তল্লার ইমাম মাওলানা আ. মালেক নেসারী র., এক নিভৃতচারী আদর্শ মানবের গল্প

নুরুদ্দীন তাসলিম।।

ছোট বোন এসএসসি পরীক্ষার্থী, নিজেও মাত্রই ভর্তি হয়েছেন দাওরা হাদিসে, বড়ভাই নাঈম ইসলাম পড়াশোনা করছেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের অনার্স ২য় বর্ষে। তিন ভাইবোন আর বাবা-মা মিলে পাঁচ সদ্যসের পরিবারটির দিনকাল এক রকম কেটে যাচ্ছিল তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদের ইমাম বাবা মাওলানা আব্দুল মালেক নেসারীর উপার্জনে।

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীর আর দশজন বাবার মতো ফাহিম ইসলামের বাবাও সন্তানদের নিয়ে বুনেছিলেন শত স্বপ্ন। আর মাত্র কয়েক বছরেই হয়তো সন্তানেরা পৌঁছে যেত স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে। দায়িত্বের  বোঝা কিছু হালকা হতো তার কাঁধ থেকে। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। কারো অবহেলা, কারো অর্থ লোভে গ্যাস লাইন লিকেজের দুর্ঘটনায় শহীদ হলেন ফাহিম ইসলামের বাবা মাওলানা আব্দুল মালেক নেসারী।

নিষ্ঠাবান, সৎ বিনয়ী মানুষ ছিলেন ফাহিম ইসলামের বাবা মাওলানা আব্দুল মালেক নেসারী। টানা ২২ বছর ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছেন তল্লার এই মসজিদে। কুমিল্লার মুরাদ নগরে পৈত্রিক ভিটা হলেও ২২ বছরে ভালবেসে ফেলেছিলেন তল্লার মাটি ও মানুষকে। এই এলাকার মানুষের সাথে গড়ে উঠেছিল তার আত্মার বন্ধন। এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন, নিরহংকার এমানুষটি আমাদের ভালবাসতো আল্লাহর জন্য। জীবনের দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ সময়ে তার কাছ থেকে এলাকাবাসী শুধু ভালবাসাই দেখেছেন।

দুর্ঘটনায় শহীদ মাওলানা আব্দুল মালেকের ছেলে প্রতিবেদককে বলছিলেন, সদাহাস্যজ্জোল এ মানুষটি শুধু পরিবার আর তল্লার কথা ভাবতেন না, পীড়িত মানুষের দুঃখ-কষ্ট ভাবাতো তাকে, এসব মানুষকে সাহায্য করতে তিনি যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে। সামাজিক উন্নয়নে কাজ করতে পারাটা যেন তার আত্মাকে প্রশান্তি দিত।

তল্লা এলাকায় জন্ম, বেড়ে ওঠা আসমা বেগমের। পুকুরে মাটি ভরাট করে প্রথমে টিনশেট মসজিদ, এরপর ধীরে ধীরে তিনতলা বিল্ডিং, সব ঘটেছে তার চোখের সামনে। এই মসজিদে ইমাম আব্দুল মালেকের নিয়োগের ব্যাপারটিও তার শৈশবের গল্পের একটি অংশ। তিনি বলছিলেন, এমন বিনয়ী, নিরহংকার মানুষ তল্লাবাসী খুব সহজে পাবে বলে মনে হয় না। আল্লাহ তাকে জান্নাত নসিব করুন। পরিবারের উর্পাজনক্ষম একমাত্র মানুষটিকে ছাড়া তার পরিবারের উপর বিশেষ রহম করুন।

ইমাম আব্দুল মালেকের ভাতিজা মাওলানা কামরুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলছিলেন, চাচা নারায়ণগঞ্জে থাকলেও সবসময় খোঁজ রাখতেন এলাকাবাসীর। ৪ সেপ্টেম্বর দুর্ঘটনার আগের দিনই তিনি এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে গিয়েছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জে থেকেও যেন মুরাদ নগরেরই বাসিন্দা ছিলেন।

ইমাম আব্দুল মালেককে হারিয়ে শোকে কাতর তার পরিবার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবাকে হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যত ভাবিয়ে তুলছে ইমামের ছেলে ফাহিম ও নাঈম ইসলামকে। কুমিল্লায় দাদার ভিটেতে তাদের কোন বাড়ি নেই। নারায়ণগঞ্জেও ভাড়া বাসাতেই থাকেন তারা। বাসা ভাড়া, তিন ভাইবোনের পড়াশোনা, সংসার খরচ, প্রতি মুর্হূতে এসব ভাবিয়ে তুলছে তাদের।

ফাহিম ইসলাম বলছেন, বাবার অবর্তমানে  অনেকেই এখন সাহায়তায় এগিয়ে আসছেন। কিন্তু কতদিন সহায়তা করবেন তারা! সবকিছু শেষে তাদেরও সীমাবদ্ধতা থাকে। তাই কোন কর্মসংস্থান চান এই তরুণ, সাথে বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি।

আরো পড়ুন:

আর ফিরে এলেন না স্বপ্নবাজ তরুণ শেখ ফরিদ, বদলে গেল পরিবারটির গল্প

ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে বার্ন ইউনিটে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ফরিদ মিয়া

মসজিদকে যারা অবৈধ বলার চেষ্টা করেছে তারাই অবৈধ: খেলাফত মজলিস

মসজিদ বৈধ জায়গায় রয়েছে, মুতাওয়াল্লী জমি দান করেছেন: নারায়ণগঞ্জ ওলামা পরিষদ

বেড়েই চলেছে মৃতের সংখ্যা, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি তল্লা মাঠ

৫০ হাজার টাকা ‘ঘুষ’ ও ২৪টি জীবনের ট্রাজেডি!

‘সময় শেষ হয়ে গেলো, আমাকে নামাজ পড়তে দাও’

‘ছেলেকে ফিরে না পেলে আর কখনোই হয়তো ক্ষুধার্ত হবো না’

বিজ্ঞাপন