“মৃত্যুদণ্ডই যথেষ্ট নয়, বিশ্বব্যাপী ধর্ষণ রোধে চাই সমন্বিত ও বহুমুখী পদক্ষেপ” 

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: সম্প্রতি বেগমগঞ্জের বর্বরোচিত ঘটনা নিয়ে আন্দোলনের মুখে ধর্ষণের আইন মৃত্যুদণ্ড করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘ধর্ষণ একটা পাশবিকতা, মানুষ পশু হয়ে যায়। সেইজন্য আমরা ধর্ষণ বন্ধে আইন সংশোধন করে যাবজ্জীবনের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন করেছি।’

চিন্তাশীল বিভিন্ন মহল থেকে ধর্ষণের আইন সাধারণভাবে মৃত্যুদণ্ড করা নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে। অনেকে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন যিনা-ব্যাভিচারের যাবতীয় পথ খোলা রেখে শুধু মৃত্যুদন্ডের আইন করে ধর্ষণ বন্ধ করা কি সম্ভব?  তাছাড়া মৃত্যুদণ্ড আইন কার্যকর করা নিয়ে অপপ্রয়োগেরও আশংকা করছেন অনেকে।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ বন্ধে কয়েকটি কার্যকরী প্রস্তাবের কথা ইসলাম টাইমসকে বললেন আলেম লেখক সাংবাদিক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী।  মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর নিকট ধর্ষণ একটি সামাজিক সমস্যা। এর কারণ ও উপাদান হিসাবে সমাজে ছড়িয়ে আছে আরো অনেক অবহেলা ও অনাচার। ভেতরের চিকিৎসা না করে বাইরে অষুধ লাগানো যেমন আসল চিকিৎসা নয়, তেমনি ধর্ষণ ও ব্যভিচারের যাবতীয় পথ খোলা রেখে শুধু মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে এই পাশবিকতা রোধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন মাওলানা নদভী।

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী ইসলাম টাইমসকে বলেন, ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে সমাজে কয়েকটি সেক্টরে আমাদেরকে সমান ভাবে কাজ করতে হবে। এ আলেম বলেন, সর্বপ্রথম আমাদেরকে এই সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। সমাজকে গোনাহমুক্ত করতে হবে। বর্তমান সমাজে পর্নোগ্রাফির যে আগ্রাসন ও সয়লাব চলছে তা রোধ করতে হবে। শিল্পসংস্কৃতির নামে অশ্লীলতার বিস্তার ঠেকাতে হবে। এসব অসুস্থ সংস্কৃতির চর্চা ও পর্নোগ্রাফি অনেক নিষ্পাপ শিশু কিশোর ও সরল- সহজ নিরপরাধ  মানুষের মনেও গোনাহের প্রবৃত্তি তৈরি করে দিচ্ছে। তাদেরকে দৈহিকভাবেও উত্তেজিত করছে।

দ্বিতীয়ত, সমাজে ইসলামী শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। কিন্তু শিক্ষা সিলেবাসে যথেষ্ট পরিমাণ ইসলামী শিক্ষা না থাকায় সাধারণ মানুষ জানে না যিনা ব্যভিচার কত ভয়াবহ। ইসলাম যিনা ব্যভিচারের দরজা বন্ধ করার জন্যে চোখের হেফাজত করতে বলেছে, নারীপুরুষ উভয়কে। ইসলামের দৃষ্টিতে হাতেরও যিনা হয়। চোখেরও যিনা হয়। কানেরও যিনা হয়। নারীপুরুষকে ইসলাম নির্জনে একাকী অবস্থান করতে নিষেধ করেছে। শিক্ষা কারিকুলামে ইসলামের এসকল বিধান সংযোজন করতে হবে। নয়তো মানুষ মনে করবে, শুধু ধর্ষণই  অপরাধ। শরীয়তে অবৈধ যৌনতা অপরাধ নয়, যোগ করেন মাওলানা নদভী।

এ সকল কাজের পাশাপাশি সমাজ থেকে মাদকসহ যৌন উস্কানিমূলক সকল কারণ ও উপাদান দূর করতে হবে। সমাজের এসব নোংরা উপাদানের কারণে  অনেক সময় লম্পট স্বভাবের লোকদেরকে নারী তো বটেই নিষ্পাপ শিশু কিংবা সত্তরোর্ধ বৃদ্ধার উপরও পাশবিকতা চালাতে  দেখা যায়। অনেক সময় নিরপরাধ নব যুবকরাও কামনা তাড়িত হয়ে এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশু ও নারীটি থাকে সম্পূর্ণ অসহায় এবং নির্দোষ। সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার ও মজলুম। যেসব অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নগ্নতাপূর্ণ ফ্যাশন, মডেল, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া  নোংরা দৃশ্য দেখে এসব লোক এমন পাশবিক ঘটনা ঘটায় সেসব উত্তেজক ছবি ও কন্টেন্টকেও এসব ঘটনার জন্য দায়ী বলে স্বীকার ও চিহ্নিত করতে হবে। বস্তুত ছবির মধ্যে দেখা চরিত্রগুলোকে নাগালে না পেয়েই এসব কামার্ত  লোকেরা অসহায় নারী, শিশু, বালক ও বৃদ্ধার দিকে লালসার হাত বাড়ায়। মানব সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী সমাজব্যবস্থা অনুসরণের বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন মাওলানা নদভী।

মানুষের জৈবিক চাহিদা সব সময় শিক্ষা ও বিবেক বুদ্ধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় না। জৈবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য দরকার আল্লাহর ভয়, আখেরাতে জবাবদিহিতার জাগ্রত অনুভূতি, কোরআন সুন্নতের নির্ধারিত শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন।  দরকার উস্কানিমূলক ও যৌন উদ্দীপক উপাদান সমাজ থেকে উৎপাটন।

“আপনি যদি আগুনের পাশে যান তাহলে আপনার শরীরে তাপ অনুভূত হবেই। আগুন গায়ে এসে লাগলে শরীর পুড়বেই। আগুনের ব্যাপারে আপনার যতই মানসিক প্রস্তুতি ও সতর্কতার জ্ঞান থাকুক। এটাই প্রকৃতির বিধান। তদ্রুপ যৌন উদ্দীপক বস্তুর সংশ্লেষে নারীপুরুষ মাত্রেরই যৌন চাহিদা সৃষ্টি হতে পারে। সে চাহিদা নিয়ন্ত্রণে দরকার আল্লাহভীরু সমাজব্যবস্থা, বাস্তবতার আলোকে প্রণীত যৌনবিষয়ক নির্দেশনা, দৃষ্টি শ্রবণ নির্জনতা চলাফেরা দেখাশোনা চলাফেরা  মেলামেশা নিয়ন্ত্রণ। দরকার সমাজে অশ্লীলতা বেহায়াপনা ও যৌন উস্কানিমূলক  বিষয়াদি না থাকা। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু শাস্তি এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।” যোগ করেন মাওলানা নদভী।

ধর্ষণ রোধে তিনি সমাজে বিবাহকে সহজ করার পরামর্শ দেন। সে সাথে যারা বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদেরকে দ্রুত অন্যত্র বিবাহের ব্যবস্থা করতে হবে। বিয়ে হয়নি এমন নারী-পুরুষের সমস্যা দূর করে তাদের বিয়ে-শাদির ব্যবস্থা করতে হবে। এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক,  সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগ।  এ জাতীয় উদ্যোগকে সমাজে ভালো দৃষ্টিতে দেখতে হবে।

গণমাধ্যমে একটি অভিযোগ বারবার ঘুরে ফিরে আসছে যে, ’আমাকে প্রলোভন দিয়ে ধর্ষণ করেছে।’ এধরণের অভিযোগের ব্যাপারে মাওলানা নদভী বলেন, প্রলোভন দিয়ে আবার ধর্ষণ করে কিভাবে?  মূলত এটি উভয়ের অংশগ্রগণে সংঘটিত জিনা বা ব্যাভিচার। হয়তো  ঘটনা ঘটেছে আরো অনেক আগে। বিয়ের আশায় তারা একত্রে থেকেছে। পরে আশা বাস্তবায়িত না হওয়ায় অভিযোগ নিয়ে এসেছে ধর্ষণের । অথচ প্রথম  দুজনেই সম্মত ছিল।  এধরণের কথিত  ধর্ষণের অভিযোগে নারীপুরুষ উভয়েরই সমান শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন মাওলানা নদভী।

এখন যে পরিস্থিতিতে শাস্তির বিধান হয়েছে এর জন্য সাময়িকভাবে হয়তো অনেকে খুশি হচ্ছেন কিন্তু এর অপপ্রয়োগের অনেক আশঙ্কা রয়েছে তাই এখনই খুশি হওয়ার কিছু নেই বরং আমরা বলব ধর্ষণ সমস্যা সমাধানের জন্য মৃত্যুদণ্ড মূল সমাধান নয় সমাধান হলো এসব ব্যাপারে শরীয়তের নীতি ও বিধান কার্যকর করা।

ধর্ষকের শাস্তির বিষয়ে ইসলাম টাইমসকে এ আলেম বলেন, মৃত্যুদণ্ড আইন নিয়ে খুশী হওয়ার কিছু নেই। এ আইনের প্রয়োগ কেমন হয়, যথাযথ হয় না মিথ্যা প্লট সাজিয়ে, মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে নিরপরাধ লোকদের ফাঁসানোর মাধ্যম হয়, না কি আলোচিত গণধিকৃত সাজাপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষমা করে দেওয়া হয়, এসব এখনই বলা যাবে না। বিচারব্যবস্থায় ফাঁক ও পক্ষপাত থাকলে নতুন নতুন কঠোর আইনের উপকারও সমাজ পায় না।  এই আইনের ইতিবাচক দিক নেতিবাচক দিক সময়ই বলে দেবে। তবে আমি যেটা বলব, তা হল, ধর্ষকদের ক্ষেত্রে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। যদি অবিবাহিত নারীপুরুষ ব্যাভিচার করে তাহলে এর শাস্তি ১০০টি বেত্রাঘাত। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এভাবে আঘাতের মাধ্যমে ব্যক্তি যেমন সংশোধিত হয় তেমনি সমাজের আর দশটা তরুণ-তরুণীও ভয়ে সংশোধিত হয়ে যায়।

যদি বিবাহিত পুরুষ ধর্ষণ করে তাহলে তার শাস্তি পাথর মেরে হত্যা করা। বিবাহিত নারীপুরুষের ব্যাভিচারের শাস্তি জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। এটি সমাজ থেকে যৌন অপরাধ নির্মূলের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পদ্ধতিও বটে। যদি জোরপূর্বক ধর্ষণ করার পাশপাশি আরো অপরাধ এবং আইনলঙ্ঘন  করে কিংবা হত্যা করে তাহলে এর শাস্তি নির্দিষ্ট শাস্তির সাথে আরো যোগ হবে দস্যুতা, সন্ত্রাস ও ফাসাদ ফিল আরদের শাস্তি। তখন বিচারক চাইলে তাকে একবার নয় দশবার মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন। একাধিক অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি দুনিয়ায় দেওয়ার সুযোগ নেই বলেই পরকালের শাস্তি প্রয়োজন, বলেন এই আলেম।

এভাবে সব অঙ্গনে পদক্ষেপ নিলেই কেবল সম্ভব ধর্ষণ রোধ করা। ধর্ষণ-ব্যাভিচারের সব দরজা খোলা রেখে শুধু মৃত্যুদণ্ড আইন দিয়ে কখনো ধর্ষণ রোধ সম্ভব নয়।

সবকথার সারসংক্ষেপ হিসাবে মাওলানা নদবী একটি দৃষ্টান্ত টানেন। একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত টেনে মাওলানা নদবী বলেন, আপনাকে কামড় দেওয়া এডিস মশাটিকে আপনি মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন। তবে এটি সমাধান নয়। মশাকে আপনি নিরস্তিত্ব করতে পারবেন না। পৃথিবীতে আত্মরক্ষা করে সহাবস্থান করতে হলে আপনাকে একসাথে কয়েকটি কাজ করতে হবে।

মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। যে পরিবেশে মশা বেড়ে ওঠে তা নষ্ট করতে হবে। যে পাত্রে পানি জমে থাকলে মশা জন্মে সেটি সরিয়ে ফেলতে হবে।

নিজের সুরক্ষার জন্য ডোর-উইণ্ডো নেট, কয়েল, ইনসেক্টিসাইড, মশারী, জেল ইত্যাদি প্রয়োজন ও সুবিধামতো ব্যবহার করতে হবে। এতে মশা চিরদিনের জন্য স্থায়ীভাবে সম্পূর্ণ নির্মূল না হলেও অত্যাচার কমবে।

এরপর যদি এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হয় তাহলে সেটা রোগীর ভাগ্য আর প্রকৃতির নিয়ম। যা রোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু নিরস্তিত্ব পর্যায়ে নেওয়া দুস্কর।

ধর্ষণ ও যৌন অনাচার রোধেও এমনই নিয়ম-নীতির প্রয়োগ করতে হবে। নারী-পুরুষের জৈবিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রদত্ত মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেওয়া বিবাহরীতি ও যৌনবিষয়ক বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করতে হবে। এক আধটি ধর্ষক/মশাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া সামগ্রিক সমাধান নয়।

বিজ্ঞাপন