ব্রিটিশ গবেষকের বিশ্লেষণ: আধুনিক ইউরোপের স্থাপত্য-ধারণা মুসলমানদের থেকে ‘লুট’ করা

ওলিউর রহমান ।।

গতবছর পুড়ে যাওয়া প্যারিসের ঐতিহাসিক গীর্জা নটরডেরম ক্যাথেড্রাল, লন্ডনের বিগ বেন ক্লক টাওয়ার এবং ভেনিসের সেন্ট মার্কস ক্যাথেড্রাল। উল্লেখিত তিনটিসহ এ জাতীয় আরও কিছু স্থাপনাকে আধুনিক ইউরোপের উৎকর্ষতার প্রতীক জ্ঞান করা হয়। এসব ভবনাদীর নির্মাণ এবং নিজ ভূমিতে তার অবস্থিতি নিয়ে ইউরোপের গর্বেরও অন্ত নেই। তবে এগুলোর স্থাপত্যশৈলি ইউরোপের মৌলিক কোনো কাজ নয়। এক ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং স্থাপত্যবিদের দাবি, ‘‘ইউরোপের ঐতিহাসিক এসব স্থাপনার শৈলি-ধারণা ইসলামি বিশ্ব থেকে ‘লুট’ করা’’।

বিজ্ঞাপন

ডায়না ডার্ক। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং স্থাপত্য গবেষক। ব্রিটেনের ইতিহাস নিয়ে লিখিত তার বইয়ে বলেন, যদিও ইউরোপ কখনো স্বীকার করে না বা এসব স্থাপত্য ধারণা অন্যের থেকে ‘ধার’ করে আনার স্বীকৃতি প্রদান করে না তবে এটাই চূড়ান্ত কথা যে ইউরোপের এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা তার পূর্বে নির্মিত মুসলমানদের স্থাপনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ফলে নিজেদের মৌলিক স্থাপত্যকর্ম বলে ইউরোপের প্রচার যে সম্পূর্ণ মিথ্যা এটা ধারণা করা কঠিন হয় না। আরও সুস্পষ্ট করে বললে, “ঐতিহাসিক গীর্জাগুলোতে যে নিদর্শন ব্যবহার করা হয়েছে ইউরোপীয় ঐতিহ্য এবং খ্রিস্টের ইতিহাসে তার কোনো নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং সিরিয়ার আলেপ্পো এবং ইদলিব প্রদেশের প্রাচীন সাধারণ ভবনগুলোতে সচরাচরই দেখা মেলে এসব স্থাপত্যশৈলির। যেগুলো মুসলিম স্থাপত্যবিদদের নির্মিত।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ইউরোপের এই কাজকে চুরি বা লুট বলে আখ্যায়িত করেন ডায়না ডার্ক। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যেহেতু ইউরোপ তুর্কি এবং আরব স্থাপত্যবিদদের থেকে আইডিয়া ধার করার বিষয়টির স্বীকৃতি প্রদান করে না বরং এগুলোকে নিজের সৃজনশীলতা বলে পরিচয় দেয় তাই চুরি বা লুট ভিন্ন অন্য কোনো শব্দ তাদের এই অপকর্মের বিশ্লেষণের জন্য উপযোগী নয়। ডার্ক তার বইয়ের নামও দিয়েছেন ‘‘বেদুইনদের থেকে চুরি করা বিদ্যা’’।

ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ডার্ক উল্লেখ করেন, “গথিক স্থাপত্যের উন্নতি, অগ্রগতিতে ‘গথ’দের থেকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের অবদান বেশি। সুতরাং আধুনিক ইউরোপে যে গথিক স্থাপত্যের বহুল ব্যবহার দেখা যায়-এটা মুসলমানদের সংস্কৃতি থেকে ধার করা নিঃসন্দেহে। কিন্তু পশ্চিমা সমাজে প্রবলমাত্রায় ইসলামফোবিয়ার উপস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষ এই সত্য সম্পর্কে অবগত নয়। তবে এখন সময় এসেছে সত্য উন্মোচিত করবার”।

শুধু ডায়না ডার্ক নয়। মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আরেক ব্রিটিশ গবেষক ভন হার্ট বলেন, পশ্চিমা আর্কিটেকচারে ইসলামি এবং আরবীয় প্রভাব অস্বীকারের প্রবণতা তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করছে খ্রিস্টীয় অসহিষ্ণুতা এবং পশ্চিমা সমাজে ইসলামফোবিয়ার ভয়াবহ বিস্তার।

গথিক শিল্প

ইউরোপসহ সমগ্র বিশ্বে ভবন নির্মাণে বহুল ব্যবহৃত গথিক শিল্পকে গথদের দিকে সম্মন্ধযুক্ত করা হলেও ইংরেজ ‘গথ বিশেষজ্ঞ’ ক্রিস্টোফার ওয়েনের দাবি, গথিক আর্কিটেকচার আসলে গথদের আবিস্কার ছিল না বরং এগুলো আরব-ইসলামিক উৎস থেকে গৃহিত। ওয়েনের বিবেচনা মতে, ক্রুসেডের মাধ্যমেই গথ শিল্প পশ্চিমে প্রবেশ করে।

স্পেন এবং ইসলামি উত্তরাধিকার

তবে ডায়না ডার্কের মতে, মুসলমানরা যখন উমাইয়া খেলাফতকালে স্পেন বিজয়ের পর সেখানে উৎকর্ষ সাধন করে তখনই ইউরোপ এই নতুন স্থাপত্যরীতি সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করে। দিনে দিনে তা নিজেদের আবিস্কার বলে দাবি করা শুরু করে। এমনকি মুসলমানদের ঐতিহ্যের ধারক স্পেনের সেভিল, গ্রানাডা, কর্ডোভার মসজিদ বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে গীর্জায় রূপান্তরিত করে ইসলামিক চিহ্নগুলোকে মুছে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। তবে তখনকার মুসলমানদের কেন্দ্রীয় শহর দামেস্কেও যেহেতু স্পেনের অনুরূপ নির্মাণশৈলি বিদ্যমান তাই স্পেন মুসলমানদের স্থাপনাকে গীর্জায় রূপান্তর করেও নিজের বলে শক্ত দাবি করতে পারে না।

ডার্কের মতে, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মানুষের যাতায়াত কম থাকায় সেখানের অনবদ্য স্থাপত্যশৈলি বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। মানুষ ইউরোপ ভ্রমণ করেই মুগ্ধ হয়ে যায় এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে বসে।

ডার্ক তার বইয়ে চিত্র উপস্থাপন এবং তথ্য বিশ্লেষনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন ইউরোপের শ্রেষ্ঠ স্থাপনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ঐতিহাসিক সব স্থাপনার সাথে কতটা সাদৃশ্যপূর্ণ।

১. সেন্ট মার্কস ক্যাথোড্রাল

গার্ডিয়ানে বলা হচ্ছে, ভেনিসে অবস্থিত এই স্থাপনাটি এই সময়ের অন্যতম বৃহত গীর্জা। ইটালিতে স্থানীয়ভাবে এটিকে স্বর্ণ গীর্জা বলেও পরিচয় দেওয়া হয়। সারা বিশ্ব থেকে মানুষ এর স্থাপত্যশৈলি দেখতে যায়।

কিন্তু ডার্ক তার বইয়ে দেখাচ্ছেন, ইউরোপীয়দের এই গর্বের দালানটি পুরোপুরি ডোম অব রক মসজিদের অবয়বে নির্মিত। এমনকি এর জানালা, গম্ভুজ এবং খিলানেও পুরোপুরি সাদৃশ্য বিদ্যমান। ভেতরের আলোকসজ্জা এবং ভেন্টিলেশন ব্যবস্থাও পুরোপুরি রক মসজিদ থেকে কপি করা। তাছাড়া এক রক মসজিদের আদলে ইউরোপে আরও কত শত উল্লেখযোগ্য স্থাপনা বিদ্যমান তার সঠিক হিসেব নেই।

২. বিগ বেন ক্লক টাওয়ার 

ছবির ডানপাশের যে সুউচ্চ স্থাপনাটি দৃশ্যমান এটি ঐতিহাসিক উমাইয়া মসজিদের মিনার। সেই হিজরী ২য় শতকে উমাইয়া খেলাফতকালে এটি নির্মাণ করা হয়। বামপাশে ঘড়ি বিশিষ্ট টাওয়ার ইংল্যান্ডে এটি বিগ বেন ক্লক টাওয়ার নামে পরিচিত।

ডার্কের বর্ণনামতে, গথিক স্থাপত্যরীতির সাথে যারা পরিচিত তাদের খুব সহজেই আন্দায করার কথা বিগ বেন ক্লক টাওয়ারের নির্মাণ ধারণাটি উমাইয়া মসজিদের মিনার থেকে নেওয়া হয়েছে। ছবিতে তথ্য চিত্রায়নের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনারও প্রয়োজন পড়ে না।

৩. নটরডেম ক্যাথোড্রাল।

গতবছরের এপ্রিল মাসে পুড়ে যাওয়া এ গীর্জাটি প্রায় আটশ বছর আগে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে নির্মাণ করা হয়। প্রাচীন এই গীর্জাটি দেখতে বিভিন্ন দেশ থেকে দর্শনার্থীরা প্যারিসে পাড়ি জমাত। তবে ডার্ক দেখাচ্ছেন, এটিও ইউরোপের মৌলিক বা নিজস্ব কোনো অবদান নয়। বরং প্রাচীন ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটিও সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের কলব লোজা গ্রামের প্রাচীন একটি ভবনের আদলে নির্মিত। ২০১১ সালে ইউনেস্কো কলব লোজাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভূক্ত করে।

আল জাজিরা একটি ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে কলব লোজার সাথে নটরডেম গীর্জার সাদৃশ্য বিস্তারিতভাবে প্রদর্শন করে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, নটরডেমের জোড়া দালান এর গোলাপ জানালা এবং খুঁটি স্থাপন সবই হয়েছে কলব লোজার অনুরূপ।

ডায়না ডার্কের ‘স্টিলিং ফ্রম দি সিয়ারসেন্স’ বইটি সম্প্রতি পশ্চিমে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষত আরও অনেক ইউরোপীয় স্থাপত্যবিদ ডার্ককে সমর্থন করায় পাঠক এই বই পাঠে আগ্রহী হচ্ছে। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডায়না ডার্কের ‘স্টিলিং ফ্রম দি সিয়ারসেন্স’ বইটি আনন্দদায়ক এবং প্রামাণ্য। এটি নিঃসন্দেহে ইউরোপের ঐতিহাসিক অনেক স্থাপনার নির্মাণের উৎসের ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করেছে।

সিরিয়ান বংশোদ্ভত এই ব্রিটিশ নাগরিক তার আরেক বিখ্যাত ‘মাই হোম ইন দামেস্ক’ বইয়ে আক্ষেপ করে লেখেন, দুঃখজনকভাবে আমার মাতৃভূমি সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যদেশ থেকে দর্শণার্থীরা প্রতিবছর ইউরোপের এসব স্থাপত্যশৈলি দেখতে আসে এবং তারা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে। অথচ এসব স্থাপত্যবিদ্যা যে তাদের দেশ থেকেই লুট করা হয়েছে সে সম্পর্কে তারা অবগত নয়।

সূত্র: গার্ডিয়ান, মিডল ইস্ট আই, আলজাজিরা।