‘কাদিয়ানী ফেতনা সম্পর্কে সর্বাত্মক সচেতনতা এখন সময়ের দাবি’

ইসলাম টাইমস ডেস্ক:  গত পরশুদিন রাজধানীর বাসাবোতে একটি কওমী মাদরাসায় আহমদিয়া অ-মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ডাকযোগে একটি চিঠি পাঠানো হয়। যার মধ্যে ভারতের পাঞ্জাবের প্রয়াত নবুওত দাবিদার মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে প্রকাশ্যে ‘আল্লাহর রাসূল’ ও ‘২য় মুহাম্মাদ সা’. দাবি করে স্পষ্ট ভাষায় মাদরাসার মুহতামিম এবং ছাত্রদেরকে কাদিয়ানিবাদ গ্রহণের দাওয়াত দেওয়া হয়।

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মাদরাসাটির মুহামিমসহ দেশের বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম। তারা বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমানদেরকে উত্তেজিত করতে কাদিয়ানীরা এ চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ চিঠিটি পাঠিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক তাহাফ্ফুজে খতমে নবুওত বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মাদ নূরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাদরাসায় এই ধরনের ধৃষ্টতাপূর্ণ চিঠি কাদিয়ানীদের চরম স্পর্ধার বহিপ্রকাশ।

মাওলানা নূরুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি ঢাকার নন্দিপাড়ায় কাদিয়ানীরা তাদের নতুন আস্তানা গড়ে তুলছে। গত বছর আমরা মুসলমানদের ঈমানি সচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রশাসনের অনুমতিক্রমে সেখানে খতমে নবুওত সম্মেলন করেছিলাম। তারা অনেক বাধা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছিল। আমি থানার ওসি সাহেবকে বলেছিলাম, কোনো সমস্যা হলে সব দায়িত্ব আমরা নেব। প্রয়োজন হলে আমাকে গ্রেফতার করবেন। এসব কথা বলার পরে থানার ওসি সাহেব শান্ত হয়েছিলেন। আমরা তখন সম্মেলন করেছি। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারীর সময়কে পুজি করে কাদিয়ানীরা আবারো নানা কৌশলে মুসলমানদের ঈমান হরণের পায়তারা করছে।

আরো পড়ুন: রাজধানীর মাদরাসায় কাদিয়ানীদের চিঠি: গোলাম আহমদকে ‘২য় মুহাম্মাদ সা.’ আখ্যা দিয়ে ‘দাওয়াত’

মাদরাসায় কাদিয়ানীদের চিঠি কী বার্তা দেয়?

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাদরাসা, যেখানে রাতদিন শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনাদর্শের পাঠদান করা হয়, সেখানে ইংরেজ আমলের একজন মানুষকে ২য় মুহাম্মাদ দাবি করে সরাসরি ধর্মীয় দাওয়াতি চিঠি কী বার্তা দেয়?

এ বিষয়ে বিশিষ্ট খতমে নবুওত গবেষক, মিফতাহুল উলূম মধ্যবাড্ডার শিক্ষক মাওলানা আবদুল মাজীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘একটা মাদরাসার মুহতামিমকে দাওয়াত দেওয়া কাদিয়ানীদের চরম দুঃসাহসের প্রমাণ। এই দুঃসাহসটা মূলত তারা পেয়েছে আমাদের দুর্বলতার কারণে। আমরা কাদিয়ানীদের ব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ। আমরা নিজেরাও এদের কুফরি মতাদর্শ সম্পর্কে পড়াশোনা করি না। সাধারণ মানুষকেও এদের কুফরি বিশ্বাস সম্পর্কে অবগত করি না। আমাদের অবহেলার কারণেই মূলত তারা এই সুযোগটা পেয়েছে।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, আমরা যে বিষয়ের গুরুত্ব যতটুকু সেটাকে ততটা গুরুত্ব দিচ্ছি না। যেমন আমাদের দ্বীনদারদের হাজার হাজার মানুষ ইসলামের নানা বিষয়ে অনলাইনে দাওয়াতি কাজ করেন। কিন্তু কাদিয়ানীদের কুফরি মতাদর্শ সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কেউ লেখালেখি করেন না।

অথচ কাদিয়ানীরা শতশত ঈমানবিধ্বংসী প্রোগ্রাম ফেসবুক-ইউটিউবে ছড়িয়ে রেখেছে। মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে তারা প্রতিনিয়ত কাফের-মুরতাদ বানাচ্ছে। এতবড় একটা কুফরী ফেতনা আজকে আমাদের ঘরের ভিতরে ইসলামের শিক্ষাদানকেন্দ্রে দাওয়াত পৌঁছানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। এটা নিয়ে আমাদের ফেসবুকে অনলাইনে কেউ কিচ্ছু লেখে না। এটা আমাদের আরেক সমস্যা।

৩য় বিষয়টা হচ্ছে, কাদিয়ানীদের ব্যাপারে যে পরিমাণ একাডেমি হওয়ার দারকার ছিল। অর্থাৎ কাদিয়ানীরা তাদের কুফরিয়াত প্রতিষ্ঠার জন্য যে পরিমাণ পড়াশোনা ও দাঈ তৈরি করে, আমাদরে সেই পরিমাণ পড়াশোনাও নেই। দাঈ তৈরি করার ব্যবস্থাও নেই। আমাদের দাওরা হাদীস মাদরাসা আছে হাজার হাজার। এই হাজার হাজার মাদরাসা থেকে যারা বের হচ্ছে, এদের শতকরা ৯৫ ভাগ জানে না যে, কাদিয়ানিবাদ কত  ভয়াবহ ফেতনা। ফলে আমাদের আলিম যারা আমাদের ঘরের লোক, যারা দাঈ হতে পারত, তারা এ ব্যাপারে অসচেতন অবস্থায় পড়াশোনা শেষ করে চলে যাচ্ছে।’

মুসলমানদের মধ্যে প্রকাশ্যে মির্জা গোলাম আহমদকে ‘২য় মুহাম্মাদ’ ঘোষণার দুঃসাহস:

আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষনবী। তারপরে আর কাউকে নবুওত প্রদান করা হবে না। এটা মুসলমানদের স্বতঃসিদ্ধ অকাট্য বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের বিপরীতে প্রকাশ্যে মুসলমাদের প্রতি মির্জা গোলাম আহমদকে ২য় মুহাম্মাদ হিসেবে মেনে নেওয়ার দাওয়াত দেওয়ার এই ঘটনাকে চরম উস্কানিমূলক হিসেবে দেখছেন দেশের আলেম সমাজ।

মাওলানা আবদুল মাজীদ বলেন, ‘খতমে নবুওত প্রসঙ্গে উম্মতের আকীদা যত দৃঢ় ও মজবুত হওয়ার দরকার ছিল, কাদিয়ানীরা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, সেই মজবুতি এখন আর নেই। তাই তারা এই স্পর্ধা করেছে।

উদারহণস্বরূপ, চোর যখন কোনো ঘরের বেড়া দুর্বল মনে করে, তখন সেই ঘরেই সে চুরি করতে আগ্রহী হয়। আমাদের খতমে নবুওতের আকীদাটি যে পরিমাণ মজবুত প্রাচীরের মতো হওয়ার দরকার ছিল সে পরিমাণ মজবুত নেই। এখন সেটা বাঁশের বেড়ার মতো দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে এ সমস্ত চোররা আমাদের খতমে নবুওতের আকীদার ঘরে চুরি করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, খতমে নবুওতের প্রতি আমাদের অবহেলার চরম প্রকাশ এটি।’

ঢাকায় কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের তৎপরতা

রাজধানী ঢাকায় বহু আগ থেকেই কাদিয়ানী সম্প্রদায় সক্রিয়। বর্তমানে ঢাকার খিলগাঁও, মাদারটেক, নন্দিপাড়া, বাসাবো, সবুজবাগ এসব এলাকাগুলোতে এই সম্প্রদায়ের মিশনারী তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জানা গেছে, ঢাকায় কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ৫ থেকে ৬টি আস্তানা রয়েছে। বকশী বাজার, নন্দিপাড়া, মিরপুর, আশকোনা এবং নাখালপাড়া তেজগাঁও এলাকায়।

বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের মতে, এইসব এলাকায় মুসলিম জনসাধারণকে ইসলামের খতমে নবুওত বিশ্বাস সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি অপরিহার্য। পাশাপাশি সারাদেশে মাদরাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, খতীব, মুসল্লি, মসজিদ কমিটির সদস্যগণসহ সব শ্রেণির মুসলমানদের কাদিয়ানী ফেতনা সম্পর্কে সর্বাত্মক সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি।

বিজ্ঞাপন