মিডিয়ার বাতাস: নারী উন্নয়নের নয়া মাপকাঠি!

ইমামুদ্দীন মেহের ।।

‘নারী উন্নয়ন’ একটি পুরনো শব্দ। বস্তুবাদী সভ্যতার তৈরিকৃত অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি শ্লোগান। বস্তুজগতের অন্যান্য ভোগ-সামগ্রীর মতো নারীকেও যারা কথিত ‘উন্নত’ করতে চায়- তাদেরই দেওয়া এই অমর্যাদাকর শিরোনাম- ‘নারী উন্নয়ন’। একসময় এ শব্দটির বেশি ব্যবহার হতো নারীর শিক্ষা (জাগতিক অর্থে), নারীর মেধা, বিত্তের অগ্রসরতা এইসব ক্ষেত্রে। কিন্তু গত দুই যুগ যাবত যে কেউ লক্ষ করলে দেখবেন, মুসলিম দেশগুলোতে নারীর উন্নয়ন বলতে এখন নতুন একটি মাপকাঠি দাঁড় করানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত ১০-১৫ বছর যাবত আমরা এর লক্ষণ দেখছি। নারী উন্নয়নের মাপকাঠি বলতে এখন বোঝানো হয়, কোন্ দেশের মেয়েরা ড্রাইভিং করতে নেমেছে, কোন্ দেশের মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, কোন্ দেশের মেয়েরা একটু খোলামেলা পোশাক পরার সাহস পাচ্ছে, কোন্ দেশে সমকামি নারীরা প্রকাশ্যে তাদের পরিচয় প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে, কোন দেশের ফিল্ম ও চলচ্চিত্রে নারীরা এখন বেশি খোলামেলা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে- এইসব। মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে এগুলোই এখন নতুন মাপকাঠি হয়েছে। আর যেসব গণমাধ্যম পশ্চিমা মূল্যবোধ ও সেক্যুলারিজম দ্বারা প্রভাবিত, মুসলিম দেশগুলোতে যারা সবসময় প্রভাব বিস্তার করতে তৎপর, সেইসব গণমাধ্যমে এধরনের নারীদেরকেই বারবার হাইলাইট করা হয়।

সাম্প্রতিককালে এই প্রসঙ্গটি আবার সামনে আসার কারণ হলো, গত কয়েকদিন আগে যশোরের একটি মেয়ে বিয়ের কয়েক বছর পর ‘গায়ে হলুদের’ নামে মোটর সাইকেলের মহড়া দিয়েছে। একদল যুবককে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা বের করে এই তরুণী। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সমালোচনা, প্রতিবাদ এবং নিন্দা উচ্চারিত হয়েছে। বাংলাদেশে বিরাজমান ক্ষয়িষ্ণু ইসলামি মূল্যবোধ যতটুকু রয়েছে, সামাজিক মূল্যবোধের যেটুকুই অবশিষ্ট আছে, তার ভিত্তিতেই ছিল এসব প্রতিবাদ ও সমালোচনা। কিন্তু এর পরপরই দেখা গেছে, বাংলাদেশে সক্রিয় আন্তর্জাতিক যেসব গণমাধ্যম রয়েছে, সেগুলোসহ দেশের প্রভাবশালী প্রিন্ট-অনলাইন এবং টিভি মিডিয়াগুলো মেয়েটির ‘জাগরণমূলক’ সাক্ষাতকার, তার পক্ষে প্রতিবেদন ইত্যাদি প্রকাশ করা আরম্ভ করে। একটি মেয়ে রাস্তায় বাইক নিয়ে মহড়া দিল- এটা যেন বিরাট এক ঘটনা। সামাজিক বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে- এরকম একটা ভাব। ‘ট্যাবু’ ভেঙ্গে ফেলছে- ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব মিডিয়ার আচরণে মনে হয়, বাংলাদেশে এর আগে যেন কোনো ‘নারী অগ্রসরতার’ কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

এদেশে জাগতিক অর্থেই যদি আমরা বলি, তাহলে হাজার হাজার নারী চিকিৎসক হয়েছেন, এর মধ্যে পর্দানশীন নারীও রয়েছেন। হাজার হাজার নারী বিচারপতি বা ম্যাজিস্ট্রেটের আসন অলংকৃত করে আছেন। ধর্মীয়ভাবে এর ভালো-মন্দের নানা বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশনা রয়েছে, কিন্তু তারপরও আমরা বলব, জাগতিক অর্থে তারা শিক্ষা-দীক্ষা, মেধা ও কর্মের মধ্য দিয়েই অগ্রসর হয়েছেন। এধরনের কথিত ‘ট্যাবু’ ভাঙ্গা ও সামাজিক বিদ্রোহমূলক আচরণ- এগুলোর সঙ্গে অপরিচিত ছিলেন তারা।বিদ্রোহ করতে মোটর বাইক নিয়ে তাদের মহড়া দিতে হয়নি। কিন্তু সেসব দিক থেকে চোখ সরিয়ে একটা মেয়ে মোটর সাইকেলের শোভাযাত্রায় বের করলো, সেই শোভাযাত্রার ভিডিও-ছবি সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে খুব একটা অহংকার ও বিদ্রোহাত্মক আচরণ প্রকাশ করল, আর মিডিয়াগুলোতেও এসব কিছুকে বাতাস দেওয়া হলো এবং বাহবা দেওয়ার একটা পরিবেশ তৈরি করা হলো। যেন এ সমাজে এই ‘বাইকার নারীর’ আগে অন্য নারীরা কোনো কাজই করতে পারেনি। কেন ঘটছে এমনটি? বিশ্লেষকগণ মনে করছেন,এসব প্রমোট-প্রচারণার ঘটনায় মুসলিম দেশগুলোতে মেয়েদেরকে নেতিবাচকভাবে উন্নয়ন বা অগ্রসরতার কথিত মাপকাঠিতে নামিয়ে নিয়ে আসার একটা নতুন মিডিয়াগত প্রয়াস ও দুরভিসন্ধির আলামত দৃশ্যমান।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আরব দেশগুলোতে গত কয়েক বছর যাবত মেয়েদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও অনুমতি নিয়ে ঠিক একই রকম বাতাস দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে আরবের কোন দেশে মেয়েরা কীভাবে বাইরে বের হতে পারছে, কে কতটা সংক্ষিপ্ত পোশাক পরতে চাচ্ছে বা পরতে পারছে, কোন্ মেয়েরা স্বভাবজাত দাম্পত্য জীবন ত্যাগ করে পশ্চিমের ন্যায় উদ্দাম জীবনযাপন করার সুযোগ নিতে চাচ্ছে,কোন কোন নারী তার দেশ থেকে পালিয়ে যেতে চাচ্ছে, অথবা স্বাভাবিক যৌন জীবনের পরিবর্তে সমকামিতার জীবন বেছে নিয়ে প্রকাশ্যে তার ঘোষণা দিচ্ছে, কে কে তার পরিবারের বন্ধন এবং পরিবারের সুন্দর শৃংখলার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে- এ বিষয়গুলি বারবার মিডিয়ায় সামনে আনা হয়েছে ও হচ্ছে।এ সবকিছুই মূলত একই সূত্রে গাথা কি না লক্ষ করলেই বোঝা যাবে।

এরও আগে যদি বাংলাদেশেরই বিভিন্ন চিত্র সামনে রাখা হয়, দেখা যাবে বাংলাদেশের কোনো অজপাড়া গাঁয়ে হাফ-প্যান্ট পরা মেয়েদের কোন্ ফুটবল টিম কোথায় খুব বড় স্থান করে নিল,এসব নিয়ে খুব বাতাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিধিনিষেধের বাইরে এসেও যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলেও আমরা দেখতে পাব, নারীর শিক্ষাগত উন্নয়ন, বাহ্যিকভাবে তাদের সামাজিক অবস্থান, শিক্ষাদীক্ষা, প্রশাসনিক এবং আর্থিক উন্নয়নের চাইতেও বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে, মুসলমান সমাজের ধর্মীয় মূল্যবোধ ভেঙ্গে কারা কারা ‘অগ্রসর’ হচ্ছে। যেমন যশোরের এই বাইকার নারীর ঘটনা, নারীদের ড্রাইভিং করার ঘটনা, সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে বের হবার ঘটনা, পর্দার বিধান উপেক্ষা করার ঘটনা, পারিবারিক জীবনকে ধ্বংস করে দেওয়া কোনো নারীর ঘটনা সামনে নিয়ে আসা- এগুলো এই অর্থে দুরভিসন্ধি যে, মুসলিম দেশগুলোতে মেয়েদেরকে উন্নয়ন, বাহবা, পদক অথবা বড় কোনো কৃতিত্বের অধিকারী হওয়ার জন্য এই ধরনের পথে হাঁটতে হবে, মিডিয়াগুলো নির্দিষ্ট এই পথটি দেখিয়ে দিতে চাচ্ছে। এর একটা বড় সাম্প্রতিক সময়ের উদাহরণ হলো, পাকিস্তানের মালালা। মালালাকে যেভাবে নোবেল দেওয়া হয়েছে, ঠিক যেই ধরনের ‘বিদ্রোহের প্রতীক’ তাকে বানানো হয়েছিল, এরই পরবর্তী ছোট ছোট জের বলা যায় এগুলোকে।

আমরা তাই শিক্ষিত মুসলিম নর-নারী যারা যেই অবস্থানেই আছেন, তাদেরকে সতর্ক থাকতে বলব। পশ্চিমা মিডয়া বা পশ্চিমা প্রভাবিত মিডিয়ার নারী বিষয়ক এই ধরনের বিপথগামী এবং বিচ্যুত বাহবা আর পিঠ চাপড়ানি দ্বারা যেন মুগ্ধ না হন কেউ। বরং বুঝতে চেষ্টা করুন সবাই যে, এটা হলো মুসলিম সমাজের নারীদেরকে বিপথে উস্কে দেওয়ার পাশ্চাত্যায়নের মিডিয়াগত প্রভাব। যারা মনে করেন মুসলিম সমাজে নারীদের জাগতিক দিক থেকেও বিকাশ দরকার, আমি তাদেরকে বলব যে, তারা পর্দা রক্ষা করে জাগতিক লেখাপড়াসহ অন্য অনেক সেবামূলক সেক্টর রয়েছে-যেখানে এ দেশের নারীরা অলরেডি রয়েছে- ওইসব জগতে তারা পা রাখার দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেয়ে এই ধরনের ভুল পিঠ চাপড়ানির দিকে তারা যেন মনোযোগ না দেন। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং একটা সমাজ ধীরে ধীরে ধ্বসে পড়বে। এই পিঠ চাপড়ানি মতলবি পিঠ চাপড়ানি। এই বাহবা মতলবি বাহবা।

কথা চলছিল যশোরের আলোচিত বাইকার নারীকে নিয়ে। যেসব মিডিয়া তার সাক্ষাতকার প্রকাশ করেছে, তারা কিন্তু কতগুলি অসঙ্গতির কথা একবারও বলছে না যে, রাস্তা দখল করে এই মেয়েটি যে মোটরসাইকেল চালিয়েছে, এদের একজনের মাথাতেও হেলমেট ছিল না। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না বাহবা দানকারী মিডিয়ায়। একজন নারী মাঝখানে, দুই পাশে অনেকগুলি পুরুষ মোটরবাইক চালক, এটা যে একটা বিশেষ রকম রাস্তা বন্ধ করা ঘটনা,এই জিনিসগুলি নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলছে না। আরেকটি ব্যাপার হলো, প্রথমে বলা হয়েছিল, গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য এটা করা হয়েছে। পরে প্রকাশ হয়েছে,বিয়ে ানেক আগেই হয়েছে।মিডিয়াগুলো এখন আর এই গায়ে হলুদ নিয়ে প্রশ্ন করছে না। যদিও এ নারী স্বীকৃতি দিয়েছে যে, তার সন্তানও আছে। এটা যে গায়ে হলুদের জন্যেও না,বিয়ে বিষয়ক কোনো অনুষ্ঠানের জন্যও না, এটা যে নিছক যশোরের রাজপথে মহড়া দেওয়ার জন্যে রাজপথে- এটা বোঝা যায়। কিন্তু এই চতুর মিডিয়া এবং পশ্চিমা ঘেষা মিডিয়াগুলো এ সব সত্যকে আড়াল করে ওই মেয়েটিকে জনপ্রিয় করা এবং তার এই ‘বিদ্রোহাত্মক’ বা কথিত উন্নয়নমূলক আচরণকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তারা এটা করছে। আসলে এটা একটা ফেইক বাহবা,ফেইক উন্নয়ন।