প্রাচীন ভারতবর্ষের তান্ত্রিকবাদ : নোংরামি ও যৌনতার ধর্ম

নূরুদ্দীন আজিম ।।

তেত্রিশ কোটি দেবতা পূজারীদের দেশ ভারতবর্ষে সব যুগেই ছিলো শত-সহস্র ধর্ম ও মতবাদের ভীড়। মানুষের তৈরি নতুন নতুন ধর্মের বিকাশ ও বিনাশ এখানকার আদিম সংস্কৃতি। ভারতের প্রাচীন ধর্মগুলোর একটি হলো তান্ত্রিকবাদ। কালের আবর্তে হারিয়ে গেলেও এই ধর্ম হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনেক রীতি-রেওয়াজে তার গভীর প্রভাব রেখে গেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রাচীন এই ধর্মের সাধু-সন্ন্যাসীদেরকে প্রকাশ্যেই গাঁজা সেবন করতে এবং হাটে-বাজারে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হতে দেখা যেতো। তাই এই ধর্ম নিয়ে বহু রহস্যময় ও ঘৃণ্য কিংবদন্তি প্রচলিত। কারো মতে এটা প্রবৃত্তিপূজারীদের ধর্ম, আবার কারো কাছে তা চরমপন্থীদের ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত। তান্ত্রিকবাদ কি আসলেই বেহায়া-প্রবৃত্তিপ্রবণদের ধর্ম, না এসব গুজব, নিম্নের আলোচনা থেকে তা অনেকটা অনুমান করা যেতে পারে।

তান্ত্রিকবাদের মূলস্তম্ভ পাঁচটি : মদ,  মাংস,  মাছ,  শস্য,  যৌনতা। যেহেতু পঞ্চম স্তম্ভটি মানুষের জন্মদানের মাধ্যম, তাই তান্ত্রিকবাদে যৌনতাকে অনেক পবিত্র মনে করা হয়। ফলে প্রতিনিয়ত তারা যৌনতার নতুন নতুন পদ্ধতির প্রসার ঘটাতে থাকে। আর বাকি চারটি মূল ধাতু যৌন আকর্ষণকে বৃদ্ধির কাজে ব্যবহৃত হয়।

তান্ত্রিকবাদীদের ধারণা,  এই পাঁচটি মূলনীতি অনুসরণ করে কলিযুগ (ক্রান্তিকাল) থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আর তাই তারা ধর্মীয় চেতনা থেকে প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও জনসম্মুখে যৌনতায় লিপ্ত হত।

হাজার বছর ধরে প্রচলিত এই মতবাদ বিকৃতির প্রধান আসামী সাব্যস্ত করা হয় হিন্দুস্তানের বিলাসী রাজা-বাদশাদেরকে। বৃটিশ শাসনামলে এই ধর্মের একমাত্র প্রয়োগ হতো রাজাদের যৌনসুখ প্রদানের ক্ষেত্রে। অসংখ্য নারীর সাথে তারা যৌনতায় লিপ্ত হতো এই ধর্মের দোহাই দিয়ে। ফলে তাদের বাসনা চরিতার্থ হলেও সম্মান-দাপট থাকতো অক্ষুন্ন। এসব অবৈধ যৌনতা যেহেতু তান্ত্রিকবাদীদের ধর্মসম্মত ছিলো, তাই রাজাদের বিরোধিতা করার মতো কেউই ছিলো না।

নিজের যৌনলালসা পূরণ করার স্বার্থে এই ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে সর্বপ্রথম ব্যবহার করেছিলো ভারতের পটিয়ালা রাজ্যের রাজা ভূপেন্দ্র সিং। সে ছিলো বিলাসিতা ও যৌনতায় প্রসিদ্ধ। তিন শতাধিক রক্ষিতা ছিলো তার রাজমহলে। এছাড়াও রাজ্যের কোনো সুন্দরী তার চোখে পড়লেই সে তাঁকে লালসার শিকারে পরিণত করতো। নিজের এসব নোংরামিকে বৈধ করার জন্যই সে বিলুপ্তপ্রায় তান্ত্রিকবাদকে পুনরজ্জীবিত করে তোলে।

বাংলা থেকে তান্ত্রিকবাদের প্রসিদ্ধ পন্ডিত নন্দ জাহানকে সে পটিয়ালায় নিয়ে আসে। তার নেতৃত্বে রাজমহলে প্রতি সপ্তাহে দু’বার তান্ত্রিকবাদের নোংরা অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। সারা দেশ থেকে বাছাই করে আনা হতো সুন্দরী কুমারী নারীদের। অনুষ্ঠানে থাকতো রাজার আস্থাভাজন ব্যক্তিবর্গ।

সন্ন্যাসী নন্দ জাহান এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে বালু-কাদা মিশিয়ে নিজ হাতে সুন্দরী এক নারীর মূর্তি তৈরী করত। রংবেরঙের অলংকার দিয়ে সেটাকে সাজাত। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিবৃন্দ এই মূর্তির পূজা করতো, বন্দনা গাইতো। এবং সবাই মদ পান করতো। যখন নেশায় মাতাল হয়ে উঠতো,  তখন সন্ন্যাসীর আদেশে সবাই বিবস্ত্র হয়ে যেতো এবং একে অপরের সাথে অপকর্মে লিপ্ত হতো। এই অনুষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ১২-১৬ বছর বয়সী যুবতী মেয়েদের ধরে এনে রাজা ও সভাসদদের সন্তুষ্ট করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

এমন একটা নোংরা অনুষ্ঠানে যোগ দিতো উন্নত সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীপুরুষরাও। পণ্ডিতের নির্দেশনায় এসকল নারী-পুরুষকে যুগলবন্দী করা হতো। এক্ষেত্রে রক্তসম্পর্কেরও কোনো তোয়াক্কা করা হতো না। থাকতো না ভাই-বোন, মা-ছেলের কোনও তফাত। সবাই প্রবৃত্তির তাড়নায় মাতাল হয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়ে যেতো। এমন একটা নোংরা কাজকে তারা দেবীর সন্তুষ্টি লাভের নেক কাজ মনে করতো। দেবীর নামে ষাঁড় উৎসর্গ করতো। অতঃপর মাংস ভুনা করে তা পরিবেশন করা হতো এবং অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিতদের মাঝে মাংস বণ্টন করা হতো।

সারা রাত চলমান এই উদ্দাম যৌনতার সমাপ্তি হতো দেবী পূজার মাধ্যমে। কখনো শত্রুর বিনাশ, কখনো বৃটিশ সরকারের কৃপা,  আবার কখনো ভূপেন্দ্র সিংহের দীর্ঘায়ু কামনা করে পূজা হতো। কালো যাদু ও তন্ত্রবিদ্যায় সিদ্ধহস্ত এই পণ্ডিত বহুবার রাজাকে উদ্বুদ্ধ করে যে,  এই দেবীর নামে মানুষ উৎসর্গ করলে তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করবেন। কিন্তু রাজা তার প্রস্তাবে মনস্থির করতে পারেনি।

সকালবেলা রাজমহল বা তার আশপাশে কোথাও এই অনুষ্ঠানের কোনো গুঞ্জনও শোনা যেতো না। সবাই রীতিমতো নিজের কাজে মশগুল হয়ে যেতো। সারারাত নোংরামিতে মত্ত থাকা নারীগণও স্বাভাবিকভাবে সাংসারিক কাজে মন দিতো।

ভূপেন্দ্র সিংহের মতই হিন্দুস্তানের বহু রাজা ও সন্ন্যাসী এই ধর্মকে নিজেদের বিলাসিতা ও যৌনতার কাজে ব্যবহার করতো। আর তাই সূচনালগ্নে তান্ত্রিকবাদের নীতিদর্শন যাই থাকুক না কেন পরবর্তী রাজাদের হস্তক্ষেপে তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ও বিকৃত হয়ে যায়। এসকল তথ্য নেওয়া হয়েছে পটিয়ালার মহারাজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেওয়ান জার্মানি দাসের ‘মহারাজা’ বই থেকে। ইংরেজি ভাষার এই বইটি ইন্টারনেটে খুব সহজেই পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন