স্মৃতির দেয়ালিকা: বই হাতে নেয়ার কিছু গল্প

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

ক্যালকুলেটরে গুণলে দেখা যায়, আমার বয়স এখন তিরিশের কাছাকাছি। সে হিসাবে জীবনের তিন দশক পূর্ণ হতে চলছে। কিন্তু চলার ভঙ্গি দেখে তো মনে হচ্ছে—বয়স শুধু বাড়ছেই না, মাঝেমধ্যে কিছু কমছে! সে এক ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বিষয়। উদ্দেশ্য হলো বয়সের স্বল্পতা স্বীকার করা, আবার একেবারে কমও যে তা নয়; সেই দাবী স্পষ্ট করা।

বিজ্ঞাপন

যৌক্তিক কারণেই আমাদের একাডেমিক পড়াশোনা হয় বয়সের প্রথম তিন দশক। কিংবা সামান্য আগে বেড়ে আরেকটা দশক পর্যন্ত। এই পড়াশোনা কাকে কতোদূরে নিয়ে যায় সেকথা বলবেন বড়রা। আমি বলবো শুধু বই হাতে নেয়ার কিছু গল্প।

আল্লাহর মেহেরবানী- এই বয়সেই ছোট বড় হালকা ভারী বেশকিছু বই হাতে নেয়ার সুযোগ হয়েছে। দেখতে হয়েছে পড়তে হয়েছে মুখস্থ করতে হয়েছে কিংবা তথ্যের সন্ধানে উল্টাতে হয়েছে অনেক পৃষ্ঠা। এর মাঝে ‘পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে গেছি’ জাতীয় বই যেমন আছে; তেমনি আছে পড়া শেষ হওয়ার পর ‘কী যেন হারিয়ে ফেলেছি’ জাতীয় বইও। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর হাতে পেয়ে ‘বে হিসাব রাত জেগেছি’ যেমন; তেমনি টেবিলে রেখে রেখে শুধু সুযোগের অপেক্ষাও করেছি অনেক। আবার দোকানে দোকানে খুঁজেছি; লাইব্রেরীতে লাইব্রেরীতে সন্ধান করেছি অথবা না খোঁজেও কখনো পেয়ে গেছি- এ জাতীয় স্মৃতি জমে আছে অনেক। আরো জমছে বোধহয় বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে।

এক.

কুরআনে কারীমের পর সর্বপ্রথম আগাগোড়া মুখস্থ করেছি যে বই তার নাম ‘মীযানুছ্ছরফ’। ‘ফছল ইঁ হামা কে গুফতা শুদ বহসে ফে’লে মাযী বুদ। আগার মুযারে বানা কুনী….’ ফার্সী ভাষার সে এক দুলুনি আর গুঞ্জন। এখনো কানে বাজে। চোখে ভাসে সেইসব স্মৃতি। যেই পর্যন্ত সবক হতো সকাল সন্ধ্যা কমপক্ষে দুইবার ‘তিলাওয়াত’ করতাম, সূরা ইয়াসীন ওয়াকিয়ার সাথে। দরসে পড়া শোনাতাম মুখস্থ। ফার্সী এবং তার অনুবাদ দুটোই। ধীরে ধীরে যখন পুরো কিতাবের সবক পড়া শেষ, তখন থেকে শুরু হলো ঘড়ি ধরে পড়া। ফার্সী সাত মিনিটে আর অনুবাদ নয় মিনিটে- সম্ভবত এই পর্যন্ত এসে থামলো প্রচেষ্টা। তারপর এই ভিত্তিতে পুরস্কারও পেলাম কয়েকবার। বয়সের দুরন্তপনা আর কৈশোরী ছাপ তখন পড়াশোনাকে আমোদে করে তুলেছিল এই কিতাবের শক্তিতে। বইয়ের স্মৃতিচারণে তাই আজো আমার কাছে ‘মীযানুছ্ছরফ’এর কোনো সমকক্ষ নেই।

দুই.

একবারের কথা। তখনও মীযান জামাতে। ফার্সী কবিতার বই ‘কারীমা’ ‘পান্দেনামা’ পড়ি। এই দরসে একদিন হুযূর শুনালেন হিজরী সপ্তম শতকের এক বুযুর্গ এবং ওলী-মনীষী হযরত বূছীরী রাহিমাহুল্লাহর ঘটনা। তার বিখ্যাত কিতাব ‘কাসীদাতুল বুরদা’র কাহিনী। সেকি গল্প!! অবিশ্বাস্য ভাব-আবেগের সেকি দোলাচল!! লেখক দীর্ঘদিনের পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী। দিনরাত শুয়ে কাটানো ছাড়া দ্বিতীয় কোনো কাজের সুযোগ নেই। তখন এই বুযুর্গ দুআ যিকির তিলাওয়াত আর দরুদ পাঠেই মশগুল থাকেন। আর ফাঁকে ফাঁকে আনমনে রচনা করেন কিছু পঙ্ক্তি। নবীপ্রেম ও প্রশস্তির  কাব্য। মোটামুটি একশো ষাট পঁয়ষট্টি পঙ্ক্তি যখন তৈরী তখন একদিন স্বপ্নে যিয়ারত লাভ করেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর। দেখেন নবীজী বসে আছেন একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে। আর তিনি পাশে দাঁড়িয়ে শোনাচ্ছেন এই পঙ্ক্তিগুলো। একটি একটি করে সবগুলো পঙ্ক্তি যখন শোনানো শেষ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হয়ে নিজের গায়ে জড়ানো চাদরটি তাকে পরিয়ে দিলেন। আনন্দের আতিশয্যে তিনি ঘুমের ভেতরেই লাফ দিয়ে উঠলেন। জেগে দেখলেন নবীজী নেই। তবে তার পরানো চাদরটি এখনো আছে গায়ে। আশ্চর্য! অবশ হাত পায়ে শক্তি ফিরে এসেছে। পক্ষাঘাত বলতে কিছুই নেই। এরপরের ঘটনা আরো মজার। তবে একটি সত্য; বলতে দ্বিধা নেই- বর্তমানে আমি এমন জায়গায় আছি যেখানে বসে ঘটনাটির শুদ্ধতা অশুদ্ধতা যাচাইয়ের সুযোগ পাচ্ছিনা। একটু আধটু চেষ্টাও যে করছিনা তা নয়। তবে এখানে উদ্ধৃত করলাম শৈশবের শোনা ঘটনা হিসাবেই।

এই ঘটনা শোনার পর ‘কাসীদাতুল বুরদা’ খুঁজতে লাগলাম। বাংলাবাজারের দোকানে দোকানে সাধ্যমতো খুঁজলাম। পেলাম না। খোঁজা তবু বন্ধ করিনি। যেখানেই ছোট বড় কোনো লাইব্রেরী পাই, দেখি। খুঁজি। এক পর্যায়ে চৌধুরীপাড়ার একটি লাইব্রেরীতে পেয়ে গেলাম এই কিতাব। হাদিয়া পরিশোধ করে যখন আমি কিতাবটির মালিক তখনকার অবস্থা সত্যিই বর্ণনার অতীত।

মাদরাসায় এসে হুযূরকে জানালাম এই মহা-সংগ্রহের কথা। আর আবেদন করলাম হুযূরের কাছে কিতাবটি পড়ার। বাচ্চা বালকের আকুল আকুতি হুযূর উপেক্ষা করতে পারলেন না। কিন্তু সে কিতাব তো উচ্চাঙ্গ আরবী সাহিত্যের। আমি পড়ি মীযান। এই কিতাব আমাকে পড়ানোর অর্থ বলা যায় নিজেকেই নিজে পড়ানো। তাই উপরের জামাতের ক’জন তালিবুল ইলমকেও হুযূর এই কিতাব পড়ার প্রস্তাব দিলেন। শুরু হলো দরস। সবাই কিভাবে পড়লো জানিনা। আমি শুধু মুখস্থ করে গেলাম সব। সেই মুখস্থই এখনো স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

أمِنْ تَذَكُّرِ جِيران بِذِي سَلَمٍ             مَزَجْتَ دَمْعاً جَرَى مِنْ مُقْلَةٍ بِدَمِ

أمْ هَبَّتْ الريحُ مِنْ تِلْقاءِ كاظِمَةٍ                    وأوْمَضَ البَرْقُ فِي الظلْماءِ مِنْ إضَمِ

          فما لِعَيْنَيْكَ إنْ قُلْتَ اكْفُفاهَمَتا           وَما لِقَلْبِكَ إنْ قُلْتَ اسْتَفِقْ يَهِمِ

তিন.

একজনের কাছে দেখলাম সৈয়দ শামছুল হকের একটি বই। ‘মার্জিনে মন্তব্য’।  মুহূর্তক্ষণের দেখা। সূচিপত্র আর কিছু পাতা উল্টানো, এই যা। সুযোগ করে আরেকদিন বইটি চাইলাম। সামান্য কিছু অংশ করে বিভিন্ন জায়গা থেকে পড়লাম। মূল পড়াশোনার ফাঁকে এরচে’ বেশি আর সময় কোথায়?! মনে হলো বইটি সংগ্রহে থাকা দরকার। সময় করে পুরোটা পড়তে পারলে লাভ হবে। প্রকাশনীর নাম লিখে রাখলাম। পরবর্তী বইমেলায় গিয়ে খুঁজলাম বইটি। নেই।

: মূলকেন্দ্রে আছে?

: না, ছাপাই শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে ছাপতে হবে।

: কবে নাগাদ ছাপা হতে পারে?

: বলা যায় না। আপাতত পরিকল্পনা নেই।

: … দীর্ঘশ্বাস- কী যেন পাবো পাবো করেও না পাওয়ার কষ্ট।

কিছুদিন পর মাথায় একটা দুষ্টামি বুদ্ধি এলো। বই যেহেতু ছাপ-ই নেই। ছাপানোর পরিকল্পনাও নেই। এতএব ছাপানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্যে- বইমেলায় যাচ্ছে কে? শুভ? দেখেন তো ‘অন্য প্রকাশ’ এ ‘মার্জিনে মন্তব্য’ আছে কিনা। কাল যাচ্ছে রায়হান ভাই কিংবা রাশেদ। ভাই, দেখেন তো সৈয়দ শামছুল হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য’ পাওয়া যায় কিনা। বইটি ‘অন্য প্রকাশ’ থেকে ছেপেছে। এভাবে যাকে পাই একবার করে বইটির সন্ধানে একটু চক্কর দিতে বলি। যেন প্রকাশনীর নজরে এই বইটির বিপুল চাহিদা প্রকাশ পায়। পরের বছর শুধু মাদরাসার তালিবুল ইলমই নয়, পরিচিত অন্যদেরকেও এই ‘গুরুদায়িত্ব’ পালনের অনুরোধ করি। এভাবে মোটামুটি চার বছর পর হঠাৎ দেখলাম নতুন বই। ঝকঝকে ছাপা। মূল্যও আগের চেয়ে বেশ ‘ঝকঝকে’। সংগ্রহ করলাম। এরপর…. কী বলবো? পড়তে থাকলাম আর তথ্যে উপাত্তে ভাবে কৌশলে উপমায় উপাস্থাপনে এবং আলোচনায় ও বিশ্লেষণে সাহিত্যকে দেখলাম আরেকবার; কিংবা বলবো- দেখলাম নতুনভাবে। ‘গল্পের কলকব্জা’য় যেমন তেমনি ‘কবিতার কিমিয়া’য়। মুগ্ধতার বর্ণনা আজ না হয় থাক।

এই বই ছাপার পেছনে প্রকাশনীর প্রেরণা-পরিকল্পনা কী ছিলো জানিনা। তবে বইটি নতুন করে ছাপার জন্যে প্রকাশনীকে ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন