ম্যাক্রোঁর ইসলামবিদ্বেষ ও বৃদ্ধার ‘আধ্যাত্মিকতায় প্রত্যাবর্তন’

সাইফ নূর ।।

সেদিন ফ্রান্সের বিমানবন্দরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। যখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মেক্রোঁ তার সরকারি উচ্চপদস্থ অফিসারদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন তার দেশের একজন নারীকে সংবর্ধনা দিতে। মহিলাটিকে  আরো পাঁচজন ইতালির বাসিন্দার সঙ্গে চার বছর পূর্বে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির একটি গোষ্ঠী (জামাতে আনসারুল ইসলাম) অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। দুনিয়া যাদেরকে ‘জিহাদী’, কট্টরপন্থী’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘মৌলবাদীর’ মতো তকমায় স্মরণ করে থাকে।

বিজ্ঞাপন

এই পঁচাত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা সোফি, যিনি ফ্রান্সের নাগরিক হলেও লম্বা সময় মালির পেট্রোনিয়ান গ্রামে বাস করছিলেন। একটি এতিমখানা এবং দাতব্য সংস্থার সহযোগিতায় নিঃস্ব ও ইয়াতীম বাচ্চাদের সহায়তার কাজ করতেন সেখানে।

যে মেক্রোঁ তার নিজ দেশে সবসময় ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধাবস্থা ঘোষণা করে রেখেছেন। ‘হিজাবকে’ সন্ত্রাসের আলামত আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করেছেন। যিনি বলেছেন, ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে ইসলামী উগ্রবাদ থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন তিনি। যার লক্ষ্য মুসলিমদের, বিশেষত মুসলিম নারীদের বাইরে যাওয়ার সময় ইসলামী পোশাক পরিধান থেকে বিরত থাকতে হবে। হিজাব পরিধান নিষিদ্ধ করা হবে এবং মুসলিম মেয়েদের স্কুলে ইসলামী পোশাক পরতে দেওয়া হবে না।’ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে যিনি ফ্রান্সের ভূখণ্ড থেকে ইসলামের শেকড় উপড়ে ফেলার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন।

ঐ বৃদ্ধা এয়ারপোর্টে নেমেই ফ্রান্সের শাসকবর্গ এবং মিডিয়াকর্মীদের সামনে মুখ খুলে যে কথাটি বললেন, তার জন্য মেক্রোঁ সত্যি প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা আমাকে সোফি নামে চেনেন, কিন্তু এখন আপনাদের সামনে যে নারী দাঁড়িয়ে, তার নাম ‘মারয়াম’।

এটা নিছক একটি বাক্য ছিল না। এটা ছিল এটমবোমা। হ্যাঁ, এটমবোমাই ছিল। যার আঘাতে ইসলামবিদ্বেষী মেক্রোঁর সকল ষড়যন্ত্র ও নীলনকশা বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে গেছে। এ বাক্য দিয়ে মূলত ঐ বৃদ্ধ ও জরাজীর্ণ নারী প্রেসিডেন্টের মুখে এমন কষে থাপ্পড় মেরেছেন, যার ‘স্বাদ’ তিনি তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনুভব করতে পারবেন। লাঞ্ছনার এ চপেটাঘাতে তার তো মাটিতে পড়ে যাওয়া উচিত ছিল।

ঐ বৃদ্ধা নারী মিডিয়ার লোকদের সামনে আরো যেসব কথা বলেছিলেন, তার দ্বারা শুধু ফ্রান্স নয়, বরং পুরো বিশ্বের মিডিয়া থতমত খেয়ে গেছে। তাদের জন্য একথাগুলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং ভীষণ হতভম্বকারী ছিল। ঐ নারী তার চার বছরের অপহরণ সম্পর্কে বলেছেন, তার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি তার বন্দিত্বের সময়কে ‘আধ্যাত্মিকতায় প্রত্যাবর্তন’ (Spiritual Retreat) বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, আমরা প্রত্যেকে এ পৃথিবীতে কোনো না কোনো পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করি। যেই পরীক্ষাটি সামনে আসছে, তাকে যদি আপনি হাসিমুখে গ্রহণ করেন তাহলে বেশি খারাপের কিছু নেই। কিন্তু যদি আপনি মোকাবেলার চিন্তা করেন তাহলে নিজেরই ক্ষতি করবেন।’ তিনি আবারো মালি যাওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। যাতে আগের মতো মানুষের খেদমত করার সুযোগ পান।

কিন্তু ফ্রান্সের শাসকবর্গ এবং উপস্থিত গণমাধ্যমের জন্য আরো পীড়াদায়ক বিষয় ছিল যে, একথাটাও তিনি ইসলামের সঙ্গে যুক্ত করে বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি মালির জন্য কল্যাণ ও বরকতের দোআ করি। কারণ, আমি মুসলমান।’

এটা প্রথম কোনো ঘটনা নয়, যেখানে অপহৃত ব্যক্তি অপহরণকারীদের আচার-স্বভাব এবং উত্তম চরিত্রগুণে মুগ্ধ হয়ে তাদের ধর্ম গ্রহণ করেছেন। বিশেষকরে ইসলাম এবং মুসলমানদের সম্পর্কে এধরনের ঘটনা ইতিপূর্বেও বহুবার ঘটেছে। চলমান শতাব্দির শুরুতে বৃটেনের নারী সাংবাদিক রিডলির ঘটনা অত্যন্ত বিখ্যাত হয়েছিল। যিনি ২০০১ সালে আফগানিস্তানে কিছুদিন তালেবানের কারাগারে কাটিয়েছিলেন। যে তালেবানকে দুনিয়া সহিংস মানুষ আখ্যা দিয়েছিল তাদের উত্তম আচার রিডলির মতো পশ্চিমা সাংবাদিককে এতই প্রভাবিত করেছিল যে, তিনি ইসলামের অধ্যয়নের প্রতি আকর্ষিত হন এবং ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

কিন্তু অপরদিকে পৃথিবীর সভ্যতম রাষ্ট্রের অবস্থান এবং আচরণ দেখুন। একজন নারী এখনো (আফিয়া সিদ্দিকী) তাদের জেলখানায় কয়েদ। কো্ন কোন্ উপায়ে তাকে অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়নি? জীবিত থেকেও তাকে মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

কোথায় গেল সভ্যতা, ভদ্রতা? কোথায় গেল আধুনিকতা, মুক্তচিন্তা এবং মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা? তারা কি আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখবেন একটু? যাদেরকে তারা সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে থাকেন, তাদের আচরণের সঙ্গে নিজেদের আচরণ মিলিয়ে দেখুন। এরপর হিসাব কষুন যে, কারা প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসী এবং চরমপন্থী, আর কারা ভদ্র, সভ্য এবং মানবতাবাদী।

বিজ্ঞাপন