একজন বটবৃক্ষের ছায়ায়

আহমদুল্লাহ আল জামী।।

সোনারগাঁয়ের বারদি বাজারে যখন সিএনজি থেকে নামি তখন কাঠফাটা রোদ মাথার উপরে। মধ্যাকাশে সূর্য ঝাঁ ঝাঁ করছে। একটা টঙ দোকানে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। পরবর্তী গন্তব্য ‘পরমেশ্বরদি মাদরাসা’। রিকশার পথ। চোখমুখ লাল দেখে চালক রিকশার হুড ওঠাতে চাইলেন,না করে দিলাম। কেন যেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর ইলমি রিহলার কথা মনে পড়লো। মরুভূমির লু হাওয়ায় তার ঝলসে যাওয়া চেহারা ও ধুলোমলিন ভূষণ দেখে হাদিস সংরক্ষণকারী সাহাবী বলেছিলেন-

বিজ্ঞাপন

يا ابن عم رسول الله! ما هيئتك!!

রিকশা চলছে পরমেশ্বরদির দিকে। বিজন এলাকা। একেবারে অজপাড়া গাঁ। নিবিড় নিঝুম পল্লী।পথের একধারে বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ। আরেকধারে মেঘনার দীঘল জলরাশি। বাতাসে মন উদাস করা মাটির সোঁদা ও জলজ গন্ধ।হারিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম প্রকৃতির ডাকে। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করেছি মুবারক ইলমি রিহলার সম্মানে। রিহলার ইচ্ছা যখন করেছিলাম তখন থেকেই একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল হৃদয়মনে। আবার চিন্তার আকাশে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ভারী হয়েও উঠেছিল। শঙ্কিত ছিলাম এই ভেবে যে, মুবারক এই রিহলার সৌভাগ্য চুম্বন করতে পারবো তো! কারণ, নির্ধারিত সময় ছিল ‘এগারোটা থেকে দশ পনের মিনিট। ‘আর আমি যখন পরমেশ্বরদি মাদরাসায় পৌঁছি তখন ‘বারোটা বেজে ঊনচল্লিশ মিনিট!’

সাহেবের আন্তরিকতায় ও ইচ্ছায় আমি রিহলার সৌভাগ্য চুম্বনটুকু করতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। খাইরুল কুরূন থেকে প্রচলিত রিহলার এই সুন্নাহর অংশ হতে পারাটা সৌভাগ্যের। আল্লাহ তাওফিক দিয়েছেন এই সুন্নাহর অংশ হওয়ার আলহামদুলিল্লাহ। আমার হৃদয়ের গভীরতর আবেগ দুআ ও মুহতারাম আতাউল করিম মাকসুদ।

আমার শিক্ষাজীবনের শুরু-শেষ থানবিয়্যাত কিংবা থানবী রহঃর তাযকিরার লালন ভূমিখ্যাত ঢালকানগরে।তাই,মাদানি রহঃর প্রতি আমার একটা হৃদয়জাত টান আছে এক অদৃশ্য কারণে। কাজী সাহেবের ‘বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সুর’র মাধ্যমে মাদানি রহঃ-এর সাথে আমি হৃদয়জ পরিচিত। জুমাবার মুহতারাম যখন বললেন-মাদানি রহঃ-এর খাস শাগরিদ ‘আল্লামা শায়খ হাতেম সাহেব মাদ্দাজিল্লুহুর’ সোহবতে আপনি আমার সাথে চলুন। ব্যস্ততা রেখে হৃদয়ের টান থেকেই রাজি হয়ে যাই।হযরতের অসুস্থতার খবর জেনে অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যেই এই রিহলা শুরু করি।

শান্ত সমাহিত গ্রামীণ পরিবেশে ‘ওলামা মঞ্জিলে’ আমি যখন হযরতের কামরায় প্রবেশ করি তখন তিনি শ্বেতশুভ্র কাপড় পরে বসে আছেন। মাদানি রহঃ-এর তাযকিরায় ভিজে উঠছে তাঁর চোখের কোণ। হযরতের সাথে তাঁর আবেগঘন সুখস্মৃতিতে হেসে উঠছেন আবার কেঁদে উঠছেন অজান্তেই। কী মায়াবী ও আবেগঘন সে দৃশ্য!

আমি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখছি প্রায় শতবর্ষী এই জ্ঞানবৃদ্ধকে। তিনি হাসি কান্নার মধ্যেই খুলে ধরেছেন ইতিহাসের শতবর্ষের পাতা। আমি তাঁর সঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছি দুই চোখ, আর দেখতে পাচ্ছি, ঐ তো আমাদের ইতিহাস, আমাদের পূর্বসূরি আর ধুলো-উড়িয়ে ছুটে চলা দিগ্বিজয়ী অশ্বারোহী। আমাদের আকাবির। আমাদের মাদানি রহিমাহুল্লাহ।

সভ্যভব্য এই লোকটির পুরো জীবনটাই ছিলো সহজসরল, অনাড়ম্বর এবং সাদামাটা। তাঁর চোখের সামনে কত আন্দোলন সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে, কতকিছু ঘটেছে… সাদা, কালো সবকিছুর হাতছানিই এসেছে তাঁর জীবনে। তিনি চাইলেই ন্যায়-অন্যায় বোধে সামান্য তারতম্য করে, চারপাশে জড়ো করে নিতে পারতেনㅡ কোলাহল, প্রাচুর্য ও শক্তির দম্ভ। নিজের করে নিতে পারতেন পার্থিব ঠাঁট ও বৈভব। কিন্তু তিনি ‘সাদা কিংবা কালো টাকা’র হাতছানিকে সরল একটি হাসি দিয়ে উপেক্ষা করে গেছেন বরাবরই।

ইসলামি চেতনার আকাশে যাদের চিন্তাসূর্য সবসময় আলো বিলায়। যাদের সুচিন্তা ও চেতনায় জাতি খুঁজে পায় শাশ্বত চেতনার গম্বুজ। যাদের কথামালা হৃদয় থেকে হৃদয়ান্তরে প্রেরণার সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করে। যাদের প্রতিভার বাতিঘর জ্বলজ্বল করে প্রত্যেক প্রতিভাবান হৃদয়ের চোখে। হযরত মাওলানা হাতেম সাহেব মাদ্দাজিল্লুহু তাদের অন্যতম নিশ্চয়ই।

তিনি বলছিলেন তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি। তাঁর মুরুব্বি নোয়াখালির ‘নূর বখশ রহিমাহুল্লাহর’ কথায় বারবার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছিলেন।

বলেছেন, দারুল উলুম দেওবন্দে তাঁর পবিত্র ইলমি জীবনের কথা;ত্যাগের কথা। সেসময়ের বিখ্যাত ‘মাশায়েখে খামসাকে’ তিনি পেয়েছিলেন। কিভাবে শুষে নিয়েছেন তাদের ইলমের শারাবান তাহুরা, সেসব বলেছেন স্বপ্রনোদিত হয়েই। আঁজল ভরে যাদের ইলম গ্রহণ করেছেন, তারা হলেন-১.শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী ২.শাইখুত তরিকত কারী তাইয়িব ৩. শাইখুল আদব ই’যায আলী ৪. শাইখুল হাইআত বশির আহমদ ৫. শাইখুল মা’কুলাত ইবরাহিম বলিয়াভি রহিমাহুমুল্লাহ। পরম সান্নিধ্যে ও গভীর মনোনিবেশে শুষে নিয়েছিলেন তাঁদের ইলম দর্শন আখলাক আদর্শ স্বপ্ন ও শপথ—সব। এসবের স্মৃতিচারণে তাঁর চোখে আসা পানির দঙ্গলকে মন চেয়েছিল হৃদয়ে ছোঁয়াই। এত বড় বড় মানুষের হাতে গড়া ছাত্র তিনি! অথচ,চলনে বলনে কতটা সরল!কতটা নির্মোহ,কতটা দুনিয়াবিমুখ!

৬৫ বছর আগে ১৩৭৫ হিজরিতে মাদানী রহঃসহ অন্যান্য আকাবিরদের সিহাহ সিত্তার তাকরির লিখেছেন হযরত মাওলানা ‘হাতেম আলী’ সাহেব দা.বা.। ছবি: সংগৃহীত

জীবনে অসামান্য কিছু ত্যাগের কথা তিনি শুনিয়েছিলেন। বলেছেন-১৯৭০ এর দশকের কথা। পাকিস্তানি স্বৈরাচারে বাঙালিরা যখন বিপ্লবমুখর, শেখ মুজিবের তর্জনী হেলনীতে যখন পথ খোঁজে, আশার আলো দেখে নির্যাতিত বাঙালি। সে সময় ‘সত্তরের নির্বাচনে’ তিনি লড়েছেন ‘নেযামে ইসলাম পার্টির’ ক্যান্ডিডেট হয়ে। হিন্দু অধ্যুষিত পরমেশ্বরদিতে জিতেছেন প্রধান দুটি কেন্দ্রে!

‘ফরিদপুরী রহঃ’ তাঁকে বলেছিলেন-“হিন্দুদের এলাকায় নৌকার জোয়াড় ছাপিয়ে আপনি দুই কেন্দ্রে জিতেছেন!এটাই আপনার বিজয়।”

অশ্রু বিগলিত নয়নে বলেছেন তাঁর বাড়িতে ‘পালকিতে চড়ে’ হাফেজ্জীর ছয় বার ও সদর সাহেবের একবার আসার কথা।

‘ফরিদপুরী রহঃ’ যখন বাইতুল মোকাররম প্রতিষ্ঠা করেন তখন তাঁকে খতীব হিসেবে আসতে বলেছিলেন। বলেছিলেন লালবাগের মুহাদ্দিস হবার কথাও। পরম মমতার মা তাঁকে ছাড়তে চাননি, কাছে রাখতে চেয়েছিলেন পুরো জীবন। তিনি সদর সাহেবের কাছে মায়ের কথা বললে তিনি বলেছিলেন-‘তবে থেকে যান। কিন্তু মাওলানা!পরে যেন আফসোস না হয়।’

তিনি অশ্রুসজল হয়েছিলেন তখন। আমাদের বলছিলেন,আমার আফসোস হয়নি। মায়ের কথায় আমি থেকে গিয়েছি। আমার মায়ের সেই কুরবানীর ফসল আজকের ‘পরমেশ্বরদি মাদরাসা’ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বড় কষ্ট করে এই প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে আজকের এই দালানের অবকাঠামোয়।

আমার হৃদয় ভিজে উঠেছিল। আহ! কেমন মানুষ এই অশীতিপর জ্ঞানবৃদ্ধ! শুধু মায়ের কথায় থেকে গেলেন মেঘনা পাড়ের এই অজপাড়া গাঁয়ে। গ্রামের সংগ্রামী জীবনে নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে ঠিক করেছেন মানুষের ঈমান। দাঁড় করিয়েছেন সুফফার নমুনা-পরমেশ্বরদি মাদরাসা। মাদরাসা কেন্দ্রিক মানবতার নিপুণ চাষ করা মেঘনা পাড়ের এ মানুষটির জীবনে ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে সাধনায় দগ্ধ হওয়ার এমন অসংখ্য গল্প!

বেতাকাল্লুফ হওয়াতে মুহতারাম ‘মাকসুদ সাহেব’ হেসে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-এই ‘ওলামা মঞ্জিলের’ দালান কিভাবে করলেন? সত্তরের নির্বাচনের টাকা দিয়ে!?

তিনি বিচলিত হননি, রাগও করেননি। মুক্তোর দানার মতো দাঁতের ফাঁক গলিয়ে বললেন-নির্বাচনে পাঁচশত টাকা জামানত আর পোস্টারিংয়ে একশত টাকা! এইটুকু আমার সম্বল ছিল।আর এই দালান করেছি নব্বই সালে নিজের টাকায়।

কথা বলতে বলতে কিছুক্ষণ পরপরই হারিয়ে যেতেন মাদানী রহঃর তাযকিরায়। সদ্য প্রয়াত বটবৃক্ষ ‘আল্লামা আহমাদ শফীর’ তাযকিরাও করেছিলেন। বলছিলেন,আহমাদ শফী রহঃকে ‘হেদায়া সালেসের’ ‘দেড়শত’ জায়গা তাকরার করানোর কথাও!

বিস্ফোরিত চোখে আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম শতবর্ষী জ্ঞানবৃদ্ধের কথা!দেড়শত জায়গা তাকরার করিয়েছেন যে আহমাদ শফী রহঃকে! তিনি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা নিয়ে ইন্তেকাল করেছেন ক’দিন হলো। অথচ,তিনি এখনো অখ্যাত ‘আল্লামা হাতেম’ মা.জি. হয়ে আছেন! কতটা নির্মোহ তাঁর জীবন! নিস্পৃহ দৃষ্টিতে কেবল আখিরাতকেই দেখেছেন তিনি গোটা জীবন! পার্থিব লালসা কখনোই তাঁকে আচ্ছাদিত করতে পারেনি। সাক্ষী দিয়েছেন মাদানী রহঃ কর্তৃক আল্লামা আহমাদ শফী রহঃর ‘খেলাফতপ্রাপ্তিরও’। একাধিকবার স্পষ্ট শব্দে বলেছেন-আমি সাক্ষী। আমি সাক্ষী।

>শেষকথা-শেষদেখা:

মুহতারাম ‘মাকসুদ সাহেব’ বুখারীর প্রথম হাদিস পড়ে ‘ইযাযত’ নিলেন। কাঁপা কন্ঠে দুরুদুরু বুকে অধম পড়লাম দ্বিতীয় হাদিস। এত বড় মহিরুহের সামনে হাদিস পড়ার সুযোগ কখনো হবে, কল্পনাও করিনি। মনে হচ্ছিল, মাদানী রহঃর সামনে হাদিস পড়ছি! তাঁর জালালাত ও শান আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল যেন।’ওবিহি কলা হাদ্দাসানার’ মধুর উচ্চারণে আমি মাদানী রহঃর শাগরিদের শাগরিদ! আল্লাহ আমাকে আমাদেরকে তাঁর হৃদয়ের ফুয়ূযাত ও রূহানিয়্যাত ভরপুর দান করুন আমীন।

আমি ভেবেছিলাম হযরত মাদানী রহঃর খাস শাগরিদ হওয়ার সুবাদে হযরতও গুরুগম্ভীর হবেন। হয়তো রোদের মত চড়া অথবা একটু কঠোর মেজাজ থাকবে তাঁর। কিন্তু হযরতের সাথে আমি যখন মুসাফাহা করছিলাম, চুমু খেয়েছিলাম তাঁর হাতে, তখন অনুভব করছিলাম আমার ভেতরের সীমানাগুলো ভেঙে যাচ্ছে, ভয়ের সীমানা, ধারণার সীমানা, নানান ভাবনার সীমানা। তিনি আমার ধারণা বদলে দিয়েছেন। তাঁর সরলতা উদারতা আমাকে আপ্লুত করেছে,প্রাণিত করেছে।

প্রায় শতবর্ষী এই বটবৃক্ষের যিয়ারত শেষে পুরোটা পথ ‘তেরশত পঁচাত্তর হিজরিতে’ তাঁর লেখা মাদানী রহঃসহ অন্যান্য আকাবিরদের ‘সিহাহ সিত্তার তাকরির’ বুকে জড়িয়ে ফিরে আসলাম। এই তাকরিরের খাতা নিয়েও আছে তাঁর অবিশ্বাস্য কারামাত!

‘করোনার’ প্রকোপের সময় তাঁর শায়েখ নূর বখশ রহঃ স্বপ্নে বলে গিয়েছেন-‘হাতেম! এই তাকরিরের খাতা বড় যত্ন করে রেখো। এটা যতদিন তোমার কাছে থাকবে, তোমার এলাকায় ‘করোনা’ আসবেনা ইনশাআল্লাহ।’

আসেওনি আলহামদুলিল্লাহ!ভালো আছে মেঘনা পাড়ের মানুষ। ভালো থাকুক দুআ করি।

ফেরার পথে মুহতারাম ‘মাকসুদ সাহেব’ এই প্রসঙ্গে থানবী রহঃর তাযকিরা করলেন। একই ঘটনা ঘটেছে থানবী রহঃর ‘নাশরুত তীবের’ পাণ্ডুলিপির ব্যাপারেও সে সময়ের এক মহামারিতে!

أولئك آبائ فجئني بمثلهم…..

শতবর্ষী এই জ্ঞানবৃদ্ধ এখন প্রায় শয্যাশায়ী। দুআ চেয়েছেন তিনিও;হযরতের সুস্থতার জন্য সকলের কাছে তাঁর হয়ে দুআ চাই আমিও।

فروغ شمع تو باقی رہے گا صبح محشر تک

مگر محفل تو پروانوں سے خالی ہوتی جاتی ہے.

আল্লাহ হযরতের রূহানী ফায়য ও ফায়যান আমাদের দান করুন।আমাদের উপর এই বটবৃক্ষের ছায়াকে দীর্ঘায়িত করুন আমিন।

বিজ্ঞাপন