আসুন মসজিদমুখী প্রজন্ম গড়ে তুলি

নুরুল্লাহ হোসাইন ।।

গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ের কথা। কুমিল্লা শহরের বাগিচাগাঁও আবাসিক এলাকার একটি মসজিদে জুমা পড়তে গেলাম। পাশেই একজন ভদ্রলোক বসলেন। দেখে শিক্ষিত মনে হলো। সাথে একটি ছোট্ট বাচ্চা। বয়স চার কি পাঁচ। ছোট্ট মুসল্লি পাঞ্জাবি-টুপি পরে একদম নামাজের সাজে উপস্থিত। মসজিদে আরো অনেক বাচ্চা-কাচ্চা আছে। বাচ্চারা তাদের মতো দুষ্টুমি-খুনসুটি করছে। খুতবার পরে নামাজ দাঁড়ালো। কোনো কারণে পাশের ছোট্ট মুসল্লি নামাজের মধ্যে কান্না শুরু করলো। এতটুকুন একটা বাচ্চা কান্না করতেই পারে। খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। কিন্তু সালাম ফেরানোর সাথে সাথেই টের পেলাম কারো কারো কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক ছিলো না। তারা রীতিমতো বকাবকি শুরু করলেন ছোট্ট মুসল্লির অভিভাবককে। বাচ্চা নিয়ে মসজিদে এসে তিনি যেন মহা অন্যায় করে ফেলেছেন। একেকজনের একেক মন্তব্য। একেকটার চেয়ে একেকটা ভীষণ তীর্যক। প্রতিটি কথাই মসজিদের আদাবের খেলাফ।

ছোট্ট মুসল্লির অভিভাবক বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। কিছু বলা জরুরী মনে করছিলাম। পাশে বড় ভাই ছিলেন, মুসুল্লিদের অনেকেই তাঁর ছাত্র। তিনি তাদেরকে বুঝিয়ে বললেন, ছোট্ট বাচ্চা কান্না করতেই পারে। ছোট্ট মানুষ। সে যে খুশিমনে মসজিদে এসেছে এটাই তো আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। তার অভিভাবককে ভাইয়া অনেক ধন্যবাদ ও শুকরিয়া জানালেন বাচ্চাকে মসজিদে নিয়ে আসার জন্য। ভদ্রলোক এতক্ষণে একটু কথা বলার সুযোগ পেলেন। তিনি বললেন, বাচ্চারা ছোটবেলা থেকে মসজিদে না এলে মসজিদে আসার ব্যাপারে উৎসাহিত হবে কি করে? জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব বুঝবে কি করে? এরকম অভদ্র আচরণের পর তো বাচ্চারা কেনো বড়রাই মসজিদে আসতে ভয় পাবে।

বিজ্ঞাপন

জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষের সুন্দর এই অভিব্যক্তি আমাকে মুগ্ধ করলো। দ্বীন ও ঈমানের মুহাব্বত মানুষকে অন্য এক মাত্রার উচ্চ আসনে পৌঁছে দেয়। সে যে কেউ হতে পারে। ঈমানের মুহাব্বতটাই এখানে প্রধান। মানুষের বাহ্যিকটা দেখে তাই ভেতরের বিচার করা উচিৎ নয়।

মসজিদ আল্লাহর ঘর। সকল মুসলমানের জন্য আল্লাহর ঘরের দরজা খোলা। আল্লাহর ঘরে প্রবেশে আল্লাহর বান্দাকে বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহর ঘরে বাধা দানকারীদেরকে তিরষ্কার করা হয়েছে। দেখুন: কুরআন মজীদ- সুরা ১, আয়াত ১১৪

এটা ভিন্নকথা যে, একেবারে এমন ছোট্টশিশু যারা অল্পসময়ের মধ্যে মসজিদ নাপাক করে দিবে বলে আশংকা হয়, তাদেরকে মসজিদে আনতে শরীয়তে বারণ রয়েছে। তাই বলে কী বুঝমান শিশুদেরকেও আমরা মসজিদে আনবো না! হাদিসে তো বরং মসজিদের কাতারের বয়ান করতে গিয়ে শিশুদের কথা আলাদা করে বয়ান করা হয়েছে। দেখুন: মুসনাদে আহমদ খন্ড: ১, হাদীস ৪৫৭; মুসলিম ৪৩২

কখনো কখনো দেখা যায় মসজিদের খাদেম বা মুআজ্জিন ভাইয়েরা শিশু মুসুল্লিদের সাথে এমন আচরণ করেন। অথচ তাদের কাছ থেকে মানুষ কখনো এমনটা আশা করে না। তারা তো দ্বীনের দাঈ। মসজিদের দিকে মানুষকে ডাকবেন। নামাজের আহবান করবেন। পিঠে হাত বুলিয়ে মিষ্টি কথা বলে মানুষকে মসজিদে নিয়ে আসবেন। দ্বীনের দাওয়াত দিবেন। এটাই তো তাদের দায়িত্ব। এজন্যই তো তারা নিজেদেরকে আল্লাহর ঘরের খাদেম হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।

কিন্তু এটা খুবই দুঃখজনক এবং ভয়ের বিষয় যে, আল্লাহর ঘরের মেহমানকে আল্লাহর ঘর থেকে বের করে দেয়া হবে। আল্লাহর দাওয়াতে আগত মেহমানকে ঘরের দরজা থেকে বিতাড়িত করা হবে। প্রকারান্তরে আল্লাহর নারাজী ও অসন্তুষ্টিকে ডেকে আনছি না তো আমরা?

শিশুরা মাসুম। নিস্পাপ জান্নাতের ফুল। মসজিদে শিশুদের উপস্থিতি মানে জান্নাতের ফুলের উপস্থিতি। কিন্তু আমাদের এই মসজিদের শহরে, মসজিদের এই দেশে জান্নাতের এইসব ফুলেরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। নিস্পাপ এই মাসুমরাই মসজিদ থেকে বিতাড়িত। প্রত্যেক মসজিদেই এমন কিছু তথাকথিত মুসুল্লি থাকেন, যাদের কাজই হচ্ছে শিশু মুসুল্লিদেরকে মসজিদ থেকে বিতাড়ন করা। চিৎকার-চেঁচামেচি ও অশোভন আচরণ করে বাচ্চাদের মনে ভীতি তৈরি করা।

ফলশ্রুতিতে এইসব শিশুরাই এক সময় মসজিদ বিমুখ হয়ে যায়। ভয় ও বিরক্তি থেকে তাদের মনে তৈরি হয় মসজিদ ও নামাজের প্রতি বিতৃষ্ণা। নিস্পাপ এই ফুলেরাই জান্নাতের বাগান থেকে ঝরে পড়ে অকালেই। হারিয়ে ফেলে তাদের মাসুমিয়্যাত। এভাবেই তৈরি হয় একেকটা দুষ্টু প্রজন্ম। যার নির্মাতা সেই তথাকথিত মুসুল্লিরা।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মসজিদগুলোতে শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যাবস্থাপনা। শিশুদের উপযোগি আলাদা কর্ণার। শিশুরা খেলতে-খেলতে সেখানে নামাজ শিখে ফেলে। মসজিদের প্রতি তাদের অন্তরে তৈরি হয় অগাধ ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাই একসময় তাদের মনে আল্লাহপ্রেমের বীজ বোনে। এভাবেই তৈরি হয় একটি সুস্থ-সুন্দর পবিত্র প্রজন্ম।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাত বছর বয়স থেকে শিশুদের নামাজের আদেশ করতে বলেছেন। সাত বছরে নামাজ পড়তে হলে আগে তো নামাজ চিনতে হবে। নামাজ শিখতে হবে। নামাজের সাথে পরিচয় ও মুহাব্বত হতে হবে । নামাজের জায়গা মসজিদমুখী হতে হবে। জীবনের শুরুতেই যদি আমাদের সন্তানরা মসজিদ থেকে বিতাড়িত হয়, তাহলে তারা কিভাবে মসজিদমুুখী হবে?

বর্তমানে আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় হাহাকার হচ্ছে অসুস্থ প্রজন্মের দুঃসহ যন্ত্রনা। অবাধ্য এক তরুণ প্রজন্ম সমাজের উপর বোঝার মতো চেপে বসেছে। অবাধ্য সন্তান। অবাধ্য ছাত্র। যেন অবাধ্যতার অসুখে ছেয়ে গেছে চারিদিক। ঘরে-বাইরে সন্তানদেরকে নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের শেষ নেই। দুদণ্ড শান্তি নেই তাদের মনে। অস্থির হয়ে এদিক-সেদিক ছুঁটছে মানুষ।

অথচ সুস্থির হওয়ার জন্য ঘরের পাশেই মসজিদের দরজা খোলা। আল্লাহ তাঁর ঘরে বান্দাকে দাওয়াত দিচ্ছেন; প্রশান্তি ও সমৃদ্ধির দাওয়াত। নামাজের দাওয়াত। আল্লাহ প্রেমের দাওয়াত। হাইয়্যা আলাস সালাহ। হাইয়্যা আলাল ফালাহ। বান্দা আমার! আসো নামাজে আসো। সফলতার জন্য আসো। রাহমানুর রাহীমের দয়াময় এই ডাক সকল মুমিনের জন্য। ছোট-বড় সবার জন্য। আমাদের জন্য এবং আমাদের সন্তানদের জন্য। আসুন আমাদের সন্তানদেরকে নিয়ে আমরা মসজিদে যাই। আল্লাহর দাওয়াতে আমাদের সন্তানদেরকে নিয়ে হাজির হই। আমাদের সন্তানদেরকে মুমিন হতে সাহায্য করি। মসজিদ হোক আমাদের ও তাদের প্রশান্তির জায়গা। মসজিদ হোক প্রেমময়। মসজিদ হোক মনের টান। মসজিদ হোক প্রাণের আওয়াজ। আসুন আমাদের সন্তানদেরকে নিয়ে আমরা মসজিদে যাই। তাদেরকে আল্লাহ প্রেমিক হতে সাহায্য করি।

বিজ্ঞাপন