পাশ্চাত্যে কোরআন পোড়ানো ও নবীর অবমাননা: মৌচাকে ঢিল ছুঁড়ে কামড় খাবেন না

আবু উবায়দা নোমান।।

সুইডেনে কোরআন পোড়ানোর ঘটনার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই মুসলিম উম্মাহর কলিজায় ফের আঘাত করেছে ফ্রান্সের সেই কুখ্যাত ম্যাগাজিন শার্লি হেবদো। গতকাল বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক প্রায় সকল গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

খবরে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের রম্য ম্যাগাজিন শার্লি হেবদো আবারো হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যঙ্গচিত্র পুনঃপ্রকাশ করে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছে।২০১৫ সালে ওই ম্যাগাজিনটির কার্যালয়ে বন্দুক হামলার বিচার চলতি সপ্তাহে শুরু হচ্ছে। একে সামনে রেখে নাকি এগুলোর প্রকাশ!

বস্তুত এমন ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করার জন্যই ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি ম্যাগাজিনটির কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। এতে ম্যাগাজিনটির সম্পাদক ও নামকরা তিনজন কার্টুনিস্টসহ ১২ জন নিহত হয়। আর দুই হামলাকারী নিহত হন।

এদিকে দুই দিন আগে সুইডেনের মালমো শহরে তিন উগ্রবাদী খৃষ্টান কর্তৃক কোরআনের কপি পোড়ানো ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ওআইসিসহ বিশ্বের মুসলিমগণ নিন্দা জানিয়েছেন। এবং বিশ্ব জুড়ে মুসলিমরা অত্যন্ত সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু তাদের সংযমকে দুর্বলতা ভেবে পশ্চিমাদেশগুলো এবার নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনের মত ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা শুরু করেছে।

পশ্চিমের দেশগুলোতে পরিকল্পিতভাবেই এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা কিছু দিন পর পর ঘটানো হয়ে থাকে। তারা এভাবে শান্তিপ্রিয় মুসলমানদেরকে বিক্ষুব্ধ করে তুলে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিতে চায়। যাতে করে মুসলমানদের উপর হামলে পড়ার জন্য, তাদেরকে দাবিয়ে রাখতে অজুহাত দাঁড় করাতে পারে।

যে কোনো বিবেকবান মানুষেই এটা বুঝতে পারবেন যে, ধর্মকে অবমাননা করে উস্কানি দেওয়ার এই কৌশল জঘন্য ও নোংরা। এসব নোংরামি নিয়েই পশ্চিমারা নিজেদেরকে সভ্য বলে দাবি করে, যা ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়।

পক্ষান্তরে ইসলাম ও মুসলমানের  অন্যতম একটি সৌন্দর্য হল, তারা কখনো কোন আসমানী কিতাবের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেন না। কারণ, মুসলিমরা আল্লাহ তাআলার সমস্ত কিতাব ও সকল পয়গম্বরগণের উপর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে চলেন। তাছাড়া প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে অন্য কোন ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় স্থান, নবীকে নিয়ে এমন বর্বর ও অসভ্য আচরণে জড়িত থাকার নজির মুসলমানদের ইতহাসে নেই।

মুসলমানরা  সবসময়ই অপরের শ্রদ্ধাভাজনদের অসম্মান করা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা পেয়ে থাকে। কাউকে পীড়া দেওয়া, কষ্ট দেওয়া, আহত করার অনুমোদন ইসলাম দেয় না। অপর দিকে ধর্মীয়ভাবেও ইহুদী-খ্রিস্টানদের সাথে বিরুদ্ধতা থাকলেও তাদের নবীকে মুসলমানরা কখনো গালি দেয় না- গালি দিতে পারে না। ইহুদী-খ্রিস্টানরা মুসলমানদের নবীকে গালি দিলেও মুসলমানরা এর উল্টোটা করে না এবং করতে পারে না। কারণ হযরত মূসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালামকে সম্মান করা মুসলমানদের ঈমানের অঙ্গ। পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, মুসলমানরা আবেগপ্রবণ, মাথাগরম। অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে নবীর প্রতি বিষোদ্গার এবং ঘৃণা প্রকাশের মতো জঘন্য কাজগুলো তারাই করছে, মুসলমানরা নন। তারপরও দোষ দেওয়া হচ্ছে মুসলমানদের।

একের পর এক মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এসব আঘাত দেখে  মনে হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবেই বিশ্বের একটি চক্র আবার ক্রুসেডের অবতারণা করতে চায় পৃথিবীতে। এজন্য তারা বারবার বিনা কারণে মুসলমানদের অন্তরে জ্বালা সৃষ্টি করছে। এর জন্য ঠুনকো একটি অজুহাত ও শেস্নাগান তারা ব্যবহার করছে। তারা বলছে, এসবই মত প্রকাশের স্বাধীনতা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। কে কার অবমাননা করছে সেটা বড় কথা নয়, বরং কারো মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। কোনো মহান সত্তার অবমাননা করলেও করতে দিতে হবে।

মূলত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার শিরোনামে তারা নিজেদের কিছু গোষ্ঠীকে মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগে আঘাত করার সুযোগ করে দিয়ে থাকেন। অথচ এ স্বাধীনতাটি যে শর্তযুক্ত তা তো পুরো বিশ্বেই স্বীকৃত। আমাদের দেশের কথাই ধরা হোক। এখানে প্রধানমন্ত্রী বা সাবেক কোনো বড় নেতার অবমাননার জন্য ইতিমধ্যেই শাস্তি হয়েছে। আদালত অবমাননার শাস্তি তো হরহামেশাই হয়ে থাকে। ধরা যাক আমেরিকা, বৃটেন বা ফ্রান্সের কথা। সে দেশের কোনো নাগরিক কি তাদের সামনে গিয়ে যাচ্ছেতাই গাল-মন্দ করতে পারবে? না আজ পর্যন্ত করতে পেরেছে? সুতরাং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে নবী-অবমাননার ঘটনাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও অগ্রহণযোগ্য ও উস্কানিমূলক একটি প্রবণতা।

অবশ্য এখানে প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, হুবেব নবী বা নবীপ্রেম উম্মতির জীবনে এমন এক হৃদয়-ভেজানো অধ্যায় যে, যারা নবীর ইশকে পড়ে যায় দুনিয়ার কোনো প্রাচীর, কোনো নিয়ম কিংবা ফতোয়া তাদের আবেগের গতি রোধ করতে পারে না।  নবী-অবমাননাকারী ধৃষ্টের টুটি চেপে ধরার জন্য সব কিছুই তারা উপেক্ষা করতে পারে। যদি নিয়ন্ত্রণহীন নবীপ্রেমিক শ্রেণিটি আইন হাতে তুলে নিয়ে বসে তাহলে সর্ব প্রথম কাকে দোষ দেয়া হবে? মৌচাকে ঢিল দিয়ে যদি কেউ কামড় খায়, তাহলে তো দোষ ঢিলদাতারই হবে।  সুতরাং বুদ্ধিমানের কাজ হল, মৌচাকে ঢিল না দেওয়া এবং কামড় খাওয়ার মত অবস্থাই সৃষ্টি না করা।

 

 

বিজ্ঞাপন