ই-ভ্যালি: নতুন রুপে সেই নিষিদ্ধ এমএলএম

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: যে কারবারগুলো ইসলামে নিষিদ্ধ সেগুলোর পতন বাস্তবেও অবশ্যম্ভাবী এ চির সত্য কথাটি আবারও প্রমাণিত হল ই-ভ্যালি নামক কথিত ইকমার্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সম্প্রতি টাকা নিয়ে গ্রাহককে সময় মতো পণ্য না দেওয়াসহ নানা অভিযোগের ভিত্তিতে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ‘ইভ্যালী ইকমার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৯ লাখ টাকাসহ ব্যবস্থাপক ও দুই কর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে দেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে।

মাত্র ৫০ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধন দিয়ে শুরু করা এই ইভ্যালি কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন এখনো ৫০ হাজার টাকাই বলে দেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বলে জানা গেছে। ২০১৮ সালের ১৪ মে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন নেয় ই-ভ্যালি ডটকম লিমিটেড। এর অনুমোদিত মূলধন ৫ লাখ টাকা। কার্যক্রম শুরুর দুই বছর পার না হতেই এ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। অথচ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৫০ হাজার টাকা। ব্যবসা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এক বছর আট মাস বয়সী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে নানা অভিযোগও জমা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়ের ধরন দেখে বিশেষজ্ঞরাও আশঙ্কা করছেন, এতে মানি লন্ডারিংয়ের সুযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের জানা মতে এখনো কোনো দারুল ইফতা থেকে লিখিত আকারে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো কিছু বলা হয়নি। কিন্তু ইতিমধ্যে সকলের সামনে চলে এসেছে যে এটি সেই নিষিদ্ধ ঘোষিত এমএলএমের নতুন রুপ যা আজ থেকে  আরো কয়েকবছর আগে দেশের নির্ভরযোগ্য আলেমগণ জাতির সামনে সর্বপ্রথম ইসলামের বিধান মোতাবেক নাজায়েয ফতোয়া দিয়েছিলেন।

২০১৩ সালে এমএলএম আইন পাস হওয়ার সময়কার বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ‘ ই-ভ্যালির কার্যক্রম তো অনেকটা এমএলএম কোম্পানির মতোই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করলে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

এ বিষয়ে আইনজীবী তানজীব-উল-আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ই-ভ্যালির কার্যক্রমের ধরন অনেকটা এমএলএম কোম্পানির মতো। এমএলএম কোম্পানিগুলোর প্রতারণার চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছে, ই-ভ্যালিও তাই করছে। ৫০ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি দেড় হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। কোম্পানির পরিচালকেরা সক্ষম হলে পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে পারতেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এখানে মানি লন্ডারিং হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে দেখতে পারে।’

ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএসের বাসিন্দা আমানউল্লাহ চৌধুরী ই-ভ্যালির প্রতারণায় ভুক্তভোগী। তিনি গত ১৪ জুলাই দুদক চেয়ারম্যান বরাবর এক আবেদনে ই-ভ্যালি নিয়ে তদন্ত করার অনুরোধ জানান। সাংবাদিকদেরকে তিনি বলেন, ই-ভ্যালি হচ্ছে ডিজিটাল এমএলএম কোম্পানি। দেশের ই-কমার্স প্ল্যাটফরমকে বাঁচাতে এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা উচিত।

আরো পড়ুন: ইভ্যালির অস্বাভাবিক ব্যবসা: আলেমগণ কী বলেন

বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার ই-ভ্যালি সম্পর্কে লিখেছেন,  এটা একটা মাছের তেলে মাছ ভাজার নব্য এম এল এম। একটা ক্লাসিক ফ্রড স্ক্যাম। অন্যরাও নানা পদ্ধতিতে মানুষ ঠকাচ্ছে। দারাজকে নিয়েও বলেছিলাম। তারা ক্রেতাকে সরাসরি ঠকায় না তবে ক্রেতাকে হয়রানী করে ও নানা ভাবে ভোক্তা অধিকারকে ক্ষুন্ন করে। এটাও প্রতারণা। কাউকে কোন সেবা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে না দেয়াও ক্ষতি ও প্রতারণামূলক কাজ। লোকঠকানোর এই মহোৎসবের কারনে বাংলাদেশে সঠিক ভাবে ই ব্যবসা দাঁড়াচ্ছে না।অনলাইনে পণ্য বিক্রিতে ক্রেতা স্বার্থ সংরক্ষণে সরকারের কোন মাথা ব্যাথা না থাকায় এরকম নানা ঠগবাজি আছে।

দুর্নীতি দূর করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলার পরে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হওয়া অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর সম্প্রতি ই-ভ্যালি নিয়ে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে বলেন, পণ্য আছে ৫টি, যেহেতু কেউ জানে না, তাই টাকা জমা দিলেন হয়তো ১০০ জন। পণ্য পাবেন ৫ জন। বাকি ৯৫ জনের টাকা ঝুলে থাকবে। আর সবার বোঝা উচিত যে বিক্রেতা বা কোম্পানি আপনাকে পণ্যের সঙ্গে ১০০ শতাংশ, ১৫০ শতাংশ টাকা ফেরত দিচ্ছে। নিশ্চয়ই তিনি পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে বা পকেট থেকে দেবেন না। দেবেন নিশ্চয়ই অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বা অন্য কোনো অনৈতিক উপায়ে।

গত ২৪ জুন ই-ভ্যালি থেকে দুটি ফ্যান কেনার অর্ডার দিয়েছিলেন মিরপুরের বাসিন্দা কামরুল আহসান দাম ৫ হাজার ৮০০ টাকা। তিনি জানান, ই-ভ্যালি তাকে বলেছিল ৭ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ফ্যান পৌঁছে দেবে বাসায়। অর্ডারের সঙ্গে ৯০ শতাংশ অর্থাৎ ৫ হাজার ২২০ টাকা ক্যাশব্যাক পান কামরুল। এই টাকা ই-ভ্যালির সরবরাহ করা কাচ্চি বিরিয়ানি খেয়ে শেষ করেন। কিন্তু দুই মাস হতে চললেও ফ্যান আর পাননি তিনি।

তবে ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল দেশের বেশ কয়েকটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপনভাষ্যে তাদের সাথে এমএলএমের কোন যোগ সূত্রতা নেই বলে জানিয়েছে। এছাড়া ইভ্যালির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোও তারা অস্বীকার করেছেন।