একটি পাখির বিরহ স্মৃতি

মাওলানা তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

আমি যখন সবেমাত্র হিফয শেষ করলাম, কিতাব বিভাগে ভর্তি হবো, সেই সময়ের কথা। রমযান মাস। প্রতিদিন সকালে একঝাঁক টিয়াপাখি আসে আমাদের কামরাঙ্গা গাছে। দীর্ঘ সময় ধরে হৈ হুলুস্থূল-কিচিরমিচির-ঝুপঝাপ করে, আর পাকা পাকা কামরাঙ্গায় কেবল কামড় বসায়। ইয়া লম্বা ঠোঁট। শুধু কামড় বসালেই হয়। খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত কোনো কষ্ট মনে হয় করতে হয় না। আমরা ছোটোরা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখি। ভারি চমৎকার দৃশ্য। এর ফাঁকে এক-আধটা কামরাঙ্গা যদি পড়ে, সেটা বোনাস। টিয়াপাখির ঠোঁট লাগা কামরাঙ্গা! স্বাদই আলাদা।

বিজ্ঞাপন

এমনি একদিন আম্মা চাচী বোনেরা সহ বাড়ির অন্য মহিলারাও সেখানে। বরং একটু দূরে। টিয়াপাখির ঝাঁক দাপাদাপি করছে। কে যেনো বললো, টিয়াপাখি কলা খায়; একটা নিয়ে আসি। কলা আনা হলো। এবং কাপড় শুকোনোর উঁচু আড়ে সেটা রেখে দেয়া হলো। চপলা পাখিদের দৃষ্টি এড়ালো না। দাপাদাপির ফাঁকে তারা কয়েকবার দেখে নিল কলাটি। দূরন্ত এক পাখি কামরাঙ্গা গাছ ছেড়ে ঘরের চালে বসলো কলার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। আমরা সুযোগ দিলাম; একটু দূরে সরে দাঁড়ালাম সবাই। পাখিটি বুঝলো—কলাটা আমরা তাকেই দিয়েছি। তবু ফাঁদ হবার যথেষ্ট ভয় তার চোখে মুখে। বড়রা সেজন্য আরো কিছুটা দূরে সরে গেলেন। কাছে থাকলাম শুধু আমি আর আমার ছোটো দুই ভাতিজা। বেশ কিছুক্ষণ ভয় শঙ্কা সতর্কতার পর আড় পর্যন্ত এলো পাখিটি। অমনি আবার উড়ে গেলো সোজা কামরাঙ্গা গাছে। একেবারে আগের মতোই দাপাদাপি ঝুপঝাপে মগ্ন হয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর আবার এলো। এদিক সেদিক তাকালো। কি যেনো ভাবলো। এরপর চলে গেলো। এভাবে কয়েকবার আসা যাওয়ার পর এক পর্যায়ে কলার দিকেই এগিয়ে এলো। এবং যথারীতি কামড় বসালো। এরপর দিলো উড়াল। কিন্তু কলা নিয়ে যেতে পারলো না। মাটিতে পড়ে গেলো। পেছন থেকে একজন এসে সেটাকে আবার উঠিয়ে দিলো আড়ে। অনেকক্ষণ পর আবার এলো পাখিটি। এবং আড়ে বসেই কলা খাওয়ার দুঃসাহস দেখালো। আমরা নীরব। শ্বাসটি পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছি। অথচ পাখির নড়াচড়ায় ভীষণ ভয়ের ছাপ। তবে চোখে কৃতজ্ঞতা। এবং ভাবটা এমন, ‘কার গাছের কলা? ভারি মিষ্টি তো! গাছের গোড়ায় সার টার দেন না নিশ্চয়!!’

এরই মধ্যে হঠাৎ কলাটি পড়ে গেলো। আমি আড় নাগাল না পাওয়ায় পিচ্চি ভাতিজার মাথায় রেখে দিলাম সেই কলা। পাখি তাতে রাজি নয়। আরেকটু উঁচু হিসাবে এবার আমার মাথায়। পাখি দ্বিধান্বিত; উড়ছে বসছে। পেটের ক্ষুধা কিংবা আরেকটু সাহসের ভরসায় কিছুক্ষণ পর আমার মাথায় বসলো। আনন্দে আবেগে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার উপক্রম। তবু নড়ছি না। পাছে সৌভাগ্য হাতছাড়া হয়ে যায়! কিন্তু পাখিটি নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে না পেরে উড়ে গেলো গাছে। সাথীদের সাথে কিছুক্ষণ থেকে দলবেঁধে যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই ফিরে গেলো। অবুঝ ‘আমি’র বুকে তখন আনন্দ বেদনার কী এক দ্যোতনা! সারাদিন সারাক্ষণ এই দ্যোতনার আকুলতা ব্যাকুলতা। কতোজনের কাছে গল্প—একটা টিয়া পাখি আজ আমার মাথায়… উচ্ছ্বাসে আবেগে বাক্য শেষ করতে পারি না। দম শেষ হয়ে যায়।

পরের দিন আবার পাখিরা এলো। এবং যথানিয়মেই বসলো কামরাঙ্গা গাছে। আমরাও কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঝুপঝাপ দেখলাম। গতকালের মতো আজও একটি পাখি, অথবা সেই পাখিটি আড়ে বসলো। আমাদের কাছে কলা নেই। টিয়াকে দেবার মতো অন্য কোনো খাবারও নেই। তবু সে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলো। একপর্যায়ে -আশ্চর্য- আমার মাথায় এসে বসলো। কে জানে, হয়তো গতকালের ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটাতে চাইলো। অথবা কলা পাওয়ার দৃঢ় আশা তাকে এই পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। কিন্তু বেশিক্ষণ দেরি করলো না। চলে গেলো গাছে। তার পরদিন আবার এলো। এভাবে কয়েকদিন সন্ধ্যা বেলায়ও আসতে লাগলো। এবং একা একাই। যদি বলি, তখন আমি এই পাখিটির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। তাহলে আমার কথা সত্য। এরপর যদি বলি, পাখিটিও আমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো। তাহলেও বোধহয় আমার কথা মিথ্যে নয়। সেই কচি বয়সে একটি পাখির প্রেম আমাকে কী ব্যাকুলতা দান করেছিলো সেকথা ভাবতে গেলে এখনও লজ্জায় সংকোচে জড়সড় হয়ে পড়ি।

একদিন আমার আম্মা বলেছিলেন, পাখিটি যদি তোমাকে কিনে দেয়া যেতো আমি দিতাম। আম্মা সে কথা কেনো বলেছিলেন আজো জানতে পারিনি।

পাখিটি আমার কাঁধে বসতো। গালে ঠোঁট ঘষতো। বড় চাচী এই দৃশ্য দেখে বললেন, ‘হায় হায়! পাখির উপর বিশ্বাস আছে? এই লম্বা ঠোঁট দিয়ে যদি একবার চোখে ঠোকর মারে কী অবস্থা হবে!?’ আম্মা ভয় পেয়েছিলেন। আমিও ভয় পেয়েছিলাম। পাখিটি তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে ভালোবেসেছিলো। আমি আমার চোখের ঝুঁকি নিয়ে তাকে ভালোবাসা দিতে পারিনি। তবে ‘প্রেম অভিধানে’ বীরের সঙ্গা নাকি ‘স্বার্থ সচেতনে’র পক্ষে। সে হিসাবে আমি বীর। তবে একথা স্বীকার করতে আমি কুণ্ঠাবোধ করি না যে, প্রেমের আদালতে সবচে’ অপরাধ হলো স্বার্থসচেতনতা।

এখন অবাক হই, এবং অবিশ্বাসও লাগে, কী করে একটি পাখি এবং টিয়ার মতো একটি অভিজাত পাখি বাচ্চা বালকের কাঁধে বসে আমাদের ঘরে যেতো! আলনায় বসতো! এক থালা থেকে আমি আর আমার পাখি মুড়ি খেতাম! আজ সেসব স্মৃতি। হয়তো কেউ বলবে—শুধুই স্মৃতি।

একটি একটি দিন করে রমযান মাস চলে গেলো। ঈদ, শাওয়াল এবং কিতাব বিভাগে ভর্তি হওয়ার নির্ধারিত তারিখ ঘনিয়ে এলো। পাখিটিকে ছেড়ে যেতে অনেক কষ্ট হবে জেনেও আমি প্রস্তুতি নিলাম। ধরা না, বাঁধা না, একটি পাখি- আমার বিচ্ছেদে কি করবে কেউই জানলো না। স্বয়ং পাখিটিও না।

বাড়ি থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরের এক মাদরাসায় ভর্তি হলাম আমি। ঢাকার রামপুরায়। টানা প্রায় একমাস থাকলাম। এরমধ্যে কতোবার কতোভাবে পাখিটিকে মনে পড়লো। একবার ভাবলাম, বাড়িতে গিয়ে একটি খাঁচা কিনবো। এরপর সেই খাঁচায় করে পাখিটিকে নিয়ে আসবো ঢাকায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আশঙ্কা, ওর সাথে আর কোনোদিনই হয়তো আমার দেখা হবে না। এই দীর্ঘ সময় কি সে আমার জন্যে অপেক্ষা করবে?! কে জানে এতোদিনে হয়তো সে অন্য কোথাও, অন্য কোনো দূরের বনে চলে গেছে!!

প্রায় একমাস পর দু’তিন দিনের ছুটিতে বাড়ি গেলাম। পাখিটির সাথে দেখা হলো না। আম্মা বললেন, তুমি চলে যাবার পর বেশ কয়েকদিন বিভিন্ন সময়ে পাখিটি আসতো। কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করে আবার চলে যেতো। এরপর হঠাৎ আর দেখি না। ছুটির তিনদিনে আমিও তার দেখা পেলাম না।

দ্বিতীয় বার বাড়ি গেলাম কুরবানীর ঈদে। পনেরো দিনের মতো ছুটি। সেই ছুটির একেবারে শেষদিকে হঠাৎ এক বিকেলে, আসরের নামায পড়ে মসজিদ থেকে বেরুনোর সময় দেখলাম একটা টিয়াপাখি উড়ছে। ভেতরটা নড়েচড়ে উঠলো। কণ্ঠে সেই পুরোনো ডাক, পরিচিত সুর। আমিও ডাকলাম আগের মতো। পাখিটি থামলো। একটা গাছে বসে বিরতিহীনভাবে ডেকে চললো। আমি আর আমার ভাতিজা আল আমীন বিরতিহীন সাড়া দিয়ে গেলাম। এরপর কি হলো, পাখিটি আমাদের বাড়ির দিকে উড়তে লাগলো। আমরাও দৌড়ে যেতে লাগলাম বাড়িতে। আমাদের ঘরের পেছনে গিয়ে একত্র হলাম। পাখিটি হয়তো আমাকে চিনলো। আমিও চিনলাম। কিন্তু সে আর আগের মতো ধরা দিলো না। দীর্ঘ বিরহের অভিমানে নাকি বিশ্বাস হারানোর ক্ষোভে তার এই আচরণ, বুঝতে পারলাম না।

আমার ছুটি শেষ। চলে এলাম ঢাকায়। পরের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে শুনলাম- পাখিটিও চলে গেছে। সে চলে গেছে এতো দূরে, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরে আসা যায় না। আরো শুনলাম- সে যায় নি। তাকে যেতে -একরকম- বাধ্য করা হয়েছে। কয়েকটি দুষ্ট ছেলে জাল দিয়ে… সেই সংবাদ এখনো আমাকে কাতর করে। ভাব ভাবনার কাছে নিজের নিয়ন্ত্রণহীতা জাগিয়ে দেয়।

এই পাখিকে আরেকবার ক’জন বুঝমান(?) মানুষ জাল দিয়ে বন্দি করেছিলো। তখন আমি বাড়িতেই ছিলাম। এবং বন্দি হবার পর পাখিটিকে দেখতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু করতে পারিনি কিছুই। খাঁচার ভেতর থেকে আমাকে দেখে সে যে কেমন করেছিলো, সে কথা জানি শুধু আমি আর আমার বড়বোন।

দুঃখগুলো আজ থাক।