বিবিসির প্রতিবেদন: বিশ্ব রাজনীতির চরম মুহূর্তে কী করবে পাকিস্তান

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ বর্তমানে চরম দুঃসময়ের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশ্ব-রাজনীতিতে চলছে নতুন মেরুকরণ। এই মুহূর্তে যদি মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিজেদের লক্ষ্য ও গন্তব্য ঠিক করতে না পারে, তাহলে শক্তি ও ক্ষমতার এই লড়াইয়ে নিজেরা টিকে থাকতে পারবে না। স্বাধীন চিন্তা চেতনা ও মজবুত পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করতে না পারলে এই দমকা হাওয়ায় খড়কুটোর ন্যায় হারিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশসহ প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রের এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করা উচিত।

আমাদের কাছের মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান জাতীয় ইস্যুতে তো সবসময় কঠিন সময়ের মোকাবেলা করে আসছে। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবেও চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে রয়েছে চিনের মতো বন্ধুরাষ্ট্র। অন্যদিকে রয়েছে প্রথম ও পুরোনো মিত্র আমেরিকা। একদিকে ভ্রাতৃপ্রতিম সৌদিআরব। অন্যদিকে রয়েছে ইরানের মতো প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র। একদিকে আছে ভারতের ন্যায় শত্রু রাষ্ট্র ও তাদের পাশে দাঁড়ানো আরব আমিরাত। যারা কাশ্মীরের ব্যাপারে নীরব হলেও ইসরাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে তৎপর। একদিকে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র ভারতের সাথে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হতে ব্যস্ত। আর অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম উম্মাহর সবচে বড় প্রচারক।

বিজ্ঞাপন

সবকিছুই একটা গতিতে চলছিল। কিন্তু এর‌ই মাঝে হঠাৎ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি আরবকে হুঁশিয়ার করে বললেন, “কাশ্মীর ইস্যুতে ওআইসির জরুরি বৈঠক ডাকুন। অন্যথায়..

এই ‘অন্যথা’ এর আগেই পাকিস্তানকে দেয়া সৌদি আরবের ঋণ ফেরত দেওয়ার তাগাদা এবং সেই মুহূর্তে পাকিস্তানের পাশে চীনের অবস্থান নেয়াটা সবকিছু স্পষ্ট করে দেয়।

ইসরাইল ও ভারতের সাথে আরব আমিরাতের সম্পর্ক, ভারতে সৌদি আরবের বিনিয়োগ ও ঐতিহাসিক পুঁজি বিনিয়োগের ঘোষণা এবং এই সবকিছুতেই আমেরিকার মোড়লগিরি চলমান বিরোধকে আরো উস্কে দিচ্ছে।

অন্যদিকে চীন, ইরান ও রাশিয়ার মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। চীন এবং ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে। ইরানের চাহবাহার প্রকল্পে ভারতের বেদখলিও চীনের জন্য নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে।

গতবছরের শেষ পর্যন্তও কেউ কল্পনাও করতে পারে নি যে, পৃথিবী কী থেকে কী হয়ে যাবে! করোনা মহামারীর পর পৃথিবীকে দুই ভাগে বিভক্ত হতে দেখা যাবে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণ হচ্ছে। প্রত্যেক রাষ্ট্র‌ই প্রস্তুতি নিচ্ছে যে, দুই ভাগে বিভক্ত হতে থাকা বিশ্বের পরাশক্তি ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে কীভাবে বিজয় অর্জন করা যায়?

ভারত ও আমেরিকার ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের মাঝেই চীন এবং ভারতের সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব, আরব আমিরাত ও ইসরাইলের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্ব, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার মৃদু দ্বন্দ্ব ইত্যাদি এই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করছে।

এই কারণেই মনে হচ্ছে যে, অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকেও সুস্পষ্টভাবে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করে নিতে হবে। বন্ধুর বন্ধু ও শত্রুর শত্রুকে প্রকাশ্যেই গ্রহণ করে নিতে হবে। ইয়াযিদের সাথেও সুসম্পর্ক আবার হুসাইনকেও সালাম দিবেন, এমন পলিসি থেকে এখন বের হয়ে আসতে হবে। বৈশ্বিক বন্ধুত্বের সাথে সাথে আঞ্চলিক বন্ধুত্ব‌ও ঠিক করে নিতে হবে।

গত সত্তর বছরে এই অঞ্চলের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো , বিশেষত বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান বেশ ভালোভাবেই নিজেদের মানচিত্রগত অবস্থানের ফায়েদা নিয়েছে। এদিক সেদিক থেকে যত আদেশ-নিষেধ এসেছে, সব ক্ষেত্রে নিজেদের ফায়েদা ও স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখেই আগে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করতে পেরেছে। কখনো এই শিবির কখনো ঐ শিবিরের অংশ এই নীতি অবলম্বন করে চলেছে।

পাকিস্তানের স্থপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যেই স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পররাষ্ট্র নীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা স্বাধীনতার কয়েক বছর পর‌ই তারা বেশ জাঁকজমকের সাথেই আমেরিকান শিবিরের সাথে নিজেদের আপনত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে মিটিয়ে দিয়েছে।

১৯৪৮সনের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকান জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে কায়েদে আজম বলেছিলেন যে, পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ থাকা উচিত।

এই ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি প্রণয়ন করতে গিয়ে জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য থাকবে যেন সবার সাথেই বন্ধুত্ব থাকে এবং কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই তাদের অপছন্দনীয় কোন পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকা। আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সততা ও নীতিগত কর্মকাণ্ডে বিশ্বাসী। আর আমাদের চেষ্টা থাকবে যেন আমাদের সব চেষ্টা-প্রচেষ্টাই বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাহায্য করে। জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী পাকিস্তান একেবারে রিক্ত ও অসহায় হয়ে অন্য দুই চারটা জাতির সাহায্য সহযোগিতার উপর ভর করে দিনাতিপাত করবে , এমন চিন্তা-ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতিগুলোকে ভুলে যেতে তাদের বেশি সময় লাগে নি এবং স্বাধীনতার মাত্র দুই মাস পর‌ই পৃথিবীর দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যকার লড়াইয়ে পাকিস্তান আমেরিকার দিকে নিজের আগ্রহ প্রকাশ করে দিল।

পরবর্তীতে ন্যাটো এবং তাদের বিভিন্ন চুক্তিতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আঞ্চলিকভাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতি সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। যার জের তারা এখনো ভুগছে।

যুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের আঞ্চলিক সম্পর্কোন্নয়ন ও একতায় জোর দিয়েছিলেন। একদিকে সমাজতান্ত্রিক চীন আর অন্যদিকে কম্যুনিস্ট রাশিয়ার সাথে সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য অর্ধেক আরব আর ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য অর্ধেক পারস্যের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।

যাইহোক, জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতায় বসা এবং তারপর একের পর এক আমেরিকার তোষামোদকারী নীতির এক লম্বা ইতিহাস আছে, যার আলোচনা পরে কখনো করবো।

পাকিস্তানের নিজের মানচিত্রগত অবস্থান এবং আঞ্চলিক গুরুত্বকে সামনে রেখে এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। অচিরেই আরো কিছু আরবরাষ্ট্র ইসরাইলমুখী হবে এবং পাকিস্তানের জন্য তা কঠিন হয়ে পড়বে।

এই নাযুক মুহূর্তে পাকিস্তানের এমন একটি পররাষ্ট্র নীতি তৈরি করা উচিত, যেখানে নিজেদের জাতিগত কল্যাণ ও জনসাধারণের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হবে। এই মুহূর্তে পাকিস্তানে যে পরিমাণ ভাষাগত, আঞ্চলিক ও দলগত বিভক্তি বিদ্যমান রয়েছে, আগে কখনো এমনটা ছিল না। সামান্য অসচেতনতাই জাতীয় ঐক্যকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিতে পারে। তাই যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে ‘জাতীয় কল্যাণ’ কে সামনে রেখেই করা উচিত পাকিস্তানের। সাথে সাথে অপরাপর মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর‌ও উচিত এমন সংকটময় মুহূর্তে নিজেদের লক্ষ্য ও কর্ম ঠিক করে নেয়া। না হয় এই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময়ে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

অবলম্বনে: মুহাম্মাদ শাহাদাত হুসাইন