‘হুযুরের জীবনের শেষ বছরগুলো নিয়ে লম্বা গবেষণা হতে পারে’

(গত ২৯ মুহাররম ১৪৪২ হি. মোতাবেক ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ঈ. তারিখে ইন্তেকাল করেন দেশের শ্রদ্ধাভাজন শীর্ষ আলেমে দ্বীন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক আমীর, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ ও আল হাইয়াতুল উলইয়ার প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক সদরে মুহতামিম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.। সন্দেহ নেই, তাঁর ইন্তেকাল দেশ ও জাতির জন্য অনেক বড় শূন্যতা। হযরতের যৌবনকাল থেকে নিয়ে ইন্তেকাল পর্যন্ত বর্ণাঢ্য জীবনের নানান দিক নিয়ে ইসলাম টাইমসকে স্মৃতিচারণমূলক সাক্ষাতকার দিয়েছেন তারই ছাত্র, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার রঈস, মাসিক আলকাউসারের সম্পাদক, ফেইথ মিডিয়া কর্পোরেশনের চেয়ার‌ম্যান এবং ইসলাম টাইমসের প্রকাশক মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ। সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন মাওলানা সাইফুল ইসলাম।

এখানে প্রথম পর্বটি পাঠকবৃন্দের সামনে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাতকারের দ্বিতীয় পর্বে হযরত আহমদ শফী সাহেব হুযুরের ইন্তেকালের পূর্বে শেষ সময়ের কিছু বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। ২য় পর্ব পড়ুন: ‘জাতীয় দ্বীনী নেতৃত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমরা আরো ভেবে দেখতে পারি’)

বিজ্ঞাপন

ইসলাম টাইমস: আল্লামা আহমদ শফী সাহেব হুযুর রহ.- কে নিয়ে আপনার স্মৃতিচারণ আমরা শুনতে চাই।

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: স্মৃতিচারণ বলতে কি, এটা তো ওস্তাদ-শাগরিদ সম্পর্কের স্মৃতি। হুযুরের কাছে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সুনানুন নাসাঈ, শামায়েলে তিরমিযী- এ দুই কিতাব হুযুর পড়াতেন। যারা নিয়মিত হুযুরের দরসে অংশগ্রহণ করত আমি তাদের মধ্যে ছিলাম। হাটহাজারী মাদরাসায় দাওরার জামাতে ছেলেরা তখন সব হুযুরের দরসে সমানভাবে অংশগ্রহণ করত না, এখন করে কিনা আমি জানি না। সব ছেলে সব দরসে আগে যেত না। শুধু হযরত মাওলানা আবদুল আযীযের দরসে নিয়মিত সব ছাত্র উপস্থিত হতো। মাওলানা আবদুল আযীয সাহেব শাইখুল হাদীস ছিলেন। বুখারী-তিরমিযী দুটিই তিনি পড়াতেন। আমি সকল উস্তাদের দরসেই শরীক হতাম। আহমদ শফী সাহেব হুযুরের সব দরসেও বসতাম। তো হুযুরের কাছে সরাসরি পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। হুযুর তখন শক্ত-সবল ছিলেন।

ঐসময়ে হুযুরের মাদরাসার বাইরেও জনপ্রিয়তা ছিল। সময়টা তখন ১৯৮৪ সন। চট্টগ্রাম শহর ও উপজেলাগুলোতে হুযুর নিয়মিত দ্বীনী মাহফিল করতেন। চট্টগ্রামে তখন তো বাড়ি বাড়ি মাহফিল করার রেওয়াজ ছিল। বাড়ি-বাড়ি, মহল্লাভিত্তিক ওয়াজ-মাহফিল হতো। হুযুর একজন জনপ্রিয় ওয়ায়েজ তখনই ছিলেন।

হাটহাজারী মাদরাসায় তখন যারা মোটামুটি শুদ্ধ কথা বলতেন, চিটাগাংয়ের সুরে হোক- তার মধ্যে আহমদ শফী সাহেব হুযুর অন্যতম ছিলেন। হুযুর শুদ্ধ বলতে পারতেন। অনেক হুযুরই কিন্তু শুদ্ধ কথা বলতে পারতেন না। কোনো হুযুর উর্দুতে তাকরীর করতেন আর কোনো হুযুর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তাকরীর করতেন। আহমদ শফী সাহেব হুযুরও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা বলতেন, কিন্তু হুযুর শুদ্ধ বলতে পারতেন। কোনো ওয়াজ-মাহফিলে গেলে চট্টগ্রামের ভাষায়ও ওয়াজ করতেন আবার যেখানে শুদ্ধ ভাষা বলা দরকার সেখানে শুদ্ধ ভাষায়ও কথা বলতেন।

তিনি আরেকটা বিষয়ের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। সেটা হচ্ছে মুনাযারা। যেহেতু চিটাগাংয়ে বেদআতীদের খুব প্রভাব এবং শিরকী-বেদআতীদের খুব দাপট, হুযুর তাদের বিরুদ্ধে কড়া মুনাযির ছিলেন। উনার বইপত্রও ছিল। তখনই উর্দু ভাষায় ইলমে গায়ব ইত্যাদি বিষয়ে বই ছিল তাঁর। এসব বিষয়ে হুযুরের সুনাম তখনই ছিল। একারণেই বেদআতীরা এখনও তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর। গালমন্দ, খারাপ ভাষা তারা ব্যবহার করে। তো মাজারপন্থী লোকেরা তো হুযুরের প্রতি রেগে থাকবেই, উনি মুহতামিম হওয়ার পরে ওদের বিরোধী হয়েছেন এমন নয়- অনেক আগে থেকেই ওদের বিরুদ্ধে মুনাযির হিসেবে মজবুত ছিলেন।

ইসলাম টাইমস: হুযুরের পড়ানোর আন্দায কেমন ছিল?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: হুযুরের পড়ানোর একটা ভিন্ন আন্দায ছিল। হুযুর যেটা করতেন সেটা হলো, শরাহ-শুরুহাত নিয়ে দরসে আসতেন। একটা দুটো শরাহ নিয়ে আসতেন, কিতাব নিয়ে আসতেন। অথবা খাতা নিয়ে আসতেন। হুযুরের কাছে খাতা থাকত। এনে হুযুর সেটা দেখে বলতেন- ‘এডে একখান্ জরুরি খতা আছে, লেখো, লেখো’। হুযুর ইমলা করাতেন। হয়ত শরাহ দেখে ইবারতটা বলতেন। নয়ত খাতা দেখে বলতেন তাকরীরটা। সেটা ছেলেরা লেখত। এই দরসে লেখানোর এ রেওয়াজ ছিল। এটা ছিল অন্য হুযুরদের চেয়ে হুযুরের পড়ানোর ভিন্ন আন্দায।

ইসলাম টাইমস: হুযুরকে নিয়ে ঢাকায় আপনার কোনো স্মৃতি?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: ঢাকায় যখন আমি তাদরীসের কাজে জড়িত হই তখনো হুযুরের সাথে ঢাকায় দুয়েকটা স্মৃতি আছে। একটা স্মৃতি আমাদের গ্রামের। আমরা যখন দেশের বাইরে পড়াশোনা করি তখনই হুযুর হাটহজারীর মুহতামিম হন। দেশে ফিরে আসার পর একবার আমাদের গ্রামের পাশে জনতা বাজার মাদরাসায় মাহফিল হলো। হুযুর সেখানে আসলেন। আমি সেদিন বাড়িতে ছিলাম। আমি হুযুরের নামে একটা তাহনিয়াতনামা লিখি, উর্দুতে। ওটা আমার ভগ্নিপতি মুফতী সাঈদ আহমদ- উনি তখন সাভার রাজ-ফুলবাড়িয়া মাদরাসার মুদাররিস, তার কণ্ঠস্বর খুব সুন্দর ছিল- তিনি সেটা মাহফিলে পড়ে শুনিয়েছিলেন। আমিও সেই মঞ্চে ছিলাম।

তখন হুযুর একটি কথা বেশি বেশি বলতেন যে, আমি গত ১০০ বছরের ফারেগ ছাত্রদের পাগড়ি দিতে চাই। হাটহাজারী মাদরাসায় হুযুর সদ সালা করেছেন, ফারেগদের পাগড়ি দিয়েছেন।

আরেকটা স্মৃতি ঢাকার। হুযুর তো আগে থেকেই পরিচিত। ঢাকায় আসতেনও। ১৯৯০ এর পরের কথা। তখন ঢাকার মাদরাসাগুলোতে উপরের দিকের মুদাররিস হাটহাজারীর ফারেগ কারা কারা আছে। তখন কিন্তু হাটহাজারী পড়ুয়া আলেমের সংখ্যা ঢাকাতে কম ছিল। ঢাকায় তখন এত মাদরাসাও হয়নি। এখন সেটা বোঝা যাবে না। তখন তো মাত্র দুটো কেন্দ্র ছিল। একটা হলো লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, ফরিদাবাদের সাইট। আরেকটা হলো মালিবাগ কেন্দ্রিক। এ দুটো ধারা ছিল ঢাকায়।

তখন কেউ কেউ উদ্যোগ নিল, হাটহাজারী পড়ুয়া উপরের দিকের মুদাররিস যারা ঢাকায় আছে তাদেরকে একত্রিত করার। এরকম দু-তিনটি বৈঠকে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেখানে আহমদ শফী সাহেব হুযুর আসতেন। পীরজঙ্গীমাজার মাদরাসাসহ আরো একটি মাদরাসায় এ বৈঠক হয়। উদ্দেশ্য ছিল হাটহাজারীর ফারেগীনদেরকে সংগঠিত করা। সেখানে হুযুর নসীহত করতেন। সম্ভবত ২০/২৫ জন লোক সেখানে জমা হত। একবছরের মধ্যে কয়েকবার হয়েছিল এমন মজলিস। পরে আর এটা অগ্রসর হয়নি।

ইসলাম টাইমস: হুযুরের জাতীয় পরিচিতি ও জাতির ওপর হুযুরের অবদান প্রসঙ্গে কিছু বলুন।

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: এক্ষেত্রে বড় দুটি সূত্র রয়েছে। দুটোকে আপনি আলাদা করে দেখতে পারেন। একটা হলো, হাটহাজারী মাদরাসার বেফাকে যোগ দেওয়া। হাটহাজারী মাদরাসা বেফাকে যোগ দেওয়ার কারণেই হুযুরও বেফাকের প্রধান হন। সম্ভবত সময়টা ২০০৫- এর পরে। মাওলানা নূরুদ্দীন গহরপুরী সাহেবের ইন্তেকালের পরে। হাটহাজারী মাদরাসা কিন্তু আগে থেকে বেফাকে ছিল না। লালবাগ মাদরাসা, যাত্রাবাড়ী মাদরাসাও ছিল না। তখন বেফাক হাটহাজারীর জন্য সুযোগ করে দিয়েছে অন্তত দাওরায় শামিল হওয়ার।

হাটহাজারী মাদরাসা যুক্ত হওয়ার আরো আগে মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী সাহেব একবার বেফাকের প্রধান হন। কারণ কওমী মাদরাসার দ্বিতীয় প্রধান বোর্ড হলো ইত্তেহাদুল মাদারিস। বেফাকের পরেই তাদের মাদরাসার সংখ্যা বেশি। ওটা পটিয়া মাদরাসা কেন্দ্রিক বোর্ড। মাওলানা হারুন সাহেব দেশে এসে চাইলেন, দুই বোর্ড এক হোক। তার উদ্যোগে দাওরায়ে হাদীস জামাতে ইত্তেহাদ আর বেফাকে একত্র হয়।

(মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী বড় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। খেদমতের প্রথম যুগে দেশে বিভিন্ন দ্বীনী, তাহকীকী কাজ করার পর এক সময় বহু বছর আবুধাবি ছিলেন। শেষের দিকে আবার দেশে চলে আসেন। হযরত হাজী ইউনুস সাহেবের ইন্তেকালের আগে তাকে পটিয়ার যিম্মাদারি দিয়ে গেছেন। তার যিন্দেগীর শেষ কিছু বছর পটিয়ার যিম্মাদার ছিলেন। বেফাক-ইত্তেহাদ উভয় বোর্ডের সদর ছিলেন।)

তখনও হাটহাজারী মাদরাসা বেফাকে ছিল না। হাটহাজারী মাদরাসা যোগ দেওয়ার পর আহমদ শফী সাহেব হুযুর বেফাকের প্রধান হন। এটাও ইতিহাসের অংশ। এভাবেই সারা বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার নেতৃত্বের নীরব চেয়ারে হুযুর আসীন হন। এর আগে ঢাকার বড় বড় ব্যক্তিত্বরা ছিলেন। শাইখুল হাদীস মাওলানা আযীযুল হক সাহেব, বিবাড়িয়ার মুফাসসির সাহেব, খতীব মাওলানা ওবায়দুল হক সাহেবসহ আরো অনেক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হুযুরও হাটহাজারী মাদরাসা কেন্দ্রিক দায়িত্বেই ছিলেন। তবে এসব জাতীয় পর্যায়ের বিষয়গুলো ঢাকার দিকের আলেমরা দেখতেন।

হুযুর বেফাকের প্রধান হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসেন। হাটহাজারী মাদরাসা দেশের প্রাচীন এবং বেশিসংখ্যক ছাত্রের মাদরাসা হওয়ায় সে প্রতিষ্ঠানের প্রভাব তো পুরো দেশে সব সময়ে রয়েছে।

ইসলাম টাইমস: হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলবেন, হুযুর যখন হেফাজতের আমীর হলেন তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে।

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: তখন একটা বড় ক্রান্তিকাল ছিল। রাজনৈতিকভাবে আমাদের মুরুব্বীরা এবং আমাদের দেশে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আসলে কখনো স্থিতিশীলভাবে টিকে থাকতে পারেনি। মজবুত কিছু করার আগেই ইখতেলাফ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি বহু কথাই ঠিক। কিন্তু এতদসত্তেও, মুরুব্বিদের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। খতীবে আযম সিদ্দীক আহমদ সাহেব ছিলেন, হাফেজ্জী হুযুর, শাইখুল হাদীস সাহেব, আমীনী সাহেবরা ছিলেন। একেক জন একেক সময়ে ছিলেন। ইসলামি হুকুমতের কথা অনেক পরের হিসাব। কিন্তু সময়ে সময়ে ময়দানি কাজে ইসলাম বিদ্বেষীদের উস্কানিগুলোর জবাবে জাগরণ তৈরি করা, হুমকি দেওয়া, হুংকার দেওয়া, এগুলো করার জন্য যেসব মুরুব্বি ছিলেন তারা সবাই বিদায় নিয়ে গেছেন। এমনই এক সময়ে দেখা গেছে যে, পুরান একটা গোষ্ঠী আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা এটার জন্য উপযুক্ত সময় বাছাই করেছে ওই সময়টাকে। যারা পূর্বের ইতিহাস জানে না তাদের এখনকার পরিস্থিতিতে বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।

এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, বরাবরই ইসলাম বিরোধী অপতৎপরতার জন্য ওরা সময় বাছাই করে নিতে। একটা সময় ইসলাম বিদ্বেষীরা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কে বাছাই করেছে। তারা মনে করেছে, তাদের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একই কাজ তারা ছিয়ানব্বই পরবর্তী সরকারের সময় করেছে। ১৯৯৬ পরবর্তী সরকার যখন এসেছে ওই গোষ্ঠী আবার তৎপর হয়েছে। কিছু কাজ তারা সরকারকে দিয়ে করিয়েছে, কিছু তারা নিজেরা করেছে। আলেম-ওলামা, দেশের মাদারিস, দ্বীনদার শ্রেণির বিরুদ্ধে বিষোদগার করা, এদের নানাভাবে লাঞ্ছিত করা- এসব কাজ তারা করেছে। সে কাজেই আবার তারা যখন সুযোগ পেয়েছে ২০১১/১২ সনের পরে, তারা মনে করেছে, এখনই আমাদের উপযুক্ত সময়। তারা তখন নতুন করে মনে করেছিল, তাদের এখন স্বর্গরাজ্য হয়েছে। কিছু ব্লগার, ইসলামবিদ্বেষী, নাস্তিক এই অপতৎপরতায় নেমে পড়ে। তারা যাচ্ছে তাই ইসলামের বিরুদ্ধে, ইসলামের মহান মনীষীদের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু দেখা গেল, প্রতিবাদে সাড়া দেওয়া তো দূরের কথা, ওদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা ও রাজপথ দখল করা হয়েছে। পুরো বাংলাদেশের সবচে বড় জেনারেল বিদ্যাপিঠের সামনে নিয়মিত ইসলাম বিদ্বেষী আয়োজন চলেছে। মনে হয়েছে, ইসলামপন্থী লোকেরা একটা কোণঠাসা অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এমনই এক সময়ে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব হয়।

এই সময়ে হেফাজতে ইসলামের আমীরের পদ হুযুরের কাছে যায়। আমি বলেছি, এটা ছিল একটা জাতির ক্রান্তিলগ্ন। এখনকার বাংলাদেশ দেখে ঐসময়কার অবস্থা অনুভব করাটা- যারা ঐসময় বুঝের হয়ে উঠেনি তাদের জন্য কঠিন।

এমনও দেখা গেছে, ইসলাম বিদ্বেষী কাউকে কেউ একজন আবেগের বশবর্তী হয়ে মেরে ফেলেছে। সংসদের অধিবেশনে দাঁড়িয়ে ওকে কেউ দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ খেতাব দিয়ে দিয়েছেন। পরিস্থিতিটা এত জটিল ছিল। এমন এক সময়ে হেফাজতের আবির্ভাব হয়, আন্দোলন হয়। বলতে দ্বিধা নেই, সে আন্দোলনে সাধারণ জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। যেটা ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণভাবে করতে পারেনি। ইসলামি দলগুলোর সভায় সাধারণত দেখা যায়, মাদারিসের লোকজনই বেশি থাকে। সাধারণ জনগণ কম থাকে। অনেক সময় একেবারেই কম থাকে। কিন্তু সেই আন্দোলনে মানুষ ব্যাপক অংশগ্রহণ করেছে। কারণ, সাধারণ মানুষই বিরক্ত ছিল ওদের ধর্মবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের কারণে। আল্লাহ তাআলা সেটার নেতৃত্ব হুযুরকে দান করেছিলেন। দেশের মানুষও শান্তির নিশ্বাস নিয়েছে যে, একজন বর্ষীয়ান আলেমে দ্বীন, বড় একজন ব্যক্তিত্ব, হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম এ পদে আছেন।

ইসলাম টাইমস: হেফাজতে ইসলামের ক্রমাগ্রসরতা ও এর সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আপনি কিছু বলবেন কিনা?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: এটার মূল্যায়ন বড় ব্যক্তিত্বরা করবেন। আমি একজন নগন্য মানুষ। আমি এ আন্দোলনের একজন দর্শক-সমর্থক মাত্র। আমি মনে করি, হেফাজতের দুটি দিক নিয়ে ভাবা যায়। এক হলো, ২০১৩ এর ৫ মের আগে। আরেকটি ৫ মের পরে।

৫ মের আগের ঘটনাবলি যদি আমরা ধরি তাহলে দেখব এর সাফল্যই সাফল্য। এ সাফল্য এমন যে, এটা নিয়ে লম্বা গবেষণা হতে পারে। পিএইচডি থিসিস হতে পারে। বাংলাদেশে তখনকার এই আন্দোলন পরিষ্কার করে দিয়েছে, একটা গোষ্ঠী বুঝে ফেলেছে, দেশের বড় বড় পত্র-পত্রিকা যারা এখন হিসাব করে কথা বলে, তারা এবং নাস্তিকমার্কা লোকেরা তারা বুঝে ফেলেছে যে, এদেশে ইসলাম নিয়ে হেলাফেলা করা এত সহজ নয়। এদেশে উল্টো কিছু করলে সমস্যা আছে। শুধু তারাই বুঝেনি, বরং আমি মনে করব, যারা বড় ক্ষমতাধর তারাও এটা বুঝেছে। একই কারণে পরবর্তী সময়ে তাদেরও পলিসিতে পরিবর্তন এসেছে।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি। প্রথমে বলব, ইসলাম বিদ্বেষী প্রত্যেক গোষ্ঠীর এটা অনুধাবন হয়েছে। এটাকে আমরা সাফল্য ধরতে পারি। ইসলামী শক্তির রোব, প্রভাব বলতে পাারি। মানুষের ঈমানি জাগরণের কত প্রভাব এটা অন্তত দেখা গেছে। এটা অন্যদের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করেছে। দেশি-বিদেশি ইসলামবিরোধী শক্তি তাদের সামর্থের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অনুভব করতে পেরেছে। শাহবাগ কেন্দ্রিক কথিত আন্দোলনও মাঠে মারা গেছে। ওরা তো পাত্তাই পায়নি।

এদিক থেকে তো এটা বড় অর্জন ছিল। মানুষের মনে বড় আশা জেগেছিল। বিশেষ করে দ্বীনদার শ্রেণির লোক, আলেম-ওলামারা অনেক দিন পরে একটু চাঙা হয়ে উঠেছিলেন।

আর হেফাজতের দ্বিতীয় যুগ হচ্ছে, ৫ মে পরবর্তী হেফাজত। এটা একটা বড় ট্রাজেডি। একটা বিপদ ঘটে গেছে। বলতে গেলে একটি জিনিসের আসমান থেকে জমিনে পড়ে যাওয়ার মতো। এরকম ঘটনা ঘটেছে ৫ মে পরবর্তী সময়ে। যতটুকু উপরে উঠেছিল ততটুকু নিচে পড়ে গেছে ৫ মের পর। অনেকের কাছে বিষয়টি এমনই। কউে ভিন্নভাবেও মূল্যায়ন করতে পারেন। তবে যারা ৫ মে সময়ের সাক্ষী, যারা তখন থেকে আগে-পরের পরিস্থিতি দেখেছে, তাদের মূল্যায়ন হয়ত এমনই হবে।

ইসলাম টাইমস: ৫ মের পরবর্তী সময়ের হেফাজতকে কেন আপনি এভাবে মূল্যায়ন করছেন?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: ৫ মের ট্রাজেডির কথা তো কমবেশি সবারই জানা থাকার কথা, কী হয়েছিল সেদিন, কাদের গাফলতি বা মতলব ছিল- এসব নিয়ে আমি আজ কিছু বলতে চাই না। তবে ৫ মে পরবর্তী সময়কে এভাবে মূল্যায়ন করছি এজন্য যে, ৫ মের আগের হেফাজতে ইসলাম ইসলাম বিদ্বেষী সবার জন্য আতংক। যারা প্রকাশ্যে ধর্ম অবমাননা করত তাদের জন্য আতংক। সে যত ক্ষমতাসীনই হোক, সে দেশি শক্তি বা বিদেশী শক্তিই হোক, সবার জন্যই ছিল আতংক। কিন্তু ৫ মে পরবর্তী হেফাজতের ক্ষেত্রে দেখা গেল, সেটা বিপরীত দিকের সকলের কাছে সহনীয়। ৫ মে পরবর্তী হেফাজতের ব্যাপারে তখন মন্ত্রীরা বলা শুরু করলেন যে, হেফাজত আমাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। এর পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বাস্তবেও তাই দেখা গেল।

এদিকে প্রভাবশালীরা একটা পলিসি গ্রহণ করল। সে পলিসি অনুযায়ী হেফাজতকে তারা ভাঙল না। সাধারণত এরকম দলকে ষড়যন্ত্র করে ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে ভাঙা না হলেও কার্যত ভেঙে দেওয়া হলো। হেফাজতের আমীরকে দেখানো হলো যে, তিনি সরকারের ঘনিষ্ঠ। আর হেফাজতের মহাসচিবকে দেখানো হলো, উনি সরকারের বিপক্ষে। একজনকে বন্দি করা হলো না। আরেকজনকে বন্দি করা হলো। একজনকে সম্মানের সাথে বিদায় করে চট্টগ্রামে পৌঁছে দেওয়া হলো। এমন একটা পলিসি তৈরি করল প্রভাবশালীরা যে, দলটি কার্যক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত হলো। ফলে কার্যকারিতাটা থেমে গেল। আপনি বলুন, ২০১৩ সনের পরবর্তীতে হেফাজত আর বড় কোনো কার্যক্রম করতে পেরেছে?

ইসলাম টাইমস: এমনিতে তো ২০১৩ সনের ৫ মের পরেও সরকারের মধ্যে হেফাজতের একটা প্রভাব ছিল। যেমন আমরা দেখেছি যে, হেফাজতের দাবির কারণে সরকার পাঠ্য সিলেবাসে ইসলাম পরিপন্থী বিষয়গুলো সংশোধন করেছে। একইভাবে হাইকোর্ট চত্ত্বরে যে নারীমূর্তিটা বসানো হয়েছিল, সেটাও আন্দোলনের মুখে সরকার সরিয়ে দিয়েছে।

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: এগুলোও ৫ মের পূর্বের হেফাজতের সাফল্য। একবার তো তারা হেফাজতকে ভয় পেয়েছে। এরপর এখন যেই যেই জায়গায় সরকার মনে করেছে যে, এদেরকে আর ক্ষেপানোর দরকার নেই, সেখানে তারা এধরনের পদক্ষেপ করেছে। এটা হেফাজতের পুরাতন সাফল্য। পুরাতন সাফল্যটাই সামনে আরো কাজে দিয়েছে। এবং এখনো যে হেফাজতকে গণনা করা হচ্ছে এটাও ৫ মের পূর্ববর্তী হেফাজতের প্রভাবের কারণে। ৫ মের পরবর্তী হেফাজতকে ভয় পাবার দৃশ্যত কোনো কারণ নেই।

আগের হেফাতকে ভয় পাওয়ার কারণেই আহমদ শফী সাহেব হুযুরের ইন্তেকালের পর বামপন্থী মিডিয়াসহ একশ্রেণির রাজনীতিবিদদের হেফাজতের প্রতি আগ্রহ-কৌতুহল দেখা গেছে। তাদের আগ্রহ এজন্য যে, তারা ওই আগের হেফাজত নিয়ে চিন্তিত। তারা মনে করেছে, ৫ মের পরবর্তী সময়ে তো হেফাজতকে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। হেফাজত পরে আর বড় কোনো কিছু করেনি। এখন হেফাজতের কোন্ নেতা এসে আবার কী ঘটিয়ে দেয়। এজন্য তাদের যত ভয়।

আমার এই বিশ্লেষণের সাথে কারো ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু আমি যেটা মনে করি যে, ৫ মের পরে হেফাজত তার আবেদন হারিয়ে ফেলেছে। তার ইমেজ হারিয়ে ফেলেছে। যে কোনো আন্দোলনের একটা ইমেজ বা ভাবমূর্তি থাকে। সেটা হারিয়ে গেছে। কারণ, কোনো একটা সংস্থা বা সংগঠন যে কোনো সরকারই দেশে থাকুক বিএনপি-আওয়ামীলীগ যারাই ক্ষমতায় থাকুক- যদি তার ঘনিষ্ঠ বলে প্রচার পেয়ে যায়, তখন তার আর সে ভাবমূর্তি থাকে না। একজন বুদ্ধিজীবীও যদি প্রচার পেয়ে যান যে, তিনি বিএনপি ঘনিষ্ঠ বা আওয়ামীপন্থী, তখন যে বুদ্ধিজীবীর ব্যাপারে এজাতীয় প্রচার নেই, আর যার ব্যাপারে দলীয় প্রচার আছে- দু’জনের ভাবমূর্তিতে অনেক পার্থক্য হয়ে যায়। যদিও সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির জ্ঞান-গরিমা অনেক থাকুক, তারপরও তার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তো হেফাজতের ওপর সরকার ঘনিষ্ঠতার একটা দাগ লেগে গেছে।

ইসলাম টাইমস: তাহলে আপনি কি মনে করেন যে, সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়া একটা সমস্যা? আপনি কি মনে করেন যে, সরকারের সাথে ঝগড়া করতে হবে বা বিরোধ থাকতে হবে আলেমদের?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: না আমি এরকম মনে করি না। আমি বিরোধ থাকা দরকার মনে করি না সরকারের সাথে। যদি আপনি বলেন, দেশে ইসলামী শাসন না থাকার কারণে বিরোধ, ইনসাফ না থাকার বিরোধ, তো সেটা তো স্বীকৃত কথা। যে দলই সরকারে আসুক সে তো ইসলামী শাসন কায়েম করবেই না। সেটা তো ভিন্ন হিসাব।

আর যদি বলেন, সরকারের সাথে সবসময় আমরা ঝগড়া করব কিনা, বিনা কারণে লেগে থাকব কিনা, তো আমি এটার পক্ষে না যে, সরকারের সাথে ঝগড়া করতে হবে, লেগে থাকতে হবে, এটার দরকার নেই। বিরুদ্ধে লেগেও থাকার দরকার নেই। আবার আমাদের সালাফের রীতি চলে আসছে যে, সরকার ঘনিষ্ঠ তারা হতে চাননি। যুগ যুগ থেকেই তারা সরকারের ঘনিষ্ঠতার দাগ তাদের গায়ে লাগাতে চাননি। এমনকি যখন ইসলামি শাসন ছিল, ক্ষমতায় ছিলেন স্বয়ং আমিরুল মুমিনীনরা, তখনও আমাদের পূর্বসূরী ওলামায়ে কেরাম সরকার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন।

যখন কোনো সংস্থা বা ফোরাম ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়, তখন তার অসুবিধার দিক হলো, তার চোখের লাজ তৈরি হয়, মুখের লাজ তৈরি হয়। তখন সে অনেক কিছুই করতে পারে না। চাইলেও সে সরকারের মন্দ কাজকর্মের ঠিক ওই প্রতিবাদটা করতে পারে না যেটা সে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত করতে পেরেছে। এজন্য বৈরিতারও দরকার নেই, ঘনিষ্ঠতারও দরকার নেই।

ইসলাম টাইমস: হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর একটি অভিমত ছিল এরকম যে, আমাদের এ উপমহাদেশে সরকারকে শুরুতেই শত্রু বানিয়ে ফেলা হয়। তিনি এক্ষেত্রে হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহ.-এর কর্মপন্থা অনুসরণের অভিমত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহ. ভারতবর্ষের ক্ষমতাসীন বাদশাহ আকবরের ওপর মেহনত করেছিলেন। এরপর আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীরের ওপরও মেহনত করেছিলেন। যার চূড়ান্ত সুফল দেখা গিয়েছিল জাহাঙ্গীরের বংশধর বাদশাহ আলমগীরের মাধ্যমে। মুজাদ্দিদ র.-এর মেহনতের বদৌলতে বাদশাহ আলমগীরের মতো আল্লাহওয়ালা শাসক ভারতবর্ষের ক্ষমতায় এসেছিলেন। তো এই কর্মপন্থার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: দেখতে হবে- সেই মেহনতটা কেমন ছিল? তার রূপরেখা কী ছিল? সেটা কি সরকার ঘনিষ্ঠ মেহনত ছিল? ঘনিষ্ঠতা যেটাকে বলে সেটা কি করেছিলেন মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহ.? তিনি কি বাদশাহ আকবরের ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন? নাকি তার কাছে গিয়ে তাকে নসীহত করেছিলেন। দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন। তার মেহনতটা ছিল হাফেজ্জী হুযুরের মতো, আজিমপুরের মাওলানা আবদুল্লাহ সাহেবের মতো। হাফেজ্জী হুযুর রাজনীতিবিদদের চিঠি লিখেছিলেন। মাওলানা আবদুল্লাহ সাহেব, আজীমপুরে যার মাদরাসায় আমি পড়িয়েছি তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে চিঠি লিখেছেন। নিজে একবার গিয়ে দিয়ে এসেছেন বঙ্গভবনে। তাদের ছিল দাওয়াতী উসলূব। আরেকটা হচ্ছে ঘনিষ্ঠতার পন্থা। সরকারের ঘনিষ্ঠতা ছিল না তাদের মধ্যে। তারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তাদের দাওয়াতী কাজ করেছেন। কেন, মাওলানা আলী মিয়া সাহেবরা কংগ্রেসের সাথে মিলে কাজ করলেন না কেন? মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের কাজে তারা সরকারী লোকদের সাথে বসেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের গায়ে কখনো সরকার ঘনিষ্ঠতার তকমা লাগতে দেননি।

উপমহাদেশে তিনি বাংলাদেশ-পাকিস্তানের কথা বলতেন যে, তোমরা ওভাবে আন্দোলন করে লাভ কী? উনি প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার মোকাবেলায় দাওয়াতের উসলূবের ওপর জোর দিতেন বেশি। এজন্য তিনি এমন বলেছেন। কিন্তু এটার অর্থ এটা না যে, সরকার ঘনিষ্ঠ হতে হবে।

এই ঘনিষ্ঠতা তো হয়ত কিছু লোকের। এটা আমি আহমদ শফী সাহেব হুযুরের ব্যাপারে বলছি না। কিন্তু আশপাশের সুবিধাবাদী লোকেরা নিজের সুবিধা আদায় করে নেওয়ার রাস্তা তৈরি করে নেয়। এটার দ্বারা জাতির বদনাম হয়। মানুষ আলেমদের ওপর আস্থা হারায়। আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতির ধারাটাই এরকম যে, সরকার ঘনিষ্ঠ আলেমদের ‘দরবারি’ ভাবা হয়।

তো যখন সরকারি মহল মনে করে এবং বলতে থাকে যে, হেফাজত আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখান থেকেই ধরে নেওয়া যায় যে, পরিস্থিতিটা কোন দিকে। নিয়ন্ত্রণে থাকার অর্থ কী? অর্থাৎ হেফাজত ওতটুকুই আন্দোলন করবে, যতটুকুতে আমাদের সায় থাকবে। বাহ্যিকভাবে এটাই তো নিয়ন্ত্রণে থাকার অর্থ।

ইসলাম টাইমস: হযরত আহমদ শফী সাহেব হুযুর রহ.-এর জীবনের শেষের দিকে সরকার ঘনিষ্ঠতা বা হুযুর যেহেতু কওমী মাদরাসা বোর্ডের প্রধান ছিলেন, অনেকেই এই প্রশ্নগুলি তুলছেন যে, স্বকীয়তা হারানো ইত্যাদি যা হুযুরের দিকে নিসবত হয়, শেষের দিকে কিছু ঘটনাও ঘটেছে, আবার বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগগুলোও উঠেছে। এরপর হুযুরের ইন্তেকাল হয়ে গেল। তো শেষ সময়ে উঠে আসা অভিযোগ ও হুযুরের বিদায়- এ সময়টাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: এটা আসলে আমি দেখব আমাদের জাতিগত একটা সমস্যা হিসেবে। বিষয়টা হুযুরের সাথেই খাস না। আমরা দেখে এসেছি অতীতে। আমাদের বয়স অনেক বেশি হয়নি, কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতি বলেন, বড় বড় ব্যক্তিত্বের জীবন বলেন, আমাদের সৌভাগ্য হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের লোকদেরকে দেখার। এদেশের ইসলামি রাজনীতির ‘নাশআতে সানিয়া’- পুনর্জাগরণ বা দ্বিতীয় ধাপ তো জিয়াউর রহমানের আমল থেকে শুরু হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্র্তী সময়ে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। এদেশে বহু বড় ব্যক্তিত্ব অতীত হয়েছেন। এখনো হায়াতে আছেন অনেকে। এদেশের একটা নিয়ম আমরা বানিয়ে ফেলেছি যে, একটা মানুষ একেবারে জীবনসায়াহ্নে চলে যাবার আগে তাকে ব্যাপক মূল্যায়ন করা হয় না। হিসাবে নেওয়া হয় না। আর কেউ যখন একবার কোনো একটি বিষয়ে প্রসিদ্ধ হয় তখন সব উনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ একজন ব্যক্তিত্ব তো যোগ্যতাসম্পন্ন থাকেন আগেই। অতীতেও একাধিক ব্যক্তিত্ব দেখেছি আমরা।

হুযুরের ক্ষেত্রে যেটা ঘটল যে, হেফাজত পরবর্তী সময়ে হেফাজতের যখন হুযুর আমীর হলেন, এরপর যত দায়-দায়িত্ব, যত নেতৃত্ব, যত একক কর্তৃত্ব সব হুযুরের দিকে দিয়ে দেওয়া হলো। হাইআতুল উলয়া, বেফাক, হাটহাজারী মাদরাসার দায়িত্ব, হেফাজতের আমীর সবকিছু। অথচ হুযুরের বয়স তখন নব্বই উর্ধ্বে; যে হায়াত এদেশের অধিকাংশ লোক পায় না। এরকম একটা বয়সে উপনীত হওয়ার পরে যদি এতগুলো দায়িত্ব একটা ব্যক্তির কাঁধে চলে যায়, তো খুব স্বাভাবিক, এ কাজগুলোর জন্য তাকে নির্ভর করতে হয়েছে তার আশপাশের লোকদের ওপর। এক্ষেত্রে আশপাশের লোকেরা, তার সহায়তাকারী, উপদেষ্টাদের ওপর নির্ভর করে অনেক কাজ করতে হয়েছে।

এরপরে দেখা গেছে, যত সিদ্ধান্তের কথা বিভিন্ন দিক থেকে শোনা গেছে, হাটহাজারীর শূরা বলেন, পরবর্তী হাটহাজারীর দায়িত্বশীল বলেন, হেফাজত নিয়ে যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুঞ্জন, মহাসচিব বদল হয়ে যাচ্ছে, এটা সেটা কত কথা উঠেছে। এরপরে বেফাক কেন্দ্রিক দায়-দায়িত্বের কথা বলেন এবং জাতীয় দ্বীনী বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা বলেন- যা কিছু হচ্ছে সবই হুযুরের দিকে নিসবত করা হচ্ছিল। ‘হাটহাজারীর হযরত একথা বলেছেন’। এত কিছুর দায়িত্ব দেওয়ার কারণেই স্বাভাবিকভাবে আমাদের দেশের ওই রেওয়াজটি আমরা সর্বশেষ হুযুরের ক্ষেত্রেও পেলাম। এগুলো করে আমরা কিছু লোককে সুযোগ করে দিলাম। যারা সুযোগ সন্ধানে থাকে, যারা এ মুরুব্বিদেরকে সামনে নিয়ে নিজেদের আখের গোছায়, নিজেদের সুবিধা নিয়ে নেয়। হুযুরের ক্ষেত্রেও সেরকমই ঘটেছে। এবং সেটা ঘটার কারণে হুযুরের ব্যাপারে সাধারণ লোকের উচ্চাশা মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা, আশা যা অনেক বেশি ছিল, কিছু কিছু সিদ্ধান্ত যখন প্রকাশ হয়েছে যে, এটা হুযুরের নামে, ওটা হুযুরের নামে, তখন মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। ফলে দেখা গেল, যাকে আমরা শ্রদ্ধার উপরের আসনে উঠিয়েছি, তার ব্যাপারেই বিভিন্ন ধরনের লোকের মধ্যে আবার বিরূপ কথা তৈরি হয়েছে।

একবার সম্ভবত শোকরানা মাহফিলের পর আমি রাজশাহীতে একটি দ্বীনী সফরে গিয়েছিলাম। রাস্তায় রিকশায় ওঠার পর রিকশাওয়ালা আমাদেরকে দেখে নিজ থেকেই কথাবার্তা শুরু করেন। তিনি বললেন, হুযুর, আল্লামা শফী তো আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দিয়েছেন। আমরা বললাম, কবে কিভাবে? তিনি বললেন, টিভিতে দেখিয়েছে। তিনি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের সাথে বসে সভা করছেন। আমরা তো ইসলামের জন্য তার ওপর ভরসা রাখতাম ইত্যাদি। আমি এটা-সেটা বলে লোকটিকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। মানুষের এই ধারণা যা কিন্তু ব্যাপক ছিল, এবং শুধু এক-দু’জনের ধারণা ছিল না।

ইসলাম টাইমস: তাহলে শেষ বয়সে মুরুব্বিদের ব্যাপারে আমাদের কর্মপন্থা কী হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: দেখুন, প্রত্যেকেরই তো একটা বয়সের তাকাযা (চাহিদা) আছে। আমাদের এই মানসিকতা কেন হয় যে, আমরা সকল জাতীয় বড় বড় দায়িত্ব একসঙ্গে মুরুব্বিদেরকে চাপিয়ে দেই। হুযুর এতকিছুর দায়িত্বে ছিলেন। হুযুরকে নিয়ে বিতর্কগুলো তৈরি হল কেন? হুযুরকে মুরুব্বি ও পৃষ্ঠপোষক রেখে এ বোর্ডগুলোর দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়া যেত না জীবদ্দশায়? কেন আমরা এটা চিন্তা করি যে, নব্বই উর্ধ্ব লোক না হলে, আশি উর্ধ্ব লোক না হলে বোর্ডের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না! আপনি বাংলাদেশের বোর্ডগুলো দেখেন। সেগুলোতে কোনো চেয়ারম্যানের বয়স ষাটের উর্ধ্বে নয়।

আমাদের আগের সালাফের যুগেও তো এমন ছিল না। অনেক বয়স হয়ে গেলে তারা নিজেরাই হাদিসের রেওয়ায়েত করা বন্ধ করে দিতেন যখন নিজেদের ওপর আস্থা থাকত না। অন্যরাও সতর্কতামূলক তাদের থেকে হাদিস গ্রহণ করতেন না। কিন্তু আমরা ধরেই নিয়েছি যে, অনেক বয়স হওয়ার পর অথবা একজন ব্যক্তিত্ব যখন বিখ্যাত হয়ে যাবেন, তখন তার কাঁধে সব চাপিয়ে দিতে হবে। আমরা এটা করি কেন? আমরা তো এটা জুলুম করি, আমরা ইহসান করি না। আমরা মনে করি, উনাকে সম্মান করছি। আসলে সব দায়িত্ব একজনকে চাপিয়ে দিয়ে তাকে কষ্ট দিচ্ছি এবং তাকে বিতর্কিত করছি। আমরা তাকে বিতর্কিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছি। হুযুরের শেষ জীবনের বিয়োগান্তক ঘটনা হলো এটা।

(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

২য় পর্ব: ‘জাতীয় দ্বীনী নেতৃত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমরা আরো ভেবে দেখতে পারি’

বিজ্ঞাপন