প্রাচ্যবাদ: পরিচয় ও প্রকৃতি

মাওলানা আবদুর রাযযাক নদভী ।।

মুসলিম দুনিয়ার সর্বত্র আজ পাশ্চাত্য সভ্যতার আধিপত্য। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি গ্রহণ করে মুসলিমরা নিজেদের পরিচয় ভুলে গেছে। প্রশ্ন হলো, পশ্চিমাদের সফলতার পিছনে কোন্ শক্তি কাজ করছে? কী তাদের মাধ্যম? উত্তর বেরিয়ে আসে, তাদের অস্ত্র হলো প্রাচ্যবিদ্যার মাধ্যমে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার, অত:পর সে অনুযায়ী মিশন বাস্তবায়ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রাচ্যবাদ সম্পর্কে মুসলমানদের বিরাট অংশই অবগত নয়। তাই প্রয়োজন, এর পরিচয় ও প্রকৃতি সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। এই লেখায় প্রাচ্যবাদের পরিচয় ও প্রেক্ষাপট সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

বিজ্ঞাপন

পরিচয়: প্রাচ্যবাদ মানে প্রাচ্য সংক্রান্ত বিদ্যা। আর যে প্রাচ্যবিদ্যা চর্চা করে তাকে বলা হয় প্রাচ্যবিদ। আরবিতে প্রাচ্যবাদকে বলা হয় استشراق। এ শব্দটি মূলত ছিলشرق । মানে প্রাচ্য। باب استفعال থেকে এসে অর্থ হয়েছে প্রাচ্যকে কামনা করা অর্থাৎ প্রাচ্যকে জানতে চাওয়া। আর প্রাচ্যবিদকে বলে مستشرقون। ইংরেজিতে প্রাচ্যকে orient, আর প্রাচ্যবিদ্যাকে বলা হয় orientalism আর প্রাচ্যবিদকে বলে orientalist।

পরিভাষায় বিভিন্নজন ভিন্ন দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে এর সংজ্ঞা দিয়েছেন। তবে সর্বোপরি বলা যায়, শব্দটি ‘ব্যাপক’ ও ‘বিশেষ’ দুই অর্থ দিতে পারে। ব্যাপক অর্থে প্রাচ্যের যে কোন স্থান, ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে পশ্চিমা গবেষণা। বিশেষ অর্থে ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে ইহুদী-খ্রীষ্টানদের গবেষণা ও ইসলামচর্চা।

চর্চার প্রেক্ষাপট :

পাশ্চাত্য জগত তথা ইহুদী-খ্রীষ্টানরা কেন প্রাচ্য এবং ইসলামী জ্ঞান চর্চায় মগ্ন হলো? এ সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না। তবে একটা প্রেক্ষাপট হলো; ক্রুসেড যুদ্ধগুলোতে যখন খ্রীষ্টান বাহিনী একের পর এক পরাজয় বরণ করল এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী রহ.-এর কাছে ইউরোপের সম্মিলিত বাহিনী চুড়ান্তভাবে পরাজিত হল তখন তারা সম্মুখযুদ্ধ হতে নিরাশ হয়ে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করলো। তারা চিন্তা করলো মুসলমানদের মুল উৎস শক্তি যদি নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যায় তাহলেই মুসলমানদের পরাস্ত করা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যেই তারা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে নিশ্চিহ্ন করার হীন কৌশল বাস্তবায়নে নেমে যায়। শুরু করে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা। যার প্রাতিষ্ঠানিক ও বর্তমানরূপ استشراق তথা প্রাচ্যবাদ।

প্রাচ্যবিদ্যা চর্চা কখন শুরু হয় 

নিশ্চিতরূপে একথা বলা মুশকিল যে, ঠিক কোন সময়টায় প্রাচ্যবাদের সূচনা হয় এবং কোন ব্যক্তি এর জনক। তবে যতটুকু জানা যায় মুসলমানরা যখন স্পেনে জ্ঞানের বিস্তার ঘটালো তখন কিছু পাদ্রী কোরআন ও আরবি সাহিত্য পড়াশুনা শুরু করে। তারা মুসলিম বিজ্ঞানীদের ছাত্রত্ব গ্রহণ করে বিভিন্ন শাস্ত্র বিশেষ করে দর্শন, চিকিৎসা এবং গণিত বিষয়ে পারদর্শীতা অর্জন করে এবং আরবি গ্রন্থাবলি তাদের ভাষায় অনুবাদ করে।

প্রথম পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন পাদ্রী হলেন:- ‘জারবাট’ ৯৯৯ সাল, বাতরত ১০৯২-১১৫৬ সাল ও গেরাডডি ক্রেমন ১১১৪-১১৮৭ সাল। এরা নিজ দেশে ফেরার পর আরব সংস্কৃতি ও প্রসিদ্ধ জ্ঞানীদের গ্রন্থাবলি ছড়িয়ে দিলো। তারা আরবি ভাষা চর্চার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরী করে সেগুলোতে তা চর্চা করতো এবং লাতিন ভাষায় অনুবাদ করতো। কেননা তখন পুরো ইউরোপজুড়ে আরবির কোন বিকল্প ছিল না। জ্ঞানের একমাত্র ভাষা ছিল আরবি। এভাবে ছয়শত বছর আরবি গ্রন্থাবলির উপর তারা নির্ভর ছিল এবং প্রতি যুগেই কিছুসংখ্যক লোক শুধু আরবি ভাষা ও ইসলামচর্চায় মগ্ন থাকতো। অষ্টাদশ শতাব্দি পর্যন্ত এভাবেই চললো। অতপর যখন তারা ইসলামী বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করলো আর মুসলমানদের শক্তি ক্রমশ দুর্বল হতে লাগল তখন তারা বিশৃংখলাকে কাজে লাগিয়ে মুর্খ মালিকদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে আরবি জ্ঞানের পান্ডুলিপিসমূহ ক্রয় করে অথবা চুরি করে তাদের দেশে স্থানান্তরিত করে। ঊনবিংশ শতাব্দির শুরু সময়ে যা আড়াই লক্ষ খন্ডে গিয়ে পৌছে। ১৮৭৩ সালে প্যারিসে প্রাচ্যবিদদের প্রথম সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তারা প্রাচ্যের বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা উপস্থাপন করে। এ ধারা আজও চলমান।

প্রাচ্যবাদের ক্ষেত্র বা আলোচ্য বিষয়: প্রাচ্যবাদের সূচনা হয়েছে আরবি ভাষা এবং ইসলাম চর্চার মাধ্যমে; কিন্তু বর্তমানে প্রাচ্যের যত ধর্ম, বর্ণ, জাতি এবং সংস্কৃতি রয়েছে সব গুলোই তাদের চর্চার বিষয়। শুধু ইসলাম নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তবে ইসলামী জ্ঞান ও কৃষ্টি-কালচার নিয়ে চর্চা ও গবেষণা এখনো তাদের মুখ্য বিষয়। এর থেকে তারা একটুও পিছপা হয়নি।

প্রাচ্যবাদের কারণসমূহ:

১। ধর্মীয়কারণ- প্রাচ্যবাদের প্রধান কারণ হলো ধর্মীয়। এর মধ্যে মোট তিনটি বিষয় রয়েছে।

একটিহলো পাশ্চাত্য জগত । মানুষ তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের দুর্বল দিকগুলো এবং পাদ্রীদের অপকর্ম সম্পর্কে যেন অবগতি লাভ না করে সেজন্য তাদের দৃষ্টিকে এদিক থেকে ফিরাতে ইসলামের ব্যাপারে মন্দ ধারণা পাশ্চাত্যের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া।

দ্বিতীয়টি হলো ইসলামের শক্তিমত্তা ও আধ্যাতিকতার ভয়ে এবং ইসলাম যাতে বিজয়ী রূপে টিকে থাকতে না পারে সেজন্য ইসলামের বিকৃতি সাধন এবং ভ্রান্তিসমূহ অনুপ্রবেশ ঘটানো।

তৃতীয়টি হলো- খ্রীষ্ট্যবাদ ও ইহুদীবাদ প্রচার এবং মিশনারী তৎপরতা জোরদার করা। সাথে সাথে পরবর্তী মুসলিম প্রজন্মের মাঝে ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়া যাতে তারা খ্রীষ্ট্যবাদ গ্রহণ করে এবং ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষী হয়ে যায়।

২। সাম্রাজ্যবাদী কারণ: এর মধ্যে দুটি বিষয়:

একটি হলো- ক্রসেডের যুদ্ধে পরাজয়ের পর পশ্চিমা বিশ্ব আরব রাষ্ট্রগুলো দখল করার আশা ছেড়ে দেয়নি বরং তারা এসব রাষ্ট্র গুলোর ধর্ম সভ্যতা ও ঐতিহ্য স্টাডি করার প্রতি মনোযোগী হয়, যেন তা দুর্বল করে দিতে পারে এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে যেন সহযোগীতা করতে পারে। যখন তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সেগুলোত প্রতিষ্ঠা হয় তখন জাতিসমূহের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে দুর্বল করার প্রয়াস চালায়, তারা তাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়। তাদের মূল্যবোধ, নিজস্ব আকীদা-বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। ফলে তারা আর নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়াতে পারে না। সর্বক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের কাছ থেকে মানদন্ড গ্রহণ করে।

দ্বিতীয় বিষয় হলো- প্রাচ্যের দেশগুলোতে যেসব ঐতিহাসিক জাতিসত্তাসমূহ রয়েছে, ইসলাম আসার কারণে তাদের ভাষা চিন্তা চেতনা ও আকিদা-বিশ্বাস একাকার হয়ে গিয়েছিল। এবং ইসলামের ছোঁয়া পেয়ে উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছিল। তাদের মাঝে আবার পূর্বের জাতীয়তা জাগ্রত করার চেষ্টা চালায়, যেমন মিশরে ফিরাউনী মতবাদ; সিরিয়া, লেবানন এবং ফিলিস্তিনে ফিনীসীয়, ইরাকে অ্যাসিরীয় ইত্যাদি। যেন উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ শক্তি বিনষ্ট হয়, স্বাধীনতা ও নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।

৩। বাণিজ্যিককারণ: পাশ্চাত্যের দেশগুলো প্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এর মাধ্যেমে তারা তাদের পণ্য প্রাচ্যে বাজারজাত করে এবং প্রাচ্যের খনিজ সম্পদ সল্পমূল্যে ক্রয় করে। আর প্রাচ্যের নিজস্ব কল-কারখানা ও উৎপাদন শক্তি ধ্বংস করে দেয়।

৪। রাজনৈতিককারণ: বিভিন্ন ইসলামী রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর সেসব দেশে তাদের দুতাবাসের অধিনে সাংস্কৃতিক এটাচি প্রতিষ্টা করে এবং এর মাধ্যমে সেসব দেশের বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক লোকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের আদর্শ চেতনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে এবং পশ্চিমা আদর্শ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। আরব ও প্রাচ্যের দেশগুলোকে পরস্পর দ্বন্দে জড়িয়ে রাখার জন্য ষড়যন্তের জাল বিস্তার করে। আরব রাষ্ট্রগুলোকে পরামর্শ ও সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। নেতৃত্বস্থানীয় লোকজন ও সাধরণ মানুষের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করে। যেন ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যবাদের জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়।

৫। জ্ঞানগতকারণ: প্রাচ্যবিদদের খুবই অল্পসংখ্যক একটা শ্রেণী রয়েছে যারা ইসলাম ও আরবি ভাষা চর্চা করে নিছক জ্ঞানচর্চা হিসেবে। কোন ধরণের ষড়যন্ত্রের মানসিকতা তাদের থাকে না। একারণে তাদের গবেষণা অনেক সময় সত্যকে উম্মোচন করে দেয়। অনেকে আবার ইসলাম গ্রহণে ধন্য হয়। তাই তারা সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সামাজিক কোন ধরণের সহযোগিতা পায় না। তখন তাদের গবেষণাও কারো কাছে গ্রহণীয় হয় না। আবার মৌলিক ইসলামী জ্ঞান না থাকার কারণে ক্রটি থেকেও মুক্ত নয়।