‘আব্বু বলেছিলেন টাকা হলে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিব’

নুরুদ্দীন তাসলিম।। –বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ঘুরে এসে

‘আব্বু বলেছিলেন টাকা হলে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিব, কিছুদিন বাড়িতে থেকেই পড়’। কিন্তু আব্বু আর ফিরে এলেন না। তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। নারায়ণগঞ্জে মসজিদে তিতাসের গ্যাস লিকেজে বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ আব্দুল আজিজ (৪৫) ভর্তি হয়েছিলেন জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) মারা যান তিনি।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতালের চারতলায় এভাবেই বলছিলেন আব্দুল আজিজের ছেলে আবু সাঈদ।

আবু সাঈদের বাবা আব্দুল আজিজ (৪৫)-এর লন্ড্রী দোকানের উপর নির্ভর করে চলতো সংসার। অসুস্থ মা এলাকায় টিউশনি পড়ান। টিউশনের আয় মায়ের ওষুধেই শেষ হয়ে যায়। বাবাই একমাত্র  সংসারের অবলম্বন।

ছোট্ট  আবু সাঈদ নারায়ণগঞ্জ আমলাপাড়া মাদরাসার নাহবেমীর জামাতের ছাত্র, ছোট বোন তল্লার এক মহিলা মাদরাসায় নাজেরা পড়ে।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের চার তলায় আইসিইউ-এর সামনে ইসলাম টাইমস প্রতিবেদককে আবু সাঈদ বলছিলেন,করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল বাবার লন্ড্রীর দোকান। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় দোকান খুললেও শুধু এর উপর নির্ভর করে সংসার চলায় বাবা এখনো মাদরাসায় ভর্তি করানোর টাকা জমাতে পারেননি। আবু সাঈদের বাবা আর কখনোই টাকা জমাবেন না ছেলের জন্য। আবু সাঈদও আশায় থাকবে না বাবার উপার্জনের। হেসে খেলে সময় কাটানোর বয়স ১৪ বছরের এই কিশোরের। এই বয়সেই তাকে সম্মুখীন হতে হলো কঠিন বাস্তবতার। বাবার সাথে হারাতে হয়েছে ক্যান্সারে আক্রান্ত নানাকে।

এক সাথে স্বামী, বাবাকে হারিয়ে পাগল প্রায় আবু সাঈদের মা আসমা বেগম। দুই সন্তানকে নিয়ে তার সামনের দিনগুলো এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।

এদিকে একই দিনে মারা গেছেন দুর্ঘটনায় দগ্ধ ফরিদ ৫৫। ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থেকে দুর্ঘটনার আগের দিন তিনি এসেছিলেন নারায়ণগঞ্জে ভাইয়ের বাড়িতে। দুই মেয়ে দুই ছেলের জনক ছিলেন ফরিদ মিয়া। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার শরীরের ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। দুই মেয়ের বিয়ে হলেও ছেলে দুজনেই ছোট, তাদের একজন পড়েন নাহবেমীর জামাতে।

দুর্ঘটনায় অন্য অনেক পরিবারের মতো সংসারের একমাত্র উর্পানক্ষম ব্যক্তিটিকে হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার দুটি। অবহেলা আর ব্যক্তিস্বার্থে ভরা সমাজের কেউ কি এগিয়ে আসবে পরিবার দুটির দিকে!

নারায়ণগঞ্জের তল্লায় মসজিদে তিতাসের গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন মাত্র একজন। হাসপাতালে বর্তমানে যারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন তারা হলেন আমজাদ হোসেন, শাহাদাত হোসেন সিফাত ও মো কেনান।

আমজাদ হোসেন (৩৯) একটি গার্মেন্টসের গাড়িচালক। তার শরীরের ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তিনি আইসিইউর ১৯ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জে। বর্তমানে পশ্চিম তল্লা এলাকায় থাকেন। রায়সা (৫) নামে এক কন্যা সন্তানের জন তিনি। স্ত্রীর নাম মৌটুসী আক্তার।

শাহাদাত হোসেন সিফাত স্থানীয় স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি চেষ্টা করছিল। তার শরীরের ২২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।  তার বাবা সপন শেখ ডেকারেটরের কাজ করেন। মো. কেনান (২৪) গার্মেন্টস কর্মী। তার ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।পটুয়াখালী জেলার বাহেরচড় উপজেলার চুন্নু মিয়ার ছেলে তিনি।  পার্থ শঙ্কর পাল বলেন, ভর্তি তিনজনের মধ্যে কারো অবস্থাই আশঙ্কামুক্ত বলা যাবে না।

আরো পড়ুন:

তল্লার ইমাম মাওলানা আ. মালেক নেসারী র., এক নিভৃতচারী আদর্শ মানবের গল্প

ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে বার্ন ইউনিটে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ফরিদ মিয়া

আর ফিরে এলেন না স্বপ্নবাজ তরুণ শেখ ফরিদ, বদলে গেল পরিবারটির গল্প

সরেজমিন প্রতিবেদন: কী ঘটেছিল নারায়ণগঞ্জের সেই মসজিদে

‘ছেলেকে ফিরে না পেলে আর কখনোই হয়তো ক্ষুধার্ত হবো না’

বেড়েই চলেছে মৃতের সংখ্যা, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি তল্লা মাঠ

‘সময় শেষ হয়ে গেলো, আমাকে নামাজ পড়তে দাও’

৫০ হাজার টাকা ‘ঘুষ’ ও ২৪টি জীবনের ট্রাজেডি!

বিজ্ঞাপন