আলজেরিয়ার স্বাধীনতার অগ্রনেতা: আমির আব্দুল কাদির 

মুজিব রাহমান ।।

আলজেরিয়া। আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ উপকূলের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম। আফ্রিকা মহাদেশের বৃহত্তম ও বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম রাষ্ট্র এটি।

বিজ্ঞাপন

আলজেরিয়ার মুসলমানদের জনসংখ্যা প্রায় ৯৮ পার্সেন্ট। বাকি ২ পার্সেন্ট ইহুদী ও খৃষ্টান।

আলজেরিয়ার যেমন সুন্দর সোনালী অতীত ছিল তেমনি দীর্ঘ সময় ফরাসীদের নগ্ন থাবায় তাদের জীবন কেটেছে পরাধীনতায়।

সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিখ্যাত মুসলিম সেনাপতি ওকবা বিন নাফে-এর নেতৃত্বে সর্বপ্রথম এ অঞ্চলগুলো মুসলমানরা বিজয় করেন।

এরপর দীর্ঘকাল মুসলমানগণ এ অঞ্চলগুলোতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ সময়ে আলজেরিয়ানদের মাঝে মুসলিম সভ্যতা, সংস্কৃতি, তাহজিব-তামাদ্দুনের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটে। আলজেরিয়ানরা ইসলামী সংস্কৃতিকে এতটাই আপন করে নেন যে, একসময় তাদের প্রধান ভাষাও আরবী হয়ে যায়।

আলজেরিয়ায় মুসলমানদের এ উত্থান বহিরাগত অনেক কুচক্রই সহ্য করতে পারছিল না। তাই তারা বিভিন্ন সময় আলজেরিয়ানদের ওপর হামলা করার অপচেষ্টা করে।

১৮৩০ সালে ফ্রান্স হঠাৎ আক্রমণ করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে আলজেরিয়া দখল করে সেখানে উপনিবেশ কায়েম করে।

১৮৩০ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তারা আলজেরিয়া শাসন করে। এই একশ ত্রিশ বছর তারা আলজেরিয়ানদের ওপর এমন কোন জুলুম অত্যাচার ছিল না যা করে নি। একলক্ষ বিশ হাজার আলজেরিয়ানদের তারা অন্যায়ভাবে এই সময় হত্যা করেছিল।

আলজেরিয়ানরা এই দীর্ঘ সময়টাতে বারবার চেষ্টা করেছিল নিজেদেরকে পরাধীনতার শিকল থেকে বের করতে।

সর্বশেষ ১৯৫৪ সালে তারা তুমুল গণ আন্দোলন শুরু করে। হয়ত মরব নয়ত মারব। দ্রুত সময়ের মাঝেই তাদের এ আন্দোলন গণ বিস্ফোরণে রুপান্তির হয়। অবশেষে ১৯৬২ সালে ফরাসিদেরকে তারা পিছু হটাতে সক্ষম হয় এবং ফরাসীদের দীর্ঘ একশ ত্রিশ বছরের পরাধীনতার জিঞ্জির থেকে মুক্তি লাভ করে।

ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ানদের চুড়ান্ত লড়াই ১৯৫৪ সালে শুরু হলেও এর আগে খন্ড খন্ডভাবে বেশ কয়েকবার আলজেরিয়াবাসী তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। শুধু  তাই নয়, একদম শুরুর দিকেই অধিকাংশ অঞ্চল তারা ফরাসীদের থেকে মুক্তও করে ফেলেছিল।

ঐসময়ের আন্দোলনে যিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনিই হলেন আমির আব্দুল কাদের আলজাজায়িরি রহ.।

আলজেরীয়দেরকে ১৯ শতকের ফরাসী আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনিই জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর কবিতা আবৃত্তি ও জ্বালাময়ী বক্তৃতা নিমিষেই সাধারণ মানুষের মনে বিদ্রোহের আগুন ধরিয়ে দিত।

তিনিই  ছিলেন প্রথম আলজেরিয়ান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা।

আন্দোলনের শুরুর দিকের কথা। ১৮৩০ সালে যখন আলজেরিয়াতে ফরাসী সৈন্যরা অবতরণ আরম্ভ করে, তখনই আলজেরিয়ানরা দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফরাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সেই সময়ে সর্বপ্রথম যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি হলেন আমির মহীউদ্দীন রহ.। ঐ সময়ে তিনি আলজেরিয়ার মাস্কারা শহরের এক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক  ছিলেন। তার দ্বীনদারি ও নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে সকলে তাকে আন্দোলনের নেতা হিসেবে বরণ করে নেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এরপর  তাদের পরামর্শ সভায় নাম প্রস্তাবিত হয় তারই ছেলে আমির আব্দুল কাদির রহ. এর।  আমির আব্দুল কাদিরের সুঠাম দেহ, শারীরিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য এবং তার সামরিক গুণের কারণে আগে থেকেই আলজেরিয়ানরা তাকে পছন্দ করত। সকলেই তাকে তাদের পরবর্তী আমির হিসেবে গ্রহণে করে। এর পাঁচ দিন পর মাস্কারার গ্রেট মসজিদ থেকে আমির হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়।

ফরাসি ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ 

আমির আব্দুল কাদির নেতৃত্বে আসার পর সর্বপ্রথম তিনি জ্বালাময়ী, জ্ঞানগর্ব বক্তৃতা ও আল্লাহ প্রদত্ত সামরিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে আলজেরিয়ানদের ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছিলন। অভ্যন্তরিন কিংবা বহিরাগত কোন কুচক্র মহল যেন তাদের মাঝে ফাটল তৈরী করতে না পারে এ ব্যাপারে তিনি খুবই সোচ্চার থাকতেন।

তিনি তার সামরিক দক্ষতা, ধর্মীয়জ্ঞান ও  দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে আলজেরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলই ফরাসীদের থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হন।

তিনি আমির নিযুক্ত হওয়ার পর ১৮৩৩ সালের মে মাসে দশ হাজার সদস্যের বিশাল এক বাহিনী নিয়ে সর্বপ্রথম আক্রমণ করেন ওড়ান শহরে। তখন ওড়ান শহর ছিল ফরাসী সেনা অফিসার ডেসমিকেলস এর অধীন।ডেসমিকেলস ও তার বাহিনীকে পরাস্ত করে আমির আব্দুল কাদির ওড়ান শহরকে মুক্ত করেন।

এরপর ডেসমিকেলস তাকে সন্ধি চুক্তির প্রস্তাব দেয়। যা ইতিহাসে ‘ডেসমিকেলস ট্রিটি ‘ নামে পরিচিত। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে পুরো ওড়ান অঞ্চল আলজেরিয়ানদের অধীনে চলে আসে।

আলজেরিয়াবাসী এ সাফল্যের কারণে তাকে ঐসময় ‘কমান্ডার অফ বিলিভার্স’ অর্থাৎ ‘বিশ্বাসীদের নেতা ‘ উপাধি দিয়েছিল।

এরপর তিনি আলজেরিয়ার শহর থেকে উত্তর পশ্চিম দিকে ১৬০ কিলোমিটার দূরের মিলিয়ানা ও মাদিয়া অঞ্চলও ফরাসীদের থেকে উদ্ধার করেন।

১৮৩৫ সনের ২৮ শে জুন ২০ হাজার সেনাবাহিনী নিয়ে মেক্টা নদীর তীরে সেখানকার ফরাসী সেনা অফিসার  ক্যামিল আলফোনস ট্রাজেন্সের সাথে বিদ্রোহ করেন। ফরাসী সৈন্যরা তখন বিপুল ক্ষয়ক্ষতিসহ পরাজয় বরণ করে এবং সেখান থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে যায়।

১৮৩৭ সাল। তৎকালীন ফরাসী সেনা অফিসার থমাস রবার্ট বুগাউড আমির আব্দুল কাদিরকে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রস্তাব দেন। যা ইতিহাসে ‘তাফনার চুক্তি ‘ নামে পরিচিত।

তখন তারা একরকম বাধ্য হয়েই এই চুক্তির মাধ্যমে আমির আব্দুল কাদিরকে তাদের আলজেরিয়ার সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেয়। যার ফলশ্রুতিতে ওড়ান, তিটারি প্রদেশসহ আরো বেশ কিছু অঞ্চল তার অধীনে চলে আসে। তখন ফরাসীদের ছিল মাত্র কয়েকটি বন্দর। এই কয়েকটি বন্দর নিয়েই তখন তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।

অধিকাংশ অঞ্চল  আলজেরিয়ানদের কাছে চলে আসার পর আব্দুল কাদের আলজেরিয়াকে পুনরায় পূর্ণ রাষ্ট্রের কাঠামোতে দাঁড় করিয়েছিলেন। যার রাজধানী ছিল কখনো মাস্কারা শহর আর কখনো টায়ারেটের দুর্গ। (বর্তমান নাম ট্যাগডেম্পট।)

রাষ্ট্র গঠনের পরপরই তিনি উপজাতিদেরকে সাথে নিয়ে  দুই হাজার সদস্যের একটি  শক্তিশালি সেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছিলেন।

এ বাহিনীর মাধ্যমে তিনি আলজেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলো যেমন সেবুডু, সওদা, টায়ারেট ও বোগার সহ আরো বেশকিছু শহর সুরক্ষিত করেছিলেন। এ শহরগুলোতেই তিনি রাষ্ট্রীয় অস্ত্রগুদাম ও খাদ্যগুদাম তৈরী করেছিলেন।

তিনি খুব অল্প সময়ের মাঝেই তার নতুন একটি প্রশাসন গঠন করতে পেরেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম যে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তন্মধ্যে শিক্ষার প্রচার-প্রসার ছিল অন্যতম।

এছাড়াও তিনি জায়শে মুহাম্মদ নামে একটি সেনাদলও গঠন করেন। যেখানে প্রাথমিকভাবে আটহাজার সৈন্য, দুই হাজার অশ্বারোহী, দুই হাজার দুইশ চল্লিশটি হালকা কামান ও দুইশ ভারি কামান ছিল।

তিনিই প্রথম নেতা ছিলেন যিনি আলজেরিয়ার আধুনিক ইতিহাসে একটি জাতীয় সেনাদল তৈরী করেছিলেন।

নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর চেলিফ উপত্যকা, মরু অঞ্চল ও তিটারির পূর্ব প্রদেশের সীমানা পর্যন্ত তার রাষ্ট্রীয় প্রভাবকে তিনি বিস্তৃত করেছিলেন।

আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে ১৮৩৪ সালে তিনি মুহাম্মাদিয়া নামে নিজস্ব মুদ্রাও তৈরী করেন।

 

১৮৩৯ সালের ১৫ই অক্টোবর। ফরাসী বাহিনী তাফনা সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে  মিতিদজা অঞ্চলে উপনিবেশ কায়েম করতে চেয়েছিল। তখন আব্দুল কাদির তাদের ওপর আক্রমণ করে।

এরপর ১৮৩৯ সালের ১৮ নভেম্বর ফরাসিরা আব্দুল কাদিরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করে।

তখন ফরাসীরা আলজেরিয়ানদের ওপর ব্যাপক আক্রমণ করে এবং আলজেরিয়াকে নরকে পরিণত করে। অবশেষে  ১৮৪৭ সালের ২১ ডিসেম্বর আব্দুল কাদির বাধ্য হয়ে তাকে আলেকজেন্দ্রিয়া বা একরিতে চলে যেতে দিতে হবে- এ শর্ত সাপেক্ষে ফরাসীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

ঐ সময় তারা তার এ শর্ত মেনে নিলেও পরবর্তীতে তা অস্বীকার করে তার পরিবার ও তার অনুসারীদেরকে সহ তাকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দিয়েছিল। প্রথমে ফ্রান্সের টলন শহরের ফোর্ট লামালগুতে ও পাউতে পাঠিয়েছিল।পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে তাদের সবাইকে এম্বয়েজ রাজ্যে স্থানান্তর করে।

সেখানে তার ও তার অনুসারীদের স্বাস্থের অবনতি দেখা দিলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল থেকে চাপ আসার পর তাকে ১৮৫২ সালের ১৬ অক্টোবর কিছু শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর  তিনি ১৮৫৫ সালে  আলজেরিয়া থেকে দামেস্কে চলে আসেন। সেখানে নিজেকে ধর্ম ও দর্শন চর্চায় নিবেদিত রাখেন। তখন তিনি দ্যা এরাবিয়ান হর্স সহ আরো বেশ কিছু বই রচনা করেন।

ব্যক্তিজীবন

আমির আব্দুল কাদিরের রহ. এর পূর্ণ নাম ইমাম আব্দুল কাদির আলজাজায়িরী ইবনে মহিউদ্দিন আলহাসান।

১৮০৮ সনের সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখে মাস্কারা শহরের গুয়েতনা নামক গ্রামের এক ধর্মীয় আভিজাত পরিবারে তাঁর জন্ম। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন হযরত হাসান রাযি. এর বংশধর।

পাঁচ বৎসর বয়স থেকেই তিনি যে কোন কিছু সহজেই পড়তে ও লেখতে পারতেন। ১৪ বৎসর বয়সেই তিনি সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্ত করেন। এরপর ওড়ান প্রদেশে গিয়ে ধর্মতত্ত্ব, আইনশাস্ত্র, সামরিকবিদ্যা ও  ব্যাকরণ বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

১৮২৫ সালে তিনি তার বাবার সাথে হজ্জ্ব পালন করতে যান। সেখানে ইমাম শামিলের সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়।তখন তাঁদের মাঝে আলজেরিয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত কথাবার্তা হয়।

তিনি দামেস্কে চলে আসার পর ১৮৬০ সনে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি হাজার হাজার খ্রিস্টানকে গণহত্যার হাত থেকে বাঁচাতে সহায়তা করেছিলেন। তাঁর এ অবদানের জন্য তৎকালীন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন তাঁর প্রশংসা করেছিলেন।

১৮৮৩ সালে তিনি যখন মারা যান তখন নিউইয়র্ক টাইমস তাকে শতাব্দীর কয়েকজন মহামানবদের একজন হিসাবে অভিহিত করেছিল।

শুধু তাই নয় যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া রাজ্যের কিছু মানুষ তার বিপ্লবী জীবন সম্পর্কে জানতে পেরে তার স্মৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে তার নামের সাথে মিল রেখে তাদের একটি গ্রামের নাম রাখে ‘আলকাদের।’

অল্প সময়ের মাঝে আমির আবদুল কাদের রহ. আলজেরিয়াকে যেভাবে ফরাসীদের থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং দ্রুত আলজেরিয়াকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে দাঁড় করিয়েছিলেন তা স্মরণ করে আলজেরিয়াবাসী আজও বিস্ময়বোধ করে।

আজও আলজেরিয়াবাসী তাদের এ মহান নায়ককে খুব শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করে। আলজেরিয়ায় ছোট বড় এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে তাদের এ মহান নায়কের নাম জানে না।

বিজ্ঞাপন