পঞ্চগড়ে কাদিয়ানী তৎপরতা: যেভাবে ঘাঁটি গেড়েছে জেলাটিতে

নুরুদ্দীন তাসলিম।।

উত্তরের সর্বশেষ জেলা পঞ্চগড়। যেসব ইস্যুতে আলোচনায় থাকে জেলাটি তার অন্যতম একটি ‘কাদিয়ানী সম্প্রদায়’। মহানবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেষ নবী ও রাসুল হিসেবে অস্বীকারকারী এই সম্প্রদায়ের তৎপরতা দেশের যেসব জেলায় সব থেকে বেশি পঞ্চগড় তার অন্যতম। বর্তমানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলাটিতে তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া এই অমুসলিম সম্প্রদায় কিভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছিল জেলাটিতে। অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে স্থানীয় সূত্রে ইসলাম টাইমস জানতে পারে, স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে জেলাটিতে জনসংখ্যা কম ছিল, অনেক জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকতো, যা অঞ্চলের মানুষদের এ অঞ্চলে বসবাসে আকৃষ্ট করে। তৎকালীন সময়ে নোয়াখালী, নরসিংদী, সিলেট, ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ পঞ্চগড়ে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৫০-এর দশকের কথা। তৎকালীন পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের দরিদ্র কাদিয়ানীরা মাথা গোজার ঠাঁই পেতে আশ্রয় এ জেলাটিতে।

সেসময় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষদের পঞ্চগড়ের স্থানীয় ভাষায় ‘ভাটিয়া’ বলা হয়। স্বভাবজাত কারণেই পঞ্চগড়ের আদি বাসিন্দা ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষদের মাঝে দ্বন্দ লেগে থাকতো- সামাজিক আচার- আচরণ ও আগতদের কারণে স্থানীয়রা না আবার প্রভাব-প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলে এই ভয়ে।

স্থানীয় ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষদের দ্বন্দ ভাটিয়াদের পরস্পরের মাঝে সম্পর্কের সেতু বন্ধন তৈরী করে। কাদিয়ানী-মুসলিম পার্থক্য ভুলে সবাই পারস্পরিক সহযোগী হিসেবে বসবাস করতে থাকে।

কাদিয়ানীদের সাথে ভাটিয়া মুসলিমদের ‘পারস্পরিক সহযোগী হিসেবে বসবাস’ কি শুধু তারা ভাটিয়া হওয়ার কারণে? এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সূত্র জানায়, অঞ্চলটিতে আগত ও স্থানীয় মুসলিমদের অনেকেই কাদিয়ানী-মুসলিম পার্থক্য ভালোভাবে বোঝেন না। ২০১৯ সালে কাদিয়ানীদের ইজতেমা নিয়ে হওয়া প্রতিবাদ ও খতমে নবুয়ত সম্মেলনের আগে এ জেলার মানুষদের মাঝে এ নিয়ে কোন ভাবান্তরই ছিল না বলা যায়।

মাথা গোজার ঠাঁই পেতে পঞ্চগড়ে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র কাদিয়ানীরা সময়ের সাথে সাথে নিজেদের সংগঠিত করে। প্রথমে তাদের তৎপরতা বন্ধ রাখলেও আস্তে আস্তে ‘ একজন কাদিয়ানী, একজন দায়ী’ তাদের  এই নীতি অনুসরণ করে স্থানীয়দের দাওয়াত দিতে শুরু করে।

এ জেলার মানুষ আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ও ধর্মীয় ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জানাশোনা কম হওয়ায় কাদিয়ানীরা এ সুযোগ কাজে লাগায়। আর্থিকভাবে অসচ্ছলদের অর্থ সহায়তা, ফ্রি প্রাইভেট পড়ানোসহ বিভিন্ন প্রলোভনে মুসলিমদের ঈমান হরণের চেষ্টা করে এই অমুসলিমরা।

এই অঞ্চলে কাদিয়ানীদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে গিয়ে স্থানীয় এক ইমাম জানান- স্থানীয় ভিক্ষুকরা কাদিয়ানীদের বাসায় ভিক্ষা করতে গেলে তারা ভিক্ষুকদের দারিদ্র্যমুক্ত স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখায়। স্বচ্ছল জীবনের বিনিময়ে তাদের কাদিয়ানী হওয়ার দাওয়াত দেয়।

উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জীবনে অন্যতম এক অভিশাপ যৌতুক। কন্যা সন্তান জন্মের আনন্দের থেকেও এ অঞ্চলের বাবাদের ভাবিয়ে তোলে বিয়ের সময় মেয়ের যৌতুকের ব্যাপারটি। দরিদ্র কবলিত বাবাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় কাদিয়ানীরা এসব মেয়েদের যৌতুক ছাড়াই বিয়ে করে। কখনোবা বিয়ের যৌতুক বহনে রাজি হয় ধর্মান্তরিত করার বিনিময়ে।

যৌতুকের অভিশাপে জর্জরিত এই অঞ্চলে কাদিয়ানীদের আরেকটি কর্মপন্থা হলো- নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় গোপন রেখে পার্শবর্তী জেলা দিনাজপুর, ঠাঁকুরগাও থেকে দরিদ্র ঘরের মেয়ের বিয়ে করে পঞ্চগড়ে নিয়ে আসা।  ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকায় অনেক সময় এই গৃহবধূদের পরিবারসহ কাদিয়ানী হয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রে একে নিজের ভাগ্য মেনে চুপ থাকেন গরিব ঘরের এই মেয়েরা। ঈমানের বলে বলিয়ান অনেকেই আবার স্বামী সংসারের মায়া তুচ্ছ করে ঈমান বাঁচাতে ফিরে আসেন দরিদ্র বাবার কুঠরিতে।

পঞ্চগড় শহরের অদূরে ফুলবাড়ী, শালসিঁড়ি ও আহমদীয়া নগরে কাদিয়ানীদের বসবাস। পঞ্চগড়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ মুসলিম শিক্ষকদের মতই চাকরি করেন অনেক কাদিয়ানী। পাঠদানের পাশাপাশি সুযোগ বুঝে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মান্তরিত করার কাজও চালিয়ে যান বলে জানা যায় স্থানীয়ভাবে ।

এদিকে পঞ্চগড়ে এখন পর্যন্ত নাহবেমীরের উপরে কোন কওমী মাদরাসা না থাকলেও ‘জামিয়া আহমদিয়া’ নামে মাদরাসা চালু করেছে কাদিয়ানীরা। আহমদিয়া কিন্ডার গার্ডেন নামেও আছে তাদের স্কুল।

স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব আলী বলছেন, ১৯৫০-এ আশ্রয়ের খোঁজে পঞ্চগড়ে এলেও বর্তমানে কাদিয়ানীদের স্পর্ধা যেন বেড়েই চলেছে। কাদিয়ানীরা এক সময় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মুসলিমদের সাথে ‘ভাটিয়া’ হিসেবে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও এখন তারা নিজস্ব পরিচয়ে (কাদিয়ানী) চালিয়ে যায় ধর্মান্তরিত করার কাজ।

বিদেশি সহায়তায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, এমপি, মন্ত্রীদের হাতের মুঠোয় রেখে এখন তারা মোকাবেলা করে সচেতন মুসলিমদের সাথে। এক সময় তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলা ‘ভাটিয়া’ মুসলিমরাও এখন আফেসোস করেন।

স্থানীয় যুবক কামরুল হাসান বলছিলেন, কাদিয়ানাীদের আচরণ যেন পুরোই মিলে যায় ইহুদের সাথে- এক সময় মাথা গোজার ঠাঁই খুঁজতে এসে এখন যেন তারা মোড়ল সাজতে বসেছে সচেতন মুসলিমদের বিপরীতে।

কাদিয়ানীদের অপতৎপরতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে ইসলাম সম্পর্কে এ অঞ্চলের মানুষের কম জানাশোনাকে দায়ী করছেন যুবক কামরুল হাসান। তিনি আরো বলছেন, এ অঞ্চলে দেশের প্রথম সারির আলেমদের নজরদারি আরো বাড়ানো গেলে হয়তোবা মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়বে। এছাড়া জেলাটিতে এখনো দাওরা হাদিস পর্যন্ত কোন মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত না থাকাটাও কাদিয়ানী বিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রতিবন্ধক বলে দাবি  কামরুল হাসানের।

বিজ্ঞাপন