‘খোলামেলা আন্দোলনে’ ধর্ষণেরই চাষ হচ্ছে না তো?

সাইফ নূর ।।

যেকোনো সমাজে কোনো অপরাধের বিস্তৃতির পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট কারণ ও অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপট। সমাজে ধর্ষণের মতো একটি ভয়াবহ অপসংস্কৃতি তো হুট করেই এসে আপতিত হয়নি। দিনের পর দিন এর পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এ ভাইরাসের উপাদান উৎপাদন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নারী জাতিকে জনসম্মুখে ভোগের পণ্য হিসেবে পরিবেশন করা হয়েছে। মুক্তচিন্তা ও আধুনিকতার নামে পুরুষের সামনে তাকে লোভনীয় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। যুব-মানসে বপন করা হয়েছে গোনাহের বিষাক্ত বীজ। চরিত্রহননকারী সংস্কৃতির চর্চা, অশ্লীল বিনোদনের বিস্তার, বিয়ের প্রতি বিরাগ ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, আত্মশুদ্ধি চর্চার অভাব এবং সর্বোপরি আল্লাহর ভয় ও আখেরাতে জবাবদিহিতার অনুভূতির শূন্যতা সমাজে তৈরি করেছে অবৈধ যৌনতার অবক্ষয়িত পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন

এর অর্থ এটা নয় যে, সারাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার পেছনে বিচারহীনতার কোনো দায় নেই। নিঃসন্দেহে ধর্ষণ ও ব্যভিচারের শরীয়া আইনে দ্রুত বিচার না হওয়ায় প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্ষকরা আরো হিংস্র হয়ে ওঠছে।

বিচারহীতার সংস্কৃতির কারণে ঘরে-বাইরে কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়- একথা সত্য, কিন্তু এটাও অনস্বীকার্য যে, বিচারহীনতাই এর পেছনে একমাত্র কারণ নয়। চরিত্রহীনতা, বিনোদনের নামে পরকীয়া-যৌনতা ও ব্যভিচারকে উৎসাহিত করা, বিয়ের পথে সামাজিকভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, অশ্লীল সাহিত্য, উগ্র পোশাক, খোলামেলা অনিয়ন্ত্রিত আচরণ-বিচরণ এবং আত্মশুদ্ধি চর্চার অভাবও এর পেছনে ব্যাপকভাবে দায়ী।

মূলত ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের একটি অসঙ্গতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই এ লেখার অবতারণা। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে একশ্রেণির নারী-পুরুষ প্রকাশ্যে রাস্তায় পরস্পরকে জড়াজড়ি ধরে ধর্ষণবিরোধী মিছিল-মানববন্ধন করছে। ক্যামেরার সামনে নারী সঙ্গী পুরুষ সঙ্গীকে চুম্বন-আলিঙ্গন করছেন, এরপর ধর্ষকদের বিচারও চাইছেন! কোনো কোনো নারী খোলামেলা পোশাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিচারের দাবিতে চিৎকার জুড়ে দিচ্ছেন। এমনকি প্রকাশ্য দিবালোকে রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কে ধর্ষণবিরোধী ‘পথনাট্যও’ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাস্তার পাশেই একজন পুরুষ ধর্ষক সাজছে, আরেকজন মেয়ে ধর্ষিতার অভিনয় করছে, এরপর ধর্ষিতা ধর্ষককে প্রতিহত করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আর পথের পাশ দিয়ে যাতায়াতকারী হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে এ নোংরা তামাশা দেখছে।

এই তো দুদিন আগেই শাহবাগে রাত দুইটা বাজে, যেসময় কোনো নারী তো দূরের কথা- পুরুষরাও সাধারণত রাস্তায় বেরোয় না, সেখানে কয়েক ডজন মেয়েকে খোলামেলা পোশাকে সেই গভীর রাতে বাঁশের লাঠির মশাল হাতে ধরিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে, ‘শেকল ভাঙ্গার পদযাত্রা’। কীসের শেকল ভাঙছেন তারা? গভীর রাতে নারীর ঘরে থাকাকে কি তারা ‘শেকল’ নাম দিচ্ছেন? তারা কি তবে বলতে চাইছেন, মধ্যরাতে নারীরা রাস্তায় বের হলে ধর্ষণ প্রতিরোধ হবে?  গতকালের আরেক অদ্ভূত সংবাদ হচ্ছে, মেয়েদেরকে দিয়ে ঢাকার রাস্তায় সাইকেল চালানো হয়েছে। এটা নাকি ধর্ষণবিরোধী সাইকেল র‌্যালি! কতগুলো কিশোরী মেয়েকে দিয়ে প্রকাশ্যে সাইকেল চালিয়ে সংবাদ শিরোনাম করে তারা ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে চাইছেন।

দেশের মানুষ জানতে চায়, এসব কীসের আন্দোলন করছেন তারা? তারা এসব আপত্তিকর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধর্ষণকে প্রতিরোধ করছেন, নাকি স্বয়ং ধর্ষণেরই চাষ-উৎপাদন করছেন? যে নারীদেরকে দিয়ে রাত দুইটায় ‘শেকল ভাঙার পদযাত্রা’ করানো হলো, তাদের একটি শ্লোগান ছিল, ‘দিনে হোক, রাতে হোক, সামলিয়ে রাখো চোখ’। আমরা তাদের শ্লোগান ধরেই তাদের কাছে জানতে চাই, কিভাবে মানুষ চোখ সামলে রাখবে যখন আপনারা খোলামেলা পোশাকে গভীর রাতে রাস্তায় বেরোনোর অপসংস্কৃতি চালু করছেন? কিভাবে পুরুষরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করবে, যেখানে আপনি পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় রাস্তায় শ্লোগান দিয়ে বেড়াচ্ছেন? এ যে সর্ষের মধ্যেই ভূতের মতো হয়ে গেল! ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে যে বা যারা রাস্তায় ধর্ষণের নাটক মঞ্চায়িত করলেন, তাদের কাছে ধর্ষণে জর্জর বাংলাদেশ জানতে চায়, এ ধরনের ন্যাক্কারজনক প্রদর্শনী করে তারা কি ধর্ষণকে প্রতিহত করছেন, নাকি মায়ের জাতিকে অসম্মান করছেন রাস্তাঘাটে?

এই খোলামেলা আন্দোলনকারীরা আসলে একথা মানতেই নারাজ যে, নারীরা নিজেদেরকে পর-পুরুষ থেকে আড়ালে রাখবে। তারা বলতে চান, নারী-পুরুষ একসঙ্গে থাকবে, ঢলাঢলি করবে, মাঝরাতে খোলা পোশাকে একাকি অথবা পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গেই বের হবে, কিন্তু এর সঙ্গে ধর্ষণের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।’ তাদেরকে আমরা প্রশ্ন করতে চাই, দেশ-বিদেশের ‘প্রতিষ্ঠিত’ জায়গাগুলোতে পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের দুর্ঘটনাগুলো তাহলে কেন ঘটে? যে চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানগুলো নারীর সৌন্দর্যকে বাণিজ্যিককরণে সিদ্ধহস্ত, যারা মায়ের জাতিকে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করতে নারী স্বাধীনতার রঙিন শ্লোগানগুলোকে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে, তাদের রথি-মহারথিদের বিরুদ্ধে কেন বিশ্বজুড়ে মি-টু আন্দোলন করতে হচ্ছে তাদেরই সহকর্মী নারীদের? কেন অফিস-আদালতসমূহে বেশির ভাগ নারী বস ও ম্যানেজারের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হন প্রতিনিয়ত? এত প্রশ্নের ভীড়ে আমরা তাদেরকে আরেকটি প্রশ্ন করে কথা শেষ করতে চাই- ‘খোলামেলা আন্দোলনে ধর্ষণেরই চাষ হচ্ছে না তো?’  -ঠাণ্ডা মাথায় একটু ভেবে দেখবেন।

বিজ্ঞাপন