মাওলানা মনযুর নোমানী রহ., কর্মময় জীবনের এক ঝলক

ছবিটি মাওলানা নোমানী রহ.-এর। লেখক স্বয়ং মাওলানার নাতি মাওলানা ইলিয়াস নোমানীর কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন।

মাওলানা যহীরুল ইসলাম নদভী ।।

মাওলানা মনযুর নো’মানী রহ. ওই সকল ক্ষণজন্মা মনীষীদের একজন, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা আপন যুগে  “মকবুলিয়াতে আম্মাহ” তথা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা দান করেছেন। একাধারে তিনি ছিলেন দায়ী, মুনাযির, তরজুমানে আহলে সুন্নাহ ও একজন বিদগ্ধ লেখক ও চিন্তাবিদ। সমাজ সংস্কার ও ব্যক্তিগঠনে তিনি ছিলেন এক মহান আলোকবর্তিকা। তিনি ছিলেন আপন যুগের আকাবিরদের আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব।

বিজ্ঞাপন

এই মহা মনীষী ইউপি প্রদেশের মুরাদাবাদ জেলার সাম্ভাল গ্রামে সতের জানুয়ারি ১৯০৬ ঈ. মোতাবেক (২২যিলকদ ১৩২৩ হিজরী সনে এক দীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

পিতার দ্বীনদারী

মাওলানা নোমানী রহমাতুল্লাহ আলাইহির পিতা সূফি আহমদ হুসাইন সাহেব রহ  অত্যন্ত পরহেযগার বুযুর্গ ছিলেন। মাওলানা তাঁর আত্মজীবনীতে পিতা সম্পর্কে লিখেন–

میرے والد ماجد ایک متوسط درجے کے دولت مند تھے زمینداری بھی اچھی خاصی تھی اور تجارتی کاروبار بھی خاصا وسیع تھا اور اسمے اچھے کامیاب تھے اسی کے ساتھ ان کی آخرت کی فکر دنیا کی فکر پر غالب تھی اور وہ کاروبار میں پوری مشغولی کے ساتھ «  الذاكرون الله كثيرا » میں سے تھے

আমার আব্বা একজন মধ্যম স্তরের ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। জমিদারিও ছিল বেশ। ব্যবসা-বাণিজ্যও ছিল অনেক বিস্তৃত। এক্ষেত্রে যথেষ্ট সফল ছিলেন তিনি। একইসঙ্গে তার আখেরাতের ফিকির দুনিয়াবি চিন্তার চেয়ে বেশি ছিল। ব্যবসা-কারবারের পুরোদম ব্যস্ততার পাশাপাশি তিনি অধিক পরিমাণে আল্লাহ তাআলার যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ( তাহদীসে নিয়ামত : ২২)

তাঁর দৈনিক  মা’মুলাত ও যিকিরের সর্বমোট সংখ্যা ছিল প্রায় বিশ হাজারের কাছাকাছি। একটা সময়ে রাতে ইশার নামাজের পর দাঁড়িয়ে চার হাজার বার দুরুদ পড়ার নিয়ম ছিল।

তাহাজ্জুদের এমন অভ্যাস ছিল যে, মাওলানা মনযুর নোমানী রহ লিখেন; আব্বাজান রহ.-এর ইন্তেকালের পর আম্মাজানকে জিজ্ঞেস করলাম, আব্বাজানের কখনো কি তাহাজ্জুদের নামায কাযা হয়েছে?  তিনি বললেন, অনেক আগে কখনো-কখনো হয়ে যেতো। তবে যেদিন কাযা হতো ওইদিন রোযা রাখতেন। কিন্তু ত্রিশ বছর যাবত তাহাজ্জুদ কখনো কাযা হতে দেখেনি। (সুবাহানাল্লাহ ) আব্বাজান  ১৪৬৭হি রমজান মাসে তাসবীহ হাতে জিকির অবস্থায় ইন্তেকাল করেন ‘ ( হায়াতে নোমানী : ৩৫)

শিক্ষাজীবন

মাওলানা নোমানী রহ.-এর  শিক্ষা জীবনের বৃত্তান্ত, তাঁর লিখিত আত্মজীবনী ও  তৎসংশ্লিষ্ট গ্রন্থগুলোতে বিস্তারিত রয়েছে। এখানে সংক্ষেপে কিছু বিষয় তুলে ধরছি।

মাওলানা নো’মানী রহ. নিজের শিক্ষাজীবন সাম্ভালের বাইরে দারুল উলুম ছাড়াও মোট চার বছর কাটিয়েছেন। আজমগড় জেলার মৌ গ্রামের দারুল উলুম মাদ্রাসায় তিন বছর। সেখানে মাওলানা নো’মানী রহ. মা’কুলাত ও দর্শন শাস্ত্রের যেসমস্ত কিতাব পড়েছেন, আজ আমাদের অনেক তালিবে ইলমও সেগুলোর নাম শুনেননি বা নাম শুনলেও দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এখানে সংক্ষেপে শুধু নাম উল্লেখ করছি।

میر زاہد ،  میبذی ، حمد اللہ ،  ، قاضی مبارک ، شرح سلم، میر زاہد ملا جلال ، حاشیہ بحر العلوم، صدرا، شمس بازغہ ، خیالی، امور عامہ ، توضیح ، تلویح،

এছাড়া তাফসিরে জালালাইনেরও কিছু অংশ পড়েছেন।

মাওলানা নোমানী রহ, মৌ তে পড়ার আগে একবছর দিল্লির মাদ্রাসা আবদুর রব–এ পড়েছেন, ওই বছরই হযরত শাইখুল হিন্দ রহমতুল্লাহি আলাইহির যিয়ারতের সৌভাগ্য হয়। বিস্তারিত হায়াতে নোমানী : ৪৯ -৫১; তাহদিসে নেয়ামত : ১২১ – ১২৬ )

সর্বশেষ শিক্ষাজীবনের শেষ দু’বছর কাটিয়েছেন দারুল উলুম দেওবন্দে। মিশকাত ও দাওরায়ে হাদীস।

যাদের কাছ থেকে ইলম অর্জন করেছেন

এক. মাওলানা মুফতি নাঈম লুধিয়ানভী রহ.

দুই. মাওলানা কারীম বখশ রহ.। যার কাছে দিল্লি ও মৌ তে অধিকাংশ কিতাব পড়েছেন। এছাড়া প্রাথমিক, মাধ্যমিক শিক্ষার কোন উস্তাযের নাম পাওয়া যায়নি ।

দারুল উলুমে দেওবন্দে মাওলানা নোমানী রহ এর উস্তাদগণ

এক. হযরত মাওলানা সিরাজ আহমদ রশিদী রহ. । যিনি হযরত ইমামে রব্বানী রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহমতুল্লাহি আলাইহির শাগরিদ। মাওলানা নোমানী রহ তাঁর কাছে মিশকাত পড়েছেন।

দুই. শাইখুল আদব হযরত মাওলানা ইযায আলী আমরুহী রহমাতুল্লাহ আলাইহি।  প্রথম বছর তাঁর কাছে “হিদায়া আখেরাইন”  “সাবে মুআল্লাকা” এবং দ্বিতীয় বছর “তাফসীরে বায়যাবী সূরা বাকারা” পর্যন্ত (যা ওই সময় দাওরা হাদিসে পড়ানো হতো) এবং  “শামায়েলে তিরমিযি” পড়েছেন।

তিন. আল্লামা ইবরাহীম বালয়াবী রহমাতুল্লাহ আলাইহি। মাওলানা নোমানী তাঁর কাছে কোনো দরসি কিতাব পড়েননি। যেহেতু আল্লামা বালয়াবী রহ. মাকুলাতের ইমাম ছিলেন, মাওলানা নোমানী রহ.-এর  ও এই ফনের সাথে ছিল বিশেষ সম্পর্ক। তাই তিনি সহ আরও কয়েকজন তালেবে ইলম ব্যক্তিগতভাবে মাওলানার কাছে মা’কুলাতের কোন কিতাব পড়ার আবেদন জানালে তিনি তাদের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তাদেরকে  ‘শরহে ইশারাতে তূসী”-র দরস দেন।

চার. হযরত মাওলানা মুফতি আজিজুর রহমান উসমানী রহ.

পাঁচ. হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আসগর হুসাইন মিয়া সাহেব রহ.

ছয়. হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ.

সাত. হযরত মাওলানা রাসূল খান হাযারভি রহ.

আট. মুহাদ্দিসুল আসর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ.

মাওলানা মনজুর নোমানী রহ অন্যান্য উস্তাদগণের তুলনায় হযরত শাহ সাহেব রহ. দ্বারা বেশি প্রভাবিত ছিলেন। মাওলানা নোমানী রহ. লিখেছেন, আমাদের সময়ে তালিবে ইলমগণ নিজেদের ইসলাহের জন্য কোনো মুসলিহের সাথে ইসলাহি সম্পর্ক গড়ে তুলতো। কেউ হয়তো দেওবন্দেই হযরত মাওলানা মুফতী আযীযুর রহমান মুজাদ্দেদি নকশবন্দী রহ-এর কাছে বাইয়াত হতো। কেউ থানাভবনে হযরত থানভী রহ. এর সাথে সম্পর্ক গড়তো। আবার কেউ সাহারানপুরে হযরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারনপুরী রহ এর কাছে নিজেকে সঁপে দিতো।

মাওলানা বলেন, বছর শেষে এ বিষয়ে যখন  চিন্তা করলাম তখন জীবিত আকাবিরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুহাব্বাত ও অন্তরের টান আমি হযরত শাহ সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহির প্রতিই অনুভব করলাম। অথচ তখন সবার মাঝে এ কথা প্রসিদ্ধ ছিল যে,  শাহ সাহেব কাউকে বাইআত করেন না। তারপরেও আমি বার্ষিক পরীক্ষার শেষ দিন ইশার পর হযরতের খেদমতে উপস্থিত হলাম। তিনি তখন একা ছিলেন । হযরতের কাছে যখন কথাটি ব্যক্ত করলাম তিনি আমাকে তখন অন্যান্য আকাবিরদের কাছে যেতে বললেন। অতঃপর কয়েকবার দরখাস্ত করার পর বাইআত করে নেন।

শাহ্ সাহেব রহ. ওই বছরের দাওরার তালেবে ইলমদের ওপর এই পরিমাণ সন্তুষ্ট ছিলেন যে তিনি বলেছেন–

« ١٧ سال بعد ایسی جماعت دورہ میں آئی »

সতের বছর পর এমন দাওরার জামাত এসেছে।

বিস্তারিত হায়তে নুমানী : ৪৭-৫৬; তাহদিসে নিয়ামত : ৩০-৩৫

সমসাময়িক বুযুর্গদের সাথে সম্পর্ক: 

সমসাময়িক বুজুর্গদের অনেকের সাথে মাওলানা নোমানী রহ.-এর অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক ছিল। তাঁদের মজলিসে তিনি আসা-যাওয়া করতেন। চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসতেন। এসবের কিছু নমুনা মাওলানা নোমানী রহ. নিজেও লিখে গেছেন। এখানে বিশেষ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি।

দায়ী ইলাল্লাহ মাওলানা ইলিয়াস রহ. হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. মাওলানা আব্দুল কাদের রায়পুরী রহ. হযরত মাওলানা শাহ ওয়াসি উল্লাহ্ রহ.  হযরত মাওলানা হুসাইন আলী সাহেব মুজাদ্দেদী রহ. শাইখুল আরব ওয়াল আজম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুশ শকুর ফারুকী মুজাদ্দেদী রহ. শাইখুল হাদিস মাওলানা যাকারিয়া রাহ. এবং মুফাক্কিরে ইসলাম মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ.।

দ্বীনি খেদমত

হযরত মাওলানা মনযুর নোমানী রহ. দরস-তাদরীস ও শিক্ষকতার তুলনায় দ্বীনের অন্যান্য অঙ্গনে নিজের জীবনকে ওয়াকফ করেছেন। তবে দরস-তাদরীসের সঙ্গেও একেবারে সম্পর্কহীন থাকেননি।

ফারাগাতের পর প্রথম বছর নিজ গ্রামের “মাদরাসা মুহাম্মদিয়্যায়” দরস-তাদরীসের সিলসিলা শুরু করেন। এর পরের বছর আমরুহার “ইসলামিয়া মাদরাসায়” লাগাতার তিন বছর খিদমত করেন।

এরপর মাওলানা নোমানী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজেকে দ্বীনের অন্যান্য অঙ্গনের সাথে যুক্ত করে ফেলেন। যেহেতু ছোটবেলা থেকেই মুনাযারার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল, তাই এই অঙ্গনে জীবনের দীর্ঘ একটা অংশ ব্যয় করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। পরবর্তিতে কয়েকটি মুনাযারা গ্রন্থবদ্ধও হয়েছে। যেমন কিছুদিন পূর্বে    “ফুতুহাতে নুমানিয়্যাহ” নামে পাঁচটি মুনাযারার সঙ্কলন আটশত আশি পৃষ্ঠা ব্যাপী পাকিস্তান ও ভারত থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

মাওলানা নোমানি রহ. দ্বীনের কাজে দেশ-বিদেশে অনেক সফর করেছেন। পাকিস্তানে তিনবার, দক্ষিণ ও উত্তর আফ্রিকা এবং পবিত্র হেজাযেও কয়েকবার গিয়েছেন।

রচনা-লেখালেখি 

মাওলানা নোমানীকে আল্লাহ তাআলা লেখনীর অসাধারণ শক্তি দান করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় অনেক গ্রন্থ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। এখানে বিশেষ কিছু গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরছি।

এক.  « سیف یمانی » এটা “ইলমুল গায়েবের” আকিদা বিষয়ক। এর পূর্বে “রিশাদুল আখয়ার” নামে এই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত একটি পুস্তিকা লিখেছেন। বড়ো বড়ো আকাবিরগণ পুস্তিকাটির প্রশংসা করেছেন। তন্মধ্যে হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী, হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী, মুহাদ্দিসে কাবীর আল্লামা হাবিবুর রহমান আযমী, হযরত মাওলানা জাফর আহমদ থানভী, হযরত মাওলানা আসাদুল্লাহ সাহেব রহ. বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় দেড়শ। কিতাবটির সর্বপ্রথম এডিশন হিন্দুস্তান ভাগ হওয়ার পূর্বে ১৩৪৮-৪৯ হিজরিতে বেরিয়েছে। এরপরও কয়েকবার প্রকাশিত হয়েছে।

দুই. « بوارق الغیب »  এটাও ইলমে গায়েব সংক্রান্ত। এ গ্রন্থের দু’টো অংশ। প্রথমাংশে কুরআনের চল্লিশ আয়াত এবং সেগুলোর তাফসীরের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হাদীস, বিভিন্ন সাহাবা-তাবেয়ীনদের বক্তব্য বরেণ্য মুফাসসিরীনদের বরাতে এনে দলিলভিত্তিক আলোচনা করেছেন। এই অংশ তিনশ পৃষ্ঠা জুড়ে। দ্বিতীয় অংশে দেড়শ হাদীস এনেছেন। এটাও প্রায় দুইশ পৃষ্ঠা সম্বলিত।

এ ছাড়া এ বিষয়ে মাওলানা  আরও কয়েকটি রিসালা লিখেছেন। যেমন কবর পূজারী বিরুদ্ধে লিখেছেন-

(  ١ ) مومن کی پہچان ازروئے قرآن   (٢) ستہ ضروریہ ( ٣) حاضر وناظر (٤) تیجہ (٥) ہدایت قادریہ یا ہماری گیارھویں شریف

তিন. « اسلام کیا ہے » এটি মাওলানার একটি মকবুল কিতাব। জনসাধারণের জন্য ইসলামের পরিচয় ও প্রাথমিক বিধি-নিষেধ অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী করে পেশ করেছেন। এর সর্বপ্রথম এডিশন ১৯৫০ সনে প্রকাশিত। প্রকাশের ধারা এখনও অব্যাহত । উর্দু, হিন্দি, বাংলা, ইংরেজি, এ চার ভাষায় পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয়েছে।

চার. « دین و شریعت » এ  গ্রন্থটি একটু শিক্ষিত সমাজের উপযোগী করে লেখা। ভূমিকা লিখেছেন হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.। কিতাবটির ইংরেজি এডিশন  «Islam Faith and Practice » নামে ছেপেছে।

পাঁচ. « قرآن آپ سے کیا کہتے ھے » এটাও প্রায় দুইশ ছেষট্টি পৃষ্ঠাব্যাপি। প্রথমে “আলফুরকানে”  “কুরআনী দাওয়াত” নামে প্রকাশিত হয়। এর ইংরেজি এডিশন ( Qura’n and You ) নামে ছেপেছে।

ছয়. দরসে কুরআন। এটা মাওলানার কুরআনের দরসের একটি সংকলন। এতে মোট সাতান্নটি দরস রয়েছে।প্রায় ছয়শ আটাশ পৃষ্ঠা সম্বলিত।

সাত. মাআরিফুল হাদীস,  আট খন্ডে সমাপ্ত। এর প্রকাশনার ধারাবাহিকতা শুরু ১৩৭৬হিজরী /১৯৫৪ সন থেকে । এই কিতাব খুবই প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভারত, পাকিস্তান থেকে এর অনেকগুলো এডিশন বেরিয়েছে। এই কিতাবের অষ্টম খন্ড উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা যাকারিয়া সাম্ভালী সাহেব মুকাম্মাল করেছেন। যিনি হযরত নোমানী রহ. এর ভাতিজা ও জামাতা। বাংলা ভাষায় এর দুটো অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে। অপরটি এমদাদিয়া লাইব্রেরী থেকে।

আট :  « قادیانی کیوں مسلمان نہیں » এটা কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে লিখিত হযরত মাওলানার প্রকাশিত কিছু প্রবন্ধ সংকলন। বাংলায়ও অনুবাদ হয়েছে।

নয় : «ایرانی انقلاب، امام خمینی اور شیعیت   » এটাও মাওলানার মকবুল একটি  কিতাব। যাতে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে শিয়াদের বিরুদ্ধে খুবই দলিল ভিত্তিক আলোচনা করেছেন তিনি। যা সময়ের অতি প্রয়োজনীয় একটি কাজ ছিল। শিয়াদের লিখিত গ্রন্থাবলি থেকে বিভিন্ন অংশ উল্লেখ করে তাদের ভ্রান্ত আকিদার ব্যাপারে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। প্রথমে কিছু অংশ আলফুরকানে প্রকাশিত হয়েছে। কিতাবটি প্রায় তিনশ’ পৃষ্ঠার। বাংলা ভাষায় রূপান্তর করেছেন বাংলার কিংবদন্তি মাওলানা মহিউদ্দিন খান রাহ.। মদিনা পাবলিকেশন্স থেকে কয়েকবার এটি প্রকাশিত হয়েছে।

দশ. « الفیة الحديث  »  ১৯৭০ সনের কাছাকাছি সময়ে দারুল উলুমের মজলিসে শুরার পক্ষ থেকে মাওলানা নোমানীকে পাঠদানের উপযোগী করে হাদীসের একটি গ্রন্থ তৈরির আবেদন করা হয়। যা মিশকাতের পূর্বে তালিবে ইলমদের কে পড়ানোর উপযোগী হবে। আবেদনের পরিপেক্ষিতে মাওলানা নোমানী এই গ্রন্থটি রচনা করেন। গ্রন্থটি বিভিন্ন মাদ্রাসার পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। কিতাবটির অনেকগুলো সংস্করণ বিভিন্ন আলেমদের তাহকীক, ব্যাখ্যা ও টীকাসহ বেরিয়েছে।

আরো কিছু গ্রন্থের নাম:

১ :  ملفوظات حضرت مولانا الیاس ( উর্দু, হিন্দি, বাংলা )

২ : تصوف کیا ہے ( উর্দু , বাংলা )

৩ : تذکرہ امام ربانی مجدد الف ثانی

৪ : آپ حج کیسے کریں ( উর্দু , হিন্দি )

৫ : آسان حج ( উর্দু , হিন্দি

৬ : کلمۂ طیبہ کی حقیقت ( উর্দু , বাংলা )

৭ : نماز کی حقیقت ( উর্দু , বাংলা )

৮ : برکات رمضان

৯ : منتخب تقریریں ( উর্দু , বাংলা )

১০ : کفر و اسلام کے حدود اور قادنیت

১১ : قادنیت پر غور کرنے کا سیدھا راستہ

১২ : فیصلہ کن مناظرہ

১৩ : قرآن اور صاحب قرآن کا تعارف

১৪ : انسانیت زندہ ہے

১৫ : مسئلہ حیات النبی

১৬ : عقیده علم غیب

১৭ : میری طالب علمی ( উর্দু , বাংলা )

১৮ : حضرت شاہ اسماعیل شہید رح اور معاندین اہل بدعت کے الزامات

১৯ : مولانا مودودی کے ساتھ میری رفاقت کی سرگزشت اور اب میرا موقف ( উর্দু , বাংলা )

২০ : شیخ محمد بن عبدالوہاب کی خلاف پروپیگنڈہ اور علماء حق پر اسکے اترات ( উর্দু , আরবী, বাংলা)

এছাড়া মাওলানার আরো অনেকগুলো ছোট-বড় গ্রন্থ রয়েছে। আছে আরো অ-নে-ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ , যা তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আল-ফুরকান সহ বিভিন্ন পত্রিকায় লিখেছেন। যদি কোন আহলে ইলম সেগুলো কে জমা করেন তাহলে কয়েকখন্ডের এক বিশাল ইলমী ভাণ্ডার উম্মত হাতে পাবে। “হায়াতে নোমানী” কিতাবের পরিশেষে ছয়শ পঁয়ষট্টি পৃষ্ঠা থেকে ছয়শত একানব্বই পৃষ্ঠা পর্যন্ত আল-ফুরকানে প্রকাশিত মাওলানার সমস্ত প্রবন্ধের সংখ্যাভিত্তিক তালিকা দেয়া আছে।

পারিবারিক জীবন 

পারিবারিক জীবনেও মাওলানা অনেক সুখী ছিলেন। আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রেখে গেছেন। যা তাঁর জীবনী গ্রন্থগুলোতে রয়েছে এবং কিছু কিছু তিনি নিজেও “আল ফুরকানে’ লিখেছেন।

মাওলানা দু’বার বিয়ে করেছেন। প্রথম বিয়ে হয়েছে ১৯২৫ সনে। এই ঘরের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে ছিলেন। এক ছেলে এবং উভয় মেয়ে শিশুকালেই মারা যান। বাকি দুই ছেলে মাওলানা আতিকুর রহমান ও হাফিজুর রহমান সাহেব। উভয় জন যোগ্য আলেম ও লেখক ছিলেন।

এই আহলিয়া বিবাহের আঠারো বছর পর ইন্তেকাল করেন।

এরপর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। এই ঘরে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জন্ম হয়। ছেলে দুজন মাওলানা হাসসান নোমানী ও মাওলানা খলীলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী সাহেব। উভয়জনই পিতার ন্যায় উম্মতের খিদমাত করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে মাওলানা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী সাহেব দা,বা। ভারতের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণের মধ্যে তাকে গণ্য করা হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর হায়াতে বরকত দান করুন।

ইন্তিকাল

এই ক্ষণজন্মা মনীষী দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৪১৭ হিজরীর যিলহজের সাতাশ তারিখ সন্ধ্যা আটটা ত্রিশ মিনিটে ইন্তিকাল করেন।  পরের দিন সকাল নয়টায় ওসিয়ত অনুযায়ী নদওয়াতুল উলামার মাঠে হযরত ক্বারী সিদ্দিক আহমদ বান্দভী রহ.-এর ইমামতিতে জানাযার নামাজ আদায় করা হয়।