‘সাবধান, হে আমার প্রিয় আরবজাতি!’

আবুল হাসান আলী নদবী রহ.।।

হামদ ও সালাতের পর :

সুধী ও বন্ধুগণ!

বিজ্ঞাপন

আরব ঐতিহাসিকেরা একটি ঘটনা বয়ান করেছেন, যা আমাদের গভীর মনোযোগ দাবি করে, কিন্তু তা আমরা সাধারণত খুব সহজভাবে পড়ে চলে যাই। ঘটনাটি দিয়েই আমি আজকের আলোচনা শুরু করছি। বিষয়বস্তুর সাথেও তা সঙ্গতিপূর্ণ। ঘটনাটি আমাদের জানায়, বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতার ব্যাপারে একজন সচেতন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত।

প্রথম যুগের ইসলামী দিগ্বিজয়ের ইতিহাসে আপনারাও এই ঘটনা পড়েছেন। তবে জানি না, যেভাবে তা আমার মনে রেখাপাত করেছে আপনাদেরও মনে করেছে কি না; এবং যে গভীর মর্ম ও বার্তা সে আমাকে দিয়ে গেছে আপনাদেরকেও দিয়েছে কি না। হ্যাঁ, কখনো কখনো এমন হয়, একটি বাণী বা ঘটনা একজন সাধারণ পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করলেও বিদ্যা-বুদ্ধি ও চিন্তাশীলতায় তার চেয়ে অগ্রসর অনেকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয় না।

আরব ঐতিহাসিকেরা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন তাদের স্বভাবসুলভ সংক্ষিপ্ত ও অনাড়ম্বর ভাষায়, কোনো টীকা ও ভাষ্য ছাড়া।

পারস্য সাম্রাজ্যের সেনাপতি রুস্তম মুসলিম-বাহিনীর সেনাপতি সায়্যেদুনা সা‘দ বিন আবী ওয়াককাস রা.-এর কাছে বার্তা পাঠিয়েছিল, তিনি যেন কোনো মুসলিমকে তাদের কাছে পাঠান, যার সাথে তাদের এই অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কথা বলা যায়। কারণ পারসিকদের জন্য এ অভিযান ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। এক ধরনের আকস্মিকতা, পারসিকেরা যা প্রত্যাশা করতে পারেনি। আরবেরা তো দরিদ্র অনাড়ম্বর জীবনেই অভ্যস্ত ছিলেন। সাধারণ অবস্থায় বাইরের জগৎ থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিলেন। পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যসমূহের ব্যাপারে তাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী তাদের বৈচিত্র্যহীন মরু-জীবনের বৃত্তেই আবর্তিত ছিল। কাজেই তারা যখন তাদের সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রোম-ফারিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে বের হল তখন স্বভাবতই তা কৌতুহলের উদ্রেক করল। প্রতিপক্ষের সামনে তা একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়াল।

তো রুস্তমের বার্তা পেয়ে হযরত সা‘দ রা. রিবয়ী ইবনে আমির রা.-কে পাঠালেন। এদিকে রুস্তমের রাজসিক দরবার; রেশমের গদী, সোনার কারুকাজ করা তাকিয়া, বহুমূল্য রত্ন ও মণি-মাণিক্যের ছড়াছড়ি; জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক ও বহুমূল্য রাজমুকুটে শোভিত রুস্তম স্বর্ণ সিংহাসনে উপবিষ্ট। এক গমগমে ভীতিপ্রদ পরিবেশ। কিন্তু রিবয়ী ইবনে আমের রা. এসবের কোনো তোয়াক্কাই করলেন না। এই রাজসিক জৌলুস তাঁকে কিছুমাত্রও প্রভাবিত করল না। তিনি রুস্তমের একেবারে পার্শ্বে গিয়ে উপবেশন করলেন যেন তাঁর  কোনো সঙ্গীর পার্শ্বে বসেছেন। একপর্যায়ে রুস্তুম জিজ্ঞাসা করল-

مَا جَاءَ بِكُمْ؟

কেন তোমরা এসেছ?

তিনি বললেন-

اللّهُ ابْتَعَثْنَا لِنُخْرِجَ مَنْ شَاءَ مِنْ عِبَادَةِ الْعِبَادِ إِلَى عِبَادَةِ اللّهِ.

আল্লাহ আমাদের আবির্ভূত করেছেন যেন আমরা ঐ সকল মানুষকে বান্দার বন্দেগী থেকে আল্লাহর বন্দেগীতে নিয়ে আসি, যাদের ব্যাপারে তিনি ইচ্ছা করেছেন।

وَمِنْ ضِيقِ الدّنْيَا إِلَى سِعَتِهَا، وَمِنْ جَوْرِ الْأَدْيَانِ إِلَى عَدْلِ الْإِسْلَامِ، فَأَرْسَلَنَا بِدِينِهِ إِلَى خَلْقِهِ لِنَدْعُوَهُمْ إِلَيْهِ.

বন্ধুগণ!

এই সহজ ও সারগর্ভ বক্তব্যের তিনটি বাক্যের প্রতিটির উপর আমি কথা বলব না; আমি কথা বলব শুধু একটি বাক্যের উপর। সেটি হচ্ছে এই শাহানা শান-শওকত ও রাজকীয় প্রতাপের সাথে উপবিষ্ট রুস্তুমকে লক্ষ্য করে এ মর্দে মুমিনের এই বাক্যটি-

مِنْ ضِيقِ الدّنْيَا إِلَى سِعَتِهَا.

‘দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে দুনিয়ার প্রশস্ততার দিকে।’

আমি তাঁর مِنْ عِبَادَةِ الْعِبَادِ إِلَى عِبَادَةِ اللّهِ বাক্যে অভিভূত হইনি। তেমনি তাঁর مِنْ جَوْرِ الْأَدْيَانِ إِلَى عَدْلِ الْإِسْلَامِ বাক্যেও না। কারণ এক আল্লাহর ইবাদত আর ইসলামের সুবিচার তো সেইসকল মুসলিমের কাছে ছিল এক সহজ সত্য, যাদের অন্তরে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওহীদের আকীদা বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন, আল্লাহর ইচ্ছায় যাদের কাছে ঈমান ছিল প্রিয় ও কাক্সিক্ষত, আর কুফ্র, ফিস্ক ও নাফরমানী ছিল অপ্রিয়, অনাকাক্সিক্ষত। পৌত্তলিকতা ও মানবপূজা তাঁদের দৃষ্টিতে ছিল অতি হীন ও ঘৃণিত। তাঁদের রুচি ও স্বভাবে এসবের কোনো স্থান ছিল না।

হযরত ইবনে আমের রা. জানতেন, ফারিসের আমির-উমারা প্রজাসাধারণকে তাদের উপাসকে পরিণত করেছে। এদের সাথে তাদের আচরণ কেবল প্রভু-ভৃত্যের ছিল না, ছিল উপাস্য ও উপাসকের। প্রজারা এদের সামনে দাঁড়াত নতশিরে বুকে হাত বেঁধে। এদের সম্মুখে সিজদা করত। রাজপরিবারকে মনে করা হত অতিমানব, যাদের শিরা-উপশিরায় পবিত্র ঐশ্বরিক শোণিত প্রবাহিত।

আল্লাহর রাসূলের সাহাবীগণ বিশ্বাস করতেন একমাত্র ইসলামই ন্যায় ও ইনসাফের শরীয়ত আর অন্য সকল ধর্ম ও মতবাদ অন্যায়-অবিচারে পূর্ণ, যা মানুষকে মানুষের দাসত্বে নিয়োজিত করে এবং সাধু-পুরোহিতের বান্দায় পরিণত করে। তাদেরকে এমন সব রীতি ও বিধানের নিগড়ে আবদ্ধ করে, যার পক্ষে আল্লাহ কোনো দলীল নাযিল করেননি। তাঁরা কুরআনের এই আয়াত পাঠ করেছিলেন-

اَلَّذِیْنَ یَتَّبِعُوْنَ الرَّسُوْلَ النَّبِیَّ الْاُمِّیَّ الَّذِیْ یَجِدُوْنَهٗ مَكْتُوْبًا عِنْدَهُمْ فِی التَّوْرٰىةِ وَ الْاِنْجِیْلِ یَاْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوْفِ وَ یَنْهٰىهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ یُحِلُّ لَهُمُ الطَّیِّبٰتِ وَ یُحَرِّمُ عَلَیْهِمُ الْخَبٰٓىِٕثَ وَ یَضَعُ عَنْهُمْ اِصْرَهُمْ وَ الْاَغْلٰلَ الَّتِیْ كَانَتْ عَلَیْهِمْ  فَالَّذِیْنَ اٰمَنُوْا بِهٖ وَ عَزَّرُوْهُ وَ نَصَرُوْهُ وَ اتَّبَعُوا النُّوْرَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ مَعَهٗۤ  اُولٰٓىِٕكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ.

… যারা অনুসরণ করে রাসূলের, উম্মী নবীর, যাঁর উল্লেখ তাওরাত ও ইঞ্জিল, যা তাদের নিকট আছে তাতে লিপিবদ্ধ পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎ কাজে বাধা দেয়, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হলাল করে ও অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং যে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের গুরুভার থেকে ও শৃংখল থেকে, যা তাদের উপর ছিল। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে এবং যে নূর তাঁর সাথে অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে তারাই সফলকাম। -সূরা আ‘রাফ (৭) : ১৫৭

তাঁরা পড়েছিলেন আল্লাহর কালাম-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنَّ كَثِیْرًا مِّنَ الْاَحْبَارِ وَ الرُّهْبَانِ لَیَاْكُلُوْنَ اَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَ یَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِیْلِ اللهِ وَ الَّذِیْنَ یَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَ الْفِضَّةَ وَ لَا یُنْفِقُوْنَهَا فِیْ سَبِیْلِ اللهِ   فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ اَلِیْمٍ.

হে মুমিনগণ! প-িত এবং সংসার বিরাগীদের মধ্যে অনেকেই লোকের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করে থাকে  এবং লোককে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করে। আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জিভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। -সূরা তাওবা (৯) : ৩৪

এই বাণী ও বার্তার উপর তাঁদের ছিল গভীর ঈমান এবং এর বাস্তব উদাহরণ তাঁরা দেখেছেন রোমের নাসারা, ফারিসের অগ্নিপূজক, মদীনার ইহুদী প্রভৃতি ধর্ম-জাতির মাঝে।

রিবয়ী ইবনে আমের রা. যদি বলতেন-

من ضيق الدنيا إلى سعة الآخرة.

‘দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে’

তাহলেও আমি বিস্মিত হতাম না। কারণ তিনি ঈমান এনেছেন আখিরাতের অনিঃশেষ জীবনের উপর, জান্নাতের অফুরন্ত প্রশস্ততার উপর। তিনি যে কিতাবের উপর ঈমান এনেছেন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে যাকে ‘ইমাম’ বানিয়েছেন তাতে উৎকীর্ণ আছে এই বাণী-

وَ سَارِعُوْۤا اِلٰی مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَ جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمٰوٰتُ وَ الْاَرْضُ  اُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِیْنَ.

তোমরা ধাবমান হও স্বীয় রবের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে, যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। -সূরা আলে ইমারন (৩) : ১৩৩

বদরের যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র যবানে উচ্চারিত হয়েছে-

قُومُوا إِلَى جَنّةٍ عَرْضُهَا السّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ.

ঐ জান্নাতের দিকে ধাবিত হও, যা যমীন ও আসমানসমূহের মতো প্রশস্ত। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯০১ তিনি আরো বলেছেন-

مَوْضِعُ سَوْطٍ فِي الْجَنّةِ خَيْرٌ مِنَ الدّنْيَا وَمَا فِيهَا.

জান্নাতের একটি বেত্র পরিমাণ স্থানও পৃথিবী ও পৃথিবীর সব থেকে শ্রেষ্ঠ। -সহীহ বুখারী, হাদী ৩২৫০; সহীহ মুসলিম আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে

কাজেই তিনি যদি বলতেন, তোমাদের নিয়ে যাব দুনিয়ার অপ্রশস্ততা থেকে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে তাহলে আমি বিস্মিত হতাম না। কিন্তু তিনি তো সে কথা বলেননি। তিনি বলেছেন অন্যকথা-

مِنْ ضِيقِ الدّنْيَا إِلَى سِعَتِهَا.

দুনিয়ার অপ্রশস্ততা থেকে এর প্রশস্ততার দিকে। জ্বী, দুনিয়ার প্রশস্ততা।

এখানে আমি আশ্চর্য হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করছি, কী সেই প্রশস্ততা, যা আরবেরা উপভোগ করছিল? আর কী সেই সংকীর্ণতা, যাতে পারসিকেরা বন্দী ছিল? যে কারণে রিবয়ী রা. বলছেন, হে ভাগ্যাহত পারসিকেরা! আমরা আরব মুসলিমেরা এসেছি তোমাদের মুক্ত করতে দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে, দিতে এসেছি প্রশস্ত জীবনের স্বাদ।

সেকালের আরব-জীবন কি প্রশস্ত জীবন ছিল? আর পারসিকদের জীবন সংকীর্ণ জীবন? এই প্রশ্ন আমরা ইতিহাসকে করতে পারি। সে এক বিশ্বস্ত সাক্ষী। আরবের ইতিহাস রোম ও ফারিসের ইতিহাস, লিপিবদ্ধ ও সংকলিত। বহু সাক্ষী ও বর্ণনার বিশ্বস্ত সূত্রে সংরক্ষিত। কাজেই সেকালের আরব-জীবন যদি বাস্তবেই প্রাচুর্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন হয়ে থাকে তাহলে ইতিহাস কখনো তা গোপন করবে না। তদ্রƒপ পারসিকদের জীবন যদি দুঃখ-দুর্দশার জীবন হয়ে থাকে সেটাও অজানা থাকবে না। কিন্তু ঐতিহাসিকরা একমত, রোম-ফারিসের জীবন ছিল প্রাচুর্যের মখমল জীবন, বিলাসিতার কমনীয় জীবন। পক্ষান্তরে আরবের জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামের আবির্ভাবের পরেও তারা ছিলেন রুক্ষ মিতাচারী জীবনে অভ্যস্ত। সময়টা ছিল আমীরুল মুমিনীন  ওমর রা-এর খেলাফতকাল। আরবেরা তখনও তাদের স্বাভাবিক প্রকৃতি, ইসলামী আরবীয় স্বভাব-প্রকৃতির অধিকারী ছিলেন। জীবনযাত্রা তখনও জটিল ও আরোপিত হয়ে ওঠেনি; তা ছিল প্রকৃতির মতোই সহজ সাবলীল। স্বয়ং আমীরুল মুমিনীন ওমর রা. যাপন করতেন কৃচ্ছতা ও মিতাচারের জীবন। জনসাধারণকেও পরিচালিত করতেন মিতাচারী জীবনে। আরব উপদ্বীপের এই মরুময় জীবন রোম-ফারিসের চোখে ছিল দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতা, ওদের দৃষ্টিতে করুণা ঝরত- আহা! কী বঞ্চনা! কী সংকীর্ণতার জীবন!

কাজেই প্রশ্ন জাগছে, কী সেই সংকীর্ণতা, যাতে পারসিকেরা বন্দী ছিল? যে কারণে তাদের প্রতি আরব মর্দে মুমিনের এই করুণা ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ উচ্চারণ? আর কী সেই প্রশস্ততা, যা আরবেরা উপভোগ করছিল, যার আনন্দে এই সাহাবী উৎফুল্ল?

এটা কি কপটতার অতিরঞ্জন? আরবেরা তো এতে অভ্যস্ত ছিল না। ইসলাম তো কোনো মুসিলমকেই অনুমতি দেয় না এই মিথ্যা গৌরবের, কপট অতিরঞ্জনের। আর সেই প্রথম যুগের মানুষেরা তো পূর্ণরূপে মুক্ত ছিলেন অতিরঞ্জন অতিশয়তা থেকে, ফাঁকা বুলির প্রবণতা থেকে। তাঁরা ছিলেন সত্যভাষী ও স্পষ্টভাষী, সত্যনিষ্ঠ ও সৎসাহসী তাহলে এই ‘সংকীর্ণতা’ মানে কী?

আরবের মরুচারী এক মানুষ যখন সেই রাজসিক দরবারে প্রবেশ করেছেন; বরং পারস্য-সাম্রাজ্যের সীমানায় যখন পা রেখেছেন তখনই তো এই ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্য্য, এই বিলাস-ব্যসন দৃষ্টে তাঁর মাথা ঘুরে যাওয়ার কথা। এই বহুমূল্য বস্তুসামগ্রী, উপাদেয় খাদ্য-সম্ভার, ভোগবিলাসের অজস্র উপকরণ, উন্নত সভ্যতার নানাবিধ নিদর্শন, যা মর্যাদায়-আভিজাত্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত। পারসিকেরা তাদের উদ্ভাবন ও অভিজ্ঞতা, বিপুল বিজয়াভিযান ও অপরিমেয় সম্পদের দ্বারা এই বিস্তৃত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। কী তাতে ছিল না? উন্নত শহর-নগর, আলীশান অট্টালিকা, নয়নাভিরাম দালান-কোঠা, মনোরম বাগ-বাগিচা, বর্ণিল বিনোদনকেন্দ্র, পণ্যদ্রব্যে সমৃদ্ধ বিপনীবিতান, দেশি-বিদেশি আরো কত দ্রব্য সামগ্রী! বিলাসী জীবনের এই সকল উপকরণ, চিত্তহারী, স্নায়ুঅবশকারী এই সকল কিছুকে অবহেলা ভরে পায়ে ঠেলে এগিয়ে এল যে সকল আরব তারা আসলে কোন্ ধাতুতে গড়া ছিল?

রিবয়ী ইবনে আমের রা.-এর এই দীপ্ত বাক্যটি নিয়ে যতই চিন্তা করি ততই অভিভূত হই- হে পারসিকেরা! আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রশস্ত জীবনের স্বাদ দেয়ার জন্য।

কেন তাঁর কণ্ঠে এই বাক্য উচ্চারিত হল?

কারণ, এইসব আমীর-উমারাকে তাঁর মনে হয়েছে যেন সাজপোশাকে সজ্জিত কিছু পুতুল কিংবা দক্ষ ভাস্করের নিপুণ হাতে নির্মিত কিছু নিখুঁত ভাস্কর্য! কী তার অঙ্গ-সৌষ্ঠব! কী অসাধারণ মুখভঙ্গি! কিন্তু শেষ বিচারে তা কাঠ-পাথরের নিষ্প্রাণ মূর্তি বৈ তো নয়।

ইসলামী বাহিনীর এই সৈনিক হয়ত রিবয়ী ইবনে আমের রা.-এর কাছে সেনাপতি রুস্তমকে মনে হয়েছে স্বর্ণের খাঁচায় বন্দী এক আদুরে বিহঙ্গ। আর কিসরা ইয়াজ্দগির্দ, যার দর্শন তিনি তখনো পাননি, যেন এক ময়না বা ময়ূর কিংবা পৃথিবীর এক সুন্দরতম পাখী। কিন্তু সে বন্দী এক সোনার খাঁচায়, যে খাঁচা স্বর্ণের, খাঁচার প্রতিটি শিক স্বর্ণের, সোনার খাঁচায় তার পানাহারের পাত্রগুলোও স্বর্ণের; কিন্তু এই সোনায় মোড়ানো পাখীটির উপর কি ঈর্ষা হতে পারে এমন কোনো মানুষের, যে বোঝে জীবনের মূল্য, জ্ঞানের মর্যাদা, যে পেয়েছে স্বাধীনতার স্বাদ? এই স্বর্ণ-বিহঙ্গের উপর কি হিংসা হতে পারে এমন কারো, যাকে আল্লাহ দান করেছেন মনুষ্যত্বের মর্যাদা? এই জন্য যে, এই পাখীটি থাকে স্বর্ণের খাঁচায় আর সে বাস করে কুঁড়ে ঘরে?

আরেকটু এগিয়ে বলতে পারি, কারো কি হিংসা হতে পারে এমন একটি কুকুরের উপর, যে প্রতিপালিত তার ইউরোপিয়ান মনিবের অফুরন্ত আদর সোহাগে? তার জন্য রয়েছে সুস্বাদু খাবার, সুমিষ্ট ফল, সুপেয় দুধ! আছে সোনারূপার গলাবন্ধ! আছে নরম তুলতুলে শয্যা?

সোনার পিঁজরায় বন্দি একটি পাখি কিংবা ইউরোপীয় মনিবের আদর-সোহাগে পালিত একটি কুকুরকে আমরা যে নজরে দেখি, পারস্য সেনাবাহিনীর এই সোনা-রূপায় মোড়া দরবার ও দরবারীদেরও হযরত রিবয়ী ইবনে আমের রা. সে নজরেই দেখছিলেন। কারণ যে আকীদায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন, যে পয়গামের তিনি বাহক ছিলেন, যে ব্যক্তিত্বের তিনি অধিকারী ছিলেন এবং যে কুরআনের তিনি ঈমানদার-অনুসারী ছিলেন সে মহাসম্পদের মূল্য সম্পর্কে তিনি ছিলেন পূর্ণ সচেতন। তিনি গৌরবান্বিত ছিলেন ঐ গুণ ও বৈশিষ্ট্য, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সম্পদে, যার মর্যাদা ছিল এই অসার আড়ম্বর ও জৌলুসের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সভ্যতার আলোকচ্ছটা না তাঁর দৃষ্টিকে নিষ্প্রভ করতে পেরেছে, না তাঁর মনমস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করতে পেরেছে। তাঁর জানা ছিল, পারস্য সেনাপতি রুস্তম এক অগ্নিপূজারী। এরপর সে পূজারী তার সম্রাটের। পূজারী তার নিজের প্রবৃত্তি ও রীতি-নীতির। আর এ শুধু রুস্তমের হাল নয়, এক দু’জন আমীর বা সেনাপতির হাল নয়, এ তো এদের সকলের হাল। এমনকি সম্রাট ইয়াজ্দগির্দেরও একই অবস্থা। হযরত রিবয়ী জানতেন, এই নামের সম্রাট বাস্তবে অসংখ্য রীতি-নীতির দাস। সে তো দাস আপন দাসদেরও। এদের ছাড়া না সে নড়তে পারে, না এদের কাঁধে ভর করা ছাড়া আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ করতে পারে। সে কোনো অর্থেই মুক্ত স্বাধীন নয়। তার উপর প্রভুত্ব তার প্রবৃত্তির, তার রীতি-নীতির, তার আদত-অভ্যাসের, তার দৈহিক চাহিদার, পাশব-প্রবৃত্তির।

বন্ধুগণ!

আপনারা জানেন, সম্রাট ইয়াজ্দগির্দ ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের দুই সম্রাট- পারস্যের কিসরা ও রোমের কাইজারের একজন, যারা তৎকালীন সভ্য দুনিয়াকে দুই ভাগে ভাগ করে নিয়েছিল। ইসলামী জয়যাত্রার সমকালীন ইতিহাসের একজন মনোযোগী পাঠক হিসেবে আমার জানা আছে, পারস্য সাম্রাজ্য ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের চেয়েও বেশি বিস্তৃত ও শক্তিশালী। ভারতবর্ষের কিছু অঞ্চলও ইরানীদের শাসনাধীন ছিল। কিন্তু এই প্রবল প্রতাপ-সম্রাট সম্পর্কে ইতিহাস বলছে, যখন তিনি রাজধানী মাদায়েন থেকে পলায়ন করছিলেন সেই জরুরি অবস্থাতেও তার সাথে ছিল এক হাজার পাচক! আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে- এক হাজার পাচক!? এবং এক হাজার গায়ক এবং এক হাজার চিতা ও বাজপাখির ব্যবস্থাপক! এরপরও তার আক্ষেপ ছিল- হায়! আমার দুর্গতি! এই অল্প ক’জন সেবক পরিচারক নিয়ে আজ আমি চলেছি! যেন তিনি বলছেন, লোকেরা! আমার প্রতি করুণা কর, আমার দুর্দশায় চোখের জল ফেল!

এই যার অবস্থা তাকে কি মুক্ত-স্বাধীন বলা যায়? ব্যক্তিত্ব ও সংকল্পের অধিকারী বলা যায়?

ইতিহাসে আরো আছে- এক পর্যায়ে তিনি যখন এক দরিদ্র বৃদ্ধার কৃপাপ্রার্থী হলেন, আর সে বৃদ্ধা তার চেহারা সুরতে আভিজাত্যের ছাপ লক্ষ্য করে দয়াপরবশ হয়ে তাকে খাবার দিল তখন তিনি বলতে লাগলেন, ‘গান কোথায়? আমি তো গানের সুর ছাড়া আহার করতে পারি না!!’

চিন্তা করুন, এদের দাসত্ব ও দুর্বলতা, রীতি ও স্বভাবের মুখাপেক্ষিতা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল! যখন সে ক্ষুধার্ত, খাবারের প্রয়োজন, তখনও সে খাবার গ্রহণে অক্ষম, যদি না তাকে গান শোনানো হয়।

মনে পড়ছে, আহওয়াযের রাজা হুরমুযানের কথা, পারস্য সাম্রাজ্যের এই বড় রঈসকে গ্রেফতার করে যখন মদীনায় সাইয়েদুনা ওমর রা.-এর কাছে হাযির করা হচ্ছিল তখন তিনি মসজিদের ভূমিতে মাথার টুপিকে বালিশ বানিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। এদের পদশব্দে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। হুরমুজানকে তাঁর সামনে হাযির করা হল। কথোপকথনের একপর্যায়ে হুরমুযান তৃষ্ণার্ত বোধ করে এবং পানি চায়। তাকে সাধারণ পেয়ালায় পানি দেওয়া হয়। সে তখন বলে ওঠে- পিপাসায় মারা গেলেও আমি এমন পেয়ালায় পানি পান করতে পারব না। এরপর তার পছন্দের পেয়ালা দেয়া হলে সে পানি পানে সক্ষম হয়। তার এই অহেতুক সংবেদন দেখে আমীরুল মুমিনীন তাঁর সঙ্গীদের দিকে তাকান- তারা যেন আল্লাহর প্রশংসা এবং নিআমতে ইসলামের শোকরগোযারি করেন যে, আল্লাহ তাদেরকে এই দাসত্ব, এই আরোপিত অবস্থার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত-স্বাধীন রেখেছেন। এই রীতি-নীতি, স্বভাব-সংবেদনের মূর্তি থেকে রক্ষা করেছেন, যা মানুষ নিজের হাতে নির্মাণ করে, এরপর নিজের উপর আরোপ করে।

মর্যাদা ও আভিজাত্যের নানা শর্ত আমরা নিজেরাই তৈয়ার করি, এরপর তা দ্বারা নিজেদের আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ করি। যেমন কাউকে অভিজাত হতে হলে তার বাড়িটা এই প্রকারের হতে হবে, গাড়িটা এই মানের হতে হবে, পোশাক-পরিচ্ছদ এই রকমের হতে হবে, জীবনযাত্রার এই সামগ্রী তার অধিকারে থাকতে হবে। আরো কত কি। যে যুগের গল্প বলছি ঐ যুগে অভিজাত পারসিক সমাজে কারো টুপির দাম যদি এক লক্ষ না হত তাকে লজ্জা দেয়া হত,  আর যে ‘আধা অভিজাত’ তার টুপির মূল্য হত পঞ্চাশ হাজার। আমীর-উমারার কোমরবন্দের মূল্য ছিল পঞ্চাশ হাজার। এ সবই হচ্ছে নানা আরোপিত রীতি, যার পক্ষে আল্লাহ কোনো দলীল নাযিল করেননি।

বর্তমান ইউরোপীয় কৃষ্টি-কালচারও কি এজাতীয় নানা আরোপিত রীতি-নীতির সমষ্টি নয়? অর্থহীন শর্ত, মনগড়া পরিভাষা, অপ্রয়োজনীয় রীতি-নীতি ইউরোপিয়ানরা নিজেদের উপর আরোপ করেছে। তাদের অনুসারীরাও সেই ভার বহন করে চলেছে। কী এ সবের সূত্র? কেন এই স্বেচ্ছাবন্দিত্ব, যা আমরা বরণ করে নিয়েছি? এই সভ্যতার প্রভাবে আমরা সেই স্বাভাবিক মিতাচারী জীবন থেকে সরে এসেছি, যা ছিল আরবের বৈশিষ্ট্য এবং যা ধরে রাখতে উৎসাহ দিয়ে গেছেন ওমর ইবনুল খাত্তাবের মতো উম্মাহ্র শিক্ষক-মুরব্বীগণ!

রিবয়ী ইবনে আমের রা. ছিলেন স্বচ্ছ দৃষ্টি, মজবুত ঈমান ও গভীর ইলমের অধিকারী, যদিও জ্ঞান-সভ্যতার দাবিদারদের অনেকের কাছেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সেকেলে ও পশ্চাৎপদ। সেকারণেই পারসিকদের আরোপিত রীতি-নীতি তাঁর কাছে ছিল গলার বেড়ি ও পায়ের শৃঙ্খল, যা তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এইসকল রীতি-নীতি বিস্তারিত না জানলেও যতটুকু তিনি জেনেছিলেন ও উপলদ্ধি করেছিলেন তা-ও কম ছিল না, সাক্ষ্য ও মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট ছিল। এরই আলোকে তিনি তাদের দুনিয়ার প্রশস্ত জীবনের পয়গাম শুনিয়েছেন-

হে পারসিকেরা! প্রতারিত হয়ো না। এই অসার জৌলুস, এই আতশবাজির ঝলকানিতে হতবুদ্ধি হয়ো না। তোমরা তো বাস করছ এক আবদ্ধ পিঞ্জিরায়। আর পিঞ্জিরা তো সোনা-রূপার হলেও পিঞ্জিরা। অদৃশ্য কাঁচের হলেও পিঞ্জিরা। শহর-নগরের মতো প্রশস্ত হলেও পিঞ্জিরা। হে দার্শনিকেরা! কাকে বলে কারাগার! কেন তাকে বলে কারাগার? প্রশস্ত নয় বলে? তাতে অনেক কক্ষ থাকে না বলে? এমন শানদার কক্ষও তো থাকে অনেক কারাগারে, যা অনেক সাধারণজনের  ঘর-বাড়িতেও থাকে না। তবুও তা কারাগার। আমাদের এখানে এই মজলিসে কেউ কি আছেন, যিনি কারাজীবন পছন্দ করবেন, যতই তাতে আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা থাকুক, যতই তা প্রশস্ত ও খোলামেলা হোক; যদিও তাতে থাকে বাগান ও জলাশয়, পার্ক ও মিউজিয়াম! মানুষ তো নিজের ঘরে নজরবন্দী হয়ে থাকতে চায় না। এ-ও তার কাছে এক আযাব।

আজকাল যাকে আমরা ‘হীনম্মন্যতা’ বলি এই আরব মর্দেমুমিনের মাঝে তার লেশমাত্রও ছিল না। ভীরুতা ও নতজানুতার অপচ্ছায়া থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত।

আজ যদি তিনি পশ্চিমা সভ্যতাকে দেখতেন এবং দেখতেন ঐ বিলাসী জীবন, যা আরবেরা ও বহু দেশের মুসলিমেরা যাপন করে চলেছে, তাহলে তাদের সম্পর্কেও তাঁর মূল্যায়ন তা-ই হত, যা হয়েছে রোম ও ফারিসের সম্পর্কে। এই জীবনধারার অনুসারীদের জন্যও তাঁর মনে জাগত অনুরূপ আক্ষেপ, যা জেগেছিল রোমক ও পারসিকদের জন্য। এদেরও তিনি দুনিয়ার সংকীর্ণ জীবন থেকে মুক্ত করার ঐরূপ আকাক্সক্ষাই প্রকাশ করতেন, যেরূপ ফারিস ও রোমের ব্যাপারে করেছেন।

এই আরবী মর্দেমুমিন ঐ আযাদীর স্বাদ পেয়েছিলেন, যার সাথে তাকে পরিচিত করেছে ইসলাম। তাঁকে তুলে এনেছে আবদ্ধ শাসরুদ্ধকর পৃথিবী থেকে, যে পৃথিবী বস্তু ও উদরের, স্বার্থ ও প্রবৃত্তির, দাসত্ব ও প্রভুত্বের এবং যে পৃথিবী রোগ-শোক, জরা-ব্যধির ক্ষণস্থায়ী জীবনের পৃথিবী। এই সংকীর্ণ পৃথিবী থেকে তুলে এনে তাকে পরিচিত করেছে এক অসীম ভুবনের সাথে, যে ভুবন ঈমান ও বিশ্বাসের, যে ভুবন আত্মা ও হৃদয়ের, সহমর্মিতা ও পরার্থপরতার, সাম্য ও  সুবিচারের, প্রীতি ও মমতার, বন্ধুত্ব ও নিঃস্বার্থতার; যে ভুবন লয়, ক্ষয়, জরাহীনতার; যেখানে আবিলতা নেই, বিকার ও বিকৃতি নেই, শঙ্কা ও বিষাদ নেই। তিনি এমন সময়  এই মুক্তির স্বাদ উপভোগ করেছিলেন যখন রোম ও ফারিস তা থেকে বঞ্চিত ছিল। তাই ফারিস ও রোমের জীবন তাঁর কাছে মনে হয়েছে এক খাঁচাবন্দি জীবন, যে জীবনে আযাদ মুমিনের প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে। যেমন জলের মাছকে ডাঙায় তুললে, ডাঙায় তুলে  রেশম-কোমল বিছানায় কিংবা সোনার রেকাবিতে রেখে দিলে মাছের প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।

প্রিয় সুধী!

এই হচ্ছে এক বেদুইন আরবের দৃষ্টি! এখন বলুন, হে আমার সংস্কৃতিমনা বন্ধুগণ! হে মহান শিক্ষকবৃন্দ! হে ভার্সিটির সম্মানিত প্রফেসরগণ! হে তালীম-তারবিয়াতের দিকপাল সুধিবৃন্দ! হে কলম-সৈনিক সমাজ! হে ইউরোপের পর্যটক সুশীল সমাজ! আমাকে বলুন কেমন আমাদের দৃষ্টি। কী আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সমকালীন অসার সভ্যতার প্রতি। এর কোনো তুলনা কি হতে পারে ঐ আরব বেদ্ইুনের দৃষ্টির সাথে, যার ছিল না ‘সংস্কৃতি’-জ্ঞান! যিনি জগৎকে তেমন করে জানতেন না, যেমন আমরা জেনেছি, যিনি পড়েননি ইতিহাস-বিজ্ঞান, যেমন আমরা পড়েছি। যিনি পরিচিত হননি জাতি-সম্প্রদায়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতার সাথে, যেমন আমরা হয়েছি। দর্শন ও তার চুলচেরা বিশ্লেষণও ছিল তাঁর অজানা; অথচ এই সবই আমরা জেনেছি।

বন্ধুগণ!

এ সেই আরব মর্দেমুমিনের দৃষ্টি, ইসলাম ও ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার মনপ্রাণ পূর্ণ করে দিয়েছিলেন বিশ্বাস ও বীরত্বে, ক্ষণস্থায়ী জীবনের তুচ্ছতার চেতনা আর সত্যের গৌরবে। তাই তিনি বলতে সক্ষম হয়েছেন তৎকালীন পৃথিবীর প্রতাপশালী সেনাপতি ‘রুস্তম’কে, যার নাম মানুষকে ভীত-কম্পিত করত, যিনি ছিলেন পারস্য সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় ব্যক্তি, তাকে সম্বোধন করে এই মর্দেমুমিন বলছেন গমগমে কণ্ঠে, প্রতাপ ছিল, প্রভাব ছিল, হে রুস্তম! দুর্ভাগা রুস্তম! পড়ে আছ দুনিয়ার জিন্দানখানায়! আর আমরা আরব মুসলিমেরা, যাদের  দেহের মাত্র অর্ধেক আচ্ছাদিত, যাদের তরবারির খাপগুলো জরাজীর্ণ, যাদের পোশাক-পরিচ্ছদ শত ছিন্ন, পায়ের জুতা তালিযুক্ত আমরা আছি বেহেশতে, আর তোমরা আছ দোযখের অন্ধকুপে।

বন্ধুগণ!

কী তাঁকে এই দীপ্ত ভাষণে উদ্দীপ্ত করে তুলেছিল? জ¦ী, তাঁর ঈমান ও বিশ্বাস, আপন পরিচয় ও মর্যাদায় পূর্ণ আস্থা! আর সেই শিক্ষা ও পয়গাম, যা দ্বারা আল্লাহ তাঁকে সৌভাগ্যবান করেছেন।

বন্ধুগণ!

আজ আমাদের কয়জন, বুকে হাত দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলুন, আমাদের ভার্সিটিগুলোর কয়জন, আমাদের অফিস-আদালত, আমাদের লাইব্রেরী ও গ্রন্থগারের কয়জন, আমাদের শিল্প সংস্কৃতির, সাহিত্য-সাংবাদিকতার কয়জন আছি, যারা আজকের কোনো ইউরোপিয়ান কিংবা আমেরিকানকে সম্বোধন করার সাহস ও সক্ষমতা রাখি? যারা আমাদেরই রুটির টুকরোর উপর জীবনকে উপভোগ করে চলেছে! জ্বী, আমরাই তো সরবরাহ করে চলেছি তাদের ‘খাদ্য’। এই ‘পেট্রোল’, আরব ভূমির এই ‘তরল সোনা’ যদি এই জাযীরা থেকে পশ্চিমের দিকে প্রবাহিত না হত, তাহলে বন্ধুগণ! না আমেরিকার এই পরাক্রম থাকত, না ইউরোপের এই জেল্লা।

ইউরোপ তো মিসকীন, রিক্তহস্ত; বিশ্বাসে, চরিত্রে, ব্যক্তিত্বে। সে এখন আক্রান্ত চারিত্রিক অবক্ষয়ের এক ব্যাপক মহামারীতে, যা তার সভ্যতাকে পরিণত করেছে এক পূতিগন্ধময় গলিত লাশে। না তার কাছে এর নিরাময়ের  কোনো উপায় আছে, না নিয়ন্ত্রণের। বহু আগেই সে খ্রিস্টবাদ থেকেও হাত ধুয়ে ফেলেছে। ফলে আসমানের সাথে, নবুওত ও আখলাকের সাথে তার ক্ষীণ সূত্রটিও আজ ছিন্ন। এই হৃতসর্বস্ব সভ্যতার দিকে, এই পূতিগন্ধময় গলিত শবের দিকে ঘোলা চোখে তাকিয়ে আমরা ভাবছি, আহা! সে কত মহিয়ান! গরিয়ান! পূত-পবিত্র! …সর্বশক্তিমান!! এরপর মুখ ঘুরিয়ে তাকাচ্ছি নিজের দিকে, নিজের দ্বীন-ধর্ম, আদর্শ ও সংস্কৃতির দিকে, রাজ্যের বিরক্তি ও  তাচ্ছিল্য নিয়ে। এই গলিত শবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমরা গলে যাচ্ছি, মিলিয়ে যাচ্ছি, যেমন রৌদ্রের খরতাপে বস্তুর আর্দ্রতা হাওয়ায় মিলিয়ে যায় কিংবা রৌদ্রের প্রখরতা লেলিহান অগ্নিশিখার সামনে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।

সেই আরব মুসলিম, যিনি তাঁর আত্মপরিচয়ের মর্যাদা উপলদ্ধি করেছেন, আপন বার্তা ও পয়গামের মূল্য বুঝতে পেরেছেন, পারস্যের রাজ সেনাপতির সম্মুখে বলতে পেরেছেন-

আল্লাহুবতা‘আছানা… আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন…

ওয়াল্লাহ! এই বাক্য যদি পর্বতের উপর বর্ষণ করা হয়, পর্বত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে, সমুদ্রের উপর বর্ষিত হলে এর সমুদয় পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। তাহলে যখন তা বর্ষিত হবে হৃদয় ও অন্তরের উপর, চিন্তা ও বিবেকের উপর!

এই সেই দৃষ্টিভঙ্গি, ইসলামী দাওয়াতের সোনালী যুগে যার অধিকারী ছিলেন মুসলিমেরা। বর্তমান গলিত সভ্যতার দিকেও আজ আমাদের এই স্বচ্ছ দৃষ্টিতেই তাকাতে হবে।

প্রিয় বন্ধুগণ!

এই কথাটিই আজ আমি বলে যেতে চাই, এই সুন্দর দৃষ্টিনন্দন নগরীতে, এই রাজধানী-শহরে, যা ছিল মরুর বুকে একটি সুন্দর ফুল, আর আজ তা এক উন্নত আধুনিক নগর। এখানেই আমি আপনাদের কাছে এই পয়গামটি আমানত রেখে যেতে চাই এবং সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত এই আওয়াজ পৌঁছে দিতে চাই। আজ আরব জাতির, পূর্ব-পশ্চিমের মুসলিমজাতির অনিবার্য প্রয়োজন, সেই মর্দে মুমিনের আলোকিত দৃষ্টি, যাতে আছে ঈমানের দ্যুতি, আত্মপরিচয়ের গৌরব। এই দীপ্ত দৃষ্টিতেই আজ তাকাতে হবে বর্তমানের গলিত সভ্যতার দিকে, যা আমাদেরকে চারপাশ থেকে বেষ্টন করে রেখেছে। আমরা তো অনাহূত অপজাত নই; পৃথিবীর বুকে ভাসমান কোনো জাতি নই, যাদের না আছে বংশ-পরিচয়, না কৌলিন্য-আভিজাত্য, না কীর্তি- অবদান, না ইতিহাস-ঐতিহ্য। না, না বন্ধুগণ! আমরা ধনী। আমরাই ছিলাম এই পৃথিবীর শিক্ষক। জাতি-সম্প্রদায়ের শিক্ষাগুরু। কিন্তু কেন আজ এই তিক্ত বাস্তবতা। নীতি ও কর্মে স্বাধীন এক জাতি কীভাবে পরাধীন হয়ে গেল? চালক কেন চালিত হল? ‘শিক্ষক কেন ছাত্র হল?’ মেযবান কেন অন্যের টেবিলের অনাহূত অতিথি হল?

আল্লাহ তাআলা আরব ঐতিহাসিকদের উত্তম জাযা দান করুন, যাঁরা এই অনির্বাণ বাক্য-শিখাটি সংরক্ষণ করেছেন, যাতে আছে ঈমানের জ্যোতি, প্রথম যুগের আরবীয় ব্যক্তিত্বের দ্যুতি, আল্লাহ যাদের ইসলামী শিক্ষার চিরন্তন আলোয় আলোকিত করেছিলেন এবং যাঁরা এর মর্যাদা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন ছিলেন। এতেই তাঁরা সন্তষ্ট ও পরিতৃপ্ত ছিলেন। একেই তাঁরা সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, যা কিছু এই উৎস থেকে উৎসারিত নয় এবং যা কিছু এর সাথে যুক্ত নয় তার  কোনো স্থিতি নেই, স্থায়িত্ব নেই, মূল্য নেই, মর্যাদা নেই।

বর্তমান চিন্তা, দর্শন ও তার চ্যালেঞ্জসমূহের মোকাবিলায় আজ আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে এক সাহসী সুঠামদেহী বীর পুরুষের মত, যে সচেতন নিজের শক্তি ও মর্যাদা সম্পর্কে, গৌরবান্বিত নিজের বার্তা ও ব্যক্তিত্বে; যে তার প্রতিভার ব্যবহারে কুশলী, গ্রহণ-বর্জনে স্বাধীন, বর্তমান সভ্যতা থেকে সে ঐটুকু গ্রহণ করে, যা তার জন্য উপকারী, তার আদর্শ- উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যা তাকে নব শক্তিতে বলীয়ান করে, তাকে ঘুন পোকার মতো তিলেতিলে নিঃশেষ করে দেয় না।

তার অবস্থা কখনো ঐ খর্বাকৃতি বামুনের মতো হবে না, যে তার আস্থা ও ঈমান হারিয়ে ফেলেছে, অপচ্ছায়া ও জুজুর ভয়ে যে গুটিয়ে যায়, আরো ক্ষুদ্র হয়ে যায়, যে প্রাণপণে শুধু বেঁচে থাকতে চায়, কিছুতেই মরতে চায় না। বিপদ ও বিজয়ের চ্যালেঞ্জ থেকে, স্বকীয়তা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্র হতে, নেতৃত্ব ও ইমামতের ময়দান থেকে যে শুধু পালিয়ে বেড়ায়। যে এই অন্তসারশূন্য সভ্যতার দিকে এমন প্রলুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় যেমন পাহাড়ের পাদদেশে দ-ায়মান কোনো শিশু পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে আর মনে মনে ভাবে, আহা! আমি যদি ওখানে উঠতে পারতাম!

প্রিয় উপস্থিতি!

আজকের এই বক্তৃতা আমি সমাপ্ত করতে চাই, শায়েরে ইসলাম আল্লামা ইকবালের একটি পংক্তি দিয়ে। যেখানে তিনি সম্বোধন করেছেন উম্মাহর শিক্ষিত যুবসমাজকে, পশ্চিমা সভ্যতা যাদের মনমস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। ফলে তাদের দৃষ্টিপথ থেকে হারিয়ে গেছে তার ব্যক্তিত্ব ও আত্মপরিচয়, তার ব্যপ্তি ও গভীরতা, তার সুপ্ত ও সুষুপ্ত যোগ্যতা। ফলে সে ‘বস্তু’র প্রেমে আত্মহারা হয়েছে এবং মৃত্যু-ভয়ে ভীত। তিনি বলেছেন-

হে মুসলিম! ধিক! তোমার সামনে উন্মোচিত হয়েছে দিগ-দিগন্ত, কিন্তু হারিয়ে গেছে তোমার আপন ব্যক্তিত্ব। আর কতকাল তুমি থাকবে মূর্খ-উদাসীন? উদভ্রান্ত, কর্মহীন? তুমি তো এক প্রাচীন আলো। কাজেই অপসারিত কর রাতের আঁধার। তোমার আস্তিনে রয়েছে ‘শুভ্রহস্ত’। তা দ্বারা সাধন কর ‘কালীম-কর্ম’। তুমি আজ অঙ্কন করছ এক সংকীর্ণ পৃথিবীর ছবি। অথচ তুমি এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, এর চেয়ে অগ্রসর। তুমি ছিলে, সে ছিল না; আর তুমিই থাকবে সে থাকবে না।

হে ‘চিরজীবী’ ইনসান!

মৃত্যুকে ভয় পাও? মৃত্যুরই তো তোমাকে ভয় পাওয়ার কথা! তুমিই না ওঁৎ পেতে থাকতে তার প্রতীক্ষায়! শোনো, পরম দাতা যখন কিছু দান করেন তা ছিনিয়ে নেন না, ফিরিয়েও নেন না। জেনে রেখো, ‘মৃত’ সে নয়, যে প্রাণ হারিয়েছে। ‘মৃত’ সে, যে ঈমান হারিয়েছে। ষ

[অনুবাদে : মুহাম্মাদ যাকারিয়া আবদুল্লাহ]

বিজ্ঞাপন