আল আকসায় অগ্নিকাণ্ডের ৫১ বছর

 আরজু আহমাদ।।

২১ অগাস্ট, ১৯৬৯, বৃহস্পতিবার সকাল। ইহুদিবাদীদের ভাড়াটে সন্ত্রাসী ডেনিশ মাইকেল রোহান নামের অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তি পবিত্র আল-আক্বসা মসজিদের উত্তর-পূর্ব দিকে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন

এই পবিত্র মসজিদে হওয়া অগ্নিকাণ্ডের ধোঁয়া সর্বপ্রথমে দেখতে পান ফিলাস্তিনি পাহারাদারেরা। তাঁরা কাছে গিয়ে দেখেন নামাজের স্থানে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। উপস্থিত মুসলমানগণ আগুন নেভাতে দৌড়ে যায়। কিন্তু সশস্ত্র ইসরায়েলী সৈন্যরা এতে বাধা দেয়।

সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রাণপণে সেই বাধা উপেক্ষা করে দেখা যায় সবগুলো পানির পাম্প ইতোমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে, ফায়ার হোসগুলো কেটে টুকরো টুকরো করে রাখা হয়েছে। নিরুপায় হয়ে একজনের পর একজন সারি সারি দাঁড়িয়ে হিউমেন চেইন তৈরি করে ছোট ছোট পাত্রে পানি বহন করে আগুন নেভানোর চেষ্টা শুরু করা হয়।

পশ্চিম উপত্যকার নিকটবর্তী ফিলিস্তিনি শহর নাবলুস, রামাল্লা, বেথেলহাম, হেব্রন, জেনিন, তুলকারেম থেকে আসা আগুন নেভানোর গাড়িগুলোকেও দখলদার ইসরায়েলি সেনারা ভারী অস্ত্র মোতায়েন এবং ব্যারিকেড বসিয়ে আটকে দেয়।

পরে ইসরায়েল সরকার তাদের বিবৃতিতে বলে এই কাজ সমাধার দায়িত্ব ছিল জেরুজালেম পৌরসভার। তাই তারা অন্য শহরগুলোর গাড়ি আটকে দিয়েছে।

আগুন নেভাতে নেভাতে দেখা যায় মসজিদের বহু পুরনো অংশই পুড়ে গেছে। ৯০০ বছরের পুরনো কাঠের আর হাতির দাঁতের যে কারুকার্যগুলো সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী রহ. মসজিদে লাগিয়েছিলেন সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

যা হোক, এর দুইদিন পর গ্রেফতার করা হয় সেই অগ্নিকাণ্ডের হোতাকে। যদিও আদালত তাকে মানসিক রোগী হিসেবে চিহ্নিত করে সব অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দেয়। স্মর্তব্য আজও পশ্চিমা প্রশাসন এই মানসিক রোগী ট্রাম্পকার্ডটি ঠিকই ব্যবহার করে। তারা যে কোনো সন্ত্রাসী হামলার পর এর মধ্য দিয়েই দায়মুক্তি দেয়।

এই ঘটনার পরপরই ২৪ টি মুসলিম দেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটা পিটিশন জমা দেয় ২৮ আগস্ট। জর্দানের এম্বাসেডর মোহাম্মদ আল ফাররা সেই পিটিশনে উল্লেখ করেন, ‘ইসরায়েলি সূত্রমতে প্রাপ্ত তথ্যেই জানা গেছে অভিযুক্ত ব্যক্তি ইসরায়েলের মিত্র এবং ইহুদি সংঘের দ্বারা ভাড়া করা। তার জন্য হিব্রু ভাষা ও ইহুদিবাদের শিক্ষার বন্দোবস্তও করা হয়।’

এই হামলার সাথে ইসরায়েলের সক্রিয় অংশগ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকার প্রসঙ্গও তাতে তুলে ধরা হয়।

বিপরীতে এই পিটিশনের ব্যাপারে জাতিসংঘের উদ্যোগ ছিল সামান্যই। তারা এই হামলার কেবলমাত্র লৌকিক নিন্দা জানায় এবং ইসরায়েলের প্রতি জেরুজালেমের সম্মান রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়ে একটা রেজুলেশন গ্রহণ করে। স্বভাবসুলভভাবেই ইসরায়েল তা প্রত্যাখান করে।

আজ সেই জঘন্য দিনটির অর্ধশত বর্ষ পেরিয়ে গেল। আজও এর কোনও সুরাহা করতে পারেনি মুসলমান। যেন সেদিন আল্লাহর পবিত্র নামাঙ্কিত প্রত্যেকটা খসে যাওয়া পলেস্তারার সঙ্গে মুসলমানের ঈমানী শক্তিও ধ্বসে গিয়েছিল।

উম্মত সেই ঘটনার পর আজও এই পবিত্র মসজিদের ইজ্জত নিশ্চিত করতে পারে নি! অথচ আমাদের পূর্বপুরুষেরা কেমন ছিলেন?

উসমানীয় সুলতান সুলাইমান আল কানুনি তখন মুসলিম বিশ্বের খলিফা। জেরুজালেম থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে ইস্তাম্বুলে তাঁর রাজধানী। সেখান থেকে নির্বাহী আদেশ প্রেরণ করলেন জেরুজালেমের নগর প্রধানের কাছে। তিরস্কার করে বললেন, আমি জানতে পেরেছি-

১। পবিত্র মসজিদের মধ্য দিয়ে দুধ বিক্রেতারা যাতায়ত করে। মিষ্টি বিক্রেতারাও সিরাশুদ্ধ মিষ্টির পাত্র নিয়ে যায়। চলাচলের সময় পাত্র থেকে দুধ আর মিষ্টির সিরা পড়ে মসজিদে।
২। মসজিদের চারপাশে লোকেরা ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখে। প্রহরীরা এ ব্যাপারে সাবধান নয়।

এইরকম অশোভন আচরণ পবিত্র এই মসজিদের সাথে কী করে হতে পারে? আপনি দ্রুত এর প্রতিবিধান করুন, মসজিদের পবিত্রতায় যাবতীয় ব্যবস্থা নিন।

সুলাইমান আল কানুনি শুধু এটুকু করেই থেমে যান নি। একজন বিচারকও প্রেরণ করেছিলেন। শুধুমাত্র এই সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করতে। সহস্র মাইল দূরে থেকেও তাঁর নজরের বাইরে যেত না আল-কুদসের পবিত্র ভূমি।

শুধু পবিত্র তিন মসজিদের তত্ত্বাবধান তদারকির জন্য পৃথক গোয়েন্দা নজরদারির ব্যবস্থা ছিল সেইসময়। তিনি ছিলেন সে সময় বিশ্বের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যটির শাসক। তবুও সেই পবিত্র ভূমির কোনও অবমাননায় ব্যবস্থা নিতে তাঁর কোনও বিলম্ব হয় নি।

এত দরদ আর খেয়াল ছিল। এভাবে যত ইসলামি শাসকেরা মুসলমানের ক্ষমতার মসনদে এসেছিলেন, সবাই সেই ভূমির সেবা করেছেন।

উমার রা. এর মহান শাসনামলে কুদস (জেরুজালেম) ইসলামি খিলাফতের পতাকাতলে আসে। তাঁর শাসনামলে প্রায় অর্ধ দুনিয়া ইসলামি সম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল, অসংখ্য নগর বিজিত হয়েছিল। কোথাও নিজে গমন করেন নি। কেবল কুদস ছাড়া।

দীর্ঘ চল্লিশ দিনের মরুপথ তিনি পাড়ি দিয়ে নিজে সেই পবিত্র নগরী পৌঁছেছিলেন। নিজ হাতে আল-আকসার স্থানে খ্রিস্টানদের শত শত বছরের ফেলে রাখা আবর্জনার স্তুপ পরিষ্কার করেন। মসজিদের নির্মাণ শুরু করেন।

সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী যখন এরপর আবার ৮৮ বছরের বন্দীশালা থেকে খ্রিস্টানদের হাত থেকে জেরুজালেমের বিজয় এনেছিলেন, সেদিন নিজ হাতে তিনি পবিত্র মসজিদের এক অংশে খৃস্টানদের করে রাখা টয়লেট পরিষ্কার করে গোলাপজলে ধুয়েছিলেন। কুদস নিয়ে উম্মাহর কত পেরেশানি ছিল! কত উদ্বেগ ছিল!

আল্লামা আবুল হাকাম ইবনে বাররাজান আল আন্দালুসি বিখ্যাত আলেম ছিলেন। ৫২২ হিজরিতে তিনি তাঁর তাফসির গ্রন্থের কাজ সমাপ্ত করেন। অর্থাৎ সেবার খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের হাতে জেরুজালেম স্বাধীনতা হারানোর ২৭ বছর পর অর্থাৎ পুনরায় বিজিত হওয়ার ৬১ বছর পূর্বে তিনি তাঁর তাফসিরগ্রন্থ লেখেন।

আর তাতে উল্লেখ ছিল ৫৮৩ হিজরিতে কুদস পুনরায় বিজিত হবে। ৫৮৩ হিজরিতেই সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ূবী কুদস বিজয় করেন। তাঁর ভবিষৎবাণী সত্য প্রমাণিত হয়। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ৫৩৬ হিজরিতে, তাফসির রচনার চৌদ্দ বছর পর, যখন কুদস বিজিত হয় এর ৪৭ বছর পূর্বে।

এটা কি করে সম্ভব হয়েছিল? আসলে ক্রুশেডের মাধ্যমে কুদসের পতনে তিনি এত ব্যথিত ছিলেন, যে মাওলা পাক তাকে কোনও এক পদ্ধতিতে ইলহামের মাধ্যমে কুদস বিজয়ের সুংসবাদ দান করে তাঁর প্রশান্ত করেছিলেন। এত উদ্বেগ, ভালোবাসা কুদসের জন্য তাদের হৃদয়ে ছিল! কেন ছিল? কারণ-

১। কুদসকে আল্লাহ্‌ নিজে অনুগ্রহপ্রাপ্ত ভূমি বলে উল্লেখ করেছেন।

২। কোরআনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৭০ বার কুদসের কথা আছে। অসংখ্য হাদীসে কুদসের মাহাত্ম্য ও সম্মান বর্ণিত আছে।

৩। শত শত নবীর কবর এখানে রয়েছে। অনেক সাহাবার কবর আছে।

৪। আল্লাহ্‌ একে উর্ধ্বলোকের পথ বানিয়েছেন। মিরাজের রাতে এই পথেই আল্লাহ্‌র রাসুল উর্ধ্বলোকে গমন করেছেন এবং দুনিয়ায় ফিরেছেন।

৫। ক্বা’বা ব্যতিরিকে একমাত্র মসজিদ যাকে নাম ধরে আল্লাহ্‌ কোরআনে উল্লেখ করেছেন।

এমনকি প্রথম কেবলা কুদসকেও আমরা হারিয়ে আছি। আজকে উম্মাহর ইতিহাসে সর্বোচ্চ সময় অতিবাহিত হচ্ছে যখন এই পবিত্র ভূমি অপমানিত হয়ে চলেছে! আফসোস না আছে আমাদের সেই যন্ত্রণা, না আছে উদ্বেগ, না আছে ক্ষোভ! বরং এখন সেই ইহুদিবাদীদের সাথে প্রকাশ্য চুক্তি হয়! গোপন আঁতাত থাকে।

১০০ হলো বছর উম্মাহ এই পবিত্র ভূমির সেবা থেকে বঞ্চিত। আমরা নিমগ্ন হয়ে আছি ব্যক্তিগত কাজে। আজ পঞ্চাশ বছর হলো সেই অগ্নিকাণ্ডের! নিজেদের জন্মদিনের খোঁজ আছে, আছে প্রিয়জনেরটারও। কিন্তু সামান্যও স্মরণ নেই পবিত্র এই স্থানের !

বিজ্ঞাপন