ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে বার্ন ইউনিটে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ফরিদ মিয়া

নুরুদ্দীন তাসলিম।। -জাতীয় বার্ন ইউনিট থেকে

তল্লা মসজিদে দুর্ঘটনার আগের দিন ময়মনসিংহ থেকে নারায়ণগঞ্জে ছোট ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে আসেন ফরিদ মিয়া (৫৫)। ফরিদ মিয়ার ছোট ভাই মোবারকের বাসা তল্লা মসজিদের একেবারে কাছে। মোবারক দিনের চার ওয়াক্ত নামাজ তল্লা মসজিদে আদায় করলেও কুরআন শিক্ষা ক্লাসে অংশ নিতে নিয়মিত এশার নামাজ পড়েন পার্শ্ববর্তী মসজিদে।

বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনার দিন (৪ সেপ্টেম্বর) শুক্রবার তল্লা মসজিদে চার ওয়াক্ত নামাজ একসাথে পড়েন দু’ভাই। এশার নামাজে মোবারক পাশের এলাকার মসজিদে গেলেও বাসার কাছে হওয়ায় বড় ভাই ফরিদ মিয়া যান তল্লা মসজিদে। মসজিদে যাওয়ার আগে মোবারক তার ভাইকে ভাতিজা ভাতিজির সাথে হাসি-আনন্দে মেতে থাকতে দেখেন। এই ছিল সুস্থ অবস্থায় বড় ভাইয়ের সাথে তার শেষ সুখ স্মৃতি।

এতোটুকু বলে হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে নিজের আবেগকে সামলাতে পারছিলেন না মোবারক। হুহু করে কেঁদে উঠছিলেন বারবার।

ভাইয়ের সাথে কাটানো জীবনের সুখ স্মৃতিগুলো মনে হলেই অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠছে মোবারকের মন। একেএকে ২৭ জনের মৃত্যুর খবর মোবারকের মনের ভয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকা বড় ভাইকে হারানোর বেদনা এতো তাড়াতাড়ি সইতে চান না তিনি। তার ছেলেদের সাথে আবারো হাসি-আনন্দে মেতে উঠতে দেখতে চান ভাইকে। বারবার তার আবেগভরা কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল আফসোস- হায় সেদিন যদি ভাইকে সাথে নিয়ে যেতাম, তাহলে হয়তো আজ অজানা আশঙ্কা আর ভয় তাড়িয়ে বেড়াতো না বার্ন ইউনিটের পাঁচ তলায়।

 আরো পড়ুন:  ‘সময় শেষ হয়ে গেলো, আমাকে নামাজ পড়তে দাও’

 ‘ছেলেকে ফিরে না পেলে আর কখনোই হয়তো ক্ষুধার্ত হবো না’

দুর্ঘটনায় দগ্ধ চিকিৎসাধীনদের একজন তল্লা এলাকার অটো রিক্সাচালক আব্বাস আলী (৪০)। সেদিন রিক্সা চার্জে রেখে নামাজে যাওয়ার সময় ছোট ছেলে আব্বাস আলীকে জড়িয়ে ধরে তাকে কোথাও না যেতে বায়না ধরে, ছেলের কপালে চুমু খেয়ে আব্বাস আলী বলেন, পাঁচ মিনিট দাঁড়াও নামাজ পড়ে আসি। এরপর আব্বাস আলী এসেছেন, তবে ছেলেকে নিজ বাড়িতে আদরে ভেজাতে নয়, অ্যাম্বুলেন্সে জাতীয় বার্ন ইউনিটে।

আব্বাস আলীর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দুই ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে অন্ধকার দেখছেন স্ত্রী আখি নুর। বিশাল এই পৃথিবী যেন সংকীর্ণ হয়ে আসছে তার সামনে। পরিবারে স্বামীই তার একমাত্র উপার্জনকারী। স্বামীকে ছাড়া বাচ্চাদের নিয়ে কঠিন হবে তার জীবন। এদিকে ক্ষণে ক্ষণে একেকটা মৃত্যুর খবরে কেঁপে উঠছে তার অন্তরাত্মা।

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে গ্যাস লিকেজের এই দুর্ঘটনায় মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ এখন পর্যন্ত ২৭ জন শহীদ হয়েছেন। মামুন নামে একজনকে ছাড়পত্র দিয়েছেন ডাক্তাররা। বাকিরা এখনো চিকিৎসাধীন। তবে কেউ শঙ্কামুক্ত নন।

আরো পড়ুন: বেড়েই চলেছে মৃতের সংখ্যা, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি তল্লা মাঠ

                  সরেজমিন প্রতিবেদন: কী ঘটেছিল নারায়ণগঞ্জের সেই মসজিদে

৫০ হাজার টাকা ‘ঘুষ’ ও ২৪টি জীবনের ট্রাজেডি!

মসজিদে বিস্ফোরণ: হাসপাতাল থেকে প্রথম ছাড়পত্র পেলেন একজন

মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আজ গণশুনানি, প্রত্যক্ষদর্শীদের অংশগ্রহণের আহ্বান

মসজিদের ৬ এসির একটিও বিস্ফোরিত হয়নি: তদন্ত কমিটি

‘এসি নয়, মসজিদের নিচের গ্যাস লাইন থেকেই বিস্ফোরণ’

বিজ্ঞাপন