সরেজমিন প্রতিবেদন: কী ঘটেছিল নারায়ণগঞ্জের সেই মসজিদে

আবুদ্দারদা আশফাক ও নুরুদ্দীন আজিম।। –নারায়ণগঞ্জ থেকে

ঘটনার উৎপত্তি
মসজিদটি যখন টিনের ছিল তখন থেকেই মসজিদের নিচ দিয়ে তিতাস গ্যাসের একটি লাইন ছিল। মসজিদ বিল্ডিং হওয়ার পরও রয়ে গেছে সেই লাইন। বহু বছরের পুরনো, ফাটল ধরা পাইপটি গ্যাসের প্রেসার নিতে পারতো না। মাঝে মাঝেই টাইলসের ফাঁক দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতো।

বিজ্ঞাপন

একবার রাস্তার পানি মসজিদে ঢুকে পড়লে সেই পানিতে গ্যাসের বুদবুদ উঠতে দেখা যায়। পানি ওঠার ফলে টাইলস ফাঁক হয়ে পরবর্তীতে মসজিদে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস উঠতো।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, মসজিদ কমিটি এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সহায়তা চাইলে তারা লাইন সরিয়ে নিতে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। মসজিদ কমিটি ২০ হাজার টাকা দেওয়ার আবেদন জানালে তারা সম্মত হয়না। তাই এই গ্যাসের লাইন আগের মতোই রয়ে যায়।

গত শুক্রবার রাতে এশার নামাজ চলছিলো। টাইলসের ফাঁক দিয়ে উঠে আসা গ্যাসের কারনে এসিবদ্ধ মসজিদটি ততক্ষণে ভয়ংকর গ্যাসক্ষেত্রে পরিণত হয়ে উঠেছে।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। মসজিদে বিদ্যুতের দুটো লাইন ছিল। অপর লাইনের ফেইস পাল্টানোর সময় জ্বলে ওঠা সামান্য একটু ফুলকিতেই পুরো মসজিদে ধপ করে আগুন জ্বলে ওঠে। মূহুর্তে বিস্ফোরণ ঘটে মসজিদের ৬টি এসিতে। দরজা-জানালার গ্লাসগুলো বিকট শব্দে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। ইমাম মোয়াজ্জিনসহ ৩৭ জন মুসল্লি আগুনে পুড়ে যান। সে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি!

আগুন লাগার পরবর্তী অবস্থা
আকস্মিক আগুন লাগার কারণে মসজিদ থেকে কেউই বের হতে পারেন নি। করুণ আর্তনাদে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। অনেকেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মসজিদের মেঝেতে দাপাদাপি করতে থাকেন। কেউ কেউ মসজিদের সামনে জমে থাকা ড্রেনের পানিতে এসে ঝাপিয়ে পড়েন। আগুনের তাপ সইতে না পেরে ড্রেনের ময়লা পানিও পান করতে বাধ্য হন অনেকে।

অগ্নিদগ্ধ সকলের পোষাক পুড়ে যায়। কেউ কেউ বিবস্ত্র হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে।
সারা দেহের চামড়া খসে যায়। খসে পড়া চামড়াগুলো মসজিদের মেঝেতে এখনও বিদ্যমান।
অগ্নিদগ্ধদের আর্তনাদে আশেপাশের মানুষ এসে জড়ো হয়। কিন্তু আহতদের অবস্থা বেগতিক দেখে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে অনেকেই ভয় পেয়ে যায়।

পরবর্তীতে এলাকার যুবকশ্রেণী এগিয়ে আসে। আহতদেরকে রিক্সায় করে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। রিকশাতে উঠানোর সময়ও সাহায্যের জন্য খুব কম লোকই এগিয়ে আসার সাহস করেছিলো।
পরবর্তীতে এলাকার প্রভাবশালী নেতা জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লবের নেতৃত্বে আহত সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

আরো পড়ুন: ‘সময় শেষ হয়ে গেলো, আমাকে নামাজ পড়তে দাও’

ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে বার্ন ইউনিটে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ফরিদ মিয়া

হাসপাতালে পৌঁছার পর অবস্থা ছিলো আরো করুণ! একে তো শুক্রবার, তার ওপর রাতের বেলা। তাই ডাক্তারের উপস্থিতি কম ছিলো। আহতরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না পেয়ে নিদারুণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ ও ছটফট করতে থাকে।
পরবর্তীতে কয়েকজন ডাক্তার উপস্থিত হন।
কিন্তু অবস্থা নাজুক দেখে আহতদেরকে ঢাকার বার্ন ইউনিটে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে এতগুলো অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করাও মুশকিল ছিলো। শুরুর দিকে একেকটি এম্বুলেন্সে পাঁচ-ছয়জন করে নিয়ে যাওয়া হয়।পরবর্তীতে ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে অনেক এম্বুলেন্স যথাস্থানে এসে উপস্থিত হয়।

বর্তমান অবস্থা

রবিবার বেলা চারটায় আমরা সেখানে উপস্থিত হই। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আহতের মধ্যে ২৪ জন ইন্তিকাল করেন। ২৪ তম ব্যক্তির জানাজায় আমরা উপস্থিত ছিলাম। এখনও হসপিটালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পড়ে আছেন আরো ১৩ জন।

২৪ তম ব্যক্তি মোহাম্মদ আলী বেপারী (৬৫)’র জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বারিধারার মুহাদ্দিস, জমিয়ত নেতা মুফতি মনির কাসেমী এবং জাতীয় তাফসীর ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ।

আরো পড়ুন: ‘ছেলেকে ফিরে না পেলে আর কখনোই হয়তো ক্ষুধার্ত হবো না’

আলোচিত সেই তিন ছেলের অভাগা জননী- যার দুই ছেলেই এই দুর্ঘটনায় নিহত হন এবং সাত বছর বয়সী তৃতীয় ছেলেটি শুধু এশার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরে আসায় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায়- উক্ত মহিলাকে এই সময় জাতীয় তাফসির ফেডারেশনের পক্ষ থেকে 10 হাজার টাকা হাদিয়া দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান বলেন, ‘সরকার হতাহতদের সমস্ত দায়িত্ব নেবে।’ তিনি তার দলীয় লোকদেরকে নিহত এবং আহতদের পাশে দাঁড়ানোর আদেশ করেন।

উপস্থিত কিছু মানুষের অভিব্যক্তি

১. আসলাম নামক এক ব্যক্তির সাথে কথা হয়। তার মামা অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়ে শনিবার মারা গিয়েছেন। তিনি বলেন : ‘আমাদের ইমাম সাহেব প্রায় ২০ বৎসর যাবত এই মসজিদে ইমামতি করছেন। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। আমার মনে হয়, তার মতো এতো ভালো ইমাম এই এলাকাবাসী আর পাবে না।

মুয়াজ্জিন সাহেব মারা গিয়েছেন এবং তার ছেলে(৭)ও মারা গিয়েছে। আমার মামা আর ইমাম সাহেবের জানাজা গতকাল রাত একটার সময় হয়েছে। জানাজায় প্রায় তিন হাজারের মতো মানুষ উপস্থিত ছিলেন।’

সর্বশেষ তিনি দুর্ঘটনাকবলিত সকলের পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতার আশা ব্যক্ত করেন।

২. এক মহিলার অভিব্যক্তি, যিনি দুর্ঘটনার সময় রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন :
‘আমরা মহিলারা নামাজের সময় দূর থেকে
হঠাৎ বিকট একটি শব্দ শুনি। আমি ভাবলাম হয়তো কারেন্টের ট্রান্সফরমার ব্লাস্ট হয়েছে। তাই স্বাভাবিক থাকি। পরবর্তীতে বুঝতে পারি মসজিদের ভেতর থেকে আগুন আসছে। তাই দৌড়ে সেখানে যাই। দেখলাম মসজিদের ভিতরে অনেকে আগুনে পুড়ে দাপাদাপি করছে। আবার কেউ মসজিদ থেকে বের হয়ে সামনের নর্দমার পানিতে গড়াগড়ি করছে। কিন্তু সবাই বিবস্ত্র থাকায় এগিয়ে যেতে পারিনি। আমার নাতিন জামাইও পুড়ে যায়। সে মসজিদ থেকে বিবস্ত্র অবস্থায় বের হয়ে দৌড় দেয়। এবং বাড়িতে এসে হাউমাউ করে চিতকার করতে থাকে।’

৩. মসজিদ কমিটির সদস্য বাবুল সাহেবের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন :
‘দুর্ঘটনার পর সাহায্যের জন্যে কেউ এগিয়ে আসছিলো না। পরে এলাকার ২০/২২ বছরের যুবকরাই এগিয়ে আসে। তারাই ধরাধরি করে অগ্নিদগ্ধ লোকদেরকে মসজিদ থেকে বের করে। আর আমি গ্যারেজ থেকে পাঁচটি রিকশা নিয়ে আসি। তখনও লোকের এত সংকট ছিল যে তাদেরকে রিকশায় উঠানোর মত লোক ছিল না। আমরা কয়েকজন ধরাধরি করে রিক্সায় উঠিয়ে তাদেরকে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই দুর্ঘটনায় মসজিদ কমিটিকে দায়ী করা কোনভাবে ঠিক হবে না । তারাতো মসজিদের উন্নতির জন্য সব সময় চেষ্টা করেছেন। মসজিদটা আগে টিনের ছিল এখন তিনতলা ভবন হয়েছে। মুসল্লিদের সুবিধার্থে এসি করা হয়েছে, এসব কিছু কমিটির লোকদের পরিশ্রম ও অনুদানে।’

আরো পড়ুন: বেড়েই চলেছে মৃতের সংখ্যা, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি তল্লা মাঠ

                   ৫০ হাজার টাকা ‘ঘুষ’ ও ২৪টি জীবনের ট্রাজেডি!

তিনি আরো বলেন,
‘দুর্ঘটনার সময় যারাই মসজিদে ছিলেন সবাই গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। শুধু একজন মসজিদের একটু বাহিরে ছিলেন। তারও চেহারা ঝলসে গেছে। আমাদের ইমাম সাহেব অনেক ভাল লোক ছিলেন। তিনি ২০/২২ বছর যাবত এখানে ইমামতি করছেন। তিনি যখন মসজিদে ইমাম হিসেবে আসেন তখন আমরা বাচ্চা ছিলাম। ইমাম সাহেব কম অগ্নিদগ্ধ ছিলেন। তার শুধু বাম সাইড আর পিঠ পুড়ে গেছিলো।কিন্তু কন্ঠনালী পুড়ে যাওয়ায় তাকেও গতকালকে (শনিবার) দাফন করতে হয়েছে।’

৪. জানাযায় উপস্থিত জমিয়ত নেতা মুফতী মনির হোসেন কাসেমী বলেন:
‘অত্র এলাকার দুর্ঘটনা কবলিত মসজিদটির রাস্তা কতটা নোংরা। মসজিদের সামনের রাস্তায় সবসময়ই ড্রেনের পানি এসে জমা হয়ে থাকে। এটার প্রতি এলাকার নেতৃবৃন্দের কোনও খেয়াল নেই। যখন দুর্ঘটনাটা ঘটলো তখনও তো তারা পারত পুরা রোডটাকে বালু দিয়ে ভরাট করে দিতে। তাও করা হয়নি। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, এই রাস্তাগুলো ঠিক করার এবং পানি নিষ্কাশন পদ্ধতি উন্নত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’
তিনি আরও বলেন
হাদীসে এসেছে, ‘যারা অগ্নিদগ্ধ হয়ে এবং ডুবে মারা যায় তারা শহীদ হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’

৫. লাশগুলোর গোসল দাতার সাথে কথা হয়। তিনি বলেন :
আমি এই জীবনে বহু মৃত ব্যক্তির লাশ গোসল দিয়েছি। কিন্তু এই দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ লাশ গুলোর মতো কোনো লাশ পাইনি। ২৪তম ব্যক্তির লাশের অবস্থা এমন ছিল, যেন তার অঙ্গগুলো ক্ষয় হয়ে পড়ে যাবে। তাই স্বাভাবিকভাবে গোসল দিয়ে কাপড় পরিয়ে দিয়েছি। প্রত্যেকটা লাশ ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।

৬. এলাকাবাসীর সাথে কথা হয়। তাদের সকলের দাবি হলো, নিহত পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে যেন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এবং মসজিদের মত নিরাপদ স্থান যাতে মৃত্যুকূপে পরিণত না হয় সেজন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আর এলাকার সমস্ত রাস্তাঘাট ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা যেন উন্নত থেকে উন্নততর করা হয়। সর্বোপরি সবাই নিহতদের প্রতি মাগফেরাত কামনা করে অশ্রুসজল নয়নে দোয়া করেছেন।

বিজ্ঞাপন