণত করা হয়েছে মুসলমানদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের নগরী আফগানিস্তানের কাবুল, কান্দাহার ইরাকের মুসেল, নাজাফ। আরও জানা-অজানা কত সমৃদ্ধ জনপদ। এই তাণ্ডবলীলার এযাবত সর্বশেষ সংযোজন সিরিয়ার প্রাচীনতম শহর রাক্কা।

বিজ্ঞাপন

২০১৭ সালে আইএস বিরোধী যুদ্ধের নামে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট শহরটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। আদতে রাজধানী দামেশকসহ গোতা, হালাব (আলেপ্পো), হিমস, ইদলিব বরং পুরো সিরিয়াকেই মৃত্যুপুরী বানানো হয়েছে কয়েক বছরের যুদ্ধে।

রাক্কা, যে শহরটিতে যুদ্ধ শুরুর আগে আড়াই লাখের বেশি নাগরিকের বসবাস ছিল, জরিপ বলে, এখন সেখানে জীবিত মানুষের সংখ্যা মাত্র ৬০ হাজার।

চার মাসের অব্যাহত বোমা হামলায় শহরটিতে ষোলশয়ের অধিক বেসামরিক লোক প্রাণ হারিয়েছেন। তথ্য অনুসন্ধান করে নিশ্চিত নিহতের এসংখ্যাটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তবে সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা তাদের হিসেবের বাইরে। যা প্রকাশ করা হয়েছে তা মূল হতাহতের ঘটনার ১০ ভাগ মাত্র।

রাক্কায় হামলা চালানোর আগে-পরে মার্কিন জোট জোর গলায় প্রচার করেছিল, সেখানে মানবাধিকারের কোনো লঙ্ঘন হয়নি। কেবল আইএস যোদ্ধাদের লক্ষ্য করেই বোমা বা বিমান হামলা চালানো হয়েছে।জোটবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল লস্টিফেন জো দাবি করেন, “রাক্কা অভিযানে আইএস যোদ্ধাদের বাইরে বেসামরিক হতাহতের একটি ঘটনাও ঘটেনি”।

তবে মার্কিন জোটের এ প্রচারকে ভুয়া দাবি বলে প্রমাণ করেছে অ্যামনিস্টি। রাক্কা ট্র্যাজেডি নিয়ে তারা অভিযানের পর থেকেই অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। কয়েক বছরের অনুসন্ধানে তাদের হাতে জমা হয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য নথি। সম্প্রতি ‘রাক্কা গণহত্যা’ বিষয়ক একটি ওয়েবসাইট প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক এসংগঠনটি।

অসংখ্য স্থিরচিত্র, বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বহুতল ভবন ধ্বসের অনেক ভিডিও আপলোড করা হয়েছে ওয়েবসাইটটিতে। এছাড়া গ্রহণ করা হয়েছে অভিযানে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ বহু পরিবারের সাক্ষাতকার।

অ্যামনেস্টিকে দেওয়া এসব অডিও, ভিডিও বা লিখিত সাক্ষাতকারের বর্ণনা এতটাই করুণ যে, কোনো সাক্ষাৎকার পুরোটা দেখে, শুনে বা পড়ে শেষ করা দায়।

যদিও নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে মার্কিন বাহিনী হাজির করেছে সাধুতার বয়ান। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা সেক্রেটারি জেনারেল জেমস ম্যাটিস একটি প্রতিবেদনে লেখেছে, “রাক্কা যুদ্ধে যেকোনো মূল্যে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আমরা দুর্দান্ত ঝুঁকি নিয়েছিলাম”।

এদিকে অ্যামনেস্টি দেখাচ্ছে, যুদ্ধকালীন শহরটির ৮০% বিরান হয়ে পড়েছিল। পুরো শহর জুড়ে কোনো ভবনই অক্ষত ছিল না। “মাত্র পাঁচ মাসে শহরটিতে ৩০ হাজারেরও বেশি আর্টিলারি শেল নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যা ভিয়তনাম যুদ্ধের পর কোনো শহরে সবচেয়ে বেশি শেল নিক্ষেপের ঘটনা”। এ দাবি করেছে স্বয়ং যুদ্ধকালীন স্টাফ সার্জেন্ট জনওয়েন।

ইসলামিক স্টেট কায়েমের নামে শহর দখল করে বন্দিদেরকে আগুনে পুড়িয়ে, পানিতে ডুবিয়ে বা গলাকেটে হত্যা করা আইএসকে ‘জঙ্গীগোষ্ঠী’ বা ‘ভয়ঙ্করতম দল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। তবে আইএস এর উত্থান, এর সৃষ্টির পেছনের ভূমিকা এবং এদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করে টিকিয়ে রাখাসহ নানা বিষয়েই মার্কিন সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সময়ে সময়েই আলোচনাই উঠে আসে।

বলা হয়ে থাকে, স্বার্থস্বিদ্ধ হওয়ার পরে ছুড়ে ফেলার মতো যুক্তরাষ্ট্র আইএসকে দমন করতে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের বয়ান নতুন করে সামনে এনেছে। তাছাড়া সিরিয়া মহাযুদ্ধে মার্কিন জোট নিজের উপস্থিতি জানান দিতে ‘আইএস কার্ড’টি ব্যবহার করেছে বলেও প্রচলিত আছে। এবং আইএস দমনের নামে বরকতময় ভূমি সিরিয়ার শহরের পর শহর সমৃদ্ধ সব জনপদ ধ্বংস করে মহাযুদ্ধের অন্যতম পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। আর মার্কিন উপস্থিতি সিরিয়া যুদ্ধকে আরও প্রলম্বিত এবং কেবল রক্তক্ষয়ীই করে তুলেছে।

মার্কিন হামলায় ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম বিপর্যয়ের কয়েকটি ক্ষুদ্র নমুনা অ্যামনিস্টির সূত্রে এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।

৩৯ বছর বয়সী আবদুল আজীজ ইব্রাহিম পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। যুদ্ধের সময়ের স্মরণ তার বর্তমান জীবনের প্রতি মুহূর্তকে বিভীষিকাময় করে তুলে।

“আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রথম বিমান হামলাটি হয়েছিল আমার ভাইয়ের বাসায়। সন্ধ্যা চলছিল তখন। পুরো ভবনটি গুড়িয়ে যাওয়ার খবর পাই। আমরা নিশ্চিতভাবেই অনুমান করতে পারছিলাম ওই পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। তবে আপন ভাই, আদরের চার ভাতিজী এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের একসাথে এভাবে হারানোর বেদনা আমাদের বেশিক্ষণ বিহব্বল রাখতে পারেনি। সামান্য সময়ই আমরা পেয়েছিলাম ভাইয়ের পরিবার নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার।

দিরায়ায় আবদুল আজীজ ইব্রাহিমের ধসে যাওয়া বাড়িটি।

“দুই ভাইয়ের বাড়ির মাঝে কয়েকশো মিটারের দূরত্ব ছিল। আশঙ্কা করছিলাম, যেকোনো মুহূর্তে আমাদের দ্বিতল বাড়িটিও ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে পারে। তাই বাঙ্কারে আশ্রয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তবে ভাগ্য আমাদের অনুকূলে ছিল না। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটি বিকট আওয়াজ শুনে আমি জ্ঞান হারাই। দীর্ঘক্ষণ পরে সম্বিৎ ফিরে পেলে নিজেকে, ধ্বংসস্তুপের নিচে আবিষ্কার করি। ডান হাতটা সম্পূর্ণ বিকল হয়ে আছে। কাছেই থেতলে যাওয়া অবস্থায় আদরের পুত্র এবং প্রিয়তমা স্ত্রীর লাশ পড়ে আছে। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।” অ্যামনিস্টিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে আবদুল আজীজ ইব্রাহিম জানাচ্ছিলেন এই নির্মম আখ্যান।

অ্যামনিস্টির ওয়েবসাইটে থেকে একটি হ্যাশিশ পরিবারের দুঃখগাথাও জানা গেল।

তখন মধ্য আগস্ট।

৩৫ বছরের এই অভিভাবক মহিলাটির নাম মুনিরা। সন্তানদের নিয়ে একটি খনিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দুইদিন পরে গোলাগুলির আওয়াজ কিছুটা কমে এলে বাড়ি ফিরে পরিবারের ১৮ জনের লাশ খুঁজে পান।

পাঁচ সন্তানকে নিয়ে মুনিরার বর্তমান দুর্বিসহ জীবন।

অসহায় নিরুপায় মা চার সন্তান নিয়ে উঠেন গিয়ে একটি শরণার্থী শিবিরে। এখন এই শিশুদের জীবন কাটছে নিজ দেশেই উদ্বাস্তু হয়ে।

এবারের ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক। অন্তরে শেল নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো হৃদয়বিদারক।

১২ বছরের মুহাম্মদ। থাকতো রাক্কা থেকে দূরে অন্য একটি শহরে। সেখানে বোমা হামলা শুরু হলে তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মুহাম্মদের পরিবার রাক্কাতে তার খালার বাসায় চলে যায়। তবে গোটা সিরিয়ার চতুর্দিক বেষ্টন করে থাকা মার্কিন বাহিনী ততদিনে রাক্কাতেও আকাশ কাঁপানো হামলা শুরু করে দিয়েছে।

মুহাম্মদরা যখন তার খালার বাসায় গিয়ে পৌঁছেছে তখন মুহুর্মুহু বোমা হামলায় পাঁচতলা বাড়ির ছাদ ধসে গেছে।জায়গায় জায়গায় ভবনের দেওয়াল ফুটো হয়ে গেছে। দুই পরিবার মিলিয়ে বাড়িতে তখন বিশ জন শিশু।কয়েকজন নারী। পুরুষ কেবল একজন। মুহাম্মদের বাবা।

বোমা হামলা থেকে বাঁচতে মুহাম্মদ তার বাবার সাথে বাড়ির নিচতলায় আশ্রয়ের জন্য উপযুক্ত কোনো জায়গা তালাশ করছিল। হঠাৎ উপরে বিকট শব্দ হলে কিশোর মুহাম্মদকে রেখে তার বাবা গেলেন উপরে কী হয়েছে দেখতে। অনেক্ষণ সময় গড়ালেও তিনি ফিরছেন না। মুহাম্মদ তখন পর্যন্ত কান ছেপে হাঁটু গেড়ে বসে আছে একটি টেবিলের নিচে। বাবার ফিরতে দেরি দেখে উপরে গিয়ে দেখে আসতে চায়। কিন্তু একতলা উপরেই আর কোনো ছাদ অবশিষ্ট নেই। প্রকাণ্ড শব্দ করে সরাসরি আকাশে বিমান উড়তে দেখা যাচ্ছে।

মুহাম্মদ ১২ বছরের কিশোর হলেও যুদ্ধ তাকে বয়সের চেয়ে অনেক বয়সী করে তুলেছিল। বাবা এবং ভাই-বোনদের রক্তাক্ত, খণ্ডিত লাশ দেখেও তার চোঁখ থেকে এক ফোটা পানিও প্রবাহিত হয়নি বলে জানিয়েছে বর্তমানে ১৬ বছরে উপনীত হওয়া বালক মুহাম্মদ। এখন সে ইদলিবের একটি সহায়হীন শিবিরে বাস করে। সে পর্যন্ত পৌঁছার ঘটনাও বড়ই করুণ।

এগুলো অল্পকিছু ঘটনার বর্ণনা। এরকম হাজারও দগদগে ক্ষতের স্মৃতি বহন করে ফিরছে রাক্কাবাসী। চলতে ফিরতে এখানে সেখানে তাদের চোখে পড়ে গণকবর। ভবন চাপায় প্রাণ হারানো অনেক লাশের হাড়-অস্থি মাড়িয়েই জীবিত রাক্কাবাসীর এখন পথ চলতে হয়।

অ্যামনিস্টিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে অনেকে একটি কথা বিশেষভাবে বলেছে “যারা মরে গেছে, তারা বেঁচে গেছে”। আমরা সারাক্ষণ যে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি তা মৃত্যুর চেয়েও বিষাদময়।

বিজ্ঞাপন