আর ফিরে এলেন না স্বপ্নবাজ তরুণ শেখ ফরিদ, বদলে গেল পরিবারটির গল্প

রায়হান মুহাম্মাদ।। – জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে ঘুরে এসে

নারায়ণগঞ্জের তল্লায় মসজিদে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ মারা গেলেন মো. নজরুল (৫০) ও শেখ ফরিদ (২১)। দুইভাই, তিন বোনের মাঝে ফরিদ ছিলেন সবার বড়। পরিবারের আশা-ভরসা। বাবা-মা কতশত স্বপ্নইনা সাজিয়েছিলেন ফরিদকে নিয়ে।

ফরিদের বাবা জানান, গতকাল সারারাত ফরিদের মা আর আমি তার কাছে ছিলাম, ছেলে বলছিল বাবা আমি আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হয়ে গেছি আমার আশা ছেড়ে দাও, আমি পারলাম না তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে, ছোট ভাই-বোনদের  সাফল্য মণ্ডিত গল্পগুলোর সাক্ষী হতে।

বিজ্ঞাপন

গত ৬ সেপ্টেম্বর (সোমবার) ফরিদের মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কিছু খেয়েছেন কিনা-তিনি বলেছিলেন, বাবা, ছেলেকে ছাড়া কিভাবে খাই। আমার পেটতো ভরা। ছেলেকে ফিরে না পেলে আর কখনোই হয়তো ক্ষুধার্ত হবো না। ছেলের শোকে কাতর এই মা আর খেতে পারলেন না ছেলের সাথে।

আরো পড়ুন: ‘ছেলেকে ফিরে না পেলে আর কখনোই হয়তো ক্ষুধার্ত হবো না’

আইসিইউ এর সামনে শেখ ফরিদের বাবা

ছেলের গল্প বলতে গিয়ে ফরিদের মা বলছিলেন, বাবা, তোমার থেকেও ফর্সা, উচা,লম্বা আমার ছেলে। কিন্তু কিছু মানুষের অবহেলা আর অর্থলোভ ঝলসে দিয়েছে আমার ছেলের মুখ, চিরতরে বুক খালি করে চলে গেছে আমার মানিক, আমি সর্বোচ্চ বিচার চাই দোষীদের। জানি এবিচার ফিরিয়ে দেবে না আর ছেলেকে, কিন্তু উপযুক্ত বিচার হয়তো আরো শত শত মাকে রক্ষা করবে তাদের বুক খালি হওয়া থেকে।

গায়ে পাঞ্জাবি,মাথায় টুপি দেখে আন্তরিক হয়ে কথা বলতে চাইছিল ফরিদ আমার সাখে। আমি এক মুহূর্ত থমকে গিয়েছিলাম। একি সেই, যার ব্যাপারে তার বলছিলেন, বাবা তোমার থেকেও ফর্সা, উচা,লম্বা আমার ছেলে! নিজেকে সামলাতে পারিনি, ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম তার সামনে, ভুলে গিয়েছিলাম, রোগীর সামনে কাঁদতে হয় না, তাকে সাহস দিতে হয়। আমার কান্না দেখে শেখ ফরিদ নিজেই বলেন ওঠেন, কাইন্দেন না আমার জন্য দোয়া কইরেন,আপনার সাথে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কষ্ট হচ্ছে। আমি আর কথা বলতে দেইনি তাকে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দোয়া চেয়ে চলে এসেছি।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী ইউনিয়নের চরআলগী গ্রামে শেখ ফরিদের বাড়ি।

দুর্ঘটনায় শহীদ শেখ ফরিদ। ছবি: সংগৃহীত

গফরগাঁও সরকারি ডিগ্রি কলেজের অনার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন শেখ ফরিদ। পড়াশোনার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের ডিসি অফিসে মাস্টার রোলে চাকরি করতেন তিনি। বাবা কৃষি কাজ করেন।ফরিদের বাবা জানান,  এ মাসের ১৩ তারিখে তার চাকরি স্থায়ী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফরিদের সেই চাকরি স্থায়ী হল না, তিনি চিরস্থায়ী হলেন জান্নাতে। আমাদের জন্য এক দুঃসহ স্মৃতি হয়ে।

পরিবারের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো পূরণের চেষ্টা করতো উচ্ছল, প্রাণবন্ত এই তরুণ। কিন্তু কিছু মানুষের অবহেলা পাল্টে দিল পরিবারটির গল্প।

শেখ ফরিদের বন্ধু বৎসল মামা সোহাগ মিয়া জানান, মুখের একটু অংশ বাদে প্রায় পুরো শরীরই পুড়ে গেছে ফরিদের।

সোহাগ মিয়া বলেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর এশার নামাজ পড়তে নারায়ণগঞ্জের তল্লা মসজিদে যান ফরিদ। নামাজ শেষে জুতা আনতে মসজিদের ভেতরে গেলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে এক রিকশাওয়ালা কোলে করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন।

ঘটনার পর রাত ১২টার দিকে মুঠোফোনের মাধ্যমে শেখ ফরিদ দগ্ধ হওয়ার খবর জানতে পারেন তিনি। খবরটি তাঁর পরিবারকে জানানো হলে কান্নায় ভারী হয়ে উঠে ব্রহ্মপুত্র চরের চরআলগী গ্রামের আকাশ-বাতাস।

ফরিদ সম্পর্কে তার গ্রামবাসীদের অভিব্যক্তি হলো,  ফরিদ খুবই বিনয়ী এক যুবক। তাঁর আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও সুরেলা আজান গ্রামবাসীকে মুগ্ধ করতো।

চরআলগী গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ছেলেটি (শেখ ফরিদ) সম্পর্কে আমার নাতি। সে সবসময় চলতে ফিরতে এত সুন্দর আদব-কায়দা ছিল যা সবার নজরে পড়তো।

খুব ইবাদত বন্দেগী করতো সে। বাড়িতে এলে মসজিদে আজান দিতো। তাঁর সুরেলা আজান সবাইকে মুগ্ধ করতো। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন।

আরো পড়ুন: মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আরো দু’জনের মৃত্যু, মোট ৩১

‘সময় শেষ হয়ে গেলো, আমাকে নামাজ পড়তে দাও’

ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে বার্ন ইউনিটে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ফরিদ মিয়া

সরেজমিন প্রতিবেদন: কী ঘটেছিল নারায়ণগঞ্জের সেই মসজিদে

বেড়েই চলেছে মৃতের সংখ্যা, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি তল্লা মাঠ

মসজিদ বৈধ জায়গায় রয়েছে, মুতাওয়াল্লী জমি দান করেছেন: নারায়ণগঞ্জ ওলামা পরিষদ

বিজ্ঞাপন