পাঠকের অভিব্যক্তি: বাংলা ভাষায় ফিকহ-ফতোয়ার জগতে এক অনন্য উপহার

তাকরীম হায়দার ।।

গত কিছুদিন আগে দারুল উলুম হাটহাজারীর রচনাবিভাগ থেকে একটি ফতোয়া সংকলন বের হয়। জানতে পেরে আগ্রহভরে তা সংগ্রহ করলাম। সংকলনটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম ইসলামী পত্রিকা ”মাসিক মুইনুল ইসলাম”-এর জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে প্রকাশিত দীর্ঘ ত্রিশ বছরের ফতোয়া সংকলন। বক্ষমাণ খণ্ডটি তহারাত-সালাত (পবিত্রতা ও নামায) অধ্যায়ে পরিসমাপ্ত।

বিজ্ঞাপন

সংকলনটির শুরুতে সম্পাদক মহোদয় মাওলানা মুফতী আব্দুল্লাহ নাজীব হাফি.-এর একটি ভূমিকা রয়েছে। যেখানে তিনি সংকলনটির তাহযীব ও সম্পাদনা করার ক্ষেত্রে যে কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তার কিছু মৌলিক দিক কিছুটা ব্যাখ্যাসহ উল্লেখ করেছেন। যা দ্বারা শাস্ত্রীয় ও উপস্থাপনার দিক দিয়ে সংকলনটির বৈশিষ্ট্য ও কাজে নতুনত্বের ছাপ সুস্পষ্ট হয়।

যেমন, ফাতাওয়ায় বিধানের কারণ উল্লেখ করা, ফাতাওয়ার উপস্থাপনায় ‘মারাতিবুল আহকাম’ (গুরুত্ব হিসেবে বিধানের ক্রমপর্যায়) রক্ষা করার চেষ্টা, আইনি ভাষায় উপস্থাপন, প্রতিটি মাসআলায় আমলযোগ্য হাদীস ও ফিকহের প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে উদ্ধৃতি সংযোজন, সংশ্লিষ্ট অধ্যায় ও পাঠক চাহিদাকে সামনে রেখে প্রকাশিত ফাতাওয়ায় সংযোজন ও বিয়োজন এবং ইখতিলাফি (মতভেদপূর্ণ) মাসায়েলে অধিকাংশের মতকে প্রাধান্য দেওয়া। সর্বোপরি, প্রমিত ভাষায় সহজ ও সাবলিল উপস্থাপন করা ইত্যাদি। শিরোনামগুলো পড়ার পর সংকলনটির প্রতি আমার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। কারণ, এতে কাজের নতুনত্ব ও বৈশিষ্ট্য চমৎকারভাবে ফুটে উঠে। আমি পড়তে শুরু করলাম এবং সংকলনটিতে বিশেষ কর্ম-পদ্ধতির ছাপ প্রত্যক্ষ করলাম।

”ফাতাওয়া মুঈনুল ইসলাম: কিছু মৌলিক আলোচনা” শিরোনামে মুফতী কিফায়াতুল্লাহ হাফি.-এর একটি অসাধারণ প্রবন্ধ আছে সংলনটির শুরুভাগে। মাকালাটি পড়ে আমি খুবই উপকৃত হই। এতে সংকলনটির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা, এবং ফিক্বহ-ফতোয়া সংক্রান্ত কিছু মৌলিক ও অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এসেছে। যা ফিক্বহের প্রতিটি তালিবুল ইলমের তাদাব্বুরের সাথে বারবার পড়া উচিত বলে মনে হয়।

একজন ক্ষুদে পাঠক হিসেবে সংকলনটির আরো কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েছে আমার। এতে শুধু প্রশ্নকারীর জিজ্ঞাসার সমাধানই দেওয়া হয়নি, বরং প্রশ্ন থেকে অনুমিত হয় এমন কোনো অমূলক ধারণা বা ভুলচিন্তা থাকলে তা-ও দূর করা হয়েছে। শুধু বিধান বলে দেওয়াকে যথেষ্ট মনে করা হয়নি, বরং বিকল্প কর্মপদ্ধতিও বাতলে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে একজন সাধারণ পাঠকের পক্ষে সমস্যা-সমাধানকে নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নেওয়া অধিকতর সহজ হয়ে গেছে।

উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যাবলি সামনে রেখে সংকলনটি অধ্যয়ন করলে এবং সে আলোকে ফতোয়া অনুশীলন জারি রাখার ক্ষেত্রে একজন ফিক্বহের তালিবুল ইলম সংকলনটিকে ফিক্বহ-ফতোয়া চর্চার একটি উত্তম নির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। বলা যায়, এর মাধ্যমে বাংলাভাষায় ফিক্বহ-ফতোয়া চর্চার জন্য একটি উত্তম নমুনা আমাদের সামনে এসে গেল।

বর্তমানে এক নতুন বিশ্বে আমাদের বসবাস। যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি শাস্ত্রের চর্চার ধরণ, উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ সবকিছুর মধ্যেই কমবেশি পরিবর্তন আসে। ফিকাহ শাস্ত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন ফিতনাকে সামনে রেখেও শাস্ত্রের উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হয়।

তদুপরি মানুষ এখন অনলাইন নির্ভর। আজকাল নেট জগতে আহলে হাদীস ও তথাকথিত সালফিদের সরব উপস্থিতি ও প্রচারণা লক্ষ্য করার মত। সার্চ করলে তাদের ওয়েবসাইটগুলো দুঃখজনকভাবে আগে আসে। অপর পক্ষে ফিকহে হানাফীর ওয়েবসাইট সেবা আমার জানামতে আমাদের দেশে তেমন শক্তিশালী নয়। তাছাড়া তাদের উপস্থাপনার বাহ্যিক চাকচিক্যের কারণে অনেককে বলতে শুনা যায়, হানাফীদের তুলনায় হাদীসভিত্তিক মাসআলা বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে। তাই শূন্যতা ও চাহিদাকে সামনে রেখে ওয়েসাইটে ফাতওয়া আপলোড করা এ সংকলনটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

এসব কারণে যুগ চাহিদা পূরণার্থে উম্মুল মাদারিস দারুল উলুমহাটহাজারী থেকে উপর্যুক্ত কর্মপদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্যের আলোকে একটি ফতোয়া সংকলন প্রকাশিত হওয়া ছিল সময়ের দাবি। বক্ষমাণ সংকলনটি সে দাবি পূরণ করবে এবং আহলে ইলমগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে ইনশাআল্লাহ।

পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করলে সংকলনটির সম্পাদক মহোদয়ের ফিক্বহী পারদর্শিতা এবং অক্লান্ত শ্রমের ছাপ দৃষ্টিগোচর হয়। আল্লাহ তাআলা সম্পাদক মহোদয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে উত্তম জাযা দান করুন এবং বাকি খণ্ডগুলোর কাজ আরো সুচারুরুপে সমাপ্ত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

বিজ্ঞাপন